বাড়ি ভাড়া আইন ২০২৬ — বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া চুক্তি, অগ্রিম জামানত ও উচ্ছেদের সঠিক আইনি নিয়ম

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

<p>শহরাঞ্চলে ফ্ল্যাট, বাসা বা বাণিজ্যিক দোকান ভাড়া নিয়ে বসবাসকারী কিংবা ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রায় প্রতিটি মানুষেরই সাধারণ জীবনের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো বাড়িওয়ালার খামখেয়ালিপনা। হঠাৎ করে কোনো নোটিশ ছাড়া ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া, পানি বা গ্যাসের সংযোগ কেটে দেওয়ার হুমকি, ৩ থেকে ৬ মাসের বিপুল অঙ্কের অগ্রিম জামানত দাবি করা এবং সামান্য অজুহাতেই পরশু দিনের মধ্যে বাসা ছেড়ে দেওয়ার বেআইনি নির্দেশ—এসবই দৈনন্দিন জীবনের নির্মম বাস্তবতা। অন্যদিকে অনেক বাড়িওয়ালাও এমন দুষ্টু ভাড়াটিয়ার খপ্পরে পড়েন যারা মাসের পর মাস ভাড়া দেয় না, অবৈধ কর্মকাণ্ড চালায় এবং ফ্ল্যাট দখল করে রাখে। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে বাংলাদেশে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী আইন বিদ্যমান রয়েছে, যার নাম <strong>বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১ (The Premises Rent Control Act, 1991)</strong>। আইন অনুযায়ী কোনো বাড়িওয়ালা চাইলেই ১ মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নিতে পারেন না এবং লিখিত নোটিশ ও আদালতের ডিক্রি ছাড়া কোনো ভাড়াটিয়াকে বলপূর্বক উচ্ছেদ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ। বাড়ি ভাড়ার লিখিত চুক্তির নিয়ম, মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ এবং উচ্ছেদ মোকদ্দমার পূর্ণাঙ্গ আইনি রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ Shah Alam</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>

আমাদের দেশের শহরগুলোতে লক্ষ লক্ষ পরিবার ভাড়াবাড়িতে বসবাস করেন। বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার সম্পর্ক যাতে কোনো ধরনের শোষণ বা জোরজুলুমের শিকার না হয়, সে জন্য ১৯৯১ সালে প্রণীত হয় বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১।

এই আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো ভাড়াটিয়াদের অযৌক্তিক উচ্ছেদ ও অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং একই সাথে বাড়িওয়ালার নিয়মিত ন্যায্য ভাড়া প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। আইনটি আবাসিক বাসা, বাণিজ্যিক দোকান, ফ্ল্যাট এবং গুদাম—সকল ধরনের ভাড়াকৃত স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য।

বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো মুখে মুখে কথা বলে বাসায় উঠে যাওয়া। মৌখিক চুক্তির কোনো আইনগত মূল্য থাকে না। একটি আদর্শ ভাড়া চুক্তি অবশ্যই ন্যূনতম ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিতভাবে সম্পাদন করতে হবে।

চুক্তিপত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে:

  • মাসিক প্রকৃত ভাড়ার পরিমাণ (কথায় ও অংকে) এবং প্রতি মাসের কত তারিখের মধ্যে ভাড়া প্রদেয়।
  • বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি এবং সার্ভিস চার্জ (Service Charge) ভাড়ার অন্তর্ভুক্ত নাকি পৃথক।
  • অগ্রিম জামানতের সঠিক টাকার পরিমাণ এবং বাসা ছাড়ার সময় তা কীভাবে সমন্বয় বা ফেরত হবে।
  • চুক্তির সুনির্দিষ্ট মেয়াদ (সাধারণত ১১ মাস বা ২ বছর)।
  • বাসা ছাড়তে চাইলে উভয় পক্ষের কতদিনের লিখিত নোটিশ দিতে হবে তার স্পষ্ট শর্ত।

বাস্তব সমাজে দেখা যায় বাড়িওয়ালারা বাসা ভাড়ার সময় ৩ মাস, ৬ মাস এমনকি বাণিজ্যিক দোকানের ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকার অগ্রিম জামানত দাবি করেন।

📜 ধারা ১০: ১ মাসের বেশি অগ্রিম জামানত গ্রহণ বেআইনি

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১-এর ১০(১) ধারায় পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে—"কোনো ব্যক্তি কোনো বাড়ির জন্য এক মাসের ভাড়ার অতিরিক্ত কোনো প্রিমিয়াম, সালামি বা জামানত হিসেবে অন্য কোনো অর্থ গ্রহণ বা দাবি করিতে পারিবেন না।" কোনো বাড়িওয়ালা যদি জোর করে অতিরিক্ত অগ্রিম গ্রহণ করেন, তবে তিনি আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং ভাড়াটিয়া উক্ত অতিরিক্ত টাকা মাসিক ভাড়ার সাথে সমন্বয় করে নিতে পারেন।

আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী ভাড়াটিয়া প্রতি মাসে ভাড়া পরিশোধ করার সাথে সাথে বাড়িওয়ালা সইযুক্ত আনুষ্ঠানিক ভাড়ার রসিদ (Rent Receipt) দিতে আইনত বাধ্য। অনেক বাড়িওয়ালা ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার জন্য বা প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে রসিদ দিতে চান না। মনে রাখবেন, রসিদ না দেওয়া আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধ। ভাড়াটিয়া ব্যাংকের মাধ্যমে বা বিকাশে ভাড়া পাঠালে সেই ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও ট্রানজেকশন আইডিও আদালতে বৈধ রসিদ হিসেবে গ্রাহ্য হয়।

আইনের ৭ ও ১৫ ধারা অনুযায়ী এলাকাভিত্তিক উপযুক্ত মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণের ক্ষমতা বিজ্ঞ রেন্ট কন্ট্রোলারের (Rent Controller) হাতে ন্যস্ত। বাড়িওয়ালা প্রতি বছর বছর নিজের ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়াতে পারেন না। মানসম্মত ভাড়া একবার নির্ধারিত হলে পরবর্তী দুই বছর পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি সম্পূর্ণ বেআইনি। বাড়িওয়ালা যদি কোনো সংস্কার বা আধুনিকীকরণ না করেন, তবে দুই বছরের মধ্যে ভাড়া বৃদ্ধির দাবি আইনত সম্পূর্ণ অচল।

অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে দ্রুত তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেন, পানির মেইন সুইচ বন্ধ করে দেন বা গ্যাসে তালা লাগিয়ে দেন।

বাড়ি ভাড়া আইনের ১৭ ও ২৬ ধারা অনুযায়ী এটি একটি চরম দণ্ডনীয় অপরাধ। কোনো বাড়িওয়ালা উপযুক্ত কারণ ছাড়া ভাড়াটিয়ার গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানি সরবরাহ বন্ধ করলে বিজ্ঞ রেন্ট কন্ট্রোলার আদালত বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে ফৌজদারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন এবং অবিলম্বে সরকারি সংযোগ পুনর্বহালের নির্দেশ দিতে পারেন।

বাড়িওয়ালা চাইলেই যেকোনো মুহূর্তে কোনো কারণ ছাড়া ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করতে পারেন না। আইনের ১৮ ধারা অনুযায়ী কেবল নিচের সুনির্দিষ্ট কারণগুলো প্রমাণিত হলেই আদালত উচ্ছেদের ডিক্রি দেন:

উচ্ছেদের বৈধ কারণ আইনি ধারা শর্তাবলী ও প্রমাণের দায়
ভাড়া খেলাপ (Default of Rent) ধারা ১৮(১)(ক) পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হলে
সাবলেট প্রদান (Sub-letting) ধারা ১৮(১)(খ) বাড়িওয়ালার লিখিত সম্মতি ছাড়া অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষকে ভাড়া দিলে
বাড়িওয়ালার নিজস্ব সদ্ব্যবহার (Bona fide Need) ধারা ১৮(১)(গ) বাড়িওয়ালা বা তার পরিবারের বসবাসের জন্য বাড়িটির প্রকৃত প্রয়োজন হলে
অসামাজিক বা অবৈধ কার্যকলাপ ধারা ১৮(১)(ঘ) ফ্ল্যাটে মাদক ব্যবসা, জুয়া বা প্রতিবেশীদের উৎপাত (Nuisance) সৃষ্টি করলে

কোনো বাড়িওয়ালা যদি উপযুক্ত কারণেও ভাড়াটিয়াকে বাসা ছাড়তে বলতে চান, তবে তাকে অবশ্যই সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ (Transfer of Property Act, 1882)-এর ১০৬ ধারা অনুযায়ী লিখিত নোটিশ দিতে হবে:

  • আবাসিক বাসার ক্ষেত্রে: ন্যূনতম ১৫ (পনেরো) দিনের মেয়াদ দিয়ে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ পাঠাতে হবে।
  • বাণিজ্যিক দোকান বা কারখানার ক্ষেত্রে: ন্যূনতম ৬ (ছয়) মাসের মেয়াদ দিয়ে নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক।

নোটিশ ছাড়া বা হঠাৎ করে এক সপ্তাহের মৌখিক হুকুমে বাসা ছাড়তে বাধ্য করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

নোটিশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যদি কোনো ভাড়াটিয়া বাসা না ছাড়ে, তবে বাড়িওয়ালা নিজে গিয়ে মালামাল ফেলে দিতে বা তালা লাগাতে পারেন না। বাড়িওয়ালাকে বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালত তথা রেন্ট কন্ট্রোলার আদালতে "উচ্ছেদ মোকদ্দমা" (Eviction Suit) দায়ের করতে হয়। বিচারে উচ্ছেদ ডিক্রি হওয়ার পর আদালতের নাজির ও পুলিশের সহায়তায় মালামাল বের করে দখল পুনরুদ্ধার করতে হয়।

অনেক চতুর বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াকে খেলাপী বানিয়ে উচ্ছেদ করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ভাড়া গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এই ফাঁদ থেকে বাঁচার জন্য আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী ভাড়াটিয়া মানি অর্ডার যোগে বাড়িওয়ালার ঠিকানায় ভাড়া পাঠাবেন। বাড়িওয়ালা মানি অর্ডার ফেরত দিলে ভাড়াটিয়া বিজ্ঞ রেন্ট কন্ট্রোলার আদালতে সরাসরি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে মাসিক ভাড়া জমা (Deposit of Rent in Court) দিতে পারেন। আদালতে ভাড়া জমা রাখলে ভাড়াটিয়া কখনোই খেলাপী হবেন না এবং তাকে কোনোভাবেই উচ্ছেদ করা যাবে না।

বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের দিকনির্দেশনা:

১. মোঃ নুরুল হক বনাম মোহাম্মদ আলী (43 DLR): সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, বলপ্রয়োগ করে কোনো ভাড়াটিয়ার বিদ্যুৎ বা পানির লাইন কাটা সংবিধানের মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন; বিজ্ঞ আদালত অবিলম্বে লাইন পুনর্বহালের নির্দেশ দেবেন।

২. মমতাজ বেগম বনাম খলিলুর রহমান (48 DLR AD): আপিল বিভাগ পরিষ্কার করেছেন, নিজস্ব প্রয়োজনে উচ্ছেদ চাইতে হলে বাড়িওয়ালাকে প্রমাণ করতে হবে যে তার সত্যি বসবাসের জন্য বিকল্প কোনো ফ্ল্যাট নেই।

বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়া যে পক্ষই হোন না কেন, নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলুন:

  • ১. ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে উভয় পক্ষের ছবিযুক্ত স্পষ্ট ভাড়াচুক্তি স্বাক্ষর করুন।
  • ২. প্রতি মাসে ভাড়া পরিশোধের সাথে সাথে সইযুক্ত ভাড়ার রসিদ গ্রহণ বা প্রদান করুন।
  • ৩. ১ মাসের বেশি অগ্রিম জামানত দেওয়া বা নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
  • ৪. কোনো বিরোধ দেখা দিলে গায়ে হাত বা মারামারিতে না জড়িয়ে দ্রুত আইনজীবীর মাধ্যমে লিগ্যাল নোটিশ দিন।
  • ৫. আইনসম্মত উপায়ে রেন্ট কন্ট্রোলার আদালতের মাধ্যমে সমস্ত পাওনা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করুন।

বাড়িওয়ালা বা ভাড়াটিয়ার মধ্যে ভাড়া বা বাসা ছাড়া নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে অনেক সময় বাড়িওয়ালা স্থানীয় থানায় গিয়ে পুলিশ নিয়ে আসেন এবং পুলিশ সদস্যকে দিয়ে মালামাল বের করার চাপ দেন। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পুলিশ অফিসারদের স্পষ্ট আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে: বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়ার বিরোধ সম্পূর্ণরূপে একটি দেওয়ানি বিষয় (Civil Matter)। আদালতের উচ্ছেদ ডিক্রি ছাড়া কোনো পুলিশ অফিসারের ক্ষমতা নেই কারো ঘরের তালা ভেঙে মালামাল ফেলে দেওয়ার। তবে যদি কোনো পক্ষ অন্য পক্ষকে শারীরিকভাবে মারধর, প্রাণনাশের হুমকি বা ঘরে অনধিকার প্রবেশের (Criminal Trespass) চেষ্টা করে, কেবল তখনই শান্তিরক্ষার স্বার্থে থানায় ফৌজদারি ধারায় সাধারণ ডায়েরি (GD) বা নিয়মিত মামলা করা যায়। পুলিশ কেবল শান্তি বজায় রাখতে বাধ্য করতে পারে, কিন্তু উচ্ছেদ করতে হলে বাড়িওয়ালাকে দেওয়ানি রেন্ট কন্ট্রোলার কোর্টেই যেতে হবে। যেকোনো অন্যায় পুলিশি হয়রানির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে রিট পিটিশন দায়েরের সুযোগ রয়েছে।