চেক ডিজঅনার মামলার নতুন নিয়ম ২০২৬: ১৩৮ ধারা লিগ্যাল নোটিশ, জামিন ও আপিল প্রক্রিয়া
লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-21 · ১৯ মিনিট
⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়।
সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক দেনা পরিশোধের জন্য ইস্যু করা চেক ব্যাংকে প্রত্যাখ্যাত (Dishonour) হলে অনেকে দিশেহারা হয়ে পড়েন। নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট ১৮৮১ (Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনার মামলা দায়েরের কঠোর ও সংবিধিবদ্ধ সময়সীমা রয়েছে। সামান্য ১ দিনের বিলম্ব বা আইনি নোটিশে ভুল ঠিকানার কারণে আপনার লক্ষ লক্ষ টাকা আদায়ের অধিকার চিরতরে তামাদিতে বারিত হতে পারে। চেক বাউন্স হলে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর সঠিক পদ্ধতি, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সি.আর. মামলা দায়ের, জামিনের শর্তাবলী এবং সাজার বিরুদ্ধে আপিল করতে ৫০% অর্থ জমা দেওয়ার সর্বশেষ নিয়মাবলী বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a>।
⚡ সংক্ষেপে তাৎক্ষণিক আইনি সমাধান: চেক ডিজঅনার মামলার মূল নিয়ম
ব্যাংক থেকে চেক ডিজঅনার মেমো প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে আইনজীবীর মাধ্যমে দেনাদারকে লিখিত লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে।
নোটিশে টাকা পরিশোধের জন্য ৩০ দিনের সময় দিতে হবে। উক্ত ৩০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে উপযুক্ত আদালতে মামলা করতে হবে।
১৩৮ ধারার চেক ডিজঅনার মামলা একটি জামিনযোগ্য (Bailable) অপরাধ। প্রথম উপস্থিতিতেই আসামি বেইল বন্ড দাখিল করে জামিন পেতে পারেন।
অপরাধ প্রমাণিত হলে বিজ্ঞ আদালত দেনাদারকে অনধিক ১ বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং চেকের মূল অঙ্কের সর্বোচ্চ তিনগুণ পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারেন।
নিম্ন আদালতের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে দায়রা জজ আদালতে আপিল দায়ের করতে হলে চেকের মূল অঙ্কের ৫০% অর্থ সরকারি ট্রেজারিতে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
১. চেক ডিজঅনার কি এবং কেন হয়?
কোনো ব্যক্তি যখন তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত তহবিল (Insufficient Funds) না থাকা সত্ত্বেও অন্য কাউকে চেক প্রদান করেন এবং ব্যাংক চেকটি পরিশোধ না করে নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখপূর্বক ফেরত দেয়, তাকে আইনগত ভাষায় 'চেক ডিজঅনার' (Cheque Dishonour) বা চেক বাউন্স বলা হয়।
ব্যাংক সাধারণত যেসব কারণে চেক ফেরত দেয়:
অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা (Funds Insufficient)।
স্বাক্ষর না মেলা (Signature Differs)।
অ্যাকাউন্ট পূর্বেই বন্ধ থাকা (Account Closed)।
চেক প্রদানকারী কর্তৃক পেমেন্ট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া (Payment Stopped by Drawer)।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নজির অনুযায়ী, পেমেন্ট স্টপ করানো হলেও তা ১৩৮ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় মামলা টিকিয়ে রাখতে হলে ৩টি প্রাথমিক আইনি শর্ত শতভাগ পূরণ করতে হয়:
বৈধ ঋণের দায়: চেকটি কোনো পূর্ববর্তী আইনানুগ ঋণ বা আর্থিক দায় (Enforceable Debt or Liability) পরিশোধের জন্য ইস্যু করা হতে হবে। জুয়া বা বেআইনি লেনদেনের চেক এই আইনের আওতাভুক্ত নয়।
মেয়াদকালীন ব্যাংকে উপস্থাপন: চেকের উপর উল্লেখিত তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে ব্যাংকে জমা দিতে হবে। ৬ মাস পেরিয়ে গেলে চেকটি অকার্যকর (Stale Cheque) হয়ে যায়।
সময়মতো নোটিশ ও মামলা: ব্যাংক মেমো পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নোটিশ এবং নোটিশের মেয়াদ শেষের ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে মামলা করতে হবে। এই সময়সীমা কোনোভাবেই বৃদ্ধি করার এখতিয়ার বিচারকের নেই।
৩. লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণের বাধ্যতামূলক ধাপ ও পদ্ধতি
চেক ডিজঅনার হওয়ার পর মামলা করার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো 'তাকাজা নোটিশ' বা 'লিগ্যাল নোটিশ' প্রদান করা।
নোটিশের মাধ্যম: নোটিশ অবশ্যই রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রাপ্তিস্বীকার পত্রসহ (Registered Post with A/D) পাঠাতে হবে। বিকল্প হিসেবে বহুল প্রচারিত জাতীয় বাংলা পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেও নোটিশ জারি করা যায়।
সঠিক ঠিকানা ব্যবহার: দেনাদারের জাতীয় পরিচয়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যাংক রেকর্ডে উল্লেখিত সর্বশেষ জ্ঞাত ঠিকানায় নোটিশ পাঠাতে হবে।
দাবির স্পষ্টতা: নোটিশে চেকের নম্বর, তারিখ, ব্যাংকের নাম, টাকার পরিমাণ এবং ডিজঅনার মেমোর বিবরণ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে এবং টাকা পরিশোধের জন্য নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৩০ দিন সময় দিতে হবে।
নোটিশ জারির ৩০ দিন অতিক্রান্ত হওয়ার পরও যদি দেনাদার টাকা পরিশোধ না করেন, তবে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে উপযুক্ত আদালতে সি.আর. (Complaint Register) মামলা দায়ের করতে হয়।
উপযুক্ত আদালত এখতিয়ার: যে এলাকার ব্যাংক শাখায় চেকটি উপস্থাপিত ও ডিজঅনার হয়েছে, সেই ভৌগোলিক এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (CJM) অথবা চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (CMM) আদালতে অভিযোগ দাখিল করতে হবে। পরবর্তীতে মামলাটি বিচারের জন্য যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ বা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বদলি হয়।
৫. চেক মামলায় জামিন, সাক্ষ্য গ্রহণ ও বিচারিক প্রক্রিয়া
মামলা দায়েরের পর বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট বাদীর জবানবন্দি (CrPC ধারা ২০০) গ্রহণ করে আসামির বিরুদ্ধে সমন (Summons) জারি করেন। সমনে হাজির না হলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (Warrant of Arrest - WA) ইস্যু হয়।
জামিনযোগ্য অপরাধ: ১৩৮ ধারার মামলা জামিনযোগ্য হওয়ায় আসামি আদালতে আত্মসমর্পণ করে নির্দিষ্ট বেল বন্ড দিয়ে জামিন গ্রহণ করতে পারেন।
চার্জ গঠন ও সাক্ষ্য: বিচারিক আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪১ক ধারায় চার্জ গঠন করা হয়। এরপর মূল চেক, ডিজঅনার মেমো ও রেজিস্ট্রি নোটিশের এডি স্লিপ প্রদর্শন করে বাদীর সাক্ষ্য ও জেরা গ্রহণ করা হয়।
রায় ও দণ্ড: দোষ প্রমাণিত হলে বিচারক সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড এবং চেকের টাকার সমপরিমাণ বা সর্বোচ্চ তিনগুণ অর্থদণ্ডের রায় প্রদান করেন। অর্থদণ্ডের টাকা সরকারি কোষাগারে নয়, বরং ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাদীকে প্রদানের আদেশ দেওয়া হয়।
৬. আপিলে ৫০% জমা দেওয়ার নতুন বাধ্যবাধকতা (ধারা ১৩৮ক)
নিম্ন আদালতের সাজার আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ আসামি যদি দায়রা জজ আদালতে আপিল দায়ের করতে চান, তবে এন আই এ্যাক্ট-এর ১৩৮ক ধারা অনুযায়ী চেকের মূল টাকার ৫০% অর্থ সরকারি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে আদালতে জমা দিতে হবে।
টাকা জমার চালান ছাড়া আপিল আদালত কোনো আপিল আবেদন গ্রহণ করতে পারেন না এবং বিচারিক আদালতের সাজার আদেশ স্থগিত (Stay) করতে পারেন না। এটি পাওনাদারের জন্য একটি বিরাট রক্ষাকবচ, কারণ দেনাদার চাইলেই অর্থ পরিশোধ না করে অহেতুক আপিলের নামে বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করতে পারেন না।
৭. দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা বনাম ১৩৮ ধারার সুবিধা ও অসুবিধা
অনেকেই বুঝতে পারেন না চেক বাউন্স হলে ১৩৮ ধারায় মামলা করবেন নাকি দণ্ডবিধির ৪২০ (প্রতারণা) ধারায় মামলা করবেন। উভয়ের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য নিচে তুলে ধরা হলো:
১৩৮ ধারা এন আই এ্যাক্ট: এখানে প্রতারণার উদ্দেশ্য প্রমাণ করতে হয় না; শুধু চেক বাউন্স এবং নোটিশ প্রমাণ করলেই সাজা হয়। তাছাড়া আপিলে ৫০% জমা দিতে হয়। পাওনা টাকা আদায়ে এটি সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
দণ্ডবিধি ৪২০ ধারা: লেনদেনের শুরু থেকেই আসামির প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের অসদুদ্দেশ্য ছিল তা প্রমাণ করতে হয়। তবে যদি নোটিশের ৩০ দিনের তামাদি সময়সীমা কোনো কারণে পার হয়ে যায়, তখন ১৩৮ ধারা চালানো না গেলেও ৪২০ ধারায় ফৌজদারি মোকদ্দমা দায়ের করা যায়।
৮. চেক মামলা পরিচালনার বাস্তব লিটিগেশন ফাঁদ ও সতর্কতা
⚠️ মোকদ্দমায় যে ভুলগুলো কখনোই করবেন না:
তামাদি মেয়াদ ভুল গণনা: ব্যাংক মেমো পাওয়ার দিন গণনা না করে চেক ইস্যুর দিন থেকে নোটিশ দিলে মামলা খারিজ হয়ে যাবে।
নোটিশে অতিরিক্ত অর্থ দাবি: নোটিশে শুধুমাত্র মূল চেকের টাকার দাবি জানাতে হবে। নোটিশে সুদ বা অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণের দাবি আলাদাভাবে স্পষ্ট না থাকলে নোটিশ ডিফেক্টিভ হতে পারে।
কোম্পানির মামলায় ডিরেক্টরদের নাম বাদ দেওয়া: চেকটি কোনো প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির হলে কোম্পানিসহ পরিচালকদের পক্ষভুক্ত করা এন আই এ্যাক্ট-এর ১৪১ ধারা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক।
চেক ডিজঅনারের দ্রুত নোটিশ প্রেরণ, মহানগর দায়রা জজ আদালতে সি.আর. মামলা পরিচালনা অথবা মিথ্যা চেক মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ হতে কোয়াশমেন্ট (Section 561A CrPC) প্রতিকার পেতে যোগাযোগ করুন:
অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট 📞 মোবাইল: 01712655546 | WhatsApp: +8801712655546 📍 চেম্বার: রুম নং-২০৭, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন, ঢাকা।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)
সিকিউরিটি চেক কি ডিজঅনার হলে ১৩৮ ধারায় মামলা করা যায়?
হ্যাঁ, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চেকটি জামানত বা সিকিউরিটি হিসেবে দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ঋণের দায় থাকলে ১৩৮ ধারায় মামলা সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য।
চেক ডিজঅনার মামলায় কি আসামি সাথে সাথে জেলে যায়?
না, এটি জামিনযোগ্য অপরাধ। তবে বিচার শেষে কারাদণ্ডের রায় হলে আসামিকে কারাগারে যেতে হয় এবং সাজার বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে চেকের টাকার ৫০% জমা দিতে হয়।
লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর কত দিন পর মামলা দায়ের করতে হয়?
নোটিশ জারির ৩০ দিন সময় পার হওয়ার পর পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে মামলা করতে হয়।
আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546 |
WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০