ডিএনএ টেস্ট আইন ২০১৪ ও পিতৃত্ব নির্ধারণ: আদালত কখন ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেন এবং সন্তানের অধিকার ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-11 · 12 min read

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

আধুনিক বিজ্ঞান ও ফরেনসিক চিকিৎসা শাস্ত্রের অন্যতম যুগান্তকারী আবিষ্কার হলো ডিএনএ (DNA) পরীক্ষা। একজন মানুষের শারীরিক গঠন, বংশগতি এবং রক্তের পরিচয় নির্ধারণে ডিএনএ টেস্ট ৯৯.৯৯% নির্ভুল ফলাফল প্রদান করে। বাংলাদেশের পারিবারিক ও ফৌজদারি আদালতগুলোতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে মারাত্মক বিতর্ক ও আইনি জটিলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নিজের ঔরসজাত সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করেন এবং সন্তানের ভরণপোষণ দিতে অস্বীকৃতি জানান। আবার অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণ বা প্রতারণামূলক শারীরিক সম্পর্কের ফলে জন্ম নেওয়া নিষ্পাপ শিশুর পিতৃপরিচয় নিশ্চিত করতে মায়ের পক্ষে আদালতে শরণাপন্ন হতে হয়। সন্তানের অধিকার, পিতৃপরিচয় এবং জাতীয় ডিএনএ ডেটাবেজ পরিচালনার লক্ষ্যে বাংলাদেশে প্রণীত হয়েছে 'ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন, ২০১৪' (আইন নং ১০, ২০১৪)। বিজ্ঞ আদালত কখন কোনো ব্যক্তির ডিএনএ পরীক্ষার আদেশ দিতে পারেন এবং সাক্ষ্য আইনের ১১২ ধারার সাথে এর সম্পর্ক কী—তা ২০২৬ সালের আধুনিক আইনি দৃষ্টিভঙ্গিতে নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।

: · সুপ্রিম কোর্ট ও জজ কোর্ট জামিন আইনজীবী

এক নজরে মূল তথ্য (Quick Answer Table)

বিষয় / শর্তসরকারি নিয়ম, ফি ও আইন (২০২৬)
প্রযোজ্য আইন ও আদালতবাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (CrPC) ও সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ
আগাম ও নিয়মিত জামিনহাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিন (ধারা ৪৯৮ CrPC) ও ম্যাজিস্ট্রেট/দায়রা আদালতে নিয়মিত জামিন
সরকারি পোর্টাল ও যাচাইsupremecourt.gov.bd, judiciary.gov.bd, pcc.police.gov.bd ও land.gov.bd
জরুরি আইনি পরামর্শ চেম্বারঅ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট) — ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬
⚡ এক নজরে
📋 সূচিপত্র
  1. ১. ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন ২০১৪-এর মূল ভিত্তি ও উদ্দেশ্য
  2. ২. সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এর ধারা ১১২: বৈবাহিক বন্ধনে সন্তানের জন্ম ও বৈধতার অলঙ্ঘনীয় অনুমান
  3. ৩. পারিবারিক আদালতে পিতৃত্ব নির্ধারণ মোকদ্দমা: কখন ডিএনএ টেস্টের আবেদন করা যায়?
  4. ৪. স্বামী কর্তৃক সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকারের আইনি শর্ত: স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গমের সুযোগহীনতা (Non-Access)
  5. ৫. সম্পত্তির বিরোধে ভুয়া সন্তান দাবি প্রতিহতে ডিএনএ টেস্টের ভূমিকা
  6. ৫. ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন মামলায় নারী ও শিশু আইনে ডিএনএ পরীক্ষার আবশ্যকতা (ধারা ৩২ক)
  7. ৬. ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের সরকারি নিয়ম: ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাব
  8. ৯. ডিএনএ ডেটাবেজের গোপনীয়তা ও মানবাধিকার সুরক্ষা: আইনের কড়া শাস্তি
  9. ৭. কোনো ব্যক্তি কি আদালতের ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন?
  10. ৮. ডিএনএ টেস্টের নির্ভুলতা (Accuracy) ও আদালতে সাক্ষ্যগত মূল্য (Evidentiary Value)
  11. ৯. ডিএনএ প্রমাণের পর সন্তানের খোরপোশ ও পিতা-মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার অধিকার
  12. ১০. ডিএনএ টেস্টে খরচ ও সরকারি পরীক্ষা পদ্ধতির সময়সীমা ২০২৬
  13. ১১. পারিবারিক ও মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম ডি শাহ আলমের চেম্বারের আইনি সহায়তা

১. ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন ২০১৪-এর মূল ভিত্তি ও উদ্দেশ্য

একটি সভ্য সমাজে প্রতিটি শিশুর তার আত্মপরিচয় জানার এবং পিতা-মাতার পরিচয়ে বেড়ে ওঠার মৌলিক মানবিক অধিকার রয়েছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার 'ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন' প্রণয়ন করে। আইনের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ: ১. বিচারিক প্রক্রিয়ায় ফরেনসিক ডিএনএ প্রমাণের একটি বিধিবদ্ধ আইনগত কাঠামো তৈরি করা। ২. একটি রাষ্ট্রীয় মানসম্মত 'জাতীয় ডিএনএ ডেটাবেজ' (National DNA Database) প্রতিষ্ঠা করা। ৩. পিতৃত্ব-মাতৃত্ব নির্ধারণ, গণকবর বা দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্তকরণ এবং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের (ধর্ষণ, হত্যা) তদন্তে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা। ৪. মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (Genetic Privacy) রক্ষা করা যাতে যত্রতত্র ডিএনএ ডেটার অপব্যবহার না হয়।

২. সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এর ধারা ১১২: বৈবাহিক বন্ধনে সন্তানের জন্ম ও বৈধতার অলঙ্ঘনীয় অনুমান

পিতৃত্ব নির্ধারণের আলোচনায় সবচেয়ে মৌলিক আইনি ধারা হলো সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ (Evidence Act, 1872)-এর ধারা ১১২। আইনের কঠোর ঘোষণা: বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকাকালে অথবা বিবাহ বিচ্ছেদের পর ২৮০ দিনের মধ্যে (যদি মাতা অবিবাহিতা থাকেন) কোনো সন্তানের জন্ম হলে আইন চূড়ান্তভাবে ধরে নেবে (Conclusive Proof) যে উক্ত সন্তান উক্ত ব্যক্তিরই ঔরসজাত বৈধ সন্তান। একমাত্র ব্যতিক্রম: স্বামী কেবল একটিমাত্র শর্তে এই অনুমান খণ্ডন করতে পারেন—যদি স্বামী অকাট্যভাবে প্রমাণ করতে পারেন যে সন্তান গর্ভধারণের সম্ভাব্য সময়ে স্ত্রীর সাথে তার কোনো প্রকার দৈহিক মিলনের সুযোগই ছিল না (No Access)। যেমন—স্বামী সেই সময় প্রবাসে ছিলেন বা কারাগারে ছিলেন। এই প্রমাণ ছাড়া স্বামী মুখে হাজার বার অস্বীকার করলেও আদালত সন্তানকে তারই সন্তান বলে রায় দেবেন।

৩. পারিবারিক আদালতে পিতৃত্ব নির্ধারণ মোকদ্দমা: কখন ডিএনএ টেস্টের আবেদন করা যায়?

