বাবার সম্পত্তি বন্টন আইন বাংলাদেশ: বাটোয়ারা মামলা, খতিয়ান ও ফারায়েজ বণ্টনের সম্পূর্ণ গাইড
লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-22 · ২৫ মিনিট
⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়।
সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।
বাংলাদেশে বাবার মৃত্যুর পর পৈতৃক সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে বিরোধ, দখল জটিলতা ও সালিশি প্রতারণা একটি নিত্যদিনের চিত্র। রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ১৭(১)(চ) ধারা অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি ছাড়া মৌখিক ভাগের কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই। আপস সমঝোতা না হলে দেওয়ানি আদালতে নির্ধারিত মাত্র ৩০০ টাকা কোর্ট ফিতে বাটোয়ারা মোকদ্দমা দায়ের করে প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ডিক্রির মাধ্যমে স্বত্ব ও দখল প্রতিষ্ঠা করতে হয়। পৈতৃক সম্পত্তির ফারায়েজ হিসাব, বাটোয়ারা মামলা পরিচালনা, অর্ডার ৩৯ অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩-এর কঠোর সুরক্ষা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold;text-decoration:underline;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর বিস্তারিত নির্দেশিকা নিচে দেওয়া হলো। চেম্বার পরামর্শে সরাসরি কল করুন: <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold;">01712655546</a>।
⚡ সংক্ষেপে তাৎক্ষণিক আইনি সমাধান: বাবার সম্পত্তি বন্টন ও বাটোয়ারা
মৃতের বিধবা স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন (সন্তান থাকলে)। সন্তান না থাকলে পাবেন ১/৪ অংশ।
সন্তানদের মধ্যে ছেলে ও মেয়ের প্রাপ্ত অংশের অনুপাত হবে ২:১ (এক ছেলে দুই মেয়ের সমান অংশ পাবে)।
পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় কোনো সন্তান আইনত পৈতৃক সম্পত্তির কোনো অংশ বা বাটোয়ারা দাবি করতে পারে না।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আপস বণ্টননামা রেজিস্ট্রি না করা পর্যন্ত কোনো শরিকের নামে পৃথক ই-নামজারি খতিয়ান করা আইনত নিষিদ্ধ।
আপস না হলে সহকারী জজ আদালতে ৩০০ টাকার ফিক্সড কোর্ট ফিতে বাটোয়ারা মামলা (Partition Suit) দায়ের করতে হয়।
১. পৈতৃক সম্পত্তি বণ্টনের পূর্বে ৩টি সংবিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা
বাবার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিতে ওয়ারিশদের উত্তরাধিকার স্বত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত হয়। তবে সম্পত্তি মূল ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টনের পূর্বে ৩টি আইনগত দায়িত্ব সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক:
দাফন-কাফনের খরচ মেটানো: মৃতের শেষকৃত্যের যাবতীয় বাস্তবসম্মত খরচ মূল সম্পত্তি থেকে নির্বাহ করতে হবে।
ঋণ ও দেনমোহর পরিশোধ: পিতা কারও কাছে দেনাদার থাকলে বা স্ত্রীর দেনমোহর (Mahr) বাকি থাকলে তা সম্পত্তির মূল অংশ থেকে শতভাগ পরিশোধ করা প্রথম সংবিধিবদ্ধ কাজ।
বৈধ অসিয়ত (Will) বাস্তবায়ন: কোনো অ-ওয়ারিশের নামে বৈধ অসিয়ত থাকলে, ঋণ শোধের পর অবশিষ্ট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. মুসলিম ফারায়েজ আইন অনুযায়ী মূল অংশীদারদের সুনির্দিষ্ট হিস্যা
কোরআনিক বিধান ও মুসলিম ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত অংশ:
স্ত্রীর অংশ: সন্তান বা নাতি-নাতনি থাকলে মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ (১২.৫%)। সন্তান না থাকলে ১/৪ অংশ (২৫%)। একাধিক স্ত্রী থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে এই অংশ সমভাবে ভাগ করে নেবেন।
মায়ের অংশ (মৃতের মা জীবিত থাকলে): সন্তান থাকলে ১/৬ অংশ পাবেন।
পিতার অংশ (মৃতের পিতা জীবিত থাকলে): সন্তান থাকলে নির্ধারিত ১/৬ অংশ পাবেন।
৩. ছেলে ও মেয়ের ২:১ অংশের বাস্তব গাণিতিক হিসাব
নির্দিষ্ট অংশীদারদের হিস্যা বাদ দেওয়ার পর অবশিষ্ট জমি ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে ২:১ অনুপাতে বণ্টিত হয়। অর্থাৎ ১ জন ছেলে যে পরিমাণ জমি পাবে, ১ জন মেয়ে তার অর্ধেক পাবে।
📊 বাস্তব আদালতের ফারায়েজ উদাহরণ:
ধরি, মৃত বাবার রেখে যাওয়া মোট জমির পরিমাণ ১৪০ শতক। ওয়ারিশ: স্ত্রী, ২ ছেলে এবং ৩ মেয়ে। • স্ত্রীর অংশ (১/৮) = ১৭.৫ শতক। • অবশিষ্ট সম্পত্তি = ১৪০ - ১৭.৫ = ১২২.৫ শতক। • মোট শেয়ার পয়েন্ট = (২ ছেলে × ২) + (৩ মেয়ে × ১) = ৪ + ৩ = ৭ পয়েন্ট। • প্রতি পয়েন্টের মান = ১২২.৫ ÷ ৭ = ১৭.৫ শতক। • প্রতিটি ছেলে পাবেন: ১৭.৫ × ২ = ৩৫.০ শতক। • প্রতিটি মেয়ে পাবেন: ১৭.৫ × ১ = ১৭.৫ শতক।
৪. সরকারি ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক ও দেওয়ানি আদালতের খরচ কাঠামো
বণ্টন প্রক্রিয়ায় সরকারি খরচের তালিকা:
আপস বণ্টননামা দলিল: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সম্পত্তির মূল্যায়ন অনুযায়ী ৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা সরকারি ফি।
অ্যাডভোকেট কমিশনার ফি: আদালত নির্ধারিত ১০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা (সহজমিন সাহাম জরিপ ও নকশা প্রস্তুত)।
উত্তরাধিকার সূত্রে ই-নামজারি: সরকারি নির্ধারিত ফি ১,১৫০ টাকা।
৫. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আপস বণ্টননামা দলিল করার নিয়ম
রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ১৭(১)(চ) ধারা অনুযায়ী সহ-শরিকদের আপস বণ্টননামা রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক। দলিলের প্রতিটি সাহামে (অংশে) কে কোন দাগের কোন দিকে কত ফুট জমি পাচ্ছেন তা ট্রেস ম্যাপ (নকশা) এঁকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হয়। দলিল রেজিস্ট্রি হওয়ার পর এসি ল্যান্ড অফিসে আবেদন করে প্রত্যেকের জন্য পৃথক নামজারি খতিয়ান খুলে নেওয়া যায়।
৬. দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলার সম্পূর্ণ ধাপ ও ডিক্রি জারি
আপস না হলে সহকারী জজ আদালতে বাটোয়ারা মামলা করতে হয়। এর প্রধান পর্যায়সমূহ:
আরজি দাখিল ও অর্ডার ৩৯ নিষেধাজ্ঞা: নালিশি জমিতে যেন কেউ নতুন নির্মাণ বা বিক্রি করতে না পারে সেজন্য আরজির সাথে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করা।
প্রাথমিক ডিক্রি (Preliminary Decree): আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে কোন শরিকের কত অংশ তা সাব্যস্ত করে রায় দেন।
অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ: সরজমিনে গিয়ে সরকারি সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মেপে সীমানা ও সাহাম নির্ধারণ করে কমিশনার রিপোর্ট জমা দেওয়া।
চূড়ান্ত ডিক্রি (Final Decree) ও বাটোয়ারা জারি: কমিশনার রিপোর্ট আদালত কর্তৃক অনুমোদিত হয়ে চূড়ান্ত ডিক্রি জারি হয় এবং আদালতের নাজিরের মাধ্যমে লাল নিশান টাঙিয়ে দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
৭. ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩: দখল ও জালিয়াতির প্রতিকার
বাবার সম্পত্তিতে ভাইদের দ্বারা বোনদের বঞ্চিত করা বা ভুয়া ওয়ারিশান সনদ তৈরি বন্ধে ২০২৩ সালের ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এক যুগান্তকারী অস্ত্র:
ভুয়া ওয়ারিশ সনদে জমি রেজিস্ট্রি বা নামজারি: ধারা ৪ ও ৫ অনুযায়ী সরাসরি অজামিনযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ, যার শাস্তি সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড।
জোরপূর্বক দখল বা বাধা সৃষ্টি: ধারা ৮ অনুযায়ী প্রথম শ্রেণীর এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক তদন্ত করে পুলিশ ফোর্স দিয়ে বেদখলকারীকে উচ্ছেদ করে মূল মালিককে দখল ফিরিয়ে দিতে পারেন।
৮. ভুল পদক্ষেপ ও বাটোয়ারা মামলার মারাত্মক আইনি ফাঁদ
⚠️ বাটোয়ারা মামলায় যে ভুলগুলো মামলা খারিজ করে দেয়:
কোনো ওয়ারিশকে বাদ দেওয়া (Defect of Parties): বাবার কোনো একজন ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে মামলা করলে অর্ডার ১ রুল ৯ সিপিসি অনুযায়ী মামলা সরাসরি খারিজ হবে।
আংশিক বাটোয়ারা মামলা (Partial Partition): বাবার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর জমি একই মামলায় অন্তর্ভুক্ত না করলে মামলা অচল হবে।
সাদা কাগজের সালিশি বণ্টন: ইউনিয়ন পরিষদের সাদা কাগজে আপসনামার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। রেজিস্ট্রি বাটোয়ারা ছাড়া ই-নামজারি বাতিল হতে বাধ্য।