চুক্তি ভঙ্গ হলে আইনের প্রতিকার, ক্ষতিপূরণের মামলা ও স্পেসিফিক পারফরম্যান্স গাইড ২০২৬
লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-11-02 · ১২ মিনিট পড়ার সময়
⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়।
সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।
বাংলাদেশে বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন রিয়েল এস্টেট খাত এবং মালামাল সরবরাহ চুক্তির ক্ষেত্রে 'চুক্তি ভঙ্গ' (Breach of Contract) একটি অত্যন্ত সাধারণ ও জটিল বিরোধের কারণ। জমি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য বায়না চুক্তি করে অগ্রিম টাকা দেওয়ার পর বিক্রেতা যদি সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করে দিতে অস্বীকৃতি জানায়, কিংবা কোনো কর্পোরেট সাপ্লায়ার যদি পণ্য সরবরাহ না করে অগ্রিম টাকা আত্মসাৎ করতে চায়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ মারাত্মক আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশে চুক্তি ভঙ্গের আইনি প্রতিকার মূলত **চুক্তি আইন ১৮৭২ (Contract Act 1872)** এবং **সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ (Specific Relief Act 1877)** দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রতিকারের ক্ষেত্রে মূলত দুটি রাস্তা খোলা থাকে: আদালত কর্তৃক চুক্তিটি হুবহু বাস্তবায়ন করিয়ে নেওয়া (Specific Performance) অথবা আর্থিক ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণের মামলা (Suit for Damages) দায়ের করা। এই পূর্ণাঙ্গ আইনি গাইডে চুক্তি ভঙ্গের নোটিশ, বায়নানামা চুক্তি বাস্তবায়নের তামাদি মেয়াদ, কোর্ট ফি এবং যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা পরিচালনার যাবতীয় নিয়ম বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (CrPC) ও সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ
আগাম ও নিয়মিত জামিন
হাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিন (ধারা ৪৯৮ CrPC) ও ম্যাজিস্ট্রেট/দায়রা আদালতে নিয়মিত জামিন
সরকারি পোর্টাল ও যাচাই
supremecourt.gov.bd, judiciary.gov.bd, pcc.police.gov.bd ও land.gov.bd
জরুরি আইনি পরামর্শ চেম্বার
অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট) — ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬
⚡ এক নজরে
১. চুক্তি ভঙ্গের আইনি ভিত্তি: চুক্তি আইন ও সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন
বাংলাদেশে বৈধ চুক্তির বাস্তবায়ন এবং চুক্তি ভঙ্গের ক্ষতিপূরণ দুটি প্রাচীন কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী আইনের ওপর প্রতিষ্ঠিত:
চুক্তি আইন ১৮৭২ (The Contract Act 1872): এই আইনের মূলনীতি হলো 'Pacta sunt servanda'—চুক্তির শর্তাবলী অবশ্যই মানতে হবে। আইনের ৭৩ ধারায় বলা হয়েছে, চুক্তি ভঙ্গের কারণে কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে এমন ক্ষতিপূরণ পাবে যা ওই ভঙ্গের স্বাভাবিক ফল হিসেবে উদ্ভূত হয়েছে। তবে পরোক্ষ বা অতি দূরবর্তী ক্ষতির জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না।
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ (Specific Relief Act 1877): যখন অর্থের বিনিময়ে কোনো ক্ষতির পূর্ণ সমাধান সম্ভব হয় না, তখন আদালত স্বীয় বিবেচনায় বিবাদীকে চুক্তি অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। জমি বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের চুক্তির ক্ষেত্রে এই প্রতিকারই সবচেয়ে শক্তিশালী।
