বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজ ২০২৬ — সম্পূর্ণ পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-12
⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়।
সরাসরি পরামর্শের জন্য
+880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।
বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজ বলতে সাধারণত পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠান ছাড়াই আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে নিবন্ধিত বিবাহকে বোঝায়। এটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং প্রেমের বিবাহ বা পারিবারিক মতবিরোধে অনেকেই এই পদ্ধতি বেছে নেন। এই গাইডে কোর্ট ম্যারেজের পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, খরচ ও আইনি সুবিধা-অসুবিধা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
কোর্ট ম্যারেজ কী এবং এটি কি বাংলাদেশে বৈধ
বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজ বলতে সাধারণত দুটি জিনিস বোঝায়:
- কাজী অফিসে নিবন্ধিত বিবাহ: কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান ছাড়াই কাজী অফিসে গিয়ে বিবাহ নিবন্ধন করা। মুসলিমদের ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি।
- ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বিবাহ: হিন্দু বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে Special Marriage Act-এর আওতায় প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বিবাহ।
বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজ সম্পূর্ণ বৈধ এবং আইনসম্মত। এটি সাধারণ বিবাহের মতোই আইনি স্বীকৃতি পায়। তবে অনেকে ভুলভাবে মনে করেন এটি পারিবারিক মতের বিরুদ্ধে করলে অবৈধ — যা সঠিক নয়। প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ তাদের নিজের সিদ্ধান্তে বিবাহ করতে পারেন।
কোর্ট ম্যারেজ কে করতে পারবেন
বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজ করতে নিচের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে:
- বয়স: মুসলিম বিবাহে পুরুষের বয়স কমপক্ষে ২১ বছর এবং নারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হতে হবে (Muslim Family Laws Ordinance 1961 এবং Child Marriage Restraint Act 2017 অনুযায়ী)।
- বৈবাহিক অবস্থা: বিবাহিত হলে আগের বিবাহ ভেঙে যাওয়ার প্রমাণ (তালাকনামা বা মৃত্যু সনদ) লাগবে।
- মানসিক সক্ষমতা: উভয়পক্ষকে সুস্থ মানসিক অবস্থায় সম্মতি দিতে হবে।
- নিকটাত্মীয় নয়: মুসলিম আইনে নিষিদ্ধ সম্পর্কের মধ্যে বিবাহ করা যাবে না।
- ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা: মুসলিম বিবাহে দুইজন সাক্ষী ও মোহরানা নির্ধারণ বাধ্যতামূলক।
বিদেশিদের সাথে বা ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিবাহের ক্ষেত্রে বিশেষ আইন প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে একজন পারিবারিক আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
কোর্ট ম্যারেজের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
কোর্ট ম্যারেজের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): উভয়পক্ষের জাতীয় পরিচয়পত্রের মূল কপি ও ফটোকপি।
- জন্ম সনদ: বয়স প্রমাণের জন্য জন্ম নিবন্ধন সনদ বা জন্ম সার্টিফিকেট।
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি: উভয়পক্ষের সাম্প্রতিক ছবি।
