লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>ব্যবসায়িক লেনদেন কিংবা ব্যক্তিগত দেনা-পাওনায় চেক ডিজঅনার বা বাউন্স হওয়া বর্তমান সমাজে অত্যন্ত সাধারণ একটি ঘটনা। যখনই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট ১৮৮১ (The Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ১৩৮ ধারায় চেক বাউন্সের মামলা দায়ের হয় বা আদালত থেকে সমন/গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি হয়, তখন আসামির মনে প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি যে আতঙ্ক তৈরি হয় তা হলো—<em>"১৩৮ ধারার মামলা কি জামিনযোগ্য? আমি কি আদালতে গেলে সরাসরি জেলে পাঠানো হবে, নাকি জামিন পাব?"</em> সাধারণ মানুষের এই চরম উদ্বেগ দূর করতে বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ হলো: <strong>১৩৮ ধারার চেক ডিজঅনার মামলা সম্পূর্ণ জামিনযোগ্য (Bailable Offence)।</strong> তবে জামিন পেতে হলে কিছু সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। কীভাবে প্রথম দিনেই নিঃশর্ত জামিন পাবেন, জামিনের বন্ড কত টাকার হয় এবং কীভাবে টাকা পরিশোধ করে মামলাটি প্রত্যাহার করাবেন—তার বিস্তারিত আইনি নির্দেশিকা নিচে দেওয়া হলো। আইনি পরামর্শে: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (CrPC)-এর দ্বিতীয় তফসিল এবং দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট ১৮৮১-এর সংশ্লিষ্ট বিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৩৮ ধারার চেক ডিজঅনার মামলা একটি সুস্পষ্ট জামিনযোগ্য অপরাধ (Bailable Offence)।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬ ধারা অনুযায়ী, জামিনযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি গ্রেফতার হন বা আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন এবং উপযুক্ত জামিনদার দিতে প্রস্তুত থাকেন, তবে জামিন পাওয়া তার আইনগত অধিকার (Bail as a matter of right)। বিজ্ঞ আদালতের এই ক্ষেত্রে জামিন প্রত্যাখ্যান করার সাধারণ কোনো এখতিয়ার থাকে না, যদি না আসামি দীর্ঘদিন পলাতক থেকে আদালতের প্রক্রিয়াকে অশ্রদ্ধা করে থাকেন। তাই চেক বাউন্সের মামলা হলে অযথা ভয়ে পালিয়ে না থেকে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে প্রথম তারিখেই আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিন নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
ব্যাংকে একাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকার কারণে (Insufficient Funds) কিংবা ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত হওয়ার কারণে যদি কোনো ব্যাংক চেক ডিজঅনার বা বাউন্স হয়, তবে এনআই অ্যাক্ট ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারা আকৃষ্ট হয়।
এই ধারায় অপরাধ গঠনের মূল শর্তাবলী হলো:
এই সময়সীমার কোনো একটি দিনও যদি বাদী মিস করেন, তবে মামলাটি আইনত রক্ষণীয় হয় না (Barred by Limitation)।
মামলা দায়েরের পর বিজ্ঞ আদালত সাধারণত প্রথমে আসামির ঠিকানায় সমন (Summons) জারি করেন। অনেক সময় ঠিকানায় সমন না পৌঁছালে বা ডাকপিয়ন সমন ফেরত দিলে আদালত সরাসরি গ্রেফতারি পরোয়ানা (Warrant of Arrest - WA) ইস্যু করেন।
পুলিশের ওয়ারেন্ট বের হয়েছে জানতে পারলে আসামির করণীয়:
আদালতে জামিন গ্রহণের পদ্ধতি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সহজ:
ধাপ ১: ওকালতনামায় স্বাক্ষর: আদালতে উপস্থিত হয়ে আপনার নিযুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর ওকালতনামায় স্বাক্ষর করুন।
ধাপ ২: জামিনের দরখাস্ত প্রস্তুত: আইনজীবী ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৬ ধারার আওতায় আপনার সামাজিক মর্যাদা, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং আপনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তি উল্লেখ করে জামিনের দরখাস্ত টাইপ করাবেন।
ধাপ ৩: আদালতে আত্মসমর্পণ: আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে আইনজীবী আপনাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিজ্ঞ বিচারকের কাছে জামিন প্রার্থনা করবেন।
ধাপ ৪: জামিন মঞ্জুর ও বন্ড দাখিল: ১৩৮ ধারা জামিনযোগ্য হওয়ায় বিজ্ঞ বিচারক আসামির জামিন মঞ্জুর করেন এবং নির্দিষ্ট অঙ্কের বন্ড (সাধারণত ৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা) দাখিলের আদেশ দেন। জামিনদার বন্ডে স্বাক্ষর করলে আদালত আসামিকে মুক্তি দেন।
অধিকাংশ সাধারণ মানুষের মনে এই মারাত্মক ভুল ধারণাটি থাকে যে—"আমার বিরুদ্ধে ৫০ লাখ টাকার চেকের মামলা হয়েছে, তাহলে কি জামিন পেতে আমাকে ৫০ লাখ টাকা বা তার অর্ধেক আদালতে জমা দিতে হবে?"
