লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>ব্যবসায়িক লেনদেন, পণ্য সরবরাহ কিংবা ব্যক্তিগত ঋণের বিপরীতে প্রাপ্ত ব্যাংক চেকটি যখন ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর ডিসঅনার স্লিপ (Dishonour Memo) সহ বাউন্স হয়ে ফিরে আসে, তখন পাওনাদারের মাথায় প্রথম প্রশ্নটি আসে—<em>"এখন আমি কী করব? কতদিনের মধ্যে আমাকে নোটিশ পাঠাতে হবে? নোটিশ না পাঠালে কি সরাসরি মামলা করা যাবে?"</em> দ্য নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট ১৮৮১ (The Negotiable Instruments Act, 1881)-এর ১৩৮ ধারার অধীনে চেক বাউন্সের মামলা পরিচালনা করতে গেলে আইন একটি অত্যন্ত কঠোর, অলঙ্ঘনীয় ও অমোঘ সময়রেখা (Timetable) নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই সময়রেখার একটি মাত্র দিনও যদি ভুলবশত বা অবহেলায় অতিক্রান্ত হয়ে যায়, তবে কোটি টাকার চেক থাকা সত্ত্বেও আপনার পুরো মামলাটি তামাদি দোষে (Barred by Limitation) আদালতে শুরুতেই খারিজ হয়ে যাবে। চেক বাউন্স হওয়ার পর কতদিনের মধ্যে ব্যাংক স্লিপ সংগ্রহ করতে হয়, কতদিনের মধ্যে রেজিস্ট্রি নোটিশ পাঠাতে হয়, নোটিশের ভাষা কেমন হতে হবে এবং মামলায় জয়ী হওয়ার সঠিক কৌশল কী—তার পূর্ণাঙ্গ আইনি রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
এনআই অ্যাক্ট ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার অধীনে অপরাধ মূলত তখনই সৃষ্টি হয় যখন দেনাদারকে আনুষ্ঠানিকভাবে টাকা পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার পরও সে অর্থ প্রদানে ব্যর্থ হয়। অর্থাৎ কেবল চেক বাউন্স হওয়াটাই চূড়ান্ত অপরাধ নয়; বরং বাউন্সের পর পাওনাদারের দাবিনামা বা নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করাটাই হলো আইনের চোখে আসল অপরাধ (Cause of Action)।
অতএব, সংবিধিবদ্ধ লিগ্যাল নোটিশ (Statutory Demand Notice) হলো ১৩৮ ধারার মামলার সবচেয়ে প্রথম এবং অপরিহার্য স্তম্ভ। আইনানুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়ায় নোটিশ পাঠানো না হলে বিজ্ঞ আদালত কোনো অবস্থাতেই মামলার নালিশ গ্রহণ করতে পারেন না।
চেকের মামলা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ এবং ১৪২ ধারা মিলে একটি ত্রিমুখী সময়রেখা নির্ধারণ করেছে যা প্রতিটি পাওনাদারকে মুখস্থ রাখতে হয়:
| ধাপ নম্বর | কার্যক্রম | আইনগত সর্বোচ্চ সময়সীমা |
|---|---|---|
| ১ম ধাপ | চেক ব্যাংকে উপস্থাপন করা | চেকের গায়ে উল্লিখিত তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে |
| ২য় ধাপ | দেনাদারকে লিখিত লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ | ব্যাংক থেকে ডিসঅনার স্লিপ পাওয়ার তারিখ থেকে ঠিক ৩০ দিনের মধ্যে |
| ৩য় ধাপ | টাকা পরিশোধের জন্য দেনাদারকে সময় দেওয়া | নোটিশ প্রাপ্তির তারিখ থেকে বাধ্যতামূলক ৩০ দিন সময় |
| ৪র্থ ধাপ | বিজ্ঞ আদালতে নালিশি (CR) মামলা দায়ের | দেনাদারের ৩০ দিন সময় শেষ হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে |
একটি চেক ইস্যু করার পর তা কতদিন পর্যন্ত কার্যকর থাকে? এনআই অ্যাক্ট ১৩৮(ক) অনুযায়ী, চেকের গায়ে যে তারিখটি লেখা থাকে, সেই তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে চেকটি ব্যাংকে ক্লিয়ারিংয়ের জন্য জমা দিতে হবে। ৬ মাস এক দিন পার হয়ে গেলে চেকটি ব্যাংকিং আইনে "স্টেল চেক" (Stale Cheque) বা বাসি চেকে পরিণত হয় এবং ব্যাংক কোনো মেমো ছাড়াই তা ফেরত দেয়। তবে ৬ মাসের মেয়াদ থাকাবস্থায় আপনি একাধিকবার চেকটি ব্যাংকে জমা দিতে পারেন। সর্বশেষ যে তারিখে চেক বাউন্স হবে, সেই তারিখ থেকেই নোটিশের তামাদি গণনা শুরু হবে।
আইন অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছে—ব্যাংক থেকে ডিজঅনার মেমো বা স্লিপ যেদিন আপনি গ্রহণ করবেন, ঠিক সেই দিন থেকে পরবর্তী ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে দেনাদারের ঠিকানায় লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ করতে হবে।
এখানে অনেকে ভুল হিসাব করেন। ধরুন আপনি ৫ মে ব্যাংকে চেক জমা দিয়েছেন, কিন্তু ব্যাংক আপনাকে ৭ মে ডিসঅনার স্লিপ বুঝিয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে তামাদির ৩০ দিন গণনা শুরু হবে ৭ মে তারিখ থেকে। ৩১তম দিনে যদি রেজিস্ট্রি ডাকঘরে নোটিশ পোস্ট করা হয়, তবে উচ্চ আদালতের সুপ্রতিষ্ঠিত রায় অনুযায়ী আপনার মামলা আইনত বাতিল হয়ে যাবে। তাই বাউন্স হওয়ার সাথে সাথে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই নোটিশ পাঠিয়ে দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ কৌশল।
এনআই অ্যাক্ট ১৩৮(খ) ধারার সংশোধনী অনুযায়ী লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণের ৩টি আইনসম্মত পদ্ধতি রয়েছে:
একটি নোটিশে কোনো ভুল তথ্য থাকলে তা পরবর্তীতে পুরো মামলার পরাজয়ের কারণ হতে পারে। একটি আদর্শ নোটিশে যা যা থাকতে হবে:
অনেক চতুর দেনাদার ডাকপিয়ন নোটিশ নিয়ে গেলে তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন বা চিঠি ফিরিয়ে দেন। অনেক পাওনাদার ভয় পান যে দেনাদার চিঠি নেয়নি, তাহলে কি মামলা করা যাবে না?
আইনি বিধান: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নোটিশ যদি দেনাদারের সঠিক ও বর্তমান ঠিকানায় রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠানো হয়ে থাকে এবং ডাকপিয়ন যদি খামের গায়ে লিখে দেন "গ্রহণে অস্বীকৃতি" (Refused) বা "খুঁজে পাওয়া গেল না" (Left without address), তবে আইনের চোখে তা সম্পূর্ণ বৈধ ও সফল নোটিশ জারি (Good and Sufficient Service) হিসেবে গণ্য হবে। ডাকপিয়নের ওই মন্তব্য সম্বলিত ফেরত খামটি অক্ষত অবস্থায় আদালতে দাখিল করলেই মামলা এগিয়ে যাবে।
নোটিশ প্রেরণের সাথে সাথেই আদালতে মামলা ঠুকে দেওয়া মারাত্মক ভুল। আইন দেনাদারকে টাকা জোগাড় করার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ৩০ দিনের সময় দিয়েছে।
দেনাদার যেদিন নোটিশ গ্রহণ করবেন (A/D কার্ডের তারিখ) বা ডাকপিয়ন যেদিন ফেরত দেবেন, সেই তারিখের পরদিন থেকে ৩০ দিন গণনা করতে হবে। এই ৩০ দিন পূর্ণ হওয়ার পূর্বে মামলা দায়ের করলে মামলাটি অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অপরিপক্ব (Premature) হিসেবে বিজ্ঞ আদালত দ্বারা সরাসরি খারিজ হয়ে যাবে।
দেনাদারের টাকা পরিশোধের ৩০ দিন পার হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বাদীর মামলা করার আইনগত অধিকারের সৃষ্টি হয় (Cause of Action arises)। এনআই অ্যাক্টের ১৪২ ধারা অনুযায়ী:
"দেনাদারের ৩০ দিন সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট লিখিত নালিশ পেশ করিতে হইবে।"
এই ৩০ দিনের মধ্যে মামলা দায়ের করতে ব্যর্থ হলে তামাদির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে এবং পরবর্তীতে আর কোনো ফৌজদারি মামলা করা সম্ভব হবে না।
চেক ডিজঅনার নোটিশ সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের কিছু মাইলফলক রায়:
১. মজিবুর রহমান বনাম রাষ্ট্র (55 DLR): সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারার কার্যধারায় নোটিশের ৩০ দিনের সময়সীমা বাধ্যতামূলক (Mandatory)। একদিনের বিলম্বের ক্ষেত্রেও আদালত তামাদি মওকুফ করতে পারেন না।
২. আমিনুল ইসলাম বনাম শাহজাহান ভূঁইয়া (48 DLR AD): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, দেনাদারের ঠিকানায় রেজিস্ট্রি নোটিশ পোস্ট করলেই পাওনাদারের আইনি দায়িত্ব সম্পন্ন হয়; দেনাদার নোটিশ গ্রহণ না করে ফেরত পাঠালেও তামাদি নষ্ট হবে না।
টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে চেক বাউন্স হলে পাওনাদারকে অবশ্যই নিম্নলিখিত সতর্কতাগুলো মানতে হবে:
চেক ডিজঅনার মামলা হলো সম্পূর্ণরূপে সময় এবং ক্যালেন্ডার নির্ভর একটি প্রযুক্তিগত আইনি লড়াই। এখানে সাধারণ কোনো ভুলের ক্ষমা নেই। আপনি যদি কোনো ব্যবসায়িক প্রতারণা বা বাউন্স চেকে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে মুখে দেনাদারের সাথে বাকবিতণ্ডা করে মূল্যবান সময় নষ্ট করবেন না। তাৎক্ষণিকভাবে একজন অভিজ্ঞ এনআই অ্যাক্ট আইনজীবীর মাধ্যমে কঠোর লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে আইনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করুন। সময়মতো পদক্ষেপ নিলে আপনার কষ্টার্জিত পাওনা শতভাগ আদায় নিশ্চিত হবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এখন প্রতিটি রেজিস্ট্রি চিঠির একটি ইউনিক ট্র্যাকিং বারকোড প্রদান করে। নোটিশ পাঠানোর সাথে সাথে প্রেরক বাংলাদেশ পোস্ট অফিসের অফিশিয়াল ট্র্যাকিং পোর্টালে (Bangladesh Post e-Tracking) গিয়ে উক্ত ট্র্যাকিং নম্বর দিয়ে দেখতে পারেন চিঠিটি কবে ডাকঘরে বুকিং হয়েছে, কবে প্রাপকের স্থানীয় পোস্ট অফিসে পৌঁছেছে এবং কোন তারিখে ডাকপিয়ন প্রাপকের দরজায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ডাকপিয়ন যদি চিঠি ডেলিভারি দেন বা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান, তার সুনির্দিষ্ট তারিখ ও সময়সহ অনলাইন ট্র্যাকিং হিস্ট্রি দেখা যায়। একজন অভিজ্ঞ এনআই অ্যাক্ট আইনজীবীর পরামর্শ হলো, নোটিশ পাঠানোর কয়েকদিন পর এই ডিজিটাল ট্র্যাকিং পেজটির একটি পূর্ণাঙ্গ কালার প্রিন্টআউট নিয়ে ফাইলে সংরক্ষণ করুন। অনেক সময় ডাকঘরের কাগজের এ/ডি কার্ড ফেরত আসতে বিলম্ব হলেও আদালত এই অনলাইন ট্র্যাক রিপোর্টকে নোটিশ জারির অকাট্য দালিলিক প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং মামলাটি বিনা বাধায় ট্রায়ালে এগিয়ে যায়।