লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-08-04
ব্যবসায়িক লেনদেন, ঋণ পরিশোধ বা পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে 'চেক' একটি বহুল ব্যবহৃত ও নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কিন্তু অনেক সময় অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকা বা অন্য কোনো কারণে চেক ব্যাংক থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়, যাকে আমরা সাধারণ ভাষায় 'চেক বাউন্স' বা 'চেক ডিজঅনার' বলি। চেক বাউন্স হওয়া বাংলাদেশে একটি শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। 'Negotiable Instruments Act, 1881' (NI Act) এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী চেক ডিজঅনার মামলা দায়ের করে পাওনাদার তার হারানো টাকা উদ্ধার করতে পারেন। তবে এই মামলা দায়েরের নির্দিষ্ট আইনি সময়সীমা ও প্রক্রিয়া রয়েছে, যা সামান্য এদিক-সেদিক হলে মামলা খারিজ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে চেক বাউন্স মামলার হার অনেক বেড়েছে। এই আর্টিকেলে চেক বাউন্স হলে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো থেকে শুরু করে আদালতে মামলা দায়ের, জামিন এবং শাস্তির সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো। <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold;text-decoration:underline;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর সরাসরি সহায়তা পেতে ফোন করুন: <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold;">01712655546</a>
একটি চেক ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর ব্যাংক যদি টাকা পরিশোধ না করে চেকটি ফেরত দেয়, তবে তাকে চেক ডিজঅনার বলা হয়। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো 'Insufficient Funds' বা অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা না থাকা। এছাড়া স্বাক্ষরে অমিল (Signature mismatch), চেকে কাটা-ছেঁড়া (Overwriting) এবং ড্রয়ার কর্তৃক পেমেন্ট স্টপ (Payment stopped by drawer) করার কারণেও চেক বাউন্স হতে পারে। তবে NI Act এর ১৩৮ ধারায় মামলা করার জন্য মূল শর্ত হলো অ্যাকাউন্টে অপর্যাপ্ত তহবিল বা ধার্যকৃত সীমার চেয়ে বেশি টাকার চেক প্রদান।
চেক ডিজঅনার হলে ব্যাংক একটি 'রিটার্ন মেমো' বা ডিজঅনার স্লিপ প্রদান করে, যেখানে চেক প্রত্যাখানের কারণ এবং তারিখ উল্লেখ থাকে। মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে এই ডিজঅনার স্লিপটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। তাই চেক ফেরত আসার সাথে সাথে ব্যাংক থেকে মূল চেক এবং মেমোটি সযত্নে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে।
চেক ডিজঅনার হওয়ার পর সরাসরি আদালতে গিয়ে মামলা করার সুযোগ নেই। আইনে পাওনাদারকে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে বাধ্য করা হয়েছে। প্রথম ধাপ হলো, চেক ডিজঅনার হওয়ার তারিখ থেকে ঠিক ৩০ দিনের মধ্যে চেক প্রদানকারীকে (Drawer) একটি আইনি নোটিশ বা লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে। এই নোটিশে উল্লেখ করতে হবে যে, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে চেকের সমপরিমাণ টাকা পরিশোধ না করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নোটিশটি রেজিস্টার্ড ডাকযোগে (AD সহ) বা সরাসরি প্রদান করা যায়।
লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর সময়সীমা অত্যন্ত কঠোর। যদি আপনি ডিজঅনারের ৩০ দিন পর নোটিশ পাঠান, তবে ১৩৮ ধারায় মামলা করার আইনি অধিকার হারাবেন (তবে দেওয়ানি মামলা করার সুযোগ থাকে)। নোটিশ পাওয়ার পর চেক প্রদানকারী টাকা পরিশোধের জন্য ৩০ দিন সময় পান। এই সময়কে 'Cause of Action' বা মামলার কারণ সৃষ্টির সময় বলা হয়। এই ৩০ দিন পার হওয়ার পরই কেবল আদালতে মামলা দায়ের করা যায়।
নোটিশের ৩০ দিন পার হওয়ার পর, পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে এখতিয়ার সম্পন্ন চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি CR (Complaint Register) মামলা দায়ের করতে হয়। মামলা দায়েরের সময় মূল চেক, ব্যাংকের ডিজঅনার স্লিপ, লিগ্যাল নোটিশের কপি এবং ডাকঘরের রশিদ আদালতে দাখিল করতে হয়। ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারক জবানবন্দি গ্রহণ করে অভিযোগের সত্যতা পেলে আসামির বিরুদ্ধে সমন (Summons) বা ক্ষেত্রবিশেষে গ্রেফতারি পরোয়ানা (Arrest Warrant) জারি করেন।
আসামি আদালতে হাজির হয়ে জামিন নিলে মামলাটি বিচারের জন্য দায়রা জজ বা যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে বদলি হয়। এরপর চার্জ গঠন, সাক্ষ্য গ্রহণ (Examination in Chief & Cross Examination), আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্কের মাধ্যমে মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়। একটি চেক বাউন্স মামলা প্রমাণ করার জন্য বাদীকে প্রমাণ করতে হয় যে চেকটি একটি বৈধ পাওনার (Legally enforceable debt) বিপরীতে দেওয়া হয়েছিল।
NI Act এর ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনারের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালত আসামিকে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড অথবা চেকের টাকার সর্বোচ্চ ৩ গুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারেন। বর্তমানে সাধারণত চেকের মূল টাকার দ্বিগুণ অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। আদায়কৃত জরিমানার টাকা থেকে বাদীকে চেকের সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি (আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী) ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদান করা হয়।
আসামি যদি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে চায়, তবে তাকে সাজা ঘোষণার পর আপিল করার পূর্বশর্ত হিসেবে চেকের মূল টাকার (বা জরিমানার অর্ধেক) ৫০% টাকা বিচারিক আদালতে জমা দিতে হয়। এই নিয়মটি চেক প্রতারণা রোধে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় চেক ডিজঅনার মামলা সংক্রান্ত মামলাগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে পরিচালিত হয়। আইনি অধিকার সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাবে অনেক নাগরিক তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা না করে, শুরু থেকেই সঠিক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। প্রথম ধাপে যথাযথ নোটিশ প্রদান, প্রমাণাদি সংগ্রহ এবং উপযুক্ত আদালতে আবেদন দাখিল—এই পুরো প্রক্রিয়াটিতেই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।
এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ের আইনগত পরিবর্তনগুলো সম্পর্কে অবগত থাকা জরুরি। চেক ডিজঅনার মামলা এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায় বা নজির (Precedents) নিম্ন আদালতগুলোর জন্য অবশ্য পালনীয়। তাই মামলার আরজি বা জবাব প্রস্তুত করার সময় এই নজিরগুলো উল্লেখ করলে মামলা জেতার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষ অনেক সময় এই সূক্ষ্ম আইনি বিষয়গুলো বুঝতে পারেন না, যার ফলে মামলায় হেরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরিশেষে, চেক ডিজঅনার মামলা বিষয়ে যেকোনো ধরনের আইনি জটিলতা দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। মনে রাখবেন, আইন তার সাহায্যকারীকেই সহায়তা করে, যে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়, আইন তাকে সুরক্ষা দিতে পারে না। তাই নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হোন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিন।
যেকোনো আইনি পদক্ষেপে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে সঠিক ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইনি প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি এবং জটিল হতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে বা নথিপত্রে সামান্য ভুল থাকলে পরবর্তীতে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। দেওয়ানি বা ফৌজদারি—যেকোনো মামলার ক্ষেত্রেই প্রমাণ ও নথিপত্র সংরক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে অনেক আইনি সেবা অনলাইনে পাওয়া গেলেও, মূল আইনি লড়াই এবং জটিল সমস্যাগুলোর সমাধানে একজন বিজ্ঞ আইনজীবীর সরাসরি তত্ত্বাবধান অপরিহার্য।
মামলা দায়ের করার আগে অথবা কোনো আইনি নোটিশ পাঠানোর পূর্বে অবশ্যই আইনের প্রাসঙ্গিক ধারাগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। আদালতে মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে সময়মতো হাজিরা দেওয়া, সঠিক প্রমাণ উপস্থাপন করা এবং আইনি যুক্তি খণ্ডন করা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। অনেক সময় দেখা যায়, কেবল সঠিক নির্দেশনার অভাবে বিচারপ্রার্থীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তাই যেকোনো চুক্তি স্বাক্ষর, সম্পত্তি হস্তান্তর বা পারিবারিক সমস্যা সমাধানে আগে থেকেই আইনি দিকগুলো পর্যালোচনা করে নেওয়া উচিত। এর ফলে ভবিষ্যৎ আইনি জটিলতা যেমন এড়ানো সম্ভব, তেমনি সময় ও অর্থের সাশ্রয় হয়।
সর্বশেষ আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) বা আদালতের বাইরে মীমাংসার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। ছোটখাটো বিরোধ বা পারিবারিক সমস্যাগুলো অনেক সময় সালিশ বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব। এতে উভয় পক্ষেরই সম্মান বজায় থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি শত্রুতা এড়ানো যায়। তবে যদি বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে সমাধান করতেই হয়, সেক্ষেত্রে দৃঢ় মানসিকতা এবং প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। আইনি প্রক্রিয়ায় ধৈর্য ধারণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সময় লাগতে পারে।
আমাদের ল' ফার্ম দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে মক্কেলদের সর্বোচ্চ বিশ্বস্ততার সাথে আইনি সেবা প্রদান করে আসছে। আপনার যেকোনো আইনি সমস্যায় আমরা গোপনীয়তা বজায় রেখে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেকোনো আইনি বিষয়ে বিস্তারিত জানতে এবং সরাসরি পরামর্শের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। সঠিক আইনি পরামর্শ আপনার অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।
আইনি জটিলতা এড়াতে ও সঠিক পরামর্শের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন। আমাদের অভিজ্ঞ আইনজীবী প্যানেল আপনার সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ আইনি সহায়তা প্রদান করবে।