লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>বাংলাদেশে বসবাসরত খ্রিস্টান নাগরিকদের সম্পত্তি বণ্টন ও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে ইসলামিক ফারায়েজ বা হিন্দু দায়ভাগ আইন প্রযোজ্য নয়। তাদের উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয় ১৯২৫ সালের ঐতিহাসিক ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন (The Succession Act, 1925)-এর আওতায়। এই আইনে ছেলে ও মেয়ের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে এবং উইল (Will) সম্পাদনের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। তবে উত্তরাধিকার সনদ বা প্রবেট (Probate) গ্রহণ ব্যতিরেকে মৃত ব্যক্তির ব্যাংকের টাকা বা জমি নিজের নামে নেওয়া যায় না। খ্রিস্টান উত্তরাধিকার আইনের আদ্যোপান্ত জানতে পড়ুন। বিস্তারিত পরামর্শে: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
বাংলাদেশে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য নিজস্ব পারিবারিক ও উত্তরাধিকার আইন প্রচলিত রয়েছে। মুসলমানদের ক্ষেত্রে মুসলিম শরিয়া আইন ও ১৯৬১ সালের পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ এবং হিন্দুদের ক্ষেত্রে সনাতন ধর্মীয় আইন প্রযোজ্য। তবে বাংলাদেশে খ্রিস্টান নাগরিকদের উত্তরাধিকার পরিচালিত হয় The Succession Act, 1925 (উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫)-এর ৩৩ থেকে ৪৮ ধারার বিধানাবলী দ্বারা।
এই আইনটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল আইন হিসেবে গণ্য হয়, কারণ এতে পরিবারের সদস্যদের অধিকার নির্ধারণে কোনো প্রকার লিঙ্গভিত্তিক অসমতা বা বৈষম্য রাখা হয়নি।
উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫ অনুযায়ী, যখন কোনো খ্রিস্টান পুরুষ কোনো উইল না করে (Intestate) মৃত্যুবরণ করেন, তখন তার সম্পত্তির বণ্টন নিচের নিয়মাবলীতে নির্ধারিত হয়:
খ্রিস্টান উত্তরাধিকার আইনের সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক হলো—পিতার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ে সম্পূর্ণ সমান অধিকার লাভ করে।
উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫-এর ৫৯ ধারা অনুযায়ী সুস্থ মস্তিষ্কের যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক খ্রিস্টান ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় অর্জিত বা মালিকানাধীন যে কোনো পরিমাণ সম্পত্তি উইলের মাধ্যমে যে কাউকে দান বা উইল করে যেতে পারেন।
উইল করার আইনি শর্তাবলী:
উইলকারী ব্যক্তির মৃত্যুর পর সেই উইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না। উইলটি যে আসল এবং বৈধ, তা আদালতের মাধ্যমে সনদপ্রাপ্ত হতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে আইনগত ভাষায় "প্রবেট" (Probate) বলা হয়।
যদি কোনো ব্যক্তি কোনো উইল না রেখেই মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার রেখে যাওয়া স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি (ব্যাংক একাউন্ট, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার ও জমি) পরিচালনার জন্য উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫-এর ২১৮ ধারা মোতাবেক ওয়ারিশদের জেলা জজ আদালত থেকে Letters of Administration (প্রশাসন সনদ) সংগ্রহ করতে হয়। আদালত মৃত ব্যক্তির যোগ্যতম ওয়ারিশকে এই সনদ প্রদান করেন।
খ্রিস্টানদের বিবাহ সম্পাদিত হয় The Christian Marriage Act, 1872 অনুযায়ী চার্চের যাজক (Priest/Minister) কর্তৃক। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় The Divorce Act, 1869।
খ্রিস্টান ধর্মে বিবাহ বিচ্ছেদ অত্যন্ত কঠোর এবং শুধুমাত্র জেলা জজ আদালত বা হাইকোর্ট বিভাগের রায় ও ডিক্রির মাধ্যমেই বিবাহ বিচ্ছেদ কার্যকর হতে পারে। ব্যভিচার, ধর্মান্তরিত হওয়া বা চরম নিষ্ঠুরতার মতো গুরুতর প্রমাণ ব্যতিরেকে খ্রিস্টান ধর্মে বিবাহ বিচ্ছেদ মঞ্জুর হয় না।
খ্রিস্টান উত্তরাধিকার বণ্টননামা দলিল তৈরি, জেলা জজ আদালতে প্রবেট ও লেটার্স অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মামলা পরিচালনায় সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলমের সরাসরি আইনি সহায়তা নিন।
উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫-এর ৩৪ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো খ্রিস্টান নাগরিক কোনো প্রকার উইল না করে এবং কোনো প্রকার বৈধ ওয়ারিশ (স্ত্রী, সন্তান, পিতা, মাতা, ভাই, বোন বা দূরবর্তী রক্তের আত্মীয়) না রেখে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তার রেখে যাওয়া স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়।
আইনের ভাষায় একে Escheat (ওয়ারিশহীন সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ) বলা হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) উক্ত সম্পত্তি সরকারের ১ নং খাস খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে নেন। তাই রক্তের কোনো আত্মীয় থাকলে সময়মতো লেটার্স অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মামলা দায়ের করে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে হয়।
একটি সাধারণ প্রশ্ন দেখা দেয়—খ্রিস্টান পরিবারের কোনো সদস্য যদি অন্য ধর্মে দীক্ষিত হন বা অন্য ধর্মের কেউ খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন, তবে কি তিনি পৈত্রিক সম্পত্তিতে তার অধিকার হারাবেন?
বাংলাদেশে বহাল থাকা এই ঐতিহাসিক আইনের বিধান মতে, শুধুমাত্র ধর্ম পরিবর্তনের কারণে কোনো নাগরিকের পৈত্রিক উত্তরাধিকার বা সম্পত্তির আইনগত অধিকার বাতিল বা খর্ব হয় না। ধর্মান্তরিত হলেও উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫-এর অধীনে পিতা বা মাতার ত্যাজ্য সম্পত্তিতে তার সমঅংশ আইনত বহাল থাকে।
খ্রিস্টান উত্তরাধিকারীদের মধ্যে যখন সম্পত্তি বণ্টনের কোনো লিখিত আপসনামা বা রেজিস্ট্রেশন থাকে না, তখন শরিকদের মধ্যে ভোগদখল নিয়ে চরম বিরোধ দেখা দেয়। এই সমস্যা নিরসনে দেওয়ানি আদালতের ভূমিকা অত্যন্ত সুস্পষ্ট:
মৃত খ্রিস্টান নাগরিকের ব্যাংকে রাখা ফিক্সড ডিপোজিট, ডিপিএস বা সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে যদি কোনো নমিনি না থাকে, অথবা নমিনির সাথে ওয়ারিশদের বিরোধ দেখা দেয়, তবে ব্যাংক সরাসরি টাকা ছাড় করতে পারে না।
এক্ষেত্রে উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫-এর ৩৭০ ধারা মোতাবেক বিজ্ঞ জেলা জজ আদালতে সাকসেশন সার্টিফিকেট (Succession Certificate) মোকদ্দমা করতে হয়। আদালত মৃত ব্যক্তির আইনগত ওয়ারিশদের সুনির্দিষ্ট হিস্যা অনুযায়ী প্রত্যেকের প্রাপ্য টাকার পরিমাণ উল্লেখ করে ব্যাংককে সরাসরি পরিশোধের আদেশ প্রদান করেন।
খ্রিস্টান পরিবারের মধ্যে অনেক সময় পৈত্রিক বসতভিটা ভাই-বোনদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে অবিভক্ত অবস্থায় থাকে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন ১৮৮২ (Transfer of Property Act, 1882)-এর ১২২ থেকে ১২৯ ধারা মতে, খ্রিস্টান ধর্মে দান (Gift) সম্পাদন করতে হলে রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে ন্যূনতম ২ জন সাক্ষীর সামনে সম্পাদন করতে হয়। অন্যথায় মৌখিক দান বা গির্জা কমিটির সাধারণ প্যাডে লিখে দেওয়া দান আইনত কোনো মালিকানা স্বত্ব সৃষ্টি করে না। কোনো ওয়ারিশ যদি প্রবাসে থাকেন, তবে তিনি বৈধ আমমোক্তারনামা বা স্পেশাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে বাংলাদেশ দূতাবাসের সত্যায়নপূর্বক নিজের অংশ অন্য ভাই-বোনদের কাছে হস্তান্তর করতে পারেন। যেকোনো পারিবারিক সম্পত্তি হস্তান্তরের পূর্বে স্থানীয় চার্চ কমিটির অনুমতি ও সরকারের রেকর্ড রুম থেকে সিএস ও আরএস পর্চা মিলিয়ে নেওয়া আবশ্যকীয় শর্ত।