লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>বাংলাদেশে বিবাহ একটি পবিত্র সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন হলেও বর্তমান যুগে এর যথাযথ আইনি নিবন্ধন (Registration) জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালে বিয়ে ও নিকাহনামা রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি ও নিয়মনীতিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি রয়েছে। কাবিননামায় দেনমোহর নির্ধারণ, কাজীর সরকারি ফি কত এবং কোর্ট ম্যারেজ বনাম ধর্মীয় বিবাহের আইনি বৈধতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা আবশ্যক। পরামর্শের জন্য: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন ১৯৭৪ (Muslim Marriages and Divorces (Registration) Act, 1974) অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন করা আইনত বাধ্যতামূলক। আইন অনুযায়ী, বিবাহ অনুষ্ঠানের ৩০ দিনের মধ্যে বিবাহ নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। যদি বিবাহ কোনো কাজী (নিকাহ রেজিস্ট্রার) ব্যতীত অন্য কারো দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে বরপক্ষকে ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকার কাজীর কাছে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করতে হয়।
আইন অনুযায়ী বিবাহ নিবন্ধন না করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিকাহ নিবন্ধন না করলে দুই বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, কাবিননামা না থাকলে ভবিষ্যতে স্ত্রী ভরণপোষণ, দেনমোহর বা সন্তানের অভিভাবকত্ব ও পাসপোর্টের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতায় পড়েন।
আইন প্রয়োগে আধুনিকীকরণ আনা হয়েছে যাতে বিয়ে সংক্রান্ত কোনো জালিয়াতি বা পরিচয় গোপন না করা যায়। জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং জন্ম নিবন্ধন সনদের অনলাইন যাচাইয়ের মাধ্যমে বয়স ও পরিচয় নিশ্চিত হয়ে কাজী বিবাহ রেজিস্ট্রি সম্পাদন করেন।
অনেকের মাঝেই একটি চরম বিভ্রান্তি রয়েছে যে, কাবিননামা রেজিস্ট্রেশনের জন্য কাজী সাহেবরা যে লাখ লাখ টাকা দাবি করেন তা সরকারি ফি। বাস্তবে আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত সরকারি ফি অত্যন্ত সীমিত এবং সুনির্দিষ্ট। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা ২০০৯ (সংশোধিত) অনুযায়ী সরকারি ফি হিসাব নিচে তুলে ধরা হলো:
| দেনমোহরের স্ল্যাব | সরকারি ফি-র হার | মোট সরকারি ফি |
|---|---|---|
| প্রথম ৪,০০,০০০ (চার লাখ) টাকা পর্যন্ত | প্রতি হাজারে ১২.৫০ টাকা (লাখে ১,২৫০ টাকা) | সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা |
| ৪,০০,০০০ টাকার পরবর্তী অতিরিক্ত প্রতি লাখ | প্রতি লাখে ১০০ টাকা | অতিরিক্ত অংশ × ১০০ টাকা |
| তালাক রেজিস্ট্রেশন সরকারি ফি | নির্দিষ্ট সরকারি ফি | ১,০০০ টাকা (নির্ধারিত) |
| নিকাহনামার নকল বা কপি প্রাপ্তি ফি | নকল ফি | ২০০ - ৫০০ টাকা |
সুতরাং, ১০ লাখ টাকা দেনমোহর হলেও সরকারি ফি ৫,৬০০ টাকার বেশি নয়। কাজী সাহেবরা যাতায়াত বা ভলান্টিয়ার বাবদ সামান্য কমিশন নিতে পারেন, কিন্তু ২০-৩০ হাজার টাকা দাবি করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
মুসলিম পারিবারিক আইনে দেনমোহর (Dower বা Mahr) কোনো দান বা উপহার নয়; এটি স্ত্রীর প্রতি স্বামীর একটি অলঙ্ঘনীয় আইনগত ঋণ (Debt)। দেনমোহর দুই প্রকার হতে পারে: (১) মোহরে মুয়াজ্জল (তাৎক্ষণিক বা নগদ প্রদেয়) এবং (২) মোহরে মুওয়াজ্জল (বিলম্বিত বা বাকি প্রদেয়)।
বিয়ের সময় কাবিননামার ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর কলামে দেনমোহরের মোট অঙ্ক এবং বিয়ের আসরে কত টাকা নগদ বা গহনা বাবদ উসুল বা আদায় দেখানো হলো তা স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকে।
আমাদের দেশে অসংখ্য তরুণ-তরুণী মনে করেন নোটারি পাবলিকের কাছে গিয়ে একটি এফিডেভিট বা হলফনামা করলেই "কোর্ট ম্যারেজ" সম্পন্ন হয়ে যায়। এটি একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও মারাত্মক ভুল ধারণা।
বাংলাদেশে "কোর্ট ম্যারেজ" বলে স্বতন্ত্র কোনো আইন নেই। নোটারি পাবলিকের সামনে ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে যে হলফনামা করা হয়, তা শুধুই বর-কনের সাবালকত্ব ও পারস্পরিক সম্মতির একটি ঘোষণা মাত্র। হলফনামা কখনো মুসলিম নিকাহনামা বা রেজিস্ট্রেশনের বিকল্প হতে পারে না।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী বরের বয়স ২১ বছর এবং কনের বয়স ১৮ বছরের নিচে হলে তা বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হবে। বাল্যবিবাহের সাথে জড়িত বর, কনে, তাদের অভিভাবক, বিয়ে পরিচালনাকারী কাজী এবং বিয়েতে উপস্থিত সাক্ষীদের পর্যন্ত অনধিক ২ বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
২০২৬ সালে বিবাহ নিবন্ধনে কাজীদের জন্য কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর ইনপুট করে বর-কনের আসল বয়স এবং পূর্বের কোনো বিবাহ লুকানো আছে কিনা তা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক কারও ভুয়া জন্মসনদ তৈরি করে বিয়ে নিবন্ধন করা ফৌজদারি আইনে চরম শাস্তিযোগ্য জালিয়াতি হিসেবে গণ্য হয়।
যদি কোনো কাজী সরকার নির্ধারিত ফি-র অতিরিক্ত টাকা জোরপূর্বক দাবি করেন বা বিবাহ নিবন্ধন করতে অস্বীকার করেন, তবে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আইনি প্রতিকার পেতে পারেন:
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961)-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকাকালে কোনো পুরুষ সালিশি পরিষদের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারেন না।
সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে স্বামী অনধিক ১ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১০,০০০ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অধিকন্তু, প্রথম স্ত্রী অবিলম্বে তার পুরো দেনমোহর নগদে দাবি করতে পারেন এবং ইচ্ছা করলে স্বামীর বিরুদ্ধে বিবাহ বিচ্ছেদ ও খোরপোষের মামলা দায়ের করতে পারেন।
কোর্ট ম্যারেজ, কাবিননামার শর্তাবলী সুরক্ষা, দেনমোহর বিরোধ কিংবা নিকাহ রেজিস্ট্রেশনের যে কোনো জটিল আইনি সমস্যায় সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলমের সরাসরি সহায়তা গ্রহণ করুন।
বাংলাদেশ সরকারের নির্ধারিত প্রমিত নিকাহনামা (কাবিননামা) ফরমে মোট ২৫টি কলাম থাকে। প্রতিটি কলামে তথ্য লেখার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সচেতন থাকা আবশ্যক:
বর্তমান যুগে বর বা কনে প্রবাসে অবস্থানকালে বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কবার্তা প্রযোজ্য। সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী, টেলিফোন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিডিও কলে বিয়ে সম্পন্ন হলেও বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রতিনিধির মাধ্যমে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় নিকাহ রেজিস্ট্রারের বালাম বইয়ে স্বাক্ষর নিশ্চিত করতে হয়। অন্যথায় বিদেশের ভিসা প্রসেসিং ও ফ্যামিলি ইমিগ্রেশনে ম্যারেজ সার্টিফিকেট অগ্রহণযোগ্য বলে বাতিল হতে পারে।
ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মুসলিম আইনে বিয়ে হতে পারে না; সেক্ষেত্রে Special Marriage Act, 1872 (বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২)-এর অধীনে সরকারি বিশেষ বিবাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিয়ে সম্পাদন করতে হয়।