লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>পারিবারিক অমিল, প্রেমঘটিত বিয়ে কিংবা সামাজিক জটিলতায় আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের মুখে সবচেয়ে বহুল উচ্চারিত একটি শব্দ হলো—<strong>"কোর্ট ম্যারেজ" (Court Marriage)</strong>। কিন্তু আইন অঙ্গনে প্র্যাকটিস করতে গিয়ে আমরা প্রায় প্রতিদিনই এমন ঘটনার মুখোমুখি হই যেখানে তরুণ যুগল কেবল কোর্টে গিয়ে নোটারি পাবলিকের সামনে ২০০ বা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে একটি এফিডেভিট (হলফনামা) সই করেই মনে করেন তাদের আইনসম্মত বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেছে! অথচ বাংলাদেশের মুসলিম বিবাহ আইন ও পারিবারিক আইন অনুযায়ী <strong>শুধুমাত্র নোটারি এফিডেভিটের মাধ্যমে কোনো বিয়ে হয় না; এটি আইনের দৃষ্টিতে বিয়ে হিসেবে সম্পূর্ণ শূন্য ও অবৈধ (Void)।</strong> পরবর্তীতে মেয়ের পরিবার যখন থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ বা ৯ ধারায় অপহরণ ও ধর্ষণের মামলা ঠুকে দেয়, তখন ছেলেটিকে সরাসরি জেলে যেতে হয়। কোর্ট ম্যারেজের আসল আইনি রূপরেখা কী, কী কী কাগজপত্র ও বয়স প্রমাণের দলিল লাগে, মোট কত টাকা খরচ হয় এবং কীভাবে কাজীর মাধ্যমে কাবিননামা রেজিস্ট্রি করে শতভাগ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন—তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি গভীর ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, জজ কোর্টে বা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে গেলে বিচারক নিজে বিয়ে পড়িয়ে দেন। প্রকৃত আইনি সত্য হলো—বাংলাদেশ আইনে "কোর্ট ম্যারেজ" (Court Marriage) বলে আলাদা কোনো বিবাহের অস্তিত্ব নেই। কোনো আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেট কারো বিয়ে পড়াতে পারেন না।
আইনের পরিভাষায় যা ঘটে তা হলো: প্রাপ্তবয়স্ক একজন পুরুষ ও একজন নারী বিজ্ঞ আদালতের একজন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট অথবা আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত নোটারি পাবলিকের (Notary Public) সামনে হাজির হয়ে একটি যৌথ হলফনামা বা এফিডেভিট (Declaration Affidavit) সম্পাদন করেন। এই এফিডেভিটে তারা ঘোষণা করেন যে, তারা প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের এবং স্বেচ্ছায় পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ কোর্টের কাজ কেবল ঘোষণার সাক্ষী হওয়া, বিয়ে পড়ানো নয়।
এটি কোর্ট ম্যারেজের সবচেয়ে মারাত্মক ও সংবেদনশীল আইনি দিক। অনেকেই নোটারি পাবলিকের ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে এফিডেভিট সই করে ভাবেন তাদের বিয়ে হয়ে গেছে এবং কাজী অফিসে যাওয়ার আর প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ একাধিক রিট ও ক্রিমিনাল আপিলে সুনির্দিষ্টভাবে রায় দিয়েছেন যে—শুধুমাত্র নোটারি পাবলিকের এফিডেভিট দ্বারা কোনো মুসলিম, হিন্দু বা খ্রিস্টান বিয়ে বৈধ হয় না। মুসলিম আইন অনুযায়ী ইজাব ও কবুল, দেনমোহর নির্ধারণ, উপযুক্ত সাক্ষীদের উপস্থিতি এবং সরকারি নিকাহ রেজিস্ট্রারের ভলিউমে রেজিস্ট্রি ছাড়া বিবাহ সম্পন্ন হয় না। শুধু এফিডেভিট করে সংসার শুরু করলে মেয়ের পরিবার অপহরণ ও ধর্ষণের মামলা দিলে স্বামী আইনত নিজেকে বিবাহিত হিসেবে প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন ১৯৭৪ (The Muslim Marriages and Divorces Registration Act, 1974)-এর ৩ ও ৫ ধারায় অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেকটি মুসলিম বিবাহ সরকার অনুমোদিত নিকাহ রেজিস্ট্রারের (কাজী) মাধ্যমে সরকারি রেজিস্ট্রি বহিতে অবশ্যই নিবন্ধন করতে হবে।
আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি বিবাহ নিবন্ধন না করায়, তবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ (২ বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা জরিমানা)। সুতরাং নিরাপদ বিয়ের একমাত্র পদ্ধতি হলো—কোর্ট এফিডেভিটের সাথে সাথে কাজীর মাধ্যমে সরকারি কাবিননামা (Nikahnama) সম্পন্ন করা। এই কাবিননামা হলো বিয়ের একমাত্র চূড়ান্ত ও অলঙ্ঘনীয় রাষ্ট্রীয় সনদ।
কোর্ট ম্যারেজ এবং কাজী রেজিস্ট্রেশন উভয় কার্যক্রম নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বর ও কনেকে নিচের নথিপত্রগুলো সাথে রাখতে হবে:
কোর্ট ম্যারেজের ক্ষেত্রে বয়সের বিষয়ে কোনো আপস নেই। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী:
মেয়ের বয়স যদি ১৮ বছর পূর্ণ হতে মাত্র ১ দিনও বাকি থাকে, তবে কোনো কোর্ট বা কাজী সেই বিয়ে সম্পন্ন করতে পারবেন না। কনে অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে পুরো বিয়েটি অবৈধ হবে এবং বর ও কাজীর বিরুদ্ধে বাল্যবিবাহ আইনে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
আইনত ত্রুটিহীন ও ১০০% নিরাপদ একটি কোর্ট ম্যারেজ সম্পন্ন করার সঠিক ধারাবাহিক ধাপগুলো নিচে দেওয়া হলো:
কোর্ট ম্যারেজের খরচ মূলত নোটারি এফিডেভিট, আইনজীবীর ফি এবং দেনমোহরের ওপর সরকারি কাজী ফির সমন্বয়ে নির্ধারিত হয়:
| খরচের খাত | সরকারি ও আনুমানিক ব্যয় | বিবরণ |
|---|---|---|
| নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও নোটারি ফি | ১,৫০০ - ৩,০০০ টাকা | ৩০০ টাকার স্ট্যাম্প, টাইপিং এবং নোটারি রেজিস্ট্রারের সরকারি অনুমোদন ফি |
| বিজ্ঞ আইনজীবীর পেশাগত ফি | ৩,০০০ - ৮,০০০ টাকা | লিগ্যাল ড্রাফটিং, আইনি পরামর্শ এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের পারিশ্রমিক |
| সরকারি কাজী ফি (দেনমোহর অনুযায়ী) | প্রতি লাখে ১,২৫০ টাকা | ১ম চার লাখের জন্য প্রতি লাখে ১,২৫০ টাকা, পরবর্তী প্রতি লাখে ১০০ টাকা (সরকারী আইন) |
| কাবিননামার সার্টিফাইড কপি ও মিস ফি | ১,০০০ - ২,০০০ টাকা | নিকাহনামার অফিসিয়াল কপি ও ফরম বিতরণ খরচ |
সাধারণত দেনমোহর ২ থেকে ৫ লাখ টাকার মধ্যে হলে কোর্ট এফিডেভিট এবং কাজী রেজিস্ট্রেশন মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত কোর্ট ম্যারেজের সার্বিক খরচ ৮,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকার মধ্যে সম্পন্ন হয়।
পরিবারের অসম্মতিতে বিয়ে করার পর সবচেয়ে বড় বিপদের জায়গা হলো মেয়ের পরিবার। মেয়ের বাবা বা ভাই প্রায়শই থানায় গিয়ে অভিযোগ করেন যে "আমার নাবালিকা মেয়েকে জোরপূর্বক অপহরণ করে ধর্ষণ করা হয়েছে" এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৭ ও ৯ ধারায় নিয়মিত মামলা দায়ের করেন।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বর ও কনেকে আগে থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে:
পুলিশ যখন কনেকে উদ্ধার করে বা কনে নিজে আদালতে আত্মসমর্পণ করে, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি অস্ত্র হলো ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারা এবং নারী ও শিশু আইনের ২২ ধারায় বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে কনের জবানবন্দি।
ম্যাজিস্ট্রেটের খাসকামরায় কোনো পুলিশ বা অভিভাবক উপস্থিত থাকেন না। সেখানে মেয়ে যদি নির্ভয়ে বিচারককে বলেন—"আমাকে কেউ অপহরণ করেনি, আমার বয়স ১৮ বছরের বেশি, আমি প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে স্বেচ্ছায় বরকে বিয়ে করেছি এবং আমি স্বামীর ঘরেই সংসার করতে চাই"—তবে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিকভাবে মেয়েকে তার স্বামীর জিম্মায় (Safe Custody to Husband) দেওয়ার আদেশ দেন এবং মামলাটি খারিজের পথ সুগম হয়।
যদি বর ও কনে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের হন (যেমন একজন মুসলিম এবং অপরজন হিন্দু বা খ্রিস্টান) এবং কেউই নিজের ধর্ম পরিবর্তন করতে না চান, তবে তারা ১৮৭২ সালের বিশেষ বিবাহ আইন (Special Marriage Act, 1872) অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন করতে পারেন। এই আইনের অধীনে সরকার নিযুক্ত বিশেষ বিবাহ রেজিস্ট্রার (Marriage Registrar)-এর কাছে ১৪ দিনের নোটিশ প্রদান সাপেক্ষে সিভিল ম্যারেজ সম্পন্ন করা হয়।
কোর্ট ম্যারেজ ও নাবালিকা উদ্ধারের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের পথপ্রদর্শক রায়সমূহ:
১. রাশিদা খাতুন বনাম রাষ্ট্র (49 DLR): আদালত রায় দেন যে, প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সম্পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকারী। মেয়ের পিতা যদি প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের পছন্দের বিয়েকে অপহরণ আখ্যা দিয়ে মামলা করেন, তবে তা আইনের চরম অপব্যবহার (Abuse of Process of Court)।
২. মোঃ রফিকুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র (53 DLR AD): সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ দেন যে, শুধুমাত্র নোটারি এফিডেভিট ফৌজদারি মামলা থেকে জামিন দিতে পারে না যদি না তার সমর্থনে সরকারি কাজী কর্তৃক নিবন্ধিত কাবিননামা থাকে।
কোর্ট ম্যারেজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো শতভাগ নিশ্চিত করুন: