চেক বাউন্স হলে ১৩৮ ধারা নাকি ৪২০ ধারা? যে ভুলে টাকা আদায়ে ৫ বছর পিছিয়ে যায় মানুষ

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-13

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

ব্যবসায়িক বা ব্যক্তিগত লেনদেনে চেক বাউন্স হওয়ার পর সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বড় যে বিভ্রান্তিতে পড়েন তা হলো—মামলাটি কি এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় হবে, নাকি দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার মামলা হবে? এই একটি ভুল ধারায় মামলা করার কারণে অনেক পাওনাদার বছরের পর বছর আদালতে ঘুরেও নিজের টাকা ফেরত পান না। বাস্তব কেস স্টাডি ও আদালতের সঠিক পথ বাতলে দিয়েছেন প্রবীণ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. Shah Alam</a>।

বাস্তব ঘটনা: যে ভুলে পাওনাদার ১০ লাখ টাকার মামলাতে ফেঁসে গিয়েছিলেন

কোর্টে আসা একজন ব্যবসায়ীর ঘটনা উল্লেখ করা যায়। তিনি এক সহযোগীকে ১০ লাখ টাকা ধার দিয়ে সিকিউরিটি চেক নিয়েছিলেন। চেক ডিজঅনার হওয়ার পর স্থানীয় এক মধ্যস্থতাকারীর পরামর্শে তিনি ৩০ দিনের লিগ্যাল নোটিশ না পাঠিয়ে সরাসরি থানায় গিয়ে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় মামলা ঠুকে দেন। ৩ বছর মামলা চলার পর আসামি পক্ষ আদালতে প্রমাণ করে যে—এটি চেক লেনদেন ছিল, কোনো প্রতারণা নয়। আদালত মামলাটি খালাস করে দেন। ততদিনে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার নির্ধারিত সময়ও তামাদি হয়ে গেছে। এক ভুলের কারণে ব্যবসায়ীটি নিঃস্ব হওয়ার মুখে পড়েন।

১৩৮ ধারা (NI Act) বনাম ৪২০ ধারা (Penal Code): আইনি মৌলিক পার্থক্য

আইনের চোখে দুটি ধারার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা:

  • ১৩৮ ধারা (NI Act): অ্যাকাউন্টে অপর্যাপ্ত ফান্ড থাকার কারণে চেক ডিজঅনার হলে এই বিশেষ আইনে বিচার হয়। এখানে প্রতারণার উদ্দেশ্য প্রমাণ করতে হয় না; চেক বাউন্স হওয়া এবং নোটিশের পর টাকা না দেওয়াই শাস্তি ও অর্থদণ্ডের জন্য যথেষ্ট। শাস্তি ১ বছর পর্যন্ত জেল এবং চেকে উল্লিখিত অংকের সর্বোচ্চ ৩ গুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ড।
  • ৪২০ ধারা (Penal Code): চেক দেওয়ার সময় যদি আসামির শুরু থেকেই অসৎ উদ্দেশ্য থাকে (যেমন: বন্ধ অ্যাকাউন্ট বা অন্যের একাউন্টের চেক দিয়ে মালপত্র হাতিয়ে নেওয়া), তবেই ৪২০ ধারা প্রযোজ্য। কিন্তু সাধারণ দেনা পরিশোধের চেক বাউন্সে ৪২০ ধারা প্রমাণ করা অত্যন্ত দুরূহ।

মানুষ যেখানে মারাত্মক ভুল করে: ৩০ দিনের লিগ্যাল নোটিশের তামাদি মিস হওয়া

নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্টের সবচেয়ে কঠোর নিয়ম হলো সময়সীমা (Limitation Period)। ব্যাংক থেকে চেক ডিজঅনারের স্লিপ (Dishonour Memo) পাওয়ার তারিখ থেকে ঠিক ৩০ দিনের মধ্যে আইনজীবীর মাধ্যমে লিখিত লিগ্যাল নোটিশ জারি করতে হবে। ৩১তম দিনে নোটিশ পাঠালে আদালত সেই মামলা সরাসরি খারিজ করে দিতে বাধ্য।

যদি ৩০ দিনের নোটিশের সময় পার হয়ে যায়, তবে বিকল্প আইনি পথ কোনটি?

যদি ভুলবশত ৩০ দিনের নোটিশের সময় পার হয়ে যায়, তবে আতঙ্কিত হবেন না। বিকল্প দুটি কার্যকর রাস্তা রয়েছে:

  1. চেক পুনরায় ব্যাংকে উপস্থাপন: চেকের গায়ে লেখা তারিখ থেকে ৬ মাসের মেয়াদ বলবৎ থাকলে চেকটি পুনরায় ব্যাংকে জমা দিয়ে নতুন ডিজঅনার মেমো তুলে নতুন করে ৩০ দিনের নোটিশ পাঠানো যায়।
  2. দেওয়ানি আদালতে মানি স্যুট (Money Suit): তামাদি আইন অনুযায়ী চেক প্রত্যাখ্যানের ৩ বছরের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে অর্থ আদায়ের মোকদ্দমা দায়ের করে দেনাদারের সম্পত্তি ক্রোক করানো যায়।

আদালতে আপিল করতে হলে দেনাদারকে চেকে উল্লিখিত টাকার ৫০% জমা দেওয়ার বিধান

১৩৮ ধারার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—বিচারিক আদালত আসামিকে সাজা দিলে, আসামি যদি দায়রা জজ বা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে চায়, তবে আপিল দায়েরের পূর্বশর্ত হিসেবে চেকে উল্লেখিত মোট টাকার ৫০ শতাংশ অর্থ সরকারি কোষাগার বা চালানের মাধ্যমে আদালতে জমা দিতেই হয়। এতে পাওনাদারের টাকার নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়।

চেকের মামলা সফলভাবে লড়ার জন্য ৪টি বাধ্যতামূলক চেকলিস্ট

মামলা ফাইল করার সময় ফাইলে প্রস্তুত রাখবেন:

  • মূল চেক (Original Cheque) এবং ব্যাংকের স্বাক্ষরযুক্ত ডিজঅনার স্লিপ।
  • রেজিস্ট্রি এ/ডি রসিদসহ লিগ্যাল নোটিশের অফিস কপি।
  • পোস্টাল ট্র্যাকিং বা ডেলিভারি রিসিট।
  • লেনদেনের প্রাথমিক চুক্তি বা প্রমাণপত্র।