লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-08-04
<p>আমাদের সমাজে 'কোর্ট ম্যারেজ' (Court Marriage) শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলেও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এর প্রকৃত অর্থ অনেকেই পরিষ্কারভাবে জানেন না। অনেকে মনে করেন, শুধু নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এফিডেভিট বা হলফনামা করলেই কোর্ট ম্যারেজ সম্পন্ন হয় এবং এটিই বিয়ের সম্পূর্ণ আইনি স্বীকৃতি। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কোর্ট ম্যারেজ বা হলফনামা হলো কেবল স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসাথে থাকার একটি ঘোষণাপত্র, মূল আইনি বিবাহ সম্পন্ন হয় নিজ নিজ ধর্মীয় আইন অনুযায়ী রেজিস্ট্রি করার মাধ্যমে। এই আর্টিকেলে আমরা কোর্ট ম্যারেজ কী, এটি করার সঠিক আইনি পদ্ধতি, ধর্মীয় ও স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী বিয়ের নিয়ম, এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।</p>
সাধারণ মানুষের ভাষায় 'কোর্ট ম্যারেজ' বলতে নোটারি পাবলিক বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে একটি এফিডেভিট বা হলফনামা সম্পাদন করাকে বোঝায়। ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে পাত্র-পাত্রী ঘোষণা করেন যে তারা প্রাপ্তবয়স্ক, তারা স্বেচ্ছায় একে অপরকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং তারা ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন বা হবেন। এই হলফনামাটি ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা বা পরিবারের পক্ষ থেকে মিথ্যা অপহরণ মামলা (যেমন নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৭/৩০ ধারায় মামলা) হলে আত্মরক্ষার একটি শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। তবে মনে রাখতে হবে, শুধুমাত্র এই হলফনামাটিই বিবাহ নয়, এটি বিবাহের একটি প্রমাণমাত্র।
মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী, প্রতিটি মুসলিম বিবাহ অবশ্যই সরকার অনুমোদিত নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজি দ্বারা রেজিস্ট্রি করতে হবে। কোর্টে হলফনামা করার পর বা আগে, পাত্র-পাত্রীকে অবশ্যই কাজি অফিসে গিয়ে ধর্মীয় রীতি (ইজাব ও কবুল) পালন করে কাবিননামায় (ফরম নম্বর-২) স্বাক্ষর করতে হবে। বিয়ের অনুষ্ঠানে ২ জন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষী এবং দেনমোহর নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক। কাজি বিয়ের রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে একটি ম্যারেজ সার্টিফিকেট প্রদান করবেন। এই কাবিননামাই হলো মুসলিম বিবাহের একমাত্র চূড়ান্ত আইনি দলিল। কাবিননামা ছাড়া স্ত্রী মোহরানা বা খোরপোষ দাবি করতে পারেন না এবং সন্তানের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
যদি পাত্র এবং পাত্রী ভিন্ন ধর্মের অনুসারী হন (যেমন একজন মুসলিম, অন্যজন হিন্দু) এবং তারা কেউ ধর্ম পরিবর্তন না করেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চান, তবে তাদের 'স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট, ১৮৭২' (Special Marriage Act, 1872)-এর অধীনে বিয়ে করতে হবে। এই আইনের অধীনে সরকার নিযুক্ত 'ম্যারেজ রেজিস্ট্রার'-এর কাছে বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের অন্তত ১৪ দিন আগে রেজিস্ট্রার বরাবর একটি নোটিশ (Notice of Intended Marriage) প্রদান করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের পর ৩ জন সাক্ষীর উপস্থিতিতে পাত্র-পাত্রী রেজিস্ট্রারের সামনে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন এবং রেজিস্ট্রার একটি ম্যারেজ সার্টিফিকেট ইস্যু করেন। এটিকে প্রকৃত অর্থে আইনগত 'সিভিল ম্যারেজ' বা কোর্ট ম্যারেজ বলা যায়।
কোর্ট ম্যারেজ বা বিবাহ রেজিস্ট্রির জন্য পাত্র-পাত্রী উভয়কে বয়স প্রমাণের জন্য নির্ভরযোগ্য দলিলাদি উপস্থাপন করতে হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে: ১) পাত্র ও পাত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা জন্ম নিবন্ধন সনদ বা পাসপোর্ট। ২) শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র (বয়স প্রমাণের জন্য)। ৩) পাত্র-পাত্রী উভয়ের ৩-৪ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি। ৪) কাজি অফিসে বা রেজিস্ট্রারের কাছে উপস্থিত থাকার জন্য কমপক্ষে ২ বা ৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষী এবং তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও ছবি। মনে রাখবেন, বাল্যবিবাহ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, তাই বয়সের প্রমাণপত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নোটারি পাবলিকের কাছে কোর্ট ম্যারেজের হলফনামা তৈরি করতে স্ট্যাম্প ডিউটি এবং আইনজীবীর ফিসহ সাধারণত এক থেকে তিন হাজার টাকার মতো খরচ হতে পারে। অন্যদিকে, কাজি অফিসে কাবিননামা রেজিস্ট্রির ফি দেনমোহরের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ১,০০০ টাকা দেনমোহরের জন্য ১২.৫০ টাকা হারে রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হয় (তবে তা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে)। স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্টের অধীনে নোটিশ ফি এবং রেজিস্ট্রেশন ফি সরকার নির্ধারিত রেট অনুযায়ী খুব সামান্য, তবে আইনজীবীর সার্ভিস ফি যুক্ত হতে পারে।
অনেকে কাজি অফিসে কাবিন রেজিস্ট্রি না করে শুধু নোটারির মাধ্যমে কোর্ট ম্যারেজ করে সংসার শুরু করেন, যা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কাবিননামা না থাকলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আইনি বৈধতা পায়বিধা পায় না। পরবর্তীতে স্বামী যদি স্ত্রীকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে, তবে স্ত্রী আইনগতভাবে খোরপোষ, দেনমোহর বা সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবি করতে পারেন না। তাই কোর্ট ম্যারেজের হলফনামা করার পাশাপাশি অবশ্যই ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিবাহ রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করতে হবে।
আপনার আইনি সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম সর্বদা প্রস্তুত। সঠিক আইনি পরামর্শ পেতে আজই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী কাজী অফিসে নিকাহ ও কাবিননামা রেজিস্ট্রির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
মুসলিম কাজী অফিসে বিবাহ রেজিস্ট্রির ধাপসমূহ:
ভিন্নধর্মের দুজন ব্যক্তি (যেমন মুসলিম ও হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান) পারস্পরিক সম্মতিতে Special Marriage Act 1872 অনুযায়ী বিবাহ করতে পারেন।
Special Marriage Act-এ বিবাহের ধাপ:
Special Marriage Act-এ বিবাহকারীরা নিজ নিজ ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইনের পরিবর্তে Succession Act অনুযায়ী সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন।
যেকোনো আইনি সমস্যায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম স্যারের সরাসরি সহায়তা পেতে এখনই যোগাযোগ করুন।