তালাক না দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করলে কি শাস্তি হয়? দণ্ডবিধি ৪৯৪ ধারা, অনুমতি ছাড়া বিয়ের বিচার ও প্রথম স্ত্রীর আইনি প্রতিকার ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

<p>আমাদের সমাজে এমন অনেক ঘটনা প্রায়শই ঘটে যেখানে স্বামী প্রথম স্ত্রীকে কোনো প্রকার আইনি তালাক না দিয়ে, এমনকি কোনো প্রকার নোটিশ বা মৌখিক পূর্বাভাস না দিয়েই গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার শুরু করেন। আবার কখনো কখনো সামাজিক ও পারিবারিক জটিলতায় স্ত্রীও পূর্ববর্তী স্বামীকে আইনগতভাবে ডিভোর্স না দিয়ে অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী পূর্বের বিবাহ কার্যকর ও বলবৎ থাকা অবস্থায় কোনো পক্ষ যদি পূর্ববর্তী জীবনসঙ্গীকে তালাক না দিয়ে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তবে তা দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী একটি গুরুতর শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ (দ্বিবিবাহ বা Bigamy)। এই অপরাধে আইন অমান্যকারী স্বামীর সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং তদুপরি অর্থদণ্ড হতে পারে। একই সাথে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬ ধারা লঙ্ঘনের কারণে অতিরিক্ত ১ বছরের জেল ও জরিমানা হতে পারে। প্রথম স্ত্রীর কী কী সাংবিধানিক ও দেওয়ানি অধিকার রয়েছে, দেনমোহর কীভাবে এককালীন নগদে আদায় করবেন এবং বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে কীভাবে প্রতিকার পাবেন—তার বিস্তারিত আইনি গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>

দৈনন্দিন আইন পেশায় আমরা সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি নারীদের কাছ থেকে পাই তা হলো—"আমার স্বামী আমাকে কোনো ডিভোর্স না দিয়ে, কোনো ভরণপোষণ না দিয়ে গোপনে আরেকটি মেয়েকে বিয়ে করেছে। আমি কি তাকে জেলে পাঠাতে পারব? আমি কি আমার দেনমোহরের টাকা এখনই পাব?" আবার পুরুষ মক্কেলদের পক্ষ থেকেও প্রশ্ন আসে—"স্ত্রী বাপের বাড়ি গিয়ে আর আসছে না, ডিভোর্সও দিচ্ছে না। আমি কি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারব? করলে কি প্রথম স্ত্রী আমার বিরুদ্ধে মামলা দিতে পারবে?"

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিয়ে শুধুমাত্র একটি সামাজিক বন্ধন নয়, এটি একটি পবিত্র দেওয়ানি চুক্তি (Civil Contract)। এই চুক্তির কিছু সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোনো পক্ষ যদি পূর্বের বিয়েকে আইনি প্রক্রিয়ায় অবসান না ঘটিয়ে নিজের ইচ্ছামতো আরেকটি বিয়ে করে, তবে তা আইনত অপরাধ। এটি কেবল দাম্পত্য বিশ্বাসঘাতকতাই নয়, বরং বাংলাদেশ দণ্ডবিধি এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী সরাসরি আদালত কর্তৃক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইন স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে যে, আগের বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় কোনো পুরুষ চাইলেই দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না এবং কোনো নারীও তার পূর্ববর্তী স্বামীকে ডিভোর্স দেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন না।

বিশেষ করে শিক্ষিত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে এ ধরনের ঘটনা যখন ঘটে, তখন প্রথম স্ত্রী মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। অথচ বাংলাদেশ আইন প্রথম স্ত্রীকে অত্যন্ত কঠোর ও শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা দিয়েছে। যথাযথ প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে পারলে অভিযুক্ত স্বামীকে জেল খাটতে হয় এবং আদালতের মাধ্যমে এককালীন বকেয়া দেনমোহর ও আজীবন মাসিক ভরণপোষণ আদায় করা যায়।