আইনগত সত্য: বিচারিক আদালতে (Trial Court) জামিন পাওয়ার জন্য চেকের মূল টাকার এক পয়সাও আদালতে জমা দিতে হয় না। জামিন বন্ডের টাকা কোনো নগদ টাকা নয়; এটি কেবল একটি জামিননামা মুচলেকা। চেকের টাকা দিতে হয় মামলার বিচার শেষে যদি আসামি হেরে যান বা আপিল করতে চান তখন। বিচার চলার সময় জামিন পাওয়ার সাথে চেকের আসল টাকা পরিশোধের কোনো সম্পর্ক নেই।
আদালত জামিন মঞ্জুর করার পর জামিননামা বা বেল বন্ড দাখিল করতে হয়। একজন বৈধ জামিনদারের নিম্নলিখিত যোগ্যতা থাকতে হয়:
বিচারিক আদালতে মামলা চলাকালীন কোনো টাকা জমা দিতে না হলেও, বিচারে যদি আসামি দোষী সাব্যস্ত হন এবং সাজা প্রাপ্ত হন, তখন আপিল করার ক্ষেত্রে আইনের একটি কঠোর শর্ত রয়েছে।
এনআই অ্যাক্টের ১৩৮এ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দায়রা জজ আদালতে বা হাইকোর্ট বিভাগে সাজা ও জরিমানার বিরুদ্ধে আপিল করতে চাইলে তাকে অবশ্যই চেকের উল্লিখিত মোট টাকার কমপক্ষে ৫০% (অর্ধেক) অর্থ বিচারিক আদালতে চালানের মাধ্যমে জমা দিয়ে সেই চালানের মূল কপি আপিল মেমোর সাথে সংযুক্ত করতে হবে। ৫০% টাকা জমা না দিলে আপিল আদালত কোনোভাবেই আপিল গ্রহণ বা আসামিকে জামিন প্রদান করতে পারবেন না।
এনআই অ্যাক্ট ১৮৮১-এর ১৪১ ধারার সংশোধনী অনুযায়ী চেক ডিজঅনারের মামলা সম্পূর্ণরূপে আপসযোগ্য (Compoundable)। বাদী ও বিবাদী যদি নিজেদের মধ্যে টাকা লেনদেন মিটিয়ে ফেলতে চান, তবে যেকোনো পর্যায়ে মামলা শেষ করা সম্ভব:
| পর্যায় | আপসের নিয়ম | ফলাফল |
|---|---|---|
| চার্জ গঠনের পূর্বে | বাদী ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪৮ ধারা মতে নালিশ প্রত্যাহারের আবেদন করবেন | আসামি মামলা থেকে তাৎক্ষণিক খালাস (Acquittal) পাবেন |
| সাক্ষ্য বা বিচার চলাকালে | উভয় পক্ষ যৌথভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারা মতে আপসনামা দাখিল করবেন | বিজ্ঞ আদালত আপসনামা গ্রহণ করে আসামিকে বেকসুর খালাস দেবেন |
| রায়ের পরে আপিল পর্যায়ে | আপিল আদালতে আপসনামা ও টাকা প্রাপ্তির রসিদ দাখিল করতে হবে | আপিল আদালত বিচারিক আদালতের সাজার রায় বাতিল করে খালাস প্রদান করবেন |
অনেক সময় দেখা যায় ঋণ নেওয়ার সময় বা ব্যবসার নিরাপত্তার খাতিরে একটি ব্লাঙ্ক সিকিউরিটি চেক দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সম্পূর্ণ ঋণ পরিশোধের পরও চেক ফেরত না দিয়ে বাদী তাতে ইচ্ছামতো বিপুল অঙ্কের টাকা বসিয়ে মিথ্যা মামলা ঠুকে দিয়েছেন।
এই ধরনের মামলায় আসামির ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজি:
চেক বাউন্স ও জামিন সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত:
১. আবুল কাশেম বনাম রাষ্ট্র (58 DLR): মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ অভিমত ব্যক্ত করেন যে, এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলায় আসামি স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাকে নিয়মিত জামিন প্রদান করবেন; চেক মামলার উদ্দেশ্য আসামিকে জেল খাটানো নয়, বরং অর্থের বিরোধ নিষ্পত্তি করা।
২. খোন্দকার মাহতাবউদ্দিন বনাম রাষ্ট্র (49 DLR AD): বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেন যে, সিকিউরিটি হিসেবে প্রদত্ত চেকে যদি বৈধ আর্থিক দায় না থাকে, তবে সাক্ষ্য দ্বারা তা প্রমাণ করার পূর্ণ অধিকার আসামির রয়েছে।
১৩৮ ধারার মামলা একটি সংক্ষিপ্ত ফৌজদারি প্রক্রিয়া। এখানে আদালত কেবল দেখেন চেকটি আসামির কিনা এবং আইনানুগ নোটিশ হয়েছে কিনা। টাকা আদায়ের জন্য বাদী একই সাথে বা পরবর্তীতে দেওয়ানি আদালতে অর্থ জারির মামলা করতে পারেন। ফৌজদারি আদালতে আসামির সাজা হলেও জরিমানার টাকা সরকারি কোষাগারে না গিয়ে বাদীর পাওনা হিসেবে গণ্য হয়।
চেক ডিজঅনার মামলা হলে কখনো পালিয়ে থাকবেন না বা পুলিশ দেখে ভয় পাবেন না। যত দ্রুত সম্ভব একজন অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করে আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিন করিয়ে নিন। জামিন পাওয়ার পর মামলার নথি ও চেকের তারিখ সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করুন। নোটিশের তামাদি লঙ্ঘন হয়েছে কিনা, চেকে কোনো ঘষামাজা আছে কিনা তা চিহ্নিত করতে পারলে প্রথম ধাপেই মামলা বাতিল (Quashment) বা খালাস পাওয়া সম্ভব। আর দেনা যদি সত্যি হয়, তবে আদালতের মাধ্যমে বাদীর সাথে সম্মানজনক কিস্তিতে আপস করে মুক্ত জীবনযাপন করুন।