বাংলাদেশে তালাকের প্রক্রিয়া: সম্পূর্ণ আইনি গাইড

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-03-02

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বিবাহ বিচ্ছেদ একটি কঠিন সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের আইনে তালাকের একাধিক পদ্ধতি রয়েছে এবং প্রতিটি পদ্ধতির আইনি প্রভাব ভিন্ন। সঠিক আইনি পরামর্শ ছাড়া এই প্রক্রিয়া আপনার অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশে তালাকের প্রকারভেদ

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) আইন ১৯৭৪ অনুযায়ী তালাকের প্রধান পদ্ধতিগুলো হলো:

  • তালাক-ই-তালাক: স্বামী কর্তৃক প্রদত্ত তালাক
  • খুলা: স্ত্রী কর্তৃক দেনমোহর ফিরিয়ে দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ
  • মুবারাত: উভয় পক্ষের সম্মতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ
  • বিচারিক তালাক: পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে তালাক

কোন পদ্ধতি আপনার জন্য প্রযোজ্য তা নির্ভর করে পরিস্থিতির উপর। একজন পারিবারিক আইনজীবী সবচেয়ে উপযুক্ত পথ নির্ধারণ করতে সাহায্য করবেন।

স্বামীর তালাক: তালাক-ই-তালাক

মুসলিম আইনে স্বামী তালাক দিতে পারেন — কিন্তু বাংলাদেশে আইনি নিয়ম মেনে দিতে হবে:

  1. তালাকের নোটিশ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভার চেয়ারম্যানকে লিখিতভাবে দিতে হবে
  2. একই সাথে স্ত্রীকেও নোটিশ দিতে হবে
  3. নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ দিনের মধ্যে সালিশি পরিষদ গঠিত হবে সমঝোতার চেষ্টা করতে
  4. ৯০ দিন পর (ইদ্দত শেষে) তালাক কার্যকর হয়

গুরুত্বপূর্ণ: সরাসরি মৌখিক তিন তালাক বাংলাদেশের আইনে কার্যকর নয় — এটি একটি তালাক হিসেবে গণ্য হয় এবং উপরের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

স্ত্রীর তালাক: খুলা ও মুবারাত

খুলা তালাক: স্ত্রী যদি বিচ্ছেদ চান, তিনি দেনমোহর বা অন্য ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারেন। কাবিনে তালাক-ই-তাওফিজ (স্বামীর তালাকের ক্ষমতা অর্পণ) না থাকলে সাধারণত পারিবারিক আদালতে যেতে হয়।

মুবারাত: উভয় পক্ষ সম্মত হলে পারস্পরিক সমঝোতায় বিচ্ছেদ হয় — এতে আদালতে যেতে হয় না, তবে আইনি নথিপত্র সম্পন্ন করতে হয়।

কাবিনে তালাক-ই-তাওফিজ থাকলে স্ত্রী স্বামীর মতোই ইউনিয়ন পরিষদে নোটিশ দিয়ে তালাক দিতে পারেন।

পারিবারিক আদালতে তালাক

স্বামী সম্মত না হলে বা বিভিন্ন কারণে বিচ্ছেদ চাইলে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে তালাকের মামলা করতে পারেন। তালাকের আইনগত কারণ হতে পারে:

  • স্বামীর নিষ্ঠুরতা বা শারীরিক/মানসিক নির্যাতন
  • স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতি (৪ বছরের বেশি)
  • ভরণপোষণ না দেওয়া
  • স্বামীর কারাবাস (৭ বছর বা তার বেশি)
  • দুরারোগ্য যৌন রোগ

পারিবারিক আদালতে মামলা করলে আদালত প্রথমে সমঝোতার চেষ্টা করে। সমঝোতা না হলে বিচারিক তালাকের আদেশ দেন।

তালাকের নোটিশ ও ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা

বাংলাদেশে তালাক আইনগতভাবে কার্যকর করতে হলে আনুষ্ঠানিক নোটিশ প্রক্রিয়া অবশ্যই মেনে চলতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা চেয়ারম্যান একটি সালিশি পরিষদ গঠন করে উভয় পক্ষের সমঝোতার চেষ্টা করেন। ৯০ দিনের মধ্যে সমঝোতা না হলে তালাক চূড়ান্ত হয়।

এই নোটিশ প্রক্রিয়া না মানলে তালাক আইনগতভাবে অসম্পূর্ণ থাকে — পরবর্তীতে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষত সম্পত্তি ও সন্তানের বিষয়ে।

দেনমোহর: আদায়ের অধিকার ও পদ্ধতি

তালাকের পর স্ত্রী কাবিনে নির্ধারিত সম্পূর্ণ দেনমোহর দাবি করার অধিকার রাখেন। দেনমোহরের দুটি অংশ:

  • মুয়াজ্জাল (অগ্রিম): বিয়ের সময় পরিশোধ করার কথা — এটি ইতিমধ্যে পাওয়া হলে বাকি অংশ দাবি করতে হবে
  • মুয়াজ্জাল (বিলম্বিত): তালাকের সময় বা স্বামীর মৃত্যুতে প্রদেয় — এটি সম্পূর্ণ আদায়যোগ্য

দেনমোহর না দিলে পারিবারিক আদালতে মামলা করে আদায় করা যায়। আদালতের আদেশের পর স্বামীর সম্পদ থেকে দেনমোহর আদায় করা সম্ভব।

ভরণপোষণ (নফকা)

তালাকের পর ইদ্দতকালীন (তিন মাস) ভরণপোষণ স্বামীকে দিতে হবে। এর বাইরে স্ত্রী পারিবারিক আদালতে নফকার মামলাও করতে পারেন। আদালত স্বামীর আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে মাসিক ভরণপোষণের পরিমাণ নির্ধারণ করেন।

ভরণপোষণ না দিলে আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যায় — আদালতের আদেশ অমান্য করলে স্বামী আদালত অবমাননার দায়ে পড়েন।

সন্তানের হেফাজত ও ভরণপোষণ

তালাকের পর সন্তানের হেফাজত সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়। মুসলিম আইনে মা ছোট সন্তানের হেফাজত পান (হিজানত) — পুত্রের ক্ষেত্রে সাধারণত ৭ বছর, কন্যার ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত।

পিতা সন্তানের আইনগত অভিভাবক এবং ভরণপোষণ দিতে বাধ্য। সন্তানের ভরণপোষণ না দিলে পারিবারিক আদালতে মামলা করা যায়।

হেফাজত সংক্রান্ত যেকোনো জরুরি বিষয়ে অবিলম্বে একজন পারিবারিক আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করুন।