দণ্ডবিধি ১৮৬০ (The Penal Code, 1860)-এর ৪৯৪ ধারা মূলত দ্বিবিবাহ (Bigamy) দমন করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ধারায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে:

"যে ব্যক্তি স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় এমন কোনো অবস্থায় পুনরায় বিবাহ করে, যা উক্ত স্বামী বা স্ত্রীর জীবদ্দশায় সংঘটিত হওয়ার কারণে আইনত বাতিল বা অপরাধ বলে গণ্য হয়, সে ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে।"

এই ধারার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করতে হলে অভিযোগকারী পক্ষকে তিনটি মূল উপাদান বিজ্ঞ আদালতে প্রমাণ করতে হয়:

  • প্রথমত: অভিযুক্ত ব্যক্তির পূর্বে একটি বৈধ বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল এবং সেই বিবাহটি এখনো আইনত বহাল রয়েছে (অর্থাৎ আদালত কর্তৃক বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি বা মুসলিম আইনানুযায়ী কার্যকর তালাক হয়নি)।
  • দ্বিতীয়ত: পূর্বের স্বামী বা স্ত্রী এখনো জীবিত আছেন।
  • তৃতীয়ত: অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রথম স্বামী বা স্ত্রীর জীবদ্দশায় এবং পূর্বের বিবাহ বলবৎ থাকাকালেই দ্বিতীয় বিয়েটি সম্পন্ন করেছেন।

যদি এই তিনটি উপাদান আদালতে দালিলিক প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে বিজ্ঞ বিচারক আসামিকে সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিতে পারেন। এই ধারাটি হিন্দু, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সকল ধর্মের নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য, যেখানে একাধিক বিবাহ ধর্মীয় বা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ।

মুসলিম শরিয়া আইনে পুরুষদের ক্ষেত্রে বিশেষ শর্তসাপেক্ষে একাধিক বিয়ের সুযোগ রাখা হলেও বাংলাদেশের সংবিধিবদ্ধ আইন দ্বারা একে অত্যন্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়েছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961)-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি তার প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকাকালে আরেকটি বিবাহে আবদ্ধ হতে চান, তবে তাকে অবশ্যই স্থানীয় সালিশি পরিষদের (Arbitration Council) নিকট থেকে লিখিত অনুমতি গ্রহণ করতে হবে।

আইন অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

  1. আবেদন দাখিল: স্বামীকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলর বরাবর নির্দিষ্ট ফি দিয়ে লিখিত আবেদন করতে হবে।
  2. কারণ দর্শানো: আবেদনে দ্বিতীয় বিয়ে করার যৌক্তিক কারণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরতে হবে (যেমন: প্রথম স্ত্রীর দীর্ঘস্থায়ী বন্ধ্যাত্ব, মারাত্মক শারীরিক অক্ষমতা বা রোগ, মানসিক ভারসাম্যহীনতা বা দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখতে চরম অপারগতা)।
  3. প্রথম স্ত্রীর সম্মতিপত্র: আবেদনে প্রথম স্ত্রী স্বেচ্ছায় ও সচেতনভাবে দ্বিতীয় বিয়েতে অনুমতি দিয়েছেন কিনা তার লিখিত প্রমাণ বা প্রত্যয়নপত্র যুক্ত করতে হবে।
  4. সালিশি পরিষদ গঠন: চেয়ারম্যান উভয় পক্ষের (স্বামী ও স্ত্রী) নিকট থেকে একজন করে মনোনীত প্রতিনিধি আহ্বান করে সালিশি পরিষদ গঠন করবেন।
  5. তদন্ত ও সিদ্ধান্ত: সালিশি পরিষদ উভয় পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করে যদি সন্তুষ্ট হয় যে দ্বিতীয় বিয়েটি একান্তই ন্যায়সঙ্গত ও অপরিহার্য, কেবল তখনই লিখিত অনুমতিপত্র প্রদান করবে। অন্যথায় আবেদন সরাসরি নাকচ করে দেবে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্বামীরা প্রথম স্ত্রীর কাছে এই বিষয় সম্পূর্ণ গোপন রাখেন এবং সালিশি পরিষদের কোনো অনুমোদন না নিয়েই কাজী অফিসে গিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বা গোপনে বিয়ে করে ফেলেন। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬(৫) ধারা অনুযায়ী কোনো পুরুষ যদি সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করেন, তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দুটি মারাত্মক আইনি বিপদে পড়েন:

⚖️ অনুমতিহীন দ্বিতীয় বিয়ের ২টি প্রধান আইনগত পরিণতি

  • ১. তাৎক্ষণিক কারাদণ্ড: স্বামী ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৬(৫)(ক) ধারা লঙ্ঘনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন এবং অনধিক এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
  • ২. দেনমোহর তাৎক্ষণিক প্রদেয় (Prompt Dower): অধ্যাদেশের ৬(৫)(খ) ধারা অনুযায়ী, বিদ্যমান স্ত্রী বা স্ত্রীগণের সম্পূর্ণ দেনমোহরের টাকা—তা তাৎক্ষণিক দেনমোহর (Prompt) হোক বা বিলম্বিত দেনমোহর (Deferred) হোক—তৎক্ষণাৎ প্রদেয় হবে। স্বামী যদি সেই টাকা নগদে পরিশোধ না করেন, তবে তা বকেয়া ভূমি রাজস্ব আদায়ের মতো (Public Demands Recovery Act) স্বামীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও নিলামের মাধ্যমে আদায় করা যাবে।

অর্থাৎ কাবিননামায় দেনমোহরের টাকা যদি "তলবি" না-ও থাকে, অর্থাৎ স্ত্রী দাবি না করা পর্যন্ত বাকিতে থাকার শর্ত থাকলেও দ্বিতীয় বিয়ে করার মুহূর্ত থেকেই পুরো দেনমোহর নগদ তলবি দেনমোহরে পরিণত হয়। স্বামী এক পয়সাও বাকি রাখার আইনি অধিকার হারিয়ে ফেলেন।

স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন জানতে পারার পর অনেক স্ত্রী মানসিক ভেঙে পড়েন এবং আত্মীয়-স্বজনের ভুল পরামর্শে কোনো কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন না। একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর দৃষ্টিতে প্রথম স্ত্রীর তাৎক্ষণিকভাবে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া অত্যন্ত জরুরি:

পদক্ষেপ ১: বিয়ের দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ: স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামার সার্টিফাইড কপি (নকল) বা বিয়ের রেজিস্ট্রি ভলিউম নম্বর সংগ্রহ করুন। যে নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) মাধ্যমে বিয়ে হয়েছে, সেখানে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে বা আইনজীবীর সহায়তায় কাবিননামার নকল তুলতে হবে। এছাড়া বিয়ের ছবি, দাওয়াতপত্র বা সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা সংরক্ষণ করুন।

পদক্ষেপ ২: রেজিস্ট্রি ডাকযোগে আইনি নোটিশ প্রেরণ: সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে স্বামীকে অবিলম্বে বকেয়া দেনমোহর পরিশোধ এবং অনুমতিহীন দ্বিতীয় বিয়ের কৈফিয়ত তলব করে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। এটি ভবিষ্যতে আদালতে আপনার দাবিকে অত্যন্ত শক্তিশালী করবে।

পদক্ষেপ ৩: স্থানীয় থানায় জিডি বা অবহিতকরণ: স্বামী বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে যদি কোনো প্রকার হুমকি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা জোরপূর্বক তালাকপত্রে সই নেওয়ার চেষ্টা থাকে, তবে দ্রুত স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (GD) দায়ের করে তার রসিদ আইনজীবী মারফত আদালতে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত রাখুন।

অনেক নারী প্রথমে থানায় গিয়ে এজাহার দায়ের করতে চান। কিন্তু থানা পুলিশ প্রায়শই পারিবারিক বিষয় বলে নিয়মিত এফআইআর (FIR) নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। তাই সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো সরাসরি উপযুক্ত আদালতে নালিশি মামলা (CR Case) দায়ের করা।

অভিযোগ দায়েরের ধাপসমূহ:

  • আদালতের এখতিয়ার: যেখানে দ্বিতীয় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে অথবা যেখানে স্বামী ও প্রথম স্ত্রী একত্রে সর্বশেষ বসবাস করেছিলেন, সেই এলাকার বিজ্ঞ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (CJM) বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (CMM) আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।
  • অভিযোগের ধারা: মামলায় একসাথে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১-এর ৬(৫) ধারা যুক্ত করতে হবে।
  • জবানবন্দি গ্রহণ (ধারা ২০০ CrPC): নালিশ দাখিলের পর বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট বাদীর (প্রথম স্ত্রী) শপথপূর্বক মৌখিক জবানবন্দি গ্রহণ করে তা নথিবদ্ধ করবেন।
  • সমন বা ওয়ারেন্ট জারি: প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা ও দ্বিতীয় বিয়ের প্রাথমিক প্রমাণাদি পর্যালোচনা করে বিজ্ঞ আদালত সরাসরি আসামির বিরুদ্ধে সমন (Summons) অথবা গ্রেফতারি পরোয়ানা (Warrant of Arrest) জারি করবেন।
  • বিচার প্রক্রিয়া: আসামিকে আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করতে হয়। সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে আদালত দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড ও জরিমানার আদেশ দেন।

ফৌজদারি মামলায় স্বামীকে জেলে পাঠানো গেলেও স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। তাই ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি সহকারী জজ আদালত তথা বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতে (Family Court) একটি পারিবারিক মোকদ্দমা দায়ের করা অপরিহার্য। পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫ এবং সংশোধিত পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ অনুযায়ী এই মামলা পরিচালনা করা হয়।

পারিবারিক আদালতে স্ত্রী যা যা দাবি করতে পারেন:

  1. সম্পূর্ণ বকেয়া দেনমোহর: কাবিননামায় উল্লিখিত পুরো দেনমোহরের টাকা এককালীন আদায়ের ডিক্রি। ১৯৬১ অধ্যাদেশের ৬(৫)(খ) অনুযায়ী আদালত কোনো ছাড় ছাড়াই এই ডিক্রি প্রদান করেন।
  2. অতীতের বকেয়া খোরপোষ: স্বামী যতদিন যাবত স্ত্রীকে ভরণপোষণ দেননি, তামাদি আইন ও আদালতের এখতিয়ার অনুযায়ী সেই বিগত ৩ বছরের বকেয়া খোরপোষ আদায় করা যায়।
  3. ভবিষ্যৎ মাসিক খোরপোষ: মামলা চলাকালীন অন্তর্বর্তীকালীন এবং মামলার চূড়ান্ত রায়ের পর প্রতি মাসে স্ত্রী ও সন্তানদের জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী উপযুক্ত মাসিক ভরণপোষণ।
  4. সন্তানদের যাবতীয় লেখাপড়া ও চিকিৎসা খরচ: নাবালক সন্তানদের সমস্ত ব্যয়ভার পিতার আয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আদায় করে দেওয়া হয়। স্বামী অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে দেওয়ানি কারাগারে আটক রাখা হয়।

অনেক সময় নারীদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় প্রথম স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় রাগ করে বাপের বাড়ি চলে যান এবং আইনানুগভাবে তালাক নোটিশ জারি না করেই অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। মনে রাখতে হবে, মুসলিম আইনে একজন নারী কখনোই একসাথে একাধিক স্বামীর সাথে বিবাহবন্ধনে থাকতে পারেন না।

আইনি দিক থেকে এর মারাত্মক পরিণতি রয়েছে:

  • দ্বিতীয় বিয়ে সম্পূর্ণ বাতিল (Void): এই ধরনের বিয়ে আইনের চোখে শুরু থেকেই সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং অবৈধ। সমাজে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলেও আইন তাদের বিবাহিত হিসেবে কোনো স্বীকৃতি দেয় না।
  • দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় মামলা: প্রথম স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে সরাসরি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় মামলা করতে পারেন। বিচারে স্ত্রী সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
  • দ্বিতীয় পুরুষের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগ (দণ্ডবিধি ৪৯৭ ধারা): দ্বিতীয় স্বামী যদি জেনে থাকেন যে মেয়েটি বিবাহিত এবং আইনানুগ তালাক হয়নি, তবে প্রথম স্বামী সেই দ্বিতীয় পুরুষের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় ব্যভিচারের (Adultery) মামলা করতে পারেন, যার শাস্তি ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড।

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (CrPC)-এর দ্বিতীয় তফসিল অনুযায়ী দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারার অপরাধটি জামিনযোগ্য (Bailable), আপসযোগ্য (Compoundable with permission of Court) এবং আমল-অযোগ্য (Non-cognizable)।

এর অর্থ হলো:

  • জামিন পাওয়ার সুযোগ: আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন জানালে বিজ্ঞ আদালত সাধারণত জামিন মঞ্জুর করতে পারেন। তবে দ্বিতীয় বিয়ের স্পষ্ট কাবিননামা, প্রথম স্ত্রীর ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ইতিহাস থাকলে বিজ্ঞ বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে জেলে পাঠাতে পারেন।
  • আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে আপস: মামলা চলাকালীন স্বামী যদি নিজের ভুল বুঝতে পেরে প্রথম স্ত্রীর সমস্ত দেনমোহর, বকেয়া খোরপোষ এবং লিখিত শর্ত পূরণ করতে রাজি হন, তবে বিজ্ঞ আদালতের বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে উভয় পক্ষ আপসনামা (সোলেনামা) দাখিল করে মামলা প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করতে পারেন।

অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে এবং খোরপোষ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগের একাধিক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত রয়েছে যা অধস্তন আদালতসমূহের জন্য মান্য বাধ্যতামূলক আইন:

১. জাসমিন সুলতানা বনাম মোঃ ইলিয়াস (50 DLR AD): এই ঐতিহাসিক মামলায় মাননীয় আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণ দেন যে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে করা নারীর মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক মানবাধিকারের ওপর চরম আঘাত। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে প্রথম স্ত্রী স্বামীর সাথে একত্রে বসবাস না করেও সম্পূর্ণ আলাদা থেকে আজীবন খোরপোষ পাওয়ার পূর্ণ আইনি অধিকারী হবেন।

২. মাকসুদা খাতুন বনাম মোঃ সাহাবউদ্দিন (41 DLR): মহামান্য হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় দেন যে, দ্বিতীয় বিয়ে করার অপরাধে স্বামী দণ্ডিত হলেও কাবিননামা অনুযায়ী প্রথম স্ত্রীর দেনমোহরের দাবি কোনোভাবেই বিলুপ্ত হবে না। দেনমোহরের ডিক্রি জারির মাধ্যমে স্বামীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রয় করে অর্থ আদায় করা যাবে।

৩. আব্দুল কাদের বনাম সেলিমা খাতুন (33 DLR): আদালত রায় দেন যে, ১৯৬১ অধ্যাদেশের ৬(৫) ধারা লঙ্ঘনের কারণে স্বামী ফৌজদারি আদালতে দণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও প্রথম স্ত্রী দেওয়ানি ও পারিবারিক আদালতে পৃথকভাবে প্রতিকার চাইতে সম্পূর্ণ স্বাধীন।

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে যে, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে সেই দ্বিতীয় স্ত্রী বা তার সন্তানেরা কোনো সম্পত্তি পায় না। আইনের ব্যাখ্যা কিন্তু ভিন্ন:

বিষয় প্রথম স্ত্রী ও তার সন্তান অনুমতিহীন দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তান
আইনি বৈধতা সম্পূর্ণ বৈধ ও আইনসম্মত প্রথম স্ত্রী বিয়ে শরিয়তমতে অকার্যকর নয়, তবে স্বামী রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধী
দেনমোহর প্রাপ্তি তাৎক্ষণিক সম্পূর্ণ টাকা নগদে আদায়যোগ্য দেনমোহর দাবি করতে পারেন, তবে অগ্রাধিকার পাবে প্রথম স্ত্রী
পিতার সম্পত্তিতে সন্তানের অধিকার ফারায়েজ অনুযায়ী পূর্ণ উত্তরাধিকারী সন্তানদের কোনো দোষ নেই; পিতার সম্পত্তিতে সমান ওয়ারিশি অধিকার পাবে
স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর হিস্যা উভয় স্ত্রী থাকলে মোট ১/৮ অংশ উভয় স্ত্রীর মধ্যে সমান ভাগ হবে প্রথম স্ত্রীর সাথে ১/৮ অংশ যৌথভাবে ভাগ করতে হবে

বিজ্ঞ আদালতে মামলা পরিচালনা করতে গেলে পর্যাপ্ত দালিলিক প্রমাণাদি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত রায় লাভ করা অসম্ভব। আদালতে যাওয়ার আগে নিচের নথিপত্রগুলো প্রস্তুত রাখুন:

  • ১. প্রথম স্ত্রীর মূল নিকাহনামা বা কাবিননামার সার্টিফাইড কপি (তালাক যে হয়নি তার প্রমাণ)।
  • ২. স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের নিকাহনামার সার্টিফাইড কপি অথবা দ্বিতীয় বিয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণপত্র।
  • ৩. দ্বিতীয় বিয়ের কোনো ফটোগ্রাফ, দাওয়াতপত্র বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের প্রমাণ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
  • ৪. ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে প্রত্যয়নপত্র যে স্বামী দ্বিতীয় বিয়ের কোনো পূর্বানুমতি গ্রহণ করেননি।
  • ৫. প্রথম স্ত্রী ও স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং পাসপোর্টের কপি (যদি থাকে)।
  • ৬. আইনজীবীর মাধ্যমে প্রেরিত লিগ্যাল নোটিশ ও ডাক রসিদের মূল কপি।
  • ৭. প্রত্যক্ষদর্শী কমপক্ষে ২ থেকে ৩ জন বিশ্বস্ত সাক্ষীর নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর।

দ্বিতীয় বিয়ের শিকার হওয়া নারীদের ক্ষেত্রে আবেগতাড়িত না হয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কোনো অবস্থাতেই সালিশির নামে কালক্ষেপণ করে আইনি অধিকার নষ্ট হতে দেবেন না। অনেক সময় স্বামী ও তার পরিবার মীমাংসার নাটক সাজিয়ে কালক্ষেপণ করে যাতে মামলার তামাদির সময় পেরিয়ে যায় বা দ্বিতীয় বিয়ের প্রমাণ নষ্ট করা যায়।

মনে রাখবেন, আপনার কাছে যদি দ্বিতীয় বিয়ের দালিলিক প্রমাণ থাকে, তবে আইন শতভাগ আপনার পক্ষে। একজন অভিজ্ঞ ফৌজদারি ও পারিবারিক আইনজীবীর সাথে সরাসরি আলোচনা করে একই সাথে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি নালিশ এবং পারিবারিক আদালতে দেনমোহর ও খোরপোষের মোকদ্দমা দায়ের করুন। এটি স্বামীকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে এবং আপনার সম্মান ও পূর্ণ আর্থিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। কোনো প্রকার অবৈধ চাপে মাথা নত না করে আইনি লড়াই চালিয়ে যান।