আদালতের এখতিয়ার: ২৫ লক্ষ টাকার বেশি কমার্শিয়াল বা স্থাবর সম্পত্তির চুক্তি ভঙ্গের মামলা দায়ের করতে হয় যুগ্ম জেলা জজ আদালত-এ।
ক্ষতিপূরণের মামলার ক্ষেত্রে চুক্তি আইনের ৭৩ ও ৭৪ ধারার সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা অপরিহার্য:
৭৩ ধারা (বাস্তব ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ): বিবাদীর চুক্তি ভঙ্গের কারণে বাদীর প্রত্যক্ষ যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত মঞ্জুর করেন। তবে বাদীর আইনি দায়িত্ব থাকে সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর (Duty to mitigate loss) যৌক্তিক চেষ্টা করা।
৭৪ ধারা (চুক্তিতে উল্লেখিত পেনাল্টি বা জামানত বাজেয়াপ্তি): অনেক চুক্তিতে লেখা থাকে—'চুক্তি ভঙ্গ করলে অপর পক্ষ ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানা দেবে'। বাংলাদেশের আদালতে এই ক্লজ সরাসরি কার্যকর হয় না। ৭৪ ধারা অনুযায়ী আদালত শুধুমাত্র 'যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ' (Reasonable Compensation) দিতে পারেন, যা চুক্তিতে উল্লেখিত সর্বোচ্চ সীমার বেশি হবে না। বাদীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হয় যে সে বাস্তবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
৩. জমি ও ফ্ল্যাটের চুক্তি বাস্তবায়ন: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ১২ ধারা
জমি বা প্লটের ক্ষেত্রে মূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিক্রেতারা প্রায়ই বায়না নেওয়ার পর টালবাহানা শুরু করে। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ১২ ধারায় বলা হয়েছে:
আইনি অনুমান: জমি বা স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের চুক্তি ভঙ্গ হলে টাকা দিয়ে সেই ক্ষতি পূরণ করা যায় না—আইনগতভাবে আদালত এই অনুমান গ্রহণ করে চুক্তিটি হুবহু বাস্তবায়নের আদেশ দেন।
বায়নানামা রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক: রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮ এর ১৭ক ধারা অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির বায়না চুক্তি অবশ্যই লিখিত এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে। আনরেজিস্টার্ড স্ট্যাম্পে লেখা বায়নার ভিত্তিতে দেওয়ানি আদালতে চুক্তি বলবৎকরণের মামলা গ্রহণযোগ্য নয়।
বাদীর আর্থিক সদিচ্ছা (Ready and Willing): মামলার পুরো সময় বাদীকে প্রমাণ করতে হবে যে সে অবশিষ্ট টাকা পরিশোধ করে দলিল নেওয়ার জন্য সবসময় প্রস্তুত ছিল এবং এখনো প্রস্তুত আছে।
৪. জমিতে স্থিতাবস্থা ও নিষেধাজ্ঞা: অন্য কারও কাছে বিক্রি রোধে পদক্ষেপ
চুক্তি ভঙ্গের মামলা চলাকালীন বিবাদী যাতে নালিশি জমি অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করে জটিলতা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ নিতে হয়:
অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Order 39 Rules 1-2 CPC): মামলা দায়েরের দিনই দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১ ও ২ নিয়ম অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করা হয়। আদালত উভয় পক্ষের শুনানির মাধ্যমে জমিতে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
চিরতরে নিষেধাজ্ঞা (সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ৫৪ ধারা): মামলার চূড়ান্ত রায়ে আদালত বিবাদীকে নালিশি জমি অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করা থেকে স্থায়ীভাবে বারিত করেন।
৫. মামলা পূর্ববর্তী নোটিশ: ১৫ থেকে ৩০ দিনের লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর নিয়ম
আদালতে দেওয়ানি মামলা দায়ের করার পূর্বে একটি নিখুঁত লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো অপরিহার্য:
নোটিশের বিষয়বস্তু: বায়না দলিলের বিবরণ, প্রদত্ত অগ্রিম টাকার ব্যাংকিং প্রমাণ (পে-অর্ডার বা চেক নম্বর), অবশিষ্ট টাকা গ্রহণের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত হয়ে দলিল সম্পাদনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করতে হবে।
রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রেরণ: নোটিশটি অবশ্যই এ/ডি (Acknowledgement Due) সহ রেজিস্ট্রি ডাকযোগে এবং কুরিয়ারে বিবাদীর স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় পাঠাতে হবে।
অস্বীকৃতির তারিখ নির্ধারণ: বিবাদী নোটিশ পেয়েও যদি চুক্তি পালনে অস্বীকার করে বা জবাব না দেয়, তবে সেই দিন থেকেই মামলার জন্য 'অস্বীকৃতির তারিখ' নির্ধারিত হয়।
⚖️ আইনি কেস মূল্যায়ন ও চেম্বার অ্যাপয়েন্টমেন্ট
আপনার জমি বিরোধ, বাটোয়ারা মামলা, জামিন, তালাক বা সাইবার জটিলতায় বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে সুপ্রিম কোর্ট বা উত্তরা চেম্বারে নথিপত্রসহ সরাসরি বসুন।
সঠিক আইনি ফোরাম নির্বাচন না করলে বছরের পর বছর অপচয় হতে পারে। নিম্নের টেবিলে আইনি পথগুলোর তুলনা তুলে ধরা হলো:
প্রতিকারের ধরণ
প্রযোজ্য আইন ও ধারা
সংশ্লিষ্ট আদালত
তামাদি মেয়াদ
আইনি ফলাফল
চুক্তি বলবৎকরণ (Specific Performance)
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ধারা ১২
যুগ্ম জেলা জজ আদালত
চুক্তি ভঙ্গের তারিখ থেকে ১ বছর
আদালত অবাধ্য বিক্রেতার পরিবর্তে দলিল রেজিস্ট্রি করে দেয়
ক্ষতিপূরণের মামলা (Money Suit)
চুক্তি আইন ১৮৭২, ধারা ৭৩-৭৪
দেওয়ানি আদালত
চুক্তি ভঙ্গের তারিখ থেকে ৩ বছর
আর্থিক ক্ষতি ও সুদের ডিক্রি লাভ
অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা
দেওয়ানি কার্যবিধি, আদেশ ৩৯
বিচারিক দেওয়ানি আদালত
মামলার সাথে সাথে তাৎক্ষণিক
জমি বিক্রি বা রূপান্তর বন্ধের আদেশ
প্রতারণার মামলা (৪২০/৪০৬)
দণ্ডবিধি ১৮৬০, ধারা ৪২০/৪০৬
ম্যাজিস্ট্রেট আদালত
ঘটনা জানার পরপরই
গ্রেফতার ও কারাদণ্ড (তবে জমি উদ্ধার হয় না)
৭. মামলার তামাদি মেয়াদ ও কোর্ট ফি হিসাব
চুক্তি ভঙ্গের মামলায় সময়সীমা এবং খরচের হিসাব অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়:
তামাদি মেয়াদ (Limitation Period): তামাদি আইন ১৯০৮ এর ১১৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বায়না চুক্তি বলবৎকরণের মামলা দায়েরের জন্য মেয়াদ মাত্র ১ (এক) বছর। চুক্তি সম্পাদনের জন্য নির্ধারিত তারিখ থেকে অথবা বিক্রেতা চুক্তি সম্পাদনে অস্বীকৃতি জানানোর তারিখ থেকে এই ১ বছর গণনা শুরু হয়। মেয়াদ অতিক্রান্ত হলে মামলা সরাসরি খারিজ হয়ে যাবে।
কোর্ট ফি হিসাব: কোর্ট ফিস আইন ১৮৭০ অনুযায়ী দাবিকৃত অর্থ বা সম্পত্তির মূল্যের ওপর ২% হারে অ্যাড-ভ্যালোরেম কোর্ট ফি প্রদান করতে হয়। তবে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ কোর্ট ফির সংবিধিবদ্ধ সিলিং নির্ধারিত থাকায় অযৌক্তিক বিপুল ফি পরিশোধ করতে হয় না।
৮. বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক চুক্তি: সালিশি আইন ২০০১ ও বিদেশি রোয়েদাদ
কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে মামলা আদালতের বাইরে সালিশির মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়:
সালিশি ক্লজ (Arbitration Clause): চুক্তিতে যদি সালিশি ধারা থাকে, তবে কোনো পক্ষ দেওয়ানি আদালতে মামলা করলেও অপর পক্ষ সালিশি আইন ২০০১ এর ৭ ধারা অনুযায়ী আবেদন করে দেওয়ানি মামলা স্থগিত রেখে সালিশে যাওয়ার আদেশ নিতে পারে।
নিউইয়র্ক কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক রোয়েদাদ: বাংলাদেশ ১৯৫৮ সালের নিউইয়র্ক কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ। ফলে সিঙ্গাপুর (SIAC) বা লন্ডনের সালিশি ট্রাইব্যুনাল থেকে প্রাপ্ত রোয়েদাদ সরাসরি ঢাকার জেলা জজ আদালতের মাধ্যমে কার্যকর করা যায়।
৯. প্রবাসী (NRB) ও রিয়েল এস্টেট ফ্ল্যাট বুকিং বিরোধ
আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রতারণার শিকার হন। চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দিয়ে ডেভেলপাররা বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখে।
এক্ষেত্রে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ অত্যন্ত কঠোর সুরক্ষা দেয়:
আইনের ২৪ ধারা মতে, নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হলে ডেভেলপার কোম্পানিকে ক্রেতাকে মাসিক হারে ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান করতে হয়।
প্রকল্প সম্পূর্ণ বন্ধ বা ব্যর্থ হলে জমাকৃত সম্পূর্ণ অর্থ বাণিজ্যিক হারে সুদসহ ফেরত দিতে কোম্পানি বাধ্য।
কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে সরাসরি ফৌজদারি মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা যায়।
লন্ডন প্রবাসী এক ব্যবসায়ী ঢাকার উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে ৩.৫ কোটি টাকা মূল্যের একটি বাণিজ্যিক প্লট কেনার জন্য রেজিস্ট্রি বায়না দলিল সম্পাদন করেন এবং ১ কোটি টাকা বায়না প্রদান করেন। পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে বাকি ২.৫ কোটি টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রি নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর মধ্যে ওই এলাকায় জমির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বিক্রেতা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় এবং অন্য একটি ডেভেলপার কোম্পানির কাছে জমিটি বিক্রির চক্রান্ত করে।
লন্ডন থেকে ক্লায়েন্ট আমাদের চেম্বারের সাথে যোগাযোগ করলে আমরা নিম্নোক্ত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করি:
লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের মাধ্যমে স্পেশাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়ন সম্পন্ন করা হয়।
একটি কড়া ১৫ দিনের লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে ব্যাংক পে-অর্ডারের মাধ্যমে অবশিষ্ট ২.৫ কোটি টাকা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
বিক্রেতা জবাব না দেওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে টাইটেল স্যুট (চুক্তি বলবৎকরণ) দায়ের করা হয়।
মামলার প্রথম দিনেই দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের আওতায় আবেদন করে জমিতে স্থিতাবস্থা ও অন্য কারও কাছে হস্তান্তরের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করানো হয়।
নিষেধাজ্ঞা পেয়ে জমি বিক্রির সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিবাদী আদালতে উপস্থিত হয়ে আপোষ করতে বাধ্য হয় এবং আদালতের তত্ত্বাবধানে অবশিষ্ট টাকা গ্রহণ করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদন সম্পন্ন করে।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)
বায়না চুক্তির মেয়াদ পার হয়ে গেলে কি চুক্তি বাস্তবায়ন মামলা করা যায়?
হ্যাঁ, তবে তামাদি আইনের ১১৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিক্রেতা দলিল সম্পাদনে চূড়ান্তভাবে অস্বীকৃতি জানানোর তারিখ থেকে ১ (এক) বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। এই এক বছর পার হয়ে গেলে চুক্তি বলবৎকরণের দেওয়ানি মামলা তামাদিতে বারিত হয়ে যাবে।
আনরেজিস্টার্ড বা নোটারি করা বায়না দলিলের ভিত্তিতে কি জমি রেজিস্ট্রি করিয়ে নেওয়া সম্ভব?
না। ২০০৪ সালের সংশোধিত রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ক ধারা অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তি বিক্রির বায়না দলিল অবশ্যই সরকারি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে। আনরেজিস্টার্ড স্ট্যাম্পে চুক্তি করে স্পেসিফিক পারফরম্যান্সের মামলা করা যায় না।
চুক্তি ভঙ্গের জন্য ফৌজদারি মামলা (৪২০ ধারা) করা কি সঠিক কৌশল?
চুক্তির শুরু থেকেই যদি বিবাদীর অসৎ উদ্দেশ্য ও প্রতারণার প্রমাণ থাকে, তবেই ৪২০ ধারা খাটে। অন্যথায় উচ্চ আদালত এটিকে নিছক দেওয়ানি বিরোধ বলে ফৌজদারি মামলা বাতিল করে দেয়। জমি রেজিস্ট্রি পেতে হলে দেওয়ানি আদালতে চুক্তি বলবৎকরণের মামলাই একমাত্র সঠিক পথ।
প্রবাসী ব্যক্তি কি দেশে না এসে চুক্তি ভঙ্গের মামলা পরিচালনা করতে পারেন?
হ্যাঁ। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশ মিশন (হাই কমিশন বা দূতাবাস) থেকে স্পেশাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন করে দেশে আইনজীবী বা প্রতিনিধির মাধ্যমে মামলা পরিচালনা করতে পারেন।
চুক্তিতে লেখা ক্ষতিপূরণ বা পেনাল্টি ক্লজ কি আদালত হুবহু দিয়ে থাকে?
না। চুক্তি আইনের ৭৪ ধারা অনুযায়ী চুক্তিতে পেনাল্টির পরিমাণ লেখা থাকলেও আদালত কেবল বাস্তব ও যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করেন। বাদীকে আর্থিক ক্ষতির প্রমাণ আদালতে দাখিল করতে হয়।
মামলা চলাকালীন বিবাদী যাতে জমি অন্য কোথাও বিক্রি না করতে পারে সেজন্য কী করণীয়?
মামলার আর্জির সাথে সাথেই দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১ ও ২ নিয়ম অনুযায়ী জমিতে স্থিতাবস্থা ও তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Injunction) আবেদন করতে হয়।
ডেভেলপার নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট না দিলে শ্রম বা রিয়েল এস্টেট আইনে কী সমাধান আছে?
রিয়েল এস্টেট আইন ২০১০ এর ২৪ ধারা মোতাবেক বিলম্বিত প্রতি মাসের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা যায়, অথবা চুক্তি বাতিল করে জমাকৃত সকল অর্থ বাণিজ্যিক ব্যাংক হারে সুদসহ ফেরতের মামলা করা যায়।
চুক্তি ভঙ্গ মামলার কোর্ট ফি কত দিতে হয়?
দেওয়ানি আদালতে দাবিকৃত টাকা বা সম্পত্তির মূল্যের ওপর শতকরা হারে কোর্ট ফি ধার্য হয়। তবে কোর্ট ফিস আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সংবিধিবদ্ধ সীমার মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
দায়বর্জন (Disclaimer): এই আর্টিকেলে পরিবেশিত তথ্যসমূহ কেবল আইনি সচেতনতা ও সাধারণ শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো প্রত্যক্ষ আইনি পরামর্শ (Legal Advice) নয় এবং এর মাধ্যমে কোনো আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক (Attorney-Client Relationship) তৈরি হয় না। আপনার সুনির্দিষ্ট মামলার আইনি প্রতিকারের জন্য সরাসরি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের তালিকাভুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।
আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546 |
WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০