লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-08-04
<p>পৈতৃক সম্পত্তি বা যৌথভাবে কেনা জমির অংশীদারদের মধ্যে বন্টন নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আইনি সমাধানের একমাত্র পথ হলো 'বাটোয়ারা মামলা' বা Partition Suit। অনেক সময় শরিকরা আপোষে সম্পত্তি ভাগ করতে রাজি হনক্তহন না বা একজনের নির্দিষ্ট অংশ অন্যজন দখল করে রাখেন। এমন পরিস্থিতিতে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নিজের নির্দিষ্ট হিস্যা বা অংশ আলাদা করে নেওয়ার জন্য বাটোয়ারা মামলা দায়ের করতে হয়। এই আর্টিকেলে আমরা বাটোয়ারা মামলা দায়ের করার নিয়ম, কোর্ট ফি-এর হিসাব, প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ডিক্রি পাওয়ার প্রক্রিয়া এবং মামলা চলাকালীন নিষেধাজ্ঞার আবেদন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।</p>
যৌথ সম্পত্তির কোনো শরিক যখন তার নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে নিতে চান কিন্তু অন্য শরিকরা তাতে বাধা দেয় বা বন্টননামা দলিল (Partition Deed) করতে অস্বীকার করে, তখন বাটোয়ারা মামলা করতে হয়। বিশেষ করে পৈতৃক সম্পত্তির ক্ষেত্রে ভাই-বোন বা অন্যান্য ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পত্তির সঠিক সীমানা নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। বাটোয়ারা মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রত্যেক শরিকের হিস্যা অনুযায়ী সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট অংশ চিহ্নিত করে দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে সীমানা বা দখল নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা না থাকে। এই মামলার মাধ্যমে আদালত শরিকদের হিস্যা ঘোষণা করেন এবং আইন অনুযায়ী সম্পত্তির বন্টন কার্যকর করেন।
বাটোয়ারা মামলার ক্ষেত্রে কোর্ট ফি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ কোর্ট ফি আইন অনুযায়ী, বাটোয়ারা মামলায় সম্পত্তির মূল্যের ওপর ভিত্তি করে 'অ্যাডভ্যালোরেম' (Ad Valorem) বা মূল্যানুপাতিক কোর্ট ফি প্রদান করতে হয়। তবে বাদী যদি দাবি করেন যে তিনি যৌথ সম্পত্তির যৌথ দখলে (Joint Possession) আছেন, তবে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট অংকের ফিক্সড কোর্ট ফি (যেমন ৩০০ টাকা বা আদালতের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী) দিয়ে মামলা দায়ের করা যায়। কিন্তু বাদী যদি সম্পত্তি থেকে বেদখল থাকেন এবং দখল পুনরুদ্ধারের প্রার্থনাসহ বাটোয়ারা মামলা করেন, তবে সম্পত্তির বাজার মূল্যের ওপর ২% হারে (সর্বোচ্চ ৪০,০০০ টাকা পর্যন্ত) কোর্ট ফি জমা দিতে হতে পারে। সঠিক কোর্ট ফি নির্ধারণের জন্য আইনজীবীর সাথে সম্পত্তির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।
সম্পত্তির আর্থিক মূল্যের ওপর ভিত্তি করে বাটোয়ারা মামলা কোন আদালতে দায়ের হবে তা নির্ধারিত হয় (Pecuniary Jurisdiction)। বর্তমানে দেওয়ানি আদালত বা সিভিল কোর্টের আর্থিক এখতিয়ার অনুযায়ী— ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যের সম্পত্তির জন্য সহকারী জজ আদালত, ১৫ লক্ষ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যের জন্য সিনিয়র সহকারী জজ আদালত এবং ২৫ লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের সম্পত্তির জন্য যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে হয়। মামলাটি অবশ্যই সেই আদালতের এখতিয়ারে দায়ের করতে হবে, যে এলাকায় সম্পত্তিটি অবস্থিত (Territorial Jurisdiction)।
বাটোয়ারা মামলার আইনি প্রক্রিয়া প্রধানত দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও দলিলপত্র পর্যালোচনা করে নির্ধারণ করেন যে বাদী সম্পত্তির কতটুকু অংশের মালিক। এই ঘোষণাকে বলা হয় 'প্রাথমিক ডিক্রি' (Preliminary Decree)। প্রাথমিক ডিক্রির পর শরিকদের বলা হয় আপোষে জমি মেপে ভাগ করে নিতে। তারা ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় ধাপ শুরু হয়, যাকে বলা হয় 'চূড়ান্ত ডিক্রি' (Final Decree)। এই ধাপে আদালত একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করেন, যিনি বাস্তবে জমিটি মেপে প্রাথমিক ডিক্রি অনুযায়ী শরিকদের অংশ আলাদা করে দেন এবং আদালতে রিপোর্ট পেশ করেন। এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত ডিক্রি প্রদান করা হয়।
চূড়ান্ত ডিক্রি পাওয়ার ক্ষেত্রে অ্যাডভোকেট কমিশনারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আদালতের আদেশে তিনি একজন আমিন বা সার্ভেয়ার নিয়ে সরাসরি বিরোধপূর্ণ জমিতে যান। সেখানে তিনি সম্পত্তির ম্যাপ বা নকশা তৈরি করেন, রাস্তা বা যাতায়াতের পথ ঠিক রাখেন এবং প্রত্যেক শরিকের হিস্যা অনুযায়ী জমির সীমানা চিহ্নিত করেন। কমিশনার এমনভাবে সম্পত্তি ভাগ করার চেষ্টা করেন যাতে প্রতিটি শরিক তাদের পাওনা অনুযায়ী সমমানের বা ব্যবহার উপযোগী জমি পায়। কমিশনারের তৈরি করা ম্যাপ এবং প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার পর আদালত তা অনুমোদন করলে সেটি আইনি বৈধতা পায়।
বাটোয়ারা মামলা চলাকালীন অনেক সময় বিবাদী বা অন্য শরিকরা বিরোধপূর্ণ সম্পত্তিটি বিক্রি করে দেওয়ার বা সেখানে নতুন স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করে, যা মামলাকে আরও জটিল করে তোলে। এটি রোধ করার জন্য মামলা দায়েরের সাথেই দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১ ও ২ নিয়ম অনুযায়ী 'অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা' (Temporary Injunction)-এর আবেদন করতে হয়। আদালত নিষেধাজ্ঞা মঞ্জুর করলে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই সম্পত্তিতে কোনো প্রকার নির্মাণ কাজ করা বা সম্পত্তি হস্তান্তর (বিক্রি, দান) করা বেআইনি বলে গণ্য হবে।
দেওয়ানি মামলা, বিশেষ করে বাটোয়ারা মামলা নিষ্পত্তি হতে একটু সময় লাগে। সমন জারি, জবাব দাখিল, সাক্ষ্য গ্রহণ, প্রাথমিক ডিক্রি, কমিশনার নিয়োগ এবং চূড়ান্ত ডিক্রি—এই প্রতিটি ধাপে আইনি আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। সাধারণত একটি বাটোয়ারা মামলা সম্পূর্ণ শেষ হতে ৩ থেকে ৫ বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। তবে দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ এবং নিয়মিত আদালতে তদারকি করলে এই সময় কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব।
আপনার আইনি সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম সর্বদা প্রস্তুত। সঠিক আইনি পরামর্শ পেতে আজই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
দেওয়ানী আদালত বাটোয়ারা মামলায় প্রাথমিক ডিক্রি দেওয়ার পর চূড়ান্ত ডিক্রির জন্য একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার (Advocate Commissioner) নিয়োগ করেন। এই কমিশনার সরজমিনে মাঠ পরিদর্শন করে প্রতিটি ওয়ারিশের অংশ পরিমাপ করেন এবং জমির পরিচয়, মৌজা, দাগ ও শ্রেণী অনুযায়ী প্রতিটি হিস্যা নির্ধারণ করে আদালতে লিখিত প্রতিবেদন দেন।
কমিশনারের কাজের ধাপসমূহ:
কমিশনারের ফি সাধারণত ৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। দীর্ঘ বাটোয়ারা মামলার পুরো প্রক্রিয়া গড়ে ৩ থেকে ৫ বছর সময় নিতে পারে।
বাটোয়ারা মামলা চলাকালীন যদি অন্য পক্ষ বিতর্কিত জমিতে ইমারত নির্মাণ, জমি বিক্রয় বা অন্য কোনোভাবে পরিবর্তন করার উদ্যোগ নেয়, তবে আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Temporary Injunction Order) আবেদন করা অত্যন্ত জরুরি। দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৯ আদেশ অনুযায়ী এই আবেদন করা যায়।
ইনজাংশন পেতে ৩টি শর্ত প্রমাণ করতে হয়:
ইনজাংশন আবেদন মঞ্জুর হলে বিবাদী মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সেই জমিতে কোনো নির্মাণ বা হস্তান্তর করতে পারবেন না। পাশাপাশি বাটোয়ারা মামলায় কোর্ট ফি সম্পত্তির মূল্যের ওপর ad valorem হারে পরিশোধ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১০ লাখ টাকা মূল্যের সম্পত্তির বাটোয়ারা মামলায় কোর্ট ফি প্রায় ৭,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা হতে পারে।
যেকোনো আইনি সমস্যায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম স্যারের সরাসরি সহায়তা পেতে এখনই যোগাযোগ করুন।