ব্যাংক লোনের জামিনদার হয়ে সিআইবি ব্ল্যাকলিস্টে নাম? অর্থঋণ আদালত থেকে দায়মুক্তির আইনি উপায়

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-13

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

ভালো মানুষের মতো বন্ধু, ভাই বা ব্যবসায়িক সহযোগীর ব্যাংক ঋণে ব্যক্তিগত জামিনদার (Personal Guarantor) হিসেবে স্বাক্ষর করেছিলেন; এখন মূল ঋণগ্রহীতা টাকা শোধ না করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, আর ব্যাংক আপনার সমস্ত অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে সিআইবি (CIB)-তে খেলাপি বানিয়ে দিয়েছে। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের কষ্টার্জিত সম্পত্তি রক্ষা ও দায়মুক্তির উপায় তুলে ধরেছেন অর্থঋণ বিশেষজ্ঞ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।

জামিনদারের আইনি অবস্থান: চুক্তি আইন ও অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩

চুক্তি আইন ১৮৭২-এর ১২৮ ধারা অনুযায়ী জামিনদারের দায়ভার মূল ঋণগ্রহীতার সাথে সমান ও সমান্তরাল (Co-extensive with that of the principal debtor)। তবে অর্থঋণ আদালত আইন ২০০৩-এর ৬ ধারা অনুযায়ী বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে—ব্যাংক যখন ঋণ আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতে মামলা করে, তখন মূল ঋণগ্রহীতা ও জামিনদার উভয়কেই বিবাদী করতে হয়।

ব্যাংক কি মূল ঋণগ্রহীতাকে ছেড়ে সরাসরি জামিনদারের কাছে টাকা চাইতে পারে?

আদালতের নজির ও অর্থঋণ আদালত আইনের ১৫ ধারা অনুযায়ী—ব্যাংকের নিকট যদি মূল ঋণগ্রহীতার স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক (Mortgage) বা হাইপোথিকেশন থাকে, তবে ব্যাংককে প্রথমে সেই বন্ধকী সম্পত্তি নিলাম বিক্রির মাধ্যমে বকেয়া টাকা আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। বন্ধকী সম্পত্তি নিলাম না করে ব্যাংক সরাসরি ব্যক্তিগত জামিনদারের বসতভিটা বা একাউন্টের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি (CIB) ব্ল্যাকলিস্টের বিপদ ও ব্যবসায়িক ক্ষতি

ঋণ খেলাপির কারণে জামিনদারের নাম বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (CIB)-তে লাল তালিকায় চলে গেলে জামিনদার নিজে কোনো নতুন ব্যাংক ঋণ নিতে পারেন না, ক্রেডিট কার্ড ব্লক হয়ে যায়, এমনকি জাতীয় সংসদ বা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। এটি একটি মারাত্মক নাগরিক ভোগান্তি।

অর্থঋণ আদালতে মামলা দায়ের হলে জামিনদারের প্রথম আত্মরক্ষা

আদালতের সমন পাওয়ার পর আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিত জবাব (Written Statement) দাখিল করতে হবে। সেখানে প্রমাণ করতে হবে যে মূল ঋণগ্রহীতার পর্যাপ্ত সম্পত্তি রয়েছে যা দিয়ে সম্পূর্ণ ঋণ শোধ সম্ভব এবং জামিনদারের সই নেওয়ার সময় ব্যাংক কোনো জালিয়াতি বা অসত্য তথ্য উপস্থাপন করেছিল কি না তা চ্যালেঞ্জ করতে হবে।

মূল ঋণগ্রহীতার মর্টগেজ সম্পত্তি আগে নিলাম করানোর আইনি বাধ্যবাধকতা

অর্থঋণ আদালত আইনের ৩৩ ধারায় ব্যাংক যখন ডিক্রি কার্যকরের জন্য নিলামের উদ্যোগ নেয়, তখন জামিনদারের আইনজীবী আবেদন করবেন যাতে মূল ঋণগ্রহীতার সম্পত্তি আগে নিলামে তোলা হয়। নিলামের টাকায় ব্যাংকের দেনা পরিশোধ হয়ে গেলে জামিনদার সম্পূর্ণ দায়মুক্ত ঘোষণা পান।

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশনের মাধ্যমে সিআইবি ক্লিয়ারেন্স

যদি দেখা যায় ব্যাংক আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণ না করে বেআইনিভাবে জামিনদারের নাম সিআইবিতে ঝুলিয়ে রেখেছে, তবে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করা যায়। হাইকোর্ট বিভাগ প্রাথমিক শুনানি শেষে জামিনদারের সিআইবি স্ট্যাটাস সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন, যাতে তিনি স্বাভাবিক ব্যাংকিং লেনদেন চালিয়ে যেতে পারেন।

ভবিষ্যতে জামিনদার হওয়ার আগে যে ভুল কখনোই করবেন না

কাউকে ভালোবেসে জামিনদার হওয়ার আগে সতর্ক থাকুন:

  1. ফাঁকা বা ব্ল্যাঙ্ক কোনো গ্যারান্টি ফরমে সই করবেন না।
  2. ঋণের সর্বোচ্চ সিলিং কত তা নিশ্চিত না হয়ে কোনো নথিতে সই দেবেন না।
  3. মূল ঋণগ্রহীতার পর্যাপ্ত মর্টগেজ ব্যাংকে আছে কি না তা নিজ চোখে যাচাই করুন।