কোর্ট ম্যারেজ করলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়? নোটারি এফিডেভিট ও ভুয়া কাজীর মারাত্মক ফাঁদ

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-15

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

পরিবারের অমতে বিয়ে করতে গিয়ে বহু তরুণ-তরুণী জজ কোর্ট চত্বরে দালালদের খপ্পরে পড়েন এবং মনে করেন ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে নোটারি পাবলিক দিয়ে 'কোর্ট ম্যারেজ' করলেই বিয়ে সম্পূর্ণ পাকাপোক্ত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে পুলিশ বা পারিবারিক মামলায় যখন মেয়ে পক্ষ অপহরণ বা ধর্ষণের অভিযোগ আনে, তখন দেখা যায় ওই এফিডেভিটের আদালতে কোনো দামই নেই। বাস্তব আইনি সত্যতা তুলে ধরেছেন প্রবীণ পারিবারিক আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।

আইনের চোখে 'কোর্ট ম্যারেজ' বলে কি আদৌ কিছু আছে?

আমাদের দেশের আইনে 'কোর্ট ম্যারেজ' (Court Marriage) বলে কোনো স্বতন্ত্র বিয়ের বিধান নেই। প্রচলিত অর্থে যাকে কোর্ট ম্যারেজ বলা হয়, তা হলো নোটারি পাবলিক বা ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বামী-স্ত্রীর একটি হলফনামা (Declaration of Marriage), যেখানে তারা ঘোষণা করেন যে তারা প্রাপ্তবয়স্ক এবং স্বেচ্ছায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু এই হলফনামা কখনোই মূল বিয়ের বিকল্প নয়।

নোটারি পাবলিকের হলফনামা (Affidavit) বনাম নিকাহনামা রেজিস্ট্রি

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন ১৯৭৪ অনুযায়ী—মুসলিম রীতি অনুযায়ী প্রতিটি বিবাহ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত নিকাহ রেজিস্টার (কাজী)-এর বালাম বইয়ে যথাযথভাবে রেজিস্ট্রি হওয়া আইনত বাধ্যতামূলক। নোটারি পাবলিক কোনো কাজী নন এবং তার কোনো বিয়ের নিবন্ধন করার ক্ষমতা নেই। নিকাহনামা ছাড়া শুধুমাত্র নোটারি এফিডেভিট দিয়ে বৈবাহিক সম্পর্কের দাবি আদালতে সম্পূর্ণ অকার্যকর ও ভিত্তিহীন বলে গণ্য হতে পারে।

যে মারাত্মক ভুলে ছেলে পক্ষ অপহরণ ও নারী নির্যাতন মামলায় ফেঁসে যায়

পরিবারের অমতে গিয়ে শুধু নোটারি করিয়ে ছেলে-মেয়ে যখন সংসার শুরু করে, তখন মেয়ের অভিভাবকরা প্রায়ই থানায় এসে মেয়ের বয়স কম দেখিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭/৯ ধারায় অপহরণ ও ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন। আদালতে যখন পুলিশ হাজির করে, তখন যদি রেজিস্ট্রিকৃত সরকারি কাবিননামা না থাকে, তবে ছেলে সরাসরি জেলের ঝুঁকিতে পড়ে।

ভুয়া কাজীর সিল ও অনুমোদনহীন রেজিস্ট্রি: কীভাবে আসল কাজী চিনবেন

কোর্টের আশেপাশে বহু দালাল চক্র রয়েছে যারা ভুয়া প্যাড ও জাল সিল দিয়ে নিকাহনামা বানিয়ে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। আসল কাজীর নিকাহনামার ওপরে আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নম্বর, নির্দিষ্ট ওয়ার্ড/ইউনিয়ন বা ভলিউম নম্বর খোদাই করা থাকে এবং সরকারি বালাম বইয়ে উভয় পক্ষ ও সাক্ষীদের স্পষ্ট স্বাক্ষর সংরক্ষিত থাকে।

আদালতে আইনসঙ্গতভাবে বিয়ে সম্পন্ন করার সঠিক ৩টি ধাপ

নিরাপদে ও শতভাগ আইনসঙ্গতভাবে বিয়ে করতে হলে:

  1. ১ম ধাপ: সরকারি কাজীর মাধ্যমে নিকাহ রেজিস্ট্রি: প্রথমে অনুমোদিত কাজীর বালাম বইয়ে নির্ধারিত সরকারি ফিসহ কাবিননামা সম্পন্ন করতে হবে।
  2. ২য় ধাপ: প্রাপ্তবয়স্কতার প্রমাণপত্র: ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এসএসসি মূল সনদের কপি দাখিল করতে হবে (মেয়ের বয়স ১৮ এবং ছেলের বয়স ২১ পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক)।
  3. ৩য় ধাপ: ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি এফিডেভিট: বিয়ের কাবিননামা সংযুক্ত করে আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে হলফনামা করা, যাতে পরবর্তীতে কেউ জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগ করতে না পারে।

দেনমোহর ও সাক্ষীর বাধ্যবাধকতা: যা ছাড়া বিয়ে বাতিল হতে পারে

মুসলিম আইন অনুসারে কমপক্ষে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ পুরুষ সাক্ষী (অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষী) এবং একজন উকিল বাবার উপস্থিতিতে দেনমোহর নির্ধারণ করে বিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। দেনমোহরের ঘর ফাঁকা রেখে বা সাক্ষী ছাড়া হওয়া কোনো বিয়ে আদালতে টিকবে না।

আইনি সুরক্ষায় জরুরি চেকলিস্ট

ভবিষ্যৎ মামলা থেকে বাঁচতে নিজের কাছে রাখবেন:

  • সরকারি নিকাহ রেজিস্ট্রারের বালাম বইয়ের সিলযুক্ত নকল (Certified Copy)।
  • উভয় পক্ষের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম সনদের কপি।
  • ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিকের মূল হলফনামা।
  • বিয়ের আলোকচিত্র ও সাক্ষীদের স্বাক্ষরযুক্ত কাগজ।