যখন স্বামী স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ তুলে নবজাতক সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করেন এবং স্ত্রীকে খোরপোশ না দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন: পারিবারিক আদালতের পদক্ষেপ: ১. মোকদ্দমা দাখিল: স্ত্রী পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩ অনুযায়ী বিজ্ঞ পারিবারিক আদালতে দেনমোহর, খোরপোশ এবং সন্তানের পিতৃত্ব ঘোষণার যৌথ মোকদ্দমা দায়ের করেন। ২. ডিএনএ টেস্টের দরখাস্ত: স্ত্রী আদালতে জোর দাবি জানান যে—'স্বামী সন্তান অস্বীকার করছেন, সন্তানের রক্তের সাথে স্বামীর রক্তের ডিএনএ টেস্ট করিয়ে সত্য প্রমাণ করা হোক'। ৩. বিচারকের বিবেচনা: আদালত প্রাথমিক সাক্ষ্য-প্রমাণ দেখে যদি মনে করেন যে সন্তানের বৈধতা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করা হয়েছে, তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত উভয় পক্ষকে ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ প্রদান করেন।

৪. স্বামী কর্তৃক সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকারের আইনি শর্ত: স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গমের সুযোগহীনতা (Non-Access)

কোনো স্বামী চাইলেই কথায় কথায় ডিএনএ টেস্ট দাবি করতে পারেন না। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নজির রয়েছে যেখানে আদালত পর্যবেক্ষণ করেছেন যে—ডিএনএ টেস্টকে কোনো স্বামীর জন্য স্ত্রীর সতীত্ব নিয়ে ঢালাও সন্দেহ তৈরির হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না। সুপ্রিম কোর্টের নীতি: - স্বামী যদি নিয়মিত স্ত্রীর সাথে একই ঘরে বসবাস করে থাকেন, তবে সাধারণ পারিবারিক কলহের কারণে আদালত স্বামীকে ডিএনএ টেস্টের অনুমতি দেন না। - স্বামীকে প্রথমে অকাট্য তথ্য দিতে হবে যে সন্তান গর্ভধারণের নির্দিষ্ট মাসে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন জেলায় বা বিদেশে ছিলেন এবং স্ত্রীর সংস্পর্শে আসেননি। আদালত সেই তথ্যে সন্তুষ্ট হলেই কেবল স্ত্রীর বা সন্তানের মর্যাদা রক্ষার ঝুঁকি নিয়ে ডিএনএ টেস্টের বিশেষ আদেশ দেন।

৫. সম্পত্তির বিরোধে ভুয়া সন্তান দাবি প্রতিহতে ডিএনএ টেস্টের ভূমিকা

জমিজমা ও পারিবারিক বিরোধে প্রায়ই দেখা যায় কোনো কোটিপতি ধনী ব্যক্তি নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পর কোনো অসাধু আত্মীয় বা তৃতীয় পক্ষ হঠাৎ একটি শিশুকে হাজির করে দাবি করে—\"এটি মৃত ব্যক্তির দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান বা বৈধ উত্তরাধিকারী\" এবং জাল জন্ম সনদ দিয়ে নামজারি করার অপচেষ্টা চালায়। এমন জালিয়াতি প্রতিহত করতে মৃত ব্যক্তির ভাই-বোন বা প্রকৃত ওয়ারিশগণ দেওয়ানি আদালতে চ্যালেঞ্জ করেন এবং বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে ডিএনএ টেস্টের আবেদন জানান। মৃত ব্যক্তির দেহাবশেষ থেকে অথবা তার নিকটাত্মীয়দের (যেমন ভাই-বোন বা পিতামাতা) সাথে শিশুটির রক্তের ডিএনএ স্ট্রাকচার (Lineage Testing / Y-STR Marker Test) মেলানো হয়। ডিএনএ রিপোর্ট নেগেটিভ আসলে পুরো জালিয়াতি ধূলিসাৎ হয়ে যায় এবং প্রকৃত ওয়ারিশরা সম্পত্তি রক্ষা করতে সক্ষম হন।

৫. ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন মামলায় নারী ও শিশু আইনে ডিএনএ পরীক্ষার আবশ্যকতা (ধারা ৩২ক)

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ধারা ৩২ক অনুযায়ী ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা একটি বাধ্যতামূলক আইনি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। ফৌজদারি মামলায় গুরুত্ব: - ধর্ষণের শিকার নারীর শরীর থেকে সংগৃহীত ফরেনসিক সোয়াব (Swab), পোশাক এবং আসামির রক্তের ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়। - ধর্ষণের ফলে যদি কোনো সন্তান জন্ম নেয়, তবে সেই সন্তানের রক্তের সাথে অভিযুক্ত ধর্ষকের ডিএনএ ম্যাচ করানো হয়। - ডিএনএ ম্যাচিং পজিটিভ হলে তা আদালতে আসামির বিরুদ্ধে সবচেয়ে অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে কাজ করে এবং ধর্ষকের সর্বোচ্চ সাজার পথ সুগম হয়। ফরেনসিক ল্যাবে রক্ত বা লালা নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিতে এসটিআর (Short Tandem Repeat) এবং ওয়াই-ক্রোমোজোম মার্কার বিশ্লেষণ করা হয়। এই বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পিতা ও সন্তানের মধ্যে ১৬ থেকে ২৪টি সুনির্দিষ্ট জেনেটিক লোকাস (Genetic Loci) নিখুঁতভাবে মেলানো হয়। যদি সবগুলো লোকাস হুবহু মিলে যায়, তবে পিতৃত্বের সম্ভাবনা ৯৯.৯৯৯% বলে চিকিৎসাগতভাবে প্রত্যয়িত হয়। আর তিনটি বা ততোধিক লোকাসে অমিল থাকলে তা পিতা হওয়ার সম্ভাবনাকে শতভাগ বাতিল (Exclusion) ঘোষণা করে।

৬. ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের সরকারি নিয়ম: ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাব

ডিএনএ আইন ২০১৪-এর অধীনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন 'জাতীয় ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি' (NFDPL) একমাত্র সরকার স্বীকৃত প্রধান ফরেনসিক কেন্দ্র। নমুনা সংগ্রহের নিয়ম: ১. আদালতের আনুষ্ঠানিক আদেশ ও তলবপত্র সহ পক্ষগণকে ল্যাবে হাজির হতে হয়। ২. সাধারণত রক্ত (Blood Sample), লালা (Buccal Swab) বা চুলের ফলিকল থেকে ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়। ৩. নমুনা সংগ্রহের সময় ভিডিওগ্রাফি করা হয় এবং পক্ষগণের আঙুলের ছাপ ও ছবি নেওয়া হয় যাতে নমুনা পরিবর্তন (Tampering) না হতে পারে। ৪. অত্যন্ত সুরক্ষিত চেইন অব কাস্টডি (Chain of Custody) রক্ষা করে সিলগালা অবস্থায় রিপোর্ট সরাসরি বিজ্ঞ আদালতের নিকট প্রেরিত হয়।
⚖️ আইনি কেস মূল্যায়ন ও চেম্বার অ্যাপয়েন্টমেন্ট

আপনার জমি বিরোধ, বাটোয়ারা মামলা, জামিন, তালাক বা সাইবার জটিলতায় বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে সুপ্রিম কোর্ট বা উত্তরা চেম্বারে নথিপত্রসহ সরাসরি বসুন।

জরুরি হোয়াটসঅ্যাপ সরাসরি কল: ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬

৯. ডিএনএ ডেটাবেজের গোপনীয়তা ও মানবাধিকার সুরক্ষা: আইনের কড়া শাস্তি

ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইন ২০১৪-এর অন্যতম মৌলিক দিক হলো নাগরিকদের জিনগত গোপনীয়তার (Genetic Privacy) কঠোর সুরক্ষা। আইনের ধারা ২০ থেকে ২৫ অনুযায়ী কোনো ফরেনসিক কর্মকর্তা, পুলিশ বা ল্যাব টেকনিশিয়ান আদালতের লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া কারো ডিএনএ প্রোফাইল বা জেনেটিক ডেটা কোনো তৃতীয় পক্ষ বা গণমাধ্যমের নিকট প্রকাশ করতে পারেন না। যদি কেউ অবৈধভাবে ডিএনএ ডেটা ফাঁস করে বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, তবে উক্ত ব্যক্তির অনধিক ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে। এমনকি নমুনা সংগ্রহকালে কোনো পক্ষ যাতে নমুনার মধ্যে রক্ত বা লালা পরিবর্তন করে ফরেনসিক ট্যাম্পারিং করতে না পারে, সেজন্য ম্যাজিস্ট্রেট বা জুডিশিয়াল অফিসারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে নমুনা সিলগালা করা বাধ্যতামূলক।

৭. কোনো ব্যক্তি কি আদালতের ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করতে পারেন?

অনেক সময় দেখা যায় স্বামী বুঝতে পারেন যে সন্তান তারই, তাই তিনি ডিএনএ টেস্টের জন্য রক্ত দিতে আদালতে উপস্থিত হন না বা সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। আইন কী বলে? আদালত কাউকে জোর করে ফিজিক্যালি রক্ত নিতে পারেন না বটে, তবে সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এর ১১৪ ধারার (g) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালত 'প্রতিকূল অনুমান' (Adverse Presumption) গ্রহণ করেন। অর্থাৎ বিচারক ধরে নেবেন যে—অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পেয়েও রক্ত দিতে অস্বীকার করেছেন কারণ তিনি জানেন যে টেস্ট করালে তিনিই পিতা প্রমাণিত হবেন। ফলে আদালত সরাসরি স্ত্রীর পক্ষে রায় প্রদান করবেন।

৮. ডিএনএ টেস্টের নির্ভুলতা (Accuracy) ও আদালতে সাক্ষ্যগত মূল্য (Evidentiary Value)

আন্তর্জাতিকভাবে এবং বাংলাদেশ আইনে ডিএনএ টেস্টকে সবচেয়ে শীর্ষ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ (Gold Standard Evidence) হিসেবে গণ্য করা হয়। আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি: মানুষ মিথ্যা বলতে পারে, কিন্তু ডিএনএ কখনো মিথ্যা বলে না। যদি সরকারি ন্যাশনাল ল্যাবের রিপোর্টে ৯৯.৯৯% ম্যাচিং দেখানো হয়, তবে আদালত আর অন্য কোনো মৌখিক সাক্ষীর তোয়াক্কা করেন না। উক্ত রিপোর্টকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫১০ ধারার আওতায় সরকারি বিশেষজ্ঞের অকাট্য রিপোর্ট হিসেবে সরাসরি গ্রহণ করে বিচারিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।

৯. ডিএনএ প্রমাণের পর সন্তানের খোরপোশ ও পিতা-মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার অধিকার

আদালতে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে পিতৃত্ব প্রমাণিত হওয়ার পর সন্তানের যে সমস্ত অলঙ্ঘনীয় আইনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়: ১. সামাজিক স্বীকৃতি ও পিতৃপরিচয়: সন্তান তার জন্ম নিবন্ধন, স্কুল সার্টিফিকেট ও জাতীয় পরিচয়পত্রে পিতার নাম ব্যবহারের পূর্ণ আইনি স্বীকৃতি পায়। ২. মাসিক খোরপোশ (Child Maintenance): পিতা সন্তানের সাবালকত্ব অর্জন পর্যন্ত মাসিক সম্মানজনক খোরপোশ, চিকিৎসা ও শিক্ষার সমস্ত ব্যয়ভার বহন করতে আইনত বাধ্য থাকেন। পরিশোধ না করলে পিতার জেল ও মালামাল ক্রোক হয়। ৩. সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার: পিতা মৃত্যুবরণ করলে পিতা ও দাদার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে সাধারণ সন্তানের মতো সমপরিমাণ ফারায়েজ অনুযায়ী অংশের চিরস্থায়ী ওয়ারিশান স্বত্ব লাