পৈতৃক জমি বণ্টন বা ভাগ করতে না চাইলে বাটোয়ারা মামলা করার সঠিক নিয়ম ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-10

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

পৈতৃক বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমিজমা নিয়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারেই মারাত্মক জটিলতা ও অসন্তোষ দেখা দেয়। বিশেষ করে ভাইয়েরা মিলে বোনদের জমি দিতে টালবাহানা করা, সৎ ভাই-বোনের হক মেরে খাওয়া কিংবা প্রভাবশালী শরিকের পুরো সেরা জমি দখলে রাখার ঘটনা অহরহ ঘটছে। শরিকরা যখন আপস বণ্টনে (Family Settlement) রাজি হয় না বা রেজিস্ট্রি বণ্টননামা করতে অস্বীকার করে, তখন দেওয়ানি আদালতের শরণাপন্ন হয়ে বাটোয়ারা মামলা (Partition Suit) দায়ের করাই একমাত্র আইনসম্মত ও চূড়ান্ত সমাধান। একটি সঠিক বাটোয়ারা মামলার মাধ্যমেই প্রত্যেকে তার আইনসম্মত হিস্যা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত জমি (সাহাম) বুঝে পেতে পারেন। জানুন বাটোয়ারা মামলার ধাপসমূহ, কোর্ট ফি এবং দখল বুঝে পাওয়ার পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা।

পৈতৃক সম্পত্তিতে যতক্ষণ পর্যন্ত রেজিস্ট্রি বণ্টন দলিল (Registered Partition Deed) অথবা আদালতের বণ্টন ডিক্রি না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সকল ওয়ারিশ যৌথভাবে উক্ত সম্পত্তির প্রতিটি ধূলিকণায় অংশীদার থাকেন। তবে নিচের পরিস্থিতিতে বাটোয়ারা মামলা দায়ের করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে:

  • আপস বণ্টনে শরিকদের অসম্মতি: বারবার পারিবারিক সালিশ বা পঞ্চায়েত বৈঠক করার পরও কোনো এক বা একাধিক শরিক জমি পরিমাপে বা রেজিস্ট্রি দলিলের খরচে অংশ না দিলে।
  • রাস্তার ধারের ভালো জমি জবরদখল: প্রভাবশালী কোনো শরিক নিজে রাস্তার পাশের মূল্যবান জমি আটকে রেখে অন্যদের পেছনের বা নিচু জমি নিতে বাধ্য করলে।
  • তৃতীয় পক্ষের কাছে অবৈধ বিক্রি: অন্য ওয়ারিশদের না জানিয়ে গোপনে সম্পত্তিতে নিজের অংশের চেয়ে বেশি জমি বিক্রি করার অপচেষ্টা চালালে।
  • নামজারি বা মিউটেশন জটিলতা: সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত না থাকায় ভূমি অফিসে পৃথক খতিয়ান বা নামজারি আবেদন আটকে গেলে।

অন্যান্য দেওয়ানি মামলার তুলনায় বাটোয়ারা মামলার চরিত্র সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। এটি মূলত দুটি স্বতন্ত্র ধাপে নিষ্পন্ন হয়:

📌 বাটোয়ারা ডিক্রির দুটি রূপ

১. প্রাথমিক ডিক্রি (Preliminary Decree): আদালত আরজি ও মূল দলিলের ভিত্তিতে মুসলিম বা হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী কোন ওয়ারিশের কত আনা বা শতাংশ প্রাপ্য (হিস্যা) তা নির্ধারণ করে রায় দেন।
২. চূড়ান্ত ডিক্রি (Final Decree): হিস্যা নিশ্চিত হওয়ার পর আদালতের নিযুক্ত সরকারি সার্ভেয়ার সরেজমিনে গিয়ে জমি মেপে কার জমি কোন দিকে পড়বে তা সীমানা পিলার দিয়ে আলাদা করে ম্যাপ তৈরি করেন, যা আদালত অনুমোদন করে চূড়ান্ত ডিক্রি প্রদান করেন।

পৈতৃক জমি ভাগের দুটি পদ্ধতির সুবিধা ও অসুবিধার তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:

বিবেচ্য বিষয়আপস বণ্টন দলিল (রেজিস্ট্রি)আদালতে বাটোয়ারা মোকদ্দমা
শরিকদের সম্মতি১০০% শরিকের একমত হওয়া এবং সাব-রেজিস্ট্রারে স্বাক্ষর দেওয়া আবশ্যকএকজন শরিকও রাজি না থাকলে অন্য শরিক একা মামলা করতে পারেন
আইনি বাধ্যবাধকতাপারিবারিক সম্মতির ওপর নির্ভরশীলআদালতের ডিক্রি অমান্য করলে পুলিশি সাহায্যে সীমানা বুঝিয়ে দেওয়া হয়
খরচের ধরনসাব-রেজিস্ট্রি ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক ও দলিলের নির্ধারিত ট্যাক্সনির্দিষ্ট ফিক্সড কোর্ট ফি ও কমিশনারের সরকারি পারিশ্রমিক
পরবর্তী বিরোধের ঝুঁকিপরবর্তীতে কোনো ওয়ারিশ দলিল চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ খুঁজতে পারেআদালতের ডিক্রি স্থায়ী হওয়ায় ভবিষ্যতে কোনো শরিক দাবি তুলতে পারে না

আদালত ফি আইন অনুযায়ী বাটোয়ারা মামলায় যদি বাদী কেবল তার নিজের অংশের পৃথক বণ্টন দাবি করেন এবং দখলচ্যুত না হয়ে থাকেন, তবে নির্দিষ্ট অঙ্কের ফিক্সড কোর্ট ফি (Fixed Court Fee) প্রদান করতে হয়। তবে বাদী যদি পুরোপুরি বেদখল থাকেন, তবে অ্যাডভেলোরেম (মূল্যানুপাতিক) কোর্ট ফি লাগতে পারে।

মামলা দায়েরের পূর্বে নিচের কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে:

  • মূল খতিয়ানসমূহ (সিএস, এসএ, আরএস এবং বিএস/সিটি জরিপ খতিয়ান)।
  • পৈতৃক মূল ক্রয় বা হেবা দলিল এবং সংশ্লিষ্ট বায়া দলিলসমূহ।
  • স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত মূল ওয়ারিশান সনদপত্র।
  • শরিকদের পূর্ণাঙ্গ নাম, ঠিকানা এবং জীবিত বা মৃত ওয়ারিশদের সঠিক পরিচিতি।

প্রাথমিক ডিক্রি হওয়ার পর বিজ্ঞ আদালত একজন বিজ্ঞ আইনজীবী ও অভিজ্ঞ আমিন সমন্বয়ে গঠিত 'অ্যাডভোকেট কমিশনার' নিয়োগ করেন। কমিশনার নোটিশ জারি করে সকল পক্ষকে নির্দিষ্ট দিনে জমিতে উপস্থিত থাকতে বলেন।

কমিশনার সরেজমিনে জমির চারদিকের সীমানা, রাস্তা, পুকুর বা বসতভিটা মেপে কার ভাগে কতটুকু জমি পড়বে তার বিস্তারিত স্কেচ ম্যাপ ও প্রতিবেদন (সাহাম বণ্টন) আদালতে জমা দেন। কোনো পক্ষ আপত্তি জানালে আদালত শুনানি করে নিষ্পত্তি করেন এবং চূড়ান্ত ডিক্রি অনুমোদন করেন। এই ডিক্রির বলেই সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে আপনার একক নামে খতিয়ান তৈরি হয়।

⚖️ পৈতৃক জমি বণ্টন ও বাটোয়ারা মামলায় অভিজ্ঞ সহায়তা

বাটোয়ারা মামলায় কোনো একজন ওয়ারিশ ভুলবশত বাদ পড়লে পুরো মামলা বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবীর পরামর্শে নির্ভুল ওয়ারিশ তালিকা ও খতিয়ান মিলিয়ে মামলা দায়ের করা আবশ্যক। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম আপনার পৈতৃক সম্পত্তির ন্যায়সঙ্গত হিস্যা ও দখল নিশ্চিত করতে বিশ্বস্ততার সাথে পাশে আছেন।

সরাসরি চেম্বার পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন:
📞 ফোন / হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৭১২৬৫৫৫৪৬ (01712655546)
📍 চেম্বার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন, ঢাকা।

পৈতৃক বা যৌথ সম্পত্তিতে একজন শরিক যখন অন্য শরিকদের না জানিয়ে বাইরের কোনো তৃতীয় ব্যক্তির কাছে জমি বিক্রি করতে উদ্যত হন, তখন রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ (SAT Act)-এর ৯৬ ধারা এবং দেওয়ানি কার্যবিধির আওতায় সহ-শরিকদের 'অগ্রক্রয়াধিকার' বা হকশুফা কার্যকর হয়। বাটোয়ারা মামলার আরজিতে যদি কোনো শরিকের অবৈধ বিক্রির আশঙ্কা উল্লেখ করে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়, তবে আদালত তাৎক্ষণিক আদেশ দেন যাতে কোনো পক্ষই তৃতীয় পক্ষের কাছে জমি বিক্রি, হস্তান্তর বা রূপান্তর করতে না পারে। কোনো শরিক যদি গোপনে কোনো জমি বিক্রি করেও ফেলেন, তবে অন্যান্য শরিকরা আদালতে দলিলের মূল্যের সাথে আইন নির্ধারিত ২৫% ক্ষতিপূরণ জমা দিয়ে উক্ত জমি নিজেদের নামে রেজিস্ট্রি করিয়ে নেওয়ার আইনি অধিকার রাখেন।

বাটোয়ারা মামলার চূড়ান্ত ডিক্রি পাওয়ার পরও যদি প্রভাবশালী শরিক জমি ছাড়তে অস্বীকার করে, তবে দেওয়ানি কার্যবিধির ২১ আদেশের ৩৫ নিয়ম অনুযায়ী জেলা জজ আদালতে 'ডিক্রি জারি মামলা' (Execution Case) করতে হয়। আদালত থেকে একজন নাজির, সরকারি সার্ভেয়ার এবং স্থানীয় থানার সশস্ত্র পুলিশ ফোর্স ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। সার্ভেয়ার আদালতের অনুমোদিত সাহাম বা নকশা অনুযায়ী জমি মেপে চার কোণায় লাল নিশান ও সীমানা পিলার বসিয়ে দেন। যদি জমিতে কোনো অবৈধ কাঁচা বা পাকা স্থাপনা থাকে, তবে সরকারি খরচে তা উচ্ছেদ করে মূল বাদীকে জমি বুঝিয়ে দিয়ে আদালতে আনুষ্ঠানিক দখলনামা (Dakhalnama) দাখিল করা হয়।

বাটোয়ারা মামলায় অন্যতম প্রধান জটিলতা সৃষ্টি হয় যখন কোনো লোভী ভাই দাবি করে যে পিতা বা মাতা মৃত্যুর পূর্বে গোপনে সম্পূর্ণ জমি তার নামে হেবা বা রেজিস্ট্রি করে দিয়ে গেছেন, অথবা কোনো সৎ সন্তান বা বোনকে 'সম্পত্তি থেকে ত্যজ্য' করা হয়েছে। মুসলিম আইন ও বাংলাদেশের পারিবারিক আইনে কোনো সন্তানকে ত্যজ্য করার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই; পিতা চাইলেও জীবিতাবস্থায় কোনো সন্তানকে ফারায়েজের অধিকার থেকে চিরতরে বঞ্চিত করতে পারেন না।

তাছাড়া যদি কোনো হেবা দলিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়, তবে প্রমাণ করতে হবে যে হেবার ৩টি আবশ্যিক শর্ত (প্রস্তাব, সম্মতি ও বাস্তব দখল হস্তান্তর) লঙ্ঘিত হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী (৪৮ ডিএলআর পৃষ্ঠা ৪১৫), অসুস্থ অবস্থায় বা মৃত্যুর মুখে থাকা অবস্থায় (Marz-ul-Maut) গোপনে কোনো একটি সন্তানের নামে রেজিস্ট্রি করা দলিলের কোনো আইনি মূল্য নেই; পুরো সম্পত্তিকে যৌথ পৈতৃক ফান্ডে ফিরিয়ে এনে সকল ভাই-বোনদের মধ্যে আনুপাতিক ফারায়েজ বণ্টন করতে হবে।

বাটোয়ারা মামলা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে একটি বড় ভুল ধারণা রয়েছে যে এতে লাখ লাখ টাকা কোর্ট ফি লাগে। বাস্তবতা হলো, কোর্ট ফিস অ্যাক্ট ১৮৭০-এর শিডিউল ২-এর ১৭(vi) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাটোয়ারা মোকদ্দমায় যদি বাদী সম্পত্তিতে নিজের অবিভক্ত দখলে থাকেন এবং কেবল পৃথক সাহাম বা অংশ দাবি করেন, তবে নির্দিষ্ট অঙ্কের নামমাত্র ফিক্সড কোর্ট ফি (Fixed Court Fee) প্রদান করলেই মামলা দায়ের করা যায়।

তবে মামলার পরবর্তী ধাপে আদালত যখন অ্যাডভোকেট সার্ভেয়ার কমিশনার নিয়োগ করেন, তখন কমিশনারের সরকারি ফি, বিজ্ঞ আমিনের পরিমাপ খরচ এবং ফিল্ড ভিজিট বাবদ একটি নির্দিষ্ট বাজেট আদালতে জমা দিতে হয়, যা সাধারণত সকল শরিকের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টিত হয়। প্রাথমিক ডিক্রি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ডিক্রি রেজিস্ট্রি হওয়া পর্যন্ত অভিজ্ঞ আইনজীবীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হলে প্রতিটি ধাপে অর্থ ও সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হয়। পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ না করে ফেলে রাখলে পরবর্তীতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মামলায় জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে, তাই দ্রুত বাটোয়ারা ডিক্রি নেওয়াই সবচেয়ে লাভজনক সিদ্ধান্ত।