বাবার সম্পত্তি বণ্টন: ফারায়িজ আইনে ছেলে-মেয়ের অংশের গাণিতিক হিসেব ও সম্পূর্ণ গাইড

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-08-04

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

<p>পিতা বা বাবার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে কীভাবে বণ্টন হবে, তা মুসলিম সমাজে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। প্রায়শই দেখা যায়, সঠিক আইনি ও ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে বোনেরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। মুসলিম আইনে সম্পত্তি বণ্টনকে 'ফারায়িজ' বা ফরায়েজ বলা হয়, যা পবিত্র কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এই আর্টিকেলে আমরা বাবার সম্পত্তি বণ্টনের আগে পালনীয় কর্তব্য, ফারায়িজ আইন অনুযায়ী স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের অংশের গাণিতিক হিসাব এবং সম্পত্তি বণ্টনের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত ও সহজ ভাষায় আলোচনা করব।</p>

বাবার মৃত্যুর পরপরই তার সম্পূর্ণ সম্পত্তি সরাসরি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করা যায় না। ইসলামি আইন অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দায় পরিশোধ করতে হয়। প্রথমত, মৃত ব্যক্তির সম্মানজনক দাফন-কাফনের ব্যয়ভার বহন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মৃত ব্যক্তির যদি কোনো দেনা বা ঋণ থাকে (যেমন—ব্যাংক লোন, ব্যক্তিগত ধার বা স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহর), তা অবশ্যই ওই সম্পত্তি থেকে পরিশোধ করতে হবে। তৃতীয়ত, তিনি যদি কোনো বৈধ উইল বা ওসিয়ত করে যান, তবে তা কার্যকর করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, কোনো ওয়ারিশের অনুকূলে উইল করা যায় না এবং মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের (১/৩) বেশি সম্পত্তি উইল করা বৈধ নয়। এই তিনটি কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর যে অবশিষ্ট সম্পত্তি বা নিট এস্টেট থাকবে, সেটাই ফারায়িজ অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।

বাবার মৃত্যুর পর ওয়ারিশদের মধ্যে প্রথমেই যিনি তার নির্দিষ্ট অংশ পান, তিনি হলেন মৃত ব্যক্তির স্ত্রী (অর্থাৎ সন্তানদের মা)। মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে স্ত্রীর অংশ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। যদি মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান বা ছেলের ঘরের নাতি-নাতনি বর্তমান থাকে, তবে স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৮ অংশ (আট ভাগের এক ভাগ বা ১২.৫%) পাবেন। আর যদি মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান না থাকে, তবে স্ত্রী মোট সম্পত্তির ১/৪ অংশ (চার ভাগের এক ভাগ বা ২৫%) পাবেন। যদি মৃত ব্যক্তির একাধিক স্ত্রী জীবিত থাকেন, তবে তারা সবাই মিলে এই ১/৮ বা ১/৪ অংশটি নিজেদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে নেবেন।

স্ত্রীর অংশ দেওয়ার পর বাকি যে সম্পত্তি থাকে, তা ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে ভাগ করা হয়। পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসা এর ১১ নম্বর আয়াত অনুযায়ী সাধারণ নিয়ম হলো: 'একজন পুরুষের অংশ দুজন নারীর অংশের সমান।' অর্থাৎ, ভাই ও বোন একত্রে সম্পত্তি পেলে, একজন ভাই যে পরিমাণ সম্পত্তি পাবেন, একজন বোন তার অর্ধেক পাবেন (অনুপাত ২:১)। যদি মৃত ব্যক্তির কোনো ছেলে না থাকে এবং কেবল একজন মেয়ে থাকে, তবে সেই মেয়ে মোট সম্পত্তির অর্ধেক (১/২) পাবেন। আর যদি একাধিক মেয়ে থাকে (এবং কোনো ছেলে না থাকে), তবে তারা একত্রে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) পাবেন। অবশিষ্ট সম্পত্তি তখন 'আসাবা' বা অন্যান্য পুরুষ আত্মীয়রা (যেমন বাবার ভাই বা ভাতিজা) পাবেন।

বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে পরিষ্কার করা যাক। ধরা যাক, রহিম সাহেব মারা যাওয়ার সময় স্ত্রী, ২ ছেলে এবং ১ মেয়ে রেখে গেছেন। তার নিট সম্পত্তির পরিমাণ ৮০ শতাংশ জমি।
১) প্রথমে স্ত্রী পাবেন ১/৮ অংশ। অর্থাৎ, ৮০ শতাংশের ১/৮ = ১০ শতাংশ জমি।
২) অবশিষ্ট থাকে (৮০ - ১০) = ৭০ শতাংশ জমি।
৩) এই ৭০ শতাংশ জমি ২ ছেলে এবং ১ মেয়ের মধ্যে ২:২:১ অনুপাতে ভাগ হবে। (২ ছেলে = ৪ ভাগ, ১ মেয়ে = ১ ভাগ, মোট ৫ ভাগ)।
৪) ১ ভাগ = ৭০ ÷ ৫ = ১৪ শতাংশ।
৫) সুতরাং, মেয়েটি পাবেন ১৪ শতাংশ জমি। আর প্রতিটি ছেলে পাবেন (১৪ × ২) = ২৮ শতাংশ জমি।
হিসাব মিলিয়ে দেখুন: স্ত্রী (১০) + ১ম ছেলে (২৮) + ২য় ছেলে (২৮) + মেয়ে (১৪) = ৮০ শতাংশ জমি। এভাবেই ফারায়িজের নির্ভুল গাণিতিক হিসেব করা হয়।

আমাদের সমাজের একটি অত্যন্ত প্রচলিত ও গর্হিত প্রথা হলো মেয়েদের তাদের পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা। অনেক ভাই মনে করেন যে, বোনকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন, তাই সম্পত্তির ভাগ দিতে হবে না। আবার অনেক বোন পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে ভাইদের কাছে সম্পত্তি দাবি করেন না। কিন্তু ইসলামি আইন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী, কন্যা সন্তানের সম্পত্তির অধিকার সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। কোনোভাবেই তাকে তার ন্যায্য পাওনা থেকে জোরপূর্বক বা প্রতারণার মাধ্যমে বঞ্চিত করা যাবে না। বোনেরা যদি তাদের সম্পত্তি না পান, তবে তারা আইনের আশ্রয় নিয়ে যেকোনো সময় তা আদায় করতে পারেন।

ফারায়িজ অনুযায়ী কার কতটুকু অংশ তা মৌখিকভাবে নির্ধারণ করলেই কাজ শেষ হয় না। আইনিভাবে সম্পত্তির মালিকানা নিরঙ্কুশ করার জন্য সকল ওয়ারিশের সম্মতিতে একটি 'আপোষ বণ্টননামা দলিল' (Partition Deed) সম্পাদন করে তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করতে হবে। এই দলিলে সম্পত্তির ম্যাপ বা স্কেচসহ কোন ওয়ারিশ কোন দিকের জমিটি পাচ্ছেন, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করার পর প্রত্যেক ওয়ারিশকে নিজের নামে ওই জমির নামজারি বা মিউটেশন (Mutation) করে নিতে হবে। নামজারি সম্পন্ন হলেই কেবল সম্পত্তির ওপর পূর্ণ মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়।

অনেক সময় দেখা যায়, ভাইয়েরা বোনদের সম্পত্তি বুঝিয়ে দিচ্ছেন না, অথবা শক্তিশালী কোনো ওয়ারিশ ভালো দামি জমিটি দখল করে রেখেছেন। আপোষে বণ্টননামা করতে কেউ রাজি না হলে ভুক্তভোগী ওয়ারিশের দেওয়ানি আদালতে 'বাটোয়ারা মামলা' (Partition Suit) দায়ের করা ছাড়া কোনো বিকল্প থাকেশে থাকে না। আদালত তখন কোর্ট কমিশনার নিয়োগ করে আমিন দ্বারা জমি পরিমাপ করে প্রত্যেক ওয়ারিশের ফারায়িজ হিস্যা অনুযায়ী সম্পত্তি ভাগ করে ডিক্রি প্রদান করেন। তাই নিজের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনে আইনের আশ্রয় নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

⚖️ আইনি সহায়তা ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন

আপনার আইনি সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম সর্বদা প্রস্তুত। সঠিক আইনি পরামর্শ পেতে আজই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

📞 কল করুন: 01712655546 💬 WhatsApp 📍 চেম্বার ঠিকানা