- অ্যাফিডেভিট: ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিকের সামনে বৈবাহিক অবস্থা, বয়স ও স্বেচ্ছায় বিবাহের অঙ্গীকার জানিয়ে অ্যাফিডেভিট।
- সাক্ষীর কাগজপত্র: দুইজন সাক্ষীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি।
- তালাকনামা বা মৃত্যু সনদ: পূর্বে বিবাহিত হলে বিচ্ছেদের প্রমাণ।
অমুসলিমদের ক্ষেত্রে উপরোক্ত কাগজপত্র ছাড়াও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রমাণ লাগতে পারে।
মুসলিম কোর্ট ম্যারেজের পদ্ধতি
বাংলাদেশে মুসলিম কোর্ট ম্যারেজের ধাপগুলো:
- কাজী অফিস নির্ধারণ: আপনার এলাকার (বর বা কনের স্থায়ী ঠিকানা) কাজী অফিস খুঁজে নিন।
- অ্যাফিডেভিট প্রস্তুত: আদালতে বা নোটারি অফিসে গিয়ে অ্যাফিডেভিট করুন — বয়স, বৈবাহিক অবস্থা ও স্বেচ্ছামূলক বিবাহের ঘোষণা।
- কাজী অফিসে আবেদন: কাজী সাহেবের কাছে কাবিননামা ফর্ম পূরণ করুন।
- মোহরানা নির্ধারণ: দুইপক্ষ মিলে মোহরানার পরিমাণ নির্ধারণ করুন।
- ইজাব-কবুল ও সাক্ষী: কমপক্ষে দুইজন সাক্ষীর সামনে কাজী সাহেব ইজাব-কবুল সম্পন্ন করবেন।
- কাবিননামা নিবন্ধন: কাবিননামায় উভয়পক্ষ ও সাক্ষী স্বাক্ষর করবেন এবং কাজী নিবন্ধন করবেন।
- সনদ গ্রহণ: নিবন্ধিত কাবিননামার একটি সত্যায়িত কপি সংরক্ষণ করুন।
অমুসলিম কোর্ট ম্যারেজের পদ্ধতি
বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিষ্টান ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিবাহের আলাদা আইন রয়েছে:
- হিন্দু বিবাহ: বাংলাদেশে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন ২০১২ অনুযায়ী নিবন্ধন করা যায়। তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়।
- খ্রিষ্টান বিবাহ: Christian Marriage Act 1872 অনুযায়ী লাইসেন্সপ্রাপ্ত যাজক বা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বিবাহ নিবন্ধন হয়।
- বিশেষ বিবাহ আইন: ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বা কোনো ধর্মীয় পরিচয় ছাড়া বিবাহ করতে Special Marriage Act 1872 প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বিবাহ হয় এবং ৩০ দিন আগে নোটিশ দিতে হয়।
অমুসলিম কোর্ট ম্যারেজের জটিলতায় পারিবারিক আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কোর্ট ম্যারেজের খরচ ও সময়
কোর্ট ম্যারেজের মোট খরচ তুলনামূলকভাবে কম:
- অ্যাফিডেভিট খরচ: ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা (নোটারি বা ম্যাজিস্ট্রেট অনুযায়ী ভিন্ন)।
- কাবিননামা নিবন্ধন ফি: সরকারি ফি খুবই কম (সাধারণত ১০০-৫০০ টাকা)। কাজীর ফি আলাদা।
- স্ট্যাম্প ডিউটি: কাবিননামার স্ট্যাম্প ডিউটি মোহরানার পরিমাণ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
- আইনজীবী ফি: আইনজীবী সহায়তা নিলে আলাদা ফি।
সময়: সব কাগজপত্র প্রস্তুত থাকলে মুসলিম কোর্ট ম্যারেজ একদিনেই সম্পন্ন হতে পারে। Special Marriage Act-এ ৩০ দিন আগে নোটিশ দিতে হয় বলে সেটি বেশি সময় লাগে।
কোর্ট ম্যারেজের সুবিধা ও অসুবিধা
সুবিধা:
- সম্পূর্ণ আইনি স্বীকৃতি — পাসপোর্ট, ভিসা, সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারে সুরক্ষা।
- সামাজিক অনুষ্ঠানের খরচ বাঁচে।
- প্রেমের সম্পর্ককে আইনি সুরক্ষা দেওয়া যায়।
- দ্রুত সম্পন্ন করা যায়।
- উভয়পক্ষের স্বেচ্ছামূলক সম্মতির প্রমাণ থাকে।
অসুবিধা:
- পারিবারিক মতবিরোধ হতে পারে।
- সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা থাকে না।
- যদি ভবিষ্যতে তালাক হয়, আইনি প্রক্রিয়া একইভাবে জটিল।
- কাবিননামা না থাকলে স্ত্রী মোহরানা দাবি করতে পারবেন না।