লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-11-02 · ১৩ মিনিট পড়ার সময়
বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্পোরেট অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি বিচারাধীন মামলা হলো **নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট ১৮৮১ এর ১৩৮ ধারা (NI Act Section 138)** বা চেক ডিজঅনারের মামলা। এক বছরের কারাদণ্ড এবং চেকের মূল্যের দ্বিগুণ পর্যন্ত জরিমানার কঠোর বিধান থাকায় হাজার হাজার ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং প্রবাসী চরম মানসিক ও আইনি বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। ব্যবসায়িক মন্দা, পণ্যের ঘাটতি বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে চেক বাউন্স হলেও অনেকেই জানেন না যে—**১৩৮ ধারার অপরাধ কোনো অজামিনযোগ্য খুনের মামলা নয়, এটি একটি আপোষযোগ্য অর্থনৈতিক বিরোধ**। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বহু সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই আইনের মূল উদ্দেশ্য কাউকে জেলে পাঠানো নয়, বরং পাওনাদারের পাওনা আদায় নিশ্চিত করা। ফলে ফৌজদারি কার্যবিধির **৩৪৫ ধারা** অনুযায়ী মামলার যেকোনো স্তরে—মামলা দায়েরের পূর্বে, চার্জ গঠনের সময়, বিচার চলাকালে এমনকি রায়ের পর আপিল পর্যায়েও—একটি বিধিবদ্ধ **আপোষনামা বা সোলেহনামা (Solenama)** দাখিল করে মামলা থেকে সম্পূর্ণ **আইনসম্মত খালাস (Acquittal)** পাওয়া যায়। এই গাইডে সোলেহনামার খসড়া প্রণয়ন, কিস্তিতে টাকা পরিশোধের শর্ত, মূল চেক আদালত থেকে ফেরত নেওয়া এবং সাজা মওকুফের যাবতীয় নিয়ম বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।
| বিষয় / শর্ত | সরকারি নিয়ম, ফি ও আইন (২০২৬) |
|---|---|
| প্রযোজ্য আইন ও আদালত | বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (CrPC) ও সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ |
| আগাম ও নিয়মিত জামিন | হাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিন (ধারা ৪৯৮ CrPC) ও ম্যাজিস্ট্রেট/দায়রা আদালতে নিয়মিত জামিন |
| সরকারি পোর্টাল ও যাচাই | supremecourt.gov.bd, judiciary.gov.bd, pcc.police.gov.bd ও land.gov.bd |
| জরুরি আইনি পরামর্শ চেম্বার | অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট) — ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬ |
চেক ডিজঅনারের মামলা ফৌজদারি আদালতে বিচার হলেও এটি খুন, ডাকাতি বা চুরির মতো সমাজবিরোধী অপরাধ নয়। এটি একটি সংবিধিবদ্ধ বাণিজ্যিক ব্যর্থতা বা Regulatory Economic Offence।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো—চেক প্রদানকারী যদি পাওনাদারের দাবি মিটিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকে, তবে রাষ্ট্র কাউকে অহেতুক জেলহাজতে রাখতে আগ্রহী নয়। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৩৪৫ ধারা অনুযায়ী চেক ডিজঅনার মামলা আইনত আপোষযোগ্য। বাদী ও আসামী একমত হলে আদালত মামলাটি সরাসরি নিষ্পত্তির আদেশ দিয়ে আসামীকে খালাস দিতে আইনত বাধ্য।
একটি চেক মামলার যেকোনো পর্যায়েই উভয় পক্ষ আপোষে পৌঁছাতে পারে:
একটি অপেশাদার আপোষনামা ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে। ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সোলেহনামা ড্রাফট করার সময় নিচের শর্তগুলো অবশ্যই রাখতে হবে:
আদালতের মাধ্যমে আপোষ চূড়ান্ত করার আনুষ্ঠানিক ধাপগুলো হলো:
১৩৮ক ধারার কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, বিচারিক আদালত সাজা দিলে তার বিরুদ্ধে দায়রা আদালতে আপিল করতে হলে চেকের মূল্যের কমপক্ষে ৫০% টাকা সরকারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হয়, যা অনেকের পক্ষে তাৎক্ষণিক জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
কিন্তু রায়ের পর যদি উভয় পক্ষ আপোষে পৌঁছে যায়, তবে আপিল আদালতে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে দরখাস্ত দেওয়া যায় যে—'যেহেতু বিরোধটি আপোষনামার মাধ্যমে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে গেছে, সেহেতু ৫০% টাকা জমা দেওয়ার কোনো আইনি আবশ্যকতা নেই'। আপিল আদালত সোলেহনামা গ্রহণ করে নিম্ন আদালতের সাজার রায় বাতিল ঘোষণা করেন এবং আসামীকে বেকসুর খালাস দেন।
আপনার জমি বিরোধ, বাটোয়ারা মামলা, জামিন, তালাক বা সাইবার জটিলতায় বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে সুপ্রিম কোর্ট বা উত্তরা চেম্বারে নথিপত্রসহ সরাসরি বসুন।
মামলা চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে আপোষের সুবিধা কতটা ফলপ্রসূ তা নিম্নের টেবিলে স্পষ্ট:
| বিবেচ্য বিষয় | আদালতে মামলা চালিয়ে যাওয়া | সোলেহনামা করে আপোষ করা |
|---|---|---|
| সময়সীমা | ৩ থেকে ৫ বছর বা তদূর্ধ্ব | মাত্র ২ থেকে ৪ সপ্তাহ |
| আর্থিক ঝুঁকি | চেকের দ্বিগুণ জরিমানা ও আইনি খরচ | পারস্পরিক সমঝোতায় ডিসকাউন্টে নিষ্পত্তি |
| জেলে যাওয়ার ঝুঁকি | ১ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ডের ভয় | কোনো জেলহাজতের ঝুঁকি নেই; সসম্মানে খালাস |
| আপিলে ৫০% জমা | বাধ্যতামূলক ৫০% নগদ ডিপোজিট | আদালত কর্তৃক মওকুফ ও সরাসরি রায় বাতিল |
| মূল চেক উদ্ধার | বছরের পর বছর আদালতের নথিতে আটকে থাকে | মূল চেক তুলে এনে ছিঁড়ে ফেলা বা সিল মারা যায় |
টাকা পরিশোধ করে আপোষ করার পরও একটি মারাত্মক ভুল অনেকে করেন—তারা আদালত থেকে মূল চেকটি ফেরত নেন না। আদালতের রেকর্ড রুমে পুরোনো চেক থেকে গেলে ভবিষ্যতে কোনো অসাধু ব্যক্তি তা অপব্যবহার করতে পারে।
খালাসের আদেশের দিনই বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১৭ ধারায় জিম্মার দরখাস্ত (Jimma Petition) দিতে হয়। আদালত মূল চেক ও ডিজঅনার মেমোটি আসামী বা আইনজীবীর জিম্মায় প্রদানের আদেশ দেন। চেকটি পাওয়ার পর তার ওপর লাল কালিতে 'CANCELLED & SETTLED' লিখে কেটে দেওয়া নিরাপদ।
ব্যবসায়িক লেনদেন, ফ্ল্যাট কেনা বা ব্যক্তিগত সুদে টাকা নেওয়ার সময় অনেকেই ফাঁকা চেক (Blank Security Cheque) জমা রাখেন। সম্পূর্ণ টাকা শোধ করার পরও অসৎ পাওনাদাররা চেকে কোটি টাকার অংক বসিয়ে মামলা ঠুকে দেয়।
এক্ষেত্রে আপোষ করার সময় অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে:
বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা অনেক সময় জানতে পারেন যে দেশে ব্যবসায়িক অংশীদার তাদের বিরুদ্ধে ১৩৮ ধারায় মামলা করে ওয়ারেন্ট বের করিয়ে রেখেছে। দেশে এসে বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে অনেকেই পালিয়ে বেড়ান।
প্রবাসীদের দেশে আসার কোনো প্রয়োজন নেই। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন করে পাঠালে ঢাকার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বাদীপক্ষের সাথে বসে সমঝোতা করতে পারেন। ব্যাংকিং চ্যানেলে সমঝোতার টাকা পরিশোধ করে আদালতে যৌথ সোলেহনামা দাখিল করিয়ে প্রবাসীকে সম্পূর্ণ খালাস করিয়ে নেওয়া এবং ওয়ারেন্ট প্রত্যাহার করানো সম্পূর্ণ সম্ভব।
মতিঝিলের এক বৃহৎ ইলেকট্রনিক্স আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ডলার সংকটের কারণে এলসি খুলতে না পেরে পাইকারি ডিলারের তিনটি চেকে ১.২ কোটি টাকা বাউন্স করে। ডিলার ক্ষুব্ধ হয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনটি পৃথক সি.আর. মামলা দায়ের করে ওয়ারেন্ট জারি করায় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক যেকোনো সময় গ্রেফতারের ঝুঁকিতে পড়েন।
কোম্পানি আমাদের আইনি চেম্বারের শরণাপন্ন হলে আমরা দ্রুত নিম্নোক্ত কৌশল বাস্তবায়ন করি:
হ্যাঁ। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারা অনুযায়ী চেক ডিজঅনার মামলা আইনগতভাবে আপোষযোগ্য। উভয় পক্ষ সোলেহনামা দলিলের মাধ্যমে যেকোনো পর্যায়ে মামলা আপোষ ও প্রত্যাহার করতে পারে।
হ্যাঁ। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫(৬) ধারা অনুযায়ী অপরাধ আপোষ হলে আসামী বেকসুর খালাস (Acquittal) লাভ করেন, ফলে তার কোনো ফৌজদারি রেকর্ড থাকে না।
হ্যাঁ। বিচারিক আদালতে ১ বছরের সাজা হলেও দায়রা আদালত বা হাইকোর্টে আপিল চলাকালীন সোলেহনামা দাখিল করে সাজার রায় বাতিল ও খালাস নেওয়া যায়।
হ্যাঁ। উভয় পক্ষ পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যেকোনো অংকে (এমনকি চেকের মূল্যের চেয়ে কম টাকায়) আপোষনামা সম্পাদন করতে পারেন। এতে কোনো আইনি বাধা নেই।
মামলা নিষ্পত্তির পর ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১৭ ধারায় জিম্মার দরখাস্ত দাখিল করে আদালতের রেকর্ড থেকে মূল চেক ও ডিজঅনার মেমো ফেরত নেওয়া যায়।
হ্যাঁ। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে স্পেশাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন করে দেশে আইনজীবীর মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা দিয়ে সোলেহনামা সম্পাদন করা যায়।
হ্যাঁ। আপিল চলাকালে সোলেহনামা দাখিল করা থাকলে আপিল আদালত সমঝোতা গ্রহণ করে ৫০% নগদ ডিপোজিট ছাড়াই আপিল মঞ্জুর ও খালাসের আদেশ দেন।
সাধারণত ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সুস্পষ্ট শর্তাবলী উল্লেখ করে নোটারি বা বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে সোলেহনামা দলিল সম্পাদন করতে হয়।