লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>পারিবারিক সম্পত্তি ও ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত জমিজমার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আবেগঘন প্রশ্ন প্রায় প্রতিটি পরিবারেই দেখা যায়—<em>"বাবার সম্পত্তিতে একজন মেয়ের আইনগত অধিকার ঠিক কতটুকু? যদি কোনো পরিবারে কোনো ছেলে সন্তান না থাকে—কেবল এক বা একাধিক কন্যাসন্তান থাকে—তবে কি সমস্ত সম্পত্তি মেয়েরা পাবে, নাকি মৃত পিতার ভাই-ভাতিজা বা চাচারা এসে সম্পত্তির অংশ নিয়ে যাবে?"</em> এই এক প্রশ্নের পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো পরিবারের পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বোনেদের অধিকারবঞ্চনা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ইসলামি ফারায়েজ আইন (Muslim Law of Inheritance) এবং বাংলাদেশের প্রচলিত উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী কন্যাসন্তানদের অংশ কোরআন শরীফে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ (Sharers) করে দেওয়া হয়েছে। কোনো পরিবারে ভাই না থাকলে চাচা বা ফুফুরা কতটুকু অংশ পান (আসাব্বা বিধান), কোনো পিতা বেঁচে থাকতেই তার কন্যাসন্তানদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কী আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন এবং কীভাবে বঞ্চিত বোনেরা আদালতের মাধ্যমে জমি বুঝে পাবেন—তার পুঙ্খানুপুঙ্খ আইনি বিশ্লেষণ নিচে উপস্থাপন করা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
আমাদের দেশের গ্রামীণ ও মফস্বল সমাজে আজও অনেক পরিবারে অত্যন্ত কুৎসিত একটি মানসিকতা বিরাজ করে যে—"মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে, তারা তো পরের বাড়ি চলে গেছে, বাবার সম্পত্তিতে তাদের আর কিসের অধিকার?" ভাইয়েরা বোনদের ফাঁকি দিয়ে বাবার সমস্ত জমি নিজেরা ভাগবাটোয়ারা করে ভোগদখল করে এবং নামজারি করিয়ে নেয়।
কিন্তু ইসলামিক ফারায়েজ আইন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী কন্যাসন্তানের অধিকার কোনো পুরুষের অনুকম্পা বা দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি পবিত্র কোরআন দ্বারা সরাসরি নির্ধারিত অলঙ্ঘনীয় জন্মগত অধিকার। বোনকে তার প্রাপ্য সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা একটি মারাত্মক ধর্মীয় পাপ এবং প্রচলিত আইনে গুরুতর দেওয়ানি ও ফৌজদারি অপরাধ।
মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে মোট ১২ শ্রেণির ওয়ারিশ রয়েছেন যাদের অংশ সরাসরি কোরআন দ্বারা নির্দিষ্ট করা হয়েছে, এদের বলা হয় "জাবিল ফুরুজ" বা কোরআনিক অংশীদার (Sharers)। এই ১২ জনের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলেন কন্যাসন্তান।
পিতা মারা যাওয়ার পর তার কাফন-দাফন, ঋণ পরিশোধ এবং বৈধ ওসিয়ত নিষ্পত্তির পর অবশিষ্ট সম্পত্তিতে কন্যারা তাদের নির্ধারিত অংশ লাভ করেন। কন্যাদের অংশ কোনো অবস্থাতেই অস্বীকার করার এখতিয়ার কোনো পরিবারের নেই।
যদি মৃত পিতার পরিবারে ছেলে এবং মেয়ে উভয়ই থাকে, তবে সুরা নিসার ১১ নম্বর আয়াত অনুযায়ী কন্যারা কোরআনিক অংশীদার থেকে রূপান্তরিত হয়ে "আসাব্বা বিল গাইর" (Residuary with others) হিসেবে গণ্য হয়।
বণ্টনের সাধারণ গাণিতিক নিয়ম:
কোনো পিতার যদি কোনো পুত্রসন্তান না থাকে এবং তিনি কেবল একটিমাত্র কন্যাসন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করেন, তবে সেই একমাত্র মেয়ে বাবার মোট রেখে যাওয়া সম্পত্তির ঠিক অর্ধেক অর্থাৎ ১/২ অংশ (৫০%) কোরআনিক অংশীদার হিসেবে এককভাবে পাবেন।
মৃতের স্ত্রী (মেয়েটির মা) পাবেন ১/৮ অংশ। এর ফলে বাকি থাকে ৩/৮ অংশ। এই অবশিষ্ট অংশটি আসাব্বা হিসেবে মৃত ব্যক্তির পিতা (দাদা), ভাই (মেয়েটির চাচা) বা অন্যান্য রক্তসম্পর্কের পুরুষ ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হবে।
কোনো পিতার যদি কোনো পুত্রসন্তান না থাকে এবং তিনি দুই বা ততোধিক কন্যাসন্তান (যেমন ২ জন, ৩ জন বা ৫ জন মেয়ে) রেখে মারা যান, তবে সমস্ত কন্যারা যৌথভাবে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২/৩ অংশ (৬৬.৬৬%) পাবেন।
এই ২/৩ অংশ সমস্ত বোনদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে। আর স্ত্রী পাবেন ১/৮ অংশ। অবশিষ্ট অংশ আসাব্বা হিসেবে চাচাদের মধ্যে যাবে।
এটি হাজারো কন্যাসন্তান বিশিষ্ট পরিবারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। অনেক পিতা সারাজীবন পরিশ্রম করে জমি বা বাড়ি কেনেন, কিন্তু কোনো ছেলে না থাকার কারণে মৃত্যুর পর তার ভাই বা ভাতিজারা এসে সম্পত্তিতে ভাগ বসায় এবং মেয়েদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেয়।
| পরিবারের কাঠামো | মেয়েদের প্রাপ্য অংশ | চাচা/ভাতিজাদের আইনি অধিকার |
|---|---|---|
| ১টি ছেলে এবং যেকোনো সংখ্যক মেয়ে | ছেলের সাথে ২:১ অনুপাতে অবশিষ্ট সমস্ত অংশ | ০% (শূন্য) — ছেলে থাকলে চাচারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত (Excluded) হয় |
| শুধু ১ জন মেয়ে (কোনো ছেলে নেই) | মোট সম্পত্তির ৫০% (১/২ অংশ) | স্ত্রী ও মেয়ের অংশ বাদে অবশিষ্ট সম্পত্তি চাচারা আসাব্বা হিসেবে পাবেন |
| একাধিক মেয়ে (কোনো ছেলে নেই) | যৌথভাবে ৬৬.৬৬% (২/৩ অংশ) | স্ত্রী ও মেয়েদের অংশ বাদে অবশিষ্ট অংশ চাচারা পাবেন |
একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে ফারায়েজ হিসাবটি বুঝে নেওয়া যাক: জনাব রফিক সাহেব মৃত্যুবরণ করলেন। তিনি রেখে গেছেন স্ত্রী, ২ জন মেয়ে এবং ১ জন আপন ভাই (চাচা)। সম্পত্তি মোট ২৪ শতাংশ জমি।
যদি পরিবারে ভাইয়েরা বোনদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে রাখে বা জমি বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে বোনেরা ঘরে বসে না থেকে বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালতে "বণ্টন মোকদ্দমা" (Partition Suit) দায়ের করতে পারেন।
আদালত আরজি পাওয়ার পর বিরোধীয় সম্পত্তিতে তাৎক্ষণিক স্থিতাবস্থা (Status Quo) দেবেন যাতে ভাইয়েরা জমি বিক্রি করতে না পারে এবং বিচারে বোনদের প্রাপ্য অংশ ফারায়েজ অনুযায়ী আলাদা করে দিয়ে সরকারি আমিন মারফত লাল নিশানা পুঁতে দখল বুঝিয়ে দেবেন।
যেসব পিতার কোনো পুত্রসন্তান নেই এবং তারা চান যে মৃত্যুর পর তাদের প্রিয় কন্যারা যেন এক ইঞ্চি জমিও চাচাদের বা দূরবর্তী আত্মীয়দের সাথে ভাগ করতে বাধ্য না হয়, তারা জীবিত থাকতেই নিচের আইনি পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে পারেন:
মুসলিম আইনে পিতা জীবিত অবস্থায় তার যেকোনো পরিমাণ সম্পত্তি বা সম্পূর্ণ সম্পত্তি স্বেচ্ছায় কন্যাদের নামে হেবা করে দিতে পারেন। ২০০৪ সালের রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধনের পর রক্তসম্পর্কের পিতা কর্তৃক কন্যাদের হেবা করতে মাত্র নামমাত্র সরকারি ফিস (সাধারণত ১০০ থেকে ৫০০ টাকা সরকারি ফি এবং স্ট্যাম্প ফি) লাগে। হেবা দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে এবং কন্যারা নিজ নামে নামজারি সম্পন্ন করলে পিতার মৃত্যুর পর চাচা বা ভাতিজারা সেই সম্পত্তিতে এক পয়সাও দাবি করতে পারবে না।
কন্যাসন্তানদের উত্তরাধিকার ও হেবা সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের পথপ্রদর্শক রায়সমূহ:
১. ফাতেমা বেগম বনাম মোঃ ইসমাইল (48 DLR): সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, বোনদের বাদ দিয়ে ভাইদের প্রস্তুতকৃত কোনো একতরফা নামজারি খতিয়ান আদালতে কোনো স্বত্ব তৈরি করে না; আদালত বঞ্চিত বোনদের হিস্যা শতভাগ পুনর্বহাল করবেন।
২. শামসুন নাহার বনাম আব্দুল কাদের (52 DLR AD): আপিল বিভাগ পরিষ্কার রায় দেন যে, পিতা জীবিতাবস্থায় কন্যাদের সম্পূর্ণ সম্পত্তি হেবা করে দিলে মৃত্যুর পর দূরবর্তী ওয়ারিশদের কোনো আসাব্বা অধিকার তৈরি হয় না।
কন্যাসন্তানরা পরিবারের চোখের মণি। ভাইদের কুদৃষ্টি বা দূরবর্তী আত্মীয়দের লোলুপ দৃষ্টি থেকে কন্যাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি পিতার আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। আপনি যদি শুধু কন্যাসন্তানের জনক হন, তবে কালক্ষেপণ না করে বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে আপনার সম্পত্তি হেবা দলিলের মাধ্যমে কন্যাদের নামে রেজিস্ট্রি করিয়ে দিন। আর বোনেরা যদি পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন, তবে লোকলজ্জা ভুলে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে আপনার কোরআনিক হক বুঝে নিন। আইন আপনার অধিকার রক্ষায় সদা প্রস্তুত।
বাবার মৃত্যুর পর বোনেদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও স্থায়ী আইনি পদক্ষেপ হলো দ্রুত ভূমি অফিসে গিয়ে নিজেদের হিস্যার নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন করা। মৌখিকভাবে ভাইদের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে পরবর্তীতে ভাইয়েরা জমি বিক্রি করে দিতে পারে। নামজারি করার নিয়ম হলো: স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কাউন্সিলর অফিস থেকে সমস্ত ওয়ারিশদের নামযুক্ত মূল ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করা। এরপর land.gov.bd পোর্টালে গিয়ে ই-নামজারি আবেদন দাখিল করতে হবে। আবেদনে বাবার মূল দলিল, সিএস থেকে বিএস পর্যন্ত সমস্ত খতিয়ানের কপি এবং ওয়ারিশ সনদ আপলোড করতে হবে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিন শুনানিতে ভাই-বোন সবাইকে ডাকবেন এবং ফারায়েজ অনুযায়ী বোনদের প্রাপ্য অংশ আলাদা করে দিয়ে একক বা যৌথ নামজারি খতিয়ান অনুমোদন করবেন। নিজের নামে নামজারি খতিয়ান ও প্রতি বছরের খাজনা দাখিলা থাকলে ভাইয়েরা চাইলেও আর কোনোদিন বোনেদের জমি থেকে এক ইঞ্চিও আত্মসাৎ করতে পারবে না।