কোর্ট ম্যারেজ করার নিয়ম, প্রকৃত খরচ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র – সম্পূর্ণ আইনি নির্দেশিকা

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-22

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে 'কোর্ট ম্যারেজ' শব্দটি খুবই জনপ্রিয় হলেও আইনি পরিভাষায় শুধু নোটারি পাবলিকের সামনে এফিডেভিট বা হলফনামা করাই কিন্তু পূর্ণাঙ্গ বিবাহ নয়! প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ-তরুণী দালালদের খপ্পরে পড়ে শুধু একটা ৫০/১০০ টাকার স্ট্যাম্পে সই করে মনে করেন তাদের বিয়ে হয়ে গেছে, যা পরবর্তীতে মারাত্মক আইনি ঝুঁকি তৈরি করে। ২০২৬ সালের সঠিক আইন অনুযায়ী কোর্ট ম্যারেজের প্রকৃত নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সরকারি ও আইনজীবী ফি এবং আইনি সুরক্ষার সম্পূর্ণ গাইড পড়ুন। যেকোনো জটিল আইনি সমস্যায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর আইনি পরামর্শ নিতে পারেন।

কোর্ট ম্যারেজ কি? সাধারণ ভুল ধারণা বনাম আইনি সত্য

আইনগতভাবে বাংলাদেশে 'কোর্ট ম্যারেজ' (Court Marriage) নামের সরাসরি কোনো স্বতন্ত্র আইন বা বিবাহের আলাদা কোনো আদালত নেই। সাধারণ মানুষ আইনজীবী বা নোটারি পাবলিকের অফিসে গিয়ে ২০০/৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে স্বইচ্ছায় বিবাহের ঘোষণা দিয়ে যে হলফনামা (Affidavit) সম্পাদন করেন, তাকেই প্রচলিত ভাষায় 'কোর্ট ম্যারেজ' বলা হয়।

সবচেয়ে বড় আইনি ভুল ধারণা: অনেকে মনে করেন নোটারি পাবলিকের সামনে হলফনামা সই করলেই বিয়ে হয়ে গেল, কাজী রেজিস্ট্রি করার প্রয়োজন নেই।

আইনি সত্য: কেবল এফিডেভিট বা হলফনামা কোনো বিয়ে নয়! এটি কেবল বর ও কনের প্রাপ্তবয়স্কতা এবং স্বইচ্ছায় বিয়ের অঙ্গীকারের একটি লিখিত ঘোষণা মাত্র। এর পাশাপাশি মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজী অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন (নিকাহনামা) সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। অন্যথা উক্ত বিয়ে আইনের চোখে সিদ্ধ হবে না।

কোর্ট ম্যারেজ করার ৩টি প্রধান আইনি শর্ত

বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজ বা আইনি বিবাহ সম্পন্ন করতে হলে নিম্নলিখিত ৩টি শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে:

  1. আইনসম্মত বয়স: কনের বয়স সর্বনিম্ন ১৮ বছর এবং বরের বয়স সর্বনিম্ন ২১ বছর হতে হবে। (বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী এর কম বয়সে বিয়ে করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ)।
  2. স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত সম্মতি: বর ও কনে উভয়কে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের এবং কোনোপ্রকার ভয়ভীতি বা জোরজবরদস্তি ছাড়া স্বাধীনভাবে সসম্মতি প্রকাশ করতে হবে।
  3. সাক্ষীর উপস্থিতি: বিয়ের সময় অন্তত ২ জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সাক্ষী অথবা ১ জন পুরুষ ও ২ জন নারী সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রমাণাদির তালিকা

কোর্ট ম্যারেজ করতে যাওয়ার সময় বর ও কনে উভয়কেই সাথে করে নিম্নলিখিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো নিয়ে যেতে হবে:

  • বয়স প্রমাণের সনদ (যেকোনো একটি): জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card), স্মার্ট কার্ড, ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ (অনলাইন যাচাইযোগ্য), অথবা পাসপোর্টের সত্যায়িত কপি।
  • ছবি: বর ও কনের পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি (প্রতিজনের ৪ কপি করে)।
  • সাক্ষীদের পরিচয়পত্র: ২ বা ৩ জন সাক্ষীর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
  • পূর্বের বিবাহের অবসান প্রমাণের কাগজ (যদি প্রযোজ্য হয়): বর বা কনে পূর্বে বিবাহিত হয়ে থাকলে পূর্ববর্তী স্ত্রীর মৃত্যু সনদ বা আগের বিয়ের বৈধ তালাকনামার (Divorce Certificate) সত্যায়িত কপি।

কোর্ট ম্যারেজ সম্পাদন করার ৩টি সঠিক আইনি ধাপ

একটি ১০০% আইনসম্মত কোর্ট ম্যারেজ সম্পন্ন করতে ৩টি ধাপ অনুসরণ করতে হয়:

ধাপ ১: এফিডেভিট বা হলফনামা সম্পাদন (Notary Public Affidavit)

প্রথমেই অ্যাডভোকেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট/নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে ২০০ বা ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে বর ও কনের প্রাপ্তবয়স্কতা, সুস্থ মস্তিষ্ক এবং স্বইচ্ছায় বিবাহের ঘোষণাসংক্রান্ত একটি হলফনামা তৈরি করা হয়। বর-কনে ও সাক্ষীরা নোটারি পাবলিকের রেজিস্টার খাতায় সই করেন।

ধাপ ২: সরকারি কাজী অফিসে রেজিস্ট্রেশন (Nikahnama)

হলফনামা সম্পাদনের পর সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাজী অফিসে গিয়ে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিয়ে পড়া এবং কাজীর সরকারি বালাম খাতায় বিয়ের নিবন্ধন (কাবিননামা) সম্পন্ন করা হয়। দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করে কাজীর কাবিননামায় সই করা হয়।

ধাপ ৩: আইনজীবী কর্তৃক আইনগত সুরক্ষা ও সত্যায়ন

যদি পরিবার কর্তৃক বর বা কনের বিরুদ্ধে কোনো মিথ্যা অপহরণ মামলা (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ৯/৩০ ধারা) হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে আইনজীবী উক্ত এফিডেভিট ও কাবিননামা সার্টিফাইড করিয়ে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

কোর্ট ম্যারেজের প্রকৃত মোট খরচ কত ২০২৬? (বিস্তারিত ফি ব্রেকডাউন)

দালালদের কারণে অনেকে কোর্ট ম্যারেজে ১৫,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা পর্যন্ত প্রতারিত হন। ২০২৬ সালে কোর্ট ম্যারেজের প্রকৃত ও যৌক্তিক খরচ নিম্নরূপ:

খাত / বিবরণপ্রকৃত সরকারি ও আইনি খরচ (বিডিটি)
নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও নোটারি পাবলিক ফি১,০০০ টাকা - ১,৫০০ টাকা
কাজী রেজিস্ট্রি ফি (দেনমোহরের ওপর নির্ভর করে)প্রতি ১,০০০ টাকা দেনমোহরে ১২.৫০ টাকা (১ লাখ দেনমোহরে ১,২৫০ টাকা)
অ্যাডভোকেট লিগ্যাল ফি ও এফিডেভিট ড্রাফটিং৩,০০০ টাকা - ৫,০০০ টাকা
মোট আনুমানিক গড় খরচ (১ লাখ দেনমোহরে)৫,০০০ টাকা - ৮,০০০ টাকা (সর্বোচ্চ)

মনে রাখবেন, দেনমোহরের পরিমাণ যত বাড়বে, কাজীর সরকারি রেজিস্ট্রেশন ফি সেই অনুযায়ী গাণিতিকভাবে বাড়বে।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিবাহ ও ভুয়া জন্ম সনদের আইনি ঝুঁকি

অনেকে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের ভুয়া জন্ম সনদ বানিয়ে কোর্ট ম্যারেজ করার চেষ্টা করেন। এটি মারাত্মক বিপজ্জনক।

  • মেয়ে যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৮ এর নিচে) হয়, তবে এফিডেভিট করলেও সেই বিয়ে আইনিভাবে সিদ্ধ হবে না।
  • মেয়ের পরিবার বরের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০)-এর ৭/৯ ধারায় অপহরণ ও ধর্ষণের মামলা দায়ের করতে পারে। এতে বর ও তার সহযোগীদের জামিনহীন জেল হতে পারে।
  • ভুয়া জন্ম সনদ তৈরির জন্য দণ্ডবিধির ৪৬৭/৪৬৮ ধারায় জালিয়াতির মামলা হতে পারে।

ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে কোর্ট ম্যারেজ (বিশেষ বিবাহ আইন ১৮৭২)

যদি বর ও কনে দুইজন আলাদা ধর্মের হন (যেমন হিন্দু ও মুসলিম, বা খ্রিস্টান ও হিন্দু) এবং কেউ নিজের ধর্ম পরিবর্তন করতে না চান, তবে তারা Special Marriage Act, 1872 (বিশেষ বিবাহ আইন, ১৮৭২) অনুযায়ী বিবাহ সম্পাদন করতে পারেন।

এই বিয়ের জন্য সরকারের মনোনীত রেজিস্টারের অফিসে ১৪ দিন পূর্বে নোটিশ প্রদান করতে হয় এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হয়।

⚖️ বিশেষজ্ঞ আইনি পরামর্শের জন্য যোগাযোগ: আপনার আইনি বিষযটি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম-এর সাথে সরাসরি কথা বলুন বা আমাদের বিশেষজ্ঞ আইনি সেবা গ্রহণ করুন। যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি যোগাযোগ পেজে ক্লিক করুন।