চেক ডিজঅনার বাংলাদেশ – ধারা ১৩৮ NI আইন সম্পূর্ণ গাইড

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-03-10

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

চেক ডিজঅনার শুধু একটি ব্যাংকিং সমস্যা নয় — বাংলাদেশে এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস আইন ১৮৮১-এর ধারা ১৩৮ চেক ইস্যুকারীকে ফৌজদারি দায়বদ্ধ করতে এবং টাকা আদায়ের একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা দেয়। তবে এই প্রক্রিয়া প্রযুক্তিগত এবং সময়সংবেদনশীল — একটি সময়সীমা মিস করলে মামলা করার অধিকার হারাতে পারেন।

বাংলাদেশ আইনে চেক ডিজঅনার কী?

একটি চেক ডিজঅনার হয় যখন ব্যাংক তা অপরিশোধিত ফেরত দেয়। কারণ হতে পারে: অপর্যাপ্ত তহবিল, অ্যাকাউন্ট বন্ধ, ইস্যুকারী কর্তৃক পেমেন্ট বন্ধ, স্বাক্ষর অমিল বা মেয়াদোত্তীর্ণের আগে পোস্ট-ডেটেড চেক উপস্থাপন। প্রযুক্তিগত কারণে ডিজঅনার (যেমন তারিখ ফরম্যাট) ফৌজদারি দায় নাও আনতে পারে, কিন্তু অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে বা ব্যবস্থাকৃত পরিমাণ ছাড়িয়ে ডিজঅনার নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস আইন ১৮৮১ (NI Act)-এর ধারা ১৩৮-এর অধীনে ফৌজদারি দায় আনে।

এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি দায়ের করা ফৌজদারি মামলাগুলোর একটি — বিশেষত বাণিজ্যিক বিরোধ, ঋণ আদায় ও ব্যবসায়িক লেনদেনে। একজন অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবী ঢাকায় দক্ষতার সাথে ধারা ১৩৮ মামলা দায়ের করতে পারবেন।

আইনি কাঠামো: ধারা ১৩৮ NI আইন ১৮৮১

নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস আইন ১৮৮১-এর ধারা ১৩৮ (বাংলাদেশে প্রযোজ্য) বলে:

  • যে ব্যক্তি ঋণ বা দায় পরিশোধের জন্য চেক ইস্যু করে এবং চেক ডিজঅনার হয়, সে অপরাধ করে।
  • ডিজঅনারের কারণ অবশ্যই অপর্যাপ্ত তহবিল বা ব্যবস্থাকৃত পরিমাণ ছাড়ানো হতে হবে।
  • দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, বা চেকের তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানা, বা উভয়।
  • অপরাধটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আমলযোগ্য।

ধারা ১৩৯-১৪২ অতিরিক্ত বিধান দেয় — যেমন চেকটি দায় পরিশোধের জন্য ইস্যু করা হয়েছে বলে অনুমান (আসামির উপর প্রমাণের ভার বিপরীত করে), মামলা দায়েরের সময়সীমা ও পূর্বশর্ত।

চেক ডিজঅনার মামলা কখন বৈধ?

প্রতিটি ডিজঅনার হওয়া চেক ধারা ১৩৮ ফৌজদারি মামলার সুযোগ দেয় না। নিচের সব শর্ত একসাথে পূরণ হতে হবে:

  • চেকটি আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য ঋণ বা দায়ের জন্য ইস্যু হয়েছিল — উপহার, দান বা অবৈধ লেনদেনের জন্য নয়।
  • ব্যাংক অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে চেক ডিজঅনার করেছে — শুধুমাত্র তারিখ ত্রুটি বা স্বাক্ষর অমিলের মতো প্রযুক্তিগত কারণে নয়।
  • পাওনাদার আইনগতভাবে বৈধ ৩০ দিনের নোটিশ পাঠিয়েছেন ব্যাংকের ডিজঅনার মেমো পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে পেমেন্ট দাবি করে।
  • ইস্যুকারী নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পেমেন্ট করেননি।
  • নোটিশ মেয়াদ শেষের ৩০ দিনের মধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে — এটি কঠোর সময়সীমা। মিস করলে মামলা বাধাগ্রস্ত হয়।

যেকোনো শর্ত পূরণ না হলে ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগ খারিজ করবেন।

৩০ দিনের আইনি নোটিশের প্রয়োজনীয়তা

আইনি নোটিশ সবচেয়ে প্রযুক্তিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে থাকতে হবে:

  • ইস্যুকারীর শেষ পরিচিত ঠিকানায় লিখিতভাবে পাঠানো।
  • চেকের পরিমাণ পেমেন্ট দাবি স্পষ্টভাবে।
  • রেজিস্টার্ড ডাকে বা প্রাপ্তির প্রমাণ তৈরি করে এমন পদ্ধতিতে।
  • ইস্যুকারীকে নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে ৩০ দিন পেমেন্টের সুযোগ।
  • চেকের সঠিক বিবরণ (নম্বর, তারিখ, পরিমাণ, ব্যাংক)।

নোটিশে কোনো ত্রুটি — ভুল ঠিকানা, অপর্যাপ্ত দাবি বা প্রাপ্তির প্রমাণের অভাব — প্রতিরক্ষা পক্ষ মামলা খারিজের জন্য ব্যবহার করতে পারে। নোটিশ পাঠানোর রসিদ এবং ব্যাংকের ডিজঅনার মেমো সংরক্ষণ করুন।

মামলা দায়েরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

দায়ের করার আগে সংগ্রহ করুন:

  • মূল ডিজঅনার হওয়া চেক
  • ব্যাংকের ডিজঅনার/রিটার্ন মেমো (কারণ উল্লেখ সহ)
  • ইস্যুকারীকে পাঠানো ৩০ দিনের আইনি নোটিশের কপি
  • নোটিশ প্রদানের প্রমাণ (রেজিস্টার্ড পোস্টের রসিদ)
  • অভিযোগকারীর NID
  • ঋণের প্রমাণ — চুক্তি, চুক্তিপত্র বা সহায়ক দলিল
  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট

মূল চেক প্রাথমিক প্রামাণিক দলিল — প্রতিটি শুনানিতে মূল সংরক্ষণ করুন।

দোষী সাব্যস্ত হলে শাস্তি

ধারা ১৩৮-এর অধীনে দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত দিতে পারেন:

  • সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড
  • চেকের তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানা
  • কারাদণ্ড ও জরিমানা উভয়

বাস্তবে ফৌজদারি সমন পাওয়ার পর অনেক আসামি বিচারের আগেই মীমাংসা করেন এবং টাকা পরিশোধ করেন — যা এই মামলাকে কার্যকর আদায়ের হাতিয়ার করে তোলে। আদালত অভিযোগকারীকে ক্ষতিপূরণও দিতে পারেন।

চেক ইস্যুকারীর জন্য উপলব্ধ প্রতিরক্ষা

আসামি হলে নিচের প্রতিরক্ষাগুলো উপলব্ধ:

  • আইনগতভাবে প্রয়োগযোগ্য ঋণ নেই: চেকটি প্রকৃত ঋণের জন্য নয়, উপহার বা জামানত হিসেবে বা জোরপূর্বক ইস্যু হয়েছিল।
  • চেক চুরি বা জাল হয়েছিল।
  • প্রক্রিয়াগত ত্রুটি: নোটিশে ত্রুটি বা সময়সীমা মিস।
  • পেমেন্ট ইতিমধ্যে হয়েছে।
  • দায় উদ্ভব না হওয়া পোস্ট ডেটিং।

ধারা ১৩৯-এর অধীনে চেক ঋণের জন্য ইস্যু হয়েছে বলে অনুমান থাকে — তাই আসামিকেই প্রমাণ করতে হবে অন্যথা। যদি ধারা ১৩৮-এর নোটিশ পান তবে অবিলম্বে ফৌজদারি আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করুন।