লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>পৈতৃক বা যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তিতে শরিকদের মধ্যে যখন জমি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ চরমে পৌঁছায়—কোনো শরিক বেশি দখল করে রাখে, ভালো অংশের জমি একা ভোগ করে, কিংবা রাস্তার ধারের দামি জমি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়—তখন আপসে জমি বণ্টনের সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায়। এই অবস্থায় নিজের ন্যায্য পাওনা ও আলাদা খতিয়ান হাসিল করার একমাত্র নিরাপদ ও অকাট্য আইনি সমাধান হলো দেওয়ানি আদালতে <strong>"বাটোয়ারা মোকদ্দমা" বা বণ্টন মামলা (Partition Suit)</strong> দায়ের করা। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে বাটোয়ারা মামলা নিয়ে চরম ভয় ও বিভ্রান্তি কাজ করে—<em>"বাটোয়ারা মামলায় কি কোটি টাকার কোর্ট ফি লাগে? মামলায় আসলে কত টাকা খরচ হয়? অ্যাডভোকেট কমিশনারকে কত দিতে হয়? এবং একটি বাটোয়ারা মামলা নিষ্পত্তি হতে কত বছর সময় লাগে?"</em> বাটোয়ারা মামলার কোর্ট ফি আইন ১৮৭০-এর সুনির্দিষ্ট হিসাব, মামলার মোট বাস্তব খরচ, প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ডিক্রির নিয়মাবলী এবং দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির কৌশল নিচে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত জমি বা যৌথভাবে ক্রয়কৃত সম্পত্তিতে প্রতিটি সহ-শরিকের (Co-sharer) একটি অবিভক্ত অধিকার থাকে। কিন্তু বাস্তব জীবনে দেখা যায় কোনো ভাই বা প্রভাবশালী শরিক রাস্তার পাশের বাণিজ্যিক অংশ বা ভালো ফসল হওয়া জমি জোরপূর্বক একচেটিয়া দখলে রাখে, আর অন্য ভাই বা বোনদের পেছনে বা নিচু জমিতে ঠেলে দেয়।
মৌখিকভাবে ভাগ করা জমিতে আইনগত কোনো নিরাপত্তা থাকে না; যে কেউ যেকোনো সময় সেই ভাগ অস্বীকার করতে পারে। তাই আইনগতভাবে প্রত্যেকের প্রাপ্য শতাংশ নির্দিষ্ট করে চতুর্দিকের সুনির্দিষ্ট চৌহদ্দি (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম) সীমানা পিলার দিয়ে আলাদা করা এবং নিজের অংশে স্বতন্ত্র নামজারি খতিয়ান তৈরির একমাত্র আইনি পথ হলো দেওয়ানি আদালতে বণ্টন বা বাটোয়ারা মোকদ্দমা দায়ের করা।
বাটোয়ারা মামলার কোর্ট ফি নিয়ে মানুষের সবচেয়ে বেশি কৌতূহল ও শঙ্কা থাকে। কোর্ট ফি আইন ১৮৭০ (Court Fees Act, 1870)-এর বিধান অনুযায়ী কোর্ট ফি মূলত দুটি পদ্ধতিতে নির্ধারিত হয়:
| পরিস্থিতি | কোর্ট ফি প্রদানের নিয়ম | সরকারি কোর্ট ফি পরিমাণ |
|---|---|---|
| বাদীর যদি জমিতে যৌথ দখল থাকে | দ্বিতীয় তফসিলের ১৭(৬) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ফিক্সড কোর্ট ফি | মাত্র ৩০০ (তিনশত) টাকা ফিক্সড কোর্ট ফি |
| বাদী যদি সম্পূর্ণ বেদখল থাকেন | ধারা ৭(iv)(b) অনুযায়ী বাদীর অংশের মূল্যের ওপর অ্যাড-ভ্যালোরেম ফি | জমির মূল্যের ওপর আনুপাতিক হারে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ থেকে ৬৫,০০০ টাকা পর্যন্ত |
সুতরাং, বাদীর যদি এক বিঘত জমিতেও কোনো প্রতীকী দখল বা বসবাস থাকে, তবে তাকে কোনো কোটি টাকার কোর্ট ফি দিতে হয় না; মাত্র ৩০০ টাকার স্ট্যাম্প কোর্ট ফি দিয়েই কোটি টাকার বাটোয়ারা মামলা আদালতে দায়ের করা যায়।
একটি বাটোয়ারা মামলার মোট খরচ কয়েকটি ধাপে বিভক্ত থাকে:
সার্বিকভাবে একটি সাধারণ বাটোয়ারা মোকদ্দমা সম্পূর্ণ শেষ হতে সব মিলিয়ে প্রায় ৬০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকার মতো সামগ্রিক বাজেট প্রয়োজন হয়।
বাটোয়ারা মামলা দুই ধাপে বিচার হয়। প্রথম ধাপে আদালত আরজি পর্যালোচনা করেন, বিবাদীদের সমন দেন এবং বিবাদীদের জবাব গ্রহণ করেন। এই ধাপে আদালত নির্ধারণ করেন কার কতটুকু অংশ বা হিস্যা (Share) রয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে বিজ্ঞ বিচারক একটি "প্রাথমিক ডিক্রি" (Preliminary Decree) প্রদান করেন। যেমন: রায়ে বলা হলো বাদী পাবেন ৪ আনা (২৫%), ১নং বিবাদী পাবেন ৮ আনা (৫০%) এবং ২নং বিবাদী পাবেন ৪ আনা (২৫%)।
প্রাথমিক ডিক্রি হওয়ার পর বাদীকে আদালতে চূড়ান্ত ডিক্রির জন্য দরখাস্ত দিতে হয়। আদালত তখন একজন নিরপেক্ষ বিজ্ঞ আইনজীবীকে "অ্যাডভোকেট কমিশনার" (Advocate Commissioner) হিসেবে নিয়োগ করেন। কমিশনার উভয় পক্ষকে লিখিত নোটিশ দিয়ে জমিতে উপস্থিত হন। সাথে থাকেন সরকারি লাইসেন্সধারী আমিন। কমিশনার ফিতা দিয়ে জমি নিখুঁতভাবে মাপজোক করেন এবং রাস্তার মান ও জমির উর্বরতা বিবেচনা করে কার ভাগে কোন দাগের কোন অংশ যাবে তার বিস্তারিত নকশা ও মানচিত্র সহ একটি "সহম বণ্টন প্রতিবেদন" (Saham Report) প্রস্তুত করে আদালতে দাখিল করেন।
কমিশনারের রিপোর্টের ওপর কোনো পক্ষের আপত্তি থাকলে আদালত তা শুনানি করেন। কমিশনারের বণ্টন ন্যায়সঙ্গত প্রমাণিত হলে আদালত রিপোর্টটি অনুমোদন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে একটি "চূড়ান্ত ডিক্রি" (Final Decree) জারি করেন। এই চূড়ান্ত ডিক্রির মাধ্যমেই প্রত্যেকে নিজ নিজ প্লটের একক ও অবিসংবাদিত মালিক হন।
চূড়ান্ত ডিক্রির পরও যদি কোনো শরিক জমি ছেড়ে না দেয় বা দখল না ছাড়ে, তবে বাদীকে দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ২১ নিয়ম ৩৫ অনুযায়ী ডিক্রি জারি মোকদ্দমা (Execution Case) করতে হয়। বিজ্ঞ আদালত নাজির ও বেলিক নিযুক্ত করে স্থানীয় থানা পুলিশের উপস্থিতিতে বিরোধীয় জমিতে ঢোল-শোহরতের মাধ্যমে দখলদারকে হটিয়ে বাদীর অনুকূলে লাল নিশানা বা সীমানা পিলার পুঁতে বাস্তব দখল বুঝিয়ে দেন।
আমাদের দেশে ধারণা আছে বাটোয়ারা মামলা প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলে। কিন্তু আধুনিক দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধনের পর এটি অনেক দ্রুত নিষ্পত্তি হয়:
বাটোয়ারা মামলায় অযথা সময়ক্ষেপণ এড়াতে নিচের কৌশলগুলো অত্যন্ত কার্যকরী:
বাটোয়ারা মোকদ্দমা সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের প্রধান সিদ্ধান্তসমূহ:
১. ফজলুর রহমান বনাম আব্দুল জলিল (47 DLR): সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, বাটোয়ারা মামলায় বাদীর সামান্যতম প্রতীকী যৌথ দখল থাকলেও ফিক্সড ৩০০ টাকার কোর্ট ফি গ্রহণযোগ্য; অ্যাড-ভ্যালোরেম কোর্ট ফি দাবি করা বেআইনি।
২. মকসেদ আলী বনাম জহিরুদ্দিন (50 DLR AD): আপিল বিভাগ পরিষ্কার করেন যে, কমিশনারের সহম বণ্টন প্রতিবেদনে রাস্তার সুবিধা ও জমির ভৌগোলিক অবস্থান সমভাবে বিবেচনা করা আদালতের বাধ্যবাধকতা।
আদালতে বাটোয়ারা মামলা ফাইল করার আগে নিচের কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে নিন:
শরিকদের সাথে ঝগড়া-বিবাদ বা লাঠালাঠি করে কখনো জমির স্থায়ী সমাধান হয় না। উল্টো ফৌজদারি মামলার গ্যাঁড়াকলে পড়ে জীবন ধ্বংস হয়। পৈতৃক বা যৌথ সম্পত্তিতে নিজের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার চিরতরে নিষ্কণ্টক করার একমাত্র সভ্য ও আইনানুগ পথ হলো বাটোয়ারা মামলা। বিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবীর মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট খতিয়ান ও ওয়ারিশ সনদ উপস্থাপন করে আজই আদালতের মাধ্যমে আপনার প্রাপ্য দাগের লাল নিশানা বুঝে নিন।
বিজ্ঞ আদালত থেকে চূড়ান্ত বাটোয়ারা ডিক্রি (Final Decree) পাওয়ার পর সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো দ্রুত ভূমি অফিসে স্বত্ব হালনাগাদ করা। অনেকেই ডিক্রি পেয়ে ঘরে বসে থাকেন, যার ফলে ভূমি রেকর্ডে জমি যৌথই থেকে যায়। চূড়ান্ত ডিক্রির সার্টিফাইড কপি, অ্যাডভোকেট কমিশনারের অনুমোদিত সহম নকশা এবং আদালতের সিলমোহরযুক্ত আদেশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড কার্যালয়ে ই-নামজারি (e-Mutation) আবেদন দাখিল করতে হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদালতের ডিক্রি দেখে মূল জোত থেকে বাদীর অংশ পৃথক করে একটি স্বতন্ত্র জমাভাগ খতিয়ান (Separate Khatian) সৃজন করার আদেশ দেন। এই নতুন একক খতিয়ানের বিপরীতে নির্দিষ্ট সরকারি ফি জমা দিয়ে ডিসিআর ও দাখিলা সংগ্রহ করলে জমিতে আপনার নিরঙ্কুশ ও স্বাধীন মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ নেওয়া বা যে কারো কাছে নির্বিঘ্নে বিক্রি করার পথ সুগম করে।