লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-10
উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা রাশিয়ায় পাঠানোর নামে নিঃস্ব করে দিচ্ছে সংঘবদ্ধ দালাল চক্র ও লাইসেন্সবিহীন ট্রাভেল এজেন্সি। জমিজমা বিক্রি করে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে লাখ লাখ টাকা তুলে দেওয়ার পর দেখা যায় ভুয়া ভিসা ধরিয়ে দিয়েছে, লিবিয়া বা জঙ্গলপথে জিম্মি করে মুক্তিপণ দাবি করছে অথবা মাসের পর মাস ঘুরিয়ে টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়েছে। অনেকেই মনে করেন দালালের কোনো বৈধ রসিদ না থাকলে মামলা করা যায় না—এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বাংলাদেশের 'মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২' এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইনে কঠোর বিধান রয়েছে। এই আর্টিকেলে জানুন দালালের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে সরাসরি মামলা, গ্রেপ্তার ও খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারের কার্যকর আইনি কৌশল।
বিদেশে উচ্চ বেতনের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে কোনো ব্যক্তিকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করা, আটকে রাখা বা ভুয়া ভিসা প্রদান করা সরাসরি মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী 'মানব পাচার' হিসেবে গণ্য।
উক্ত আইনের ৬, ৭ ও ৮ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে অবৈধভাবে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে প্রতারণা বা জিম্মি করলে অপরাধীর সর্বনিম্ন ৭ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের কঠোর বিধান রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানব পাচার মামলা সম্পূর্ণ অ-আপসযোগ্য (Non-compoundable) এবং জামিন-অযোগ্য (Non-bailable)। ফলে একবার মামলা রুজু হলে দালাল বা অপরাধী চক্র আপসে আসতে বাধ্য হয়।
দালালরা সাধারণত অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির হয় এবং নগদ টাকা নেওয়ার পর কোনো মানি রিসিট দিতে চায় না। তবে ডিজিটাল যুগে রসিদ না থাকলেও বহু অকাট্য আইনি প্রমাণ সংগ্রহ করা সম্ভব:
ভুক্তভোগীর সামনে তিনটি কার্যকর আইনি পথ খোলা থাকে, যার তুলনামূলক রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:
| আইনি ফোরাম | মামলার ধরন ও এখতিয়ার | আদায়ের কার্যকারিতা ও গতি |
|---|---|---|
| ১. মানব পাচার দমন ট্রাইব্যুনাল | জেলা দায়রা জজ আদালতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সরাসরি সিআর মামলা | খুব দ্রুত ওয়ারেন্ট জারি হয়; দালাল জামিন না পেয়ে টাকা ফেরতে বাধ্য হয় |
| ২. প্রবাসী কল্যাণ ব্যুরো (BMET) | বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের রিক্রুটিং লাইসেন্সধারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ | লাইসেন্সের ৫০ লাখ টাকার জামানত থেকে টাকা কাটিয়ে ফেরত দেওয়া হয় |
| ৩. ম্যাজিস্ট্রেট আদালত (CrPC) | দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের মামলা | নিয়মিত আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় সিআইডি তদন্ত সাপেক্ষে নিষ্পত্তি |
যদি স্থানীয় থানা মামলা নিতে গড়িমসি করে, তবে ভুক্তভোগী সরাসরি জেলা জজ আদালতের মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পিটিশন মামলা দায়ের করতে পারেন:
মানব পাচার আইনের একটি অসাধারণ বিধান হলো ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ও অর্থ পুনরুদ্ধার। উক্ত আইনের ২৯ ও ৩৮ ধারা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল চাইলে আসামির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ও স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করতে পারেন।
তাছাড়া আসামিপক্ষ যখন কারাগারে যায়, তখন জামিন প্রার্থনার শর্ত হিসেবে বিজ্ঞ আদালত পুরো বা আংশিক টাকা নগদ বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে বাদীর অনুকূলে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তার খোয়া যাওয়া কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে ফিরে পেতে পারেন।
দালালের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর। মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম অপরাধীদের উপযুক্ত সাজা এবং ভুক্তভোগীর আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধারে বলিষ্ঠ আইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে থাকেন।
সরাসরি চেম্বার পরামর্শ বা মামলা সংক্রান্ত সহায়তার জন্য যোগাযোগ করুন:
📞 ফোন / হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৭১২৬৫৫৫৪৬ (01712655546)
📍 চেম্বার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন, ঢাকা।
দালাল চক্রের পাশাপাশি বহু লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সিও প্রবাসীদের সাথে প্রতারণা করে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন, ২০১৩-এর ১৯ ও ৩১ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা সরকারের অনুমতি ও বৈধ কর্মসংস্থান চুক্তি (Employment Contract) ব্যতীত কোনো নাগরিককে অভিবাসী হিসেবে বিদেশে পাঠাতে পারে না। কোনো এজেন্সি যদি অতিরিক্ত ফি গ্রহণ করে, প্রতিশ্রুত কাজের চেয়ে কম বেতনের চাকরিতে পাঠায় কিংবা বিদেশে পাঠিয়ে ফেলে রেখে আসে, তবে উক্ত আইনে এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল, ৫০ লাখ টাকা জামানত বাজেয়াপ্ত এবং ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের কঠোর বিধান রয়েছে। ভুক্তভোগী প্রবাসী কল্যাণ আদালতে বা জেলা প্রশাসকের বিশেষ তদন্ত কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দিলে মন্ত্রণালয় লাইসেন্সধারীকে তলব করে টাকা আদায় করে দেয়।
মাফিয়া বা মানব পাচারকারী চক্র যখন কোনো নাগরিককে লিবিয়া, তুরস্ক বা বলকান অঞ্চলের গহিন জঙ্গলে আটকে রেখে বাংলাদেশে তার স্বজনদের কাছে ভিডিও কলে নির্যাতন দেখিয়ে কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করে, তখন এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সরাসরি ৩টি আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে: (১) ঢাকার সিআইডি ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ও হিউম্যান ট্রাফিকিং ডিভিশনে আনুষ্ঠানিক এফআইআর দায়ের, (২) যে বিকাশ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মুক্তিপণের টাকা চাওয়া হচ্ছে তা তাৎক্ষণিক ফ্রিজ করার জন্য বিএফআইইউ-কে অনুরোধ, এবং (৩) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কল্যাণ উইং এবং ইন্টারপোলের (Interpol) ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (NCB) মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রেড নোটিশ জারি করে দূতাবাস সমন্বয়ে জিম্মিদের উদ্ধার করা।
অনেক সময় দেখা যায়, মূল দালাল ইউরোপ বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসে নিরাপদে আছে আর দেশে তার আত্মীয়স্বজনদের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করছে। এ ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বাংলাদেশ পুলিশের ইন্টারপোল ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (NCB Dhaka)-এর মাধ্যমে 'রেড নোটিশ' (Red Notice) জারি করানো সম্ভব। মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল থেকে যখন কোনো আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও হুলিয়া (Proclamation and Attachment) জারি হয়, তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) বা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রুলস অনুযায়ী বিদেশে অবস্থানরত আসামিকে গ্রেপ্তার করে দেশে এনে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার ব্যবস্থা রয়েছে।
তাছাড়া বাংলাদেশে থাকা দালালের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বসতবাড়ি ও রেজিস্ট্রিকৃত জমিজমা মানব পাচার আইনের ধারা ২৯ অনুযায়ী ক্রোক (Attach) করে নিলামে বিক্রি করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার বহু দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের আদালতে রয়েছে।
বিদেশে প্রতারিত শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ তহবিল রয়েছে, যা 'ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড তহবিল' নামে পরিচিত। যেসকল কর্মী বিএমইটি (BMET) ইমিগ্রেশন কার্ড নিয়ে বা দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশে গিয়ে নির্যাতিত হন, তারা দেশে ফেরার পর মন্ত্রণালয়ের বিশেষ কল্যাণ সেলে আর্থিক পুনর্বাসনের জন্য আবেদন করতে পারেন। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা, জরুরি প্রত্যাবাসন বিমান ভাড়া এবং স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য বিশেষ ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করে থাকে।
আইনি দিক থেকে, মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল আইনের ধারা ৩৮ অনুযায়ী আসামির স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও ব্যাংকে থাকা অবৈধ উপার্জনের অর্থ বাজেয়াপ্ত করে সরাসরি ভুক্তভোগী বাদীকে 'ক্ষতিপূরণ অ্যাওয়ার্ড' (Compensation Award) হিসেবে প্রদান করতে পারেন। অভিজ্ঞ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবীর মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে প্রপার ড্রাফটিং ও শুনানিতে এই ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করতে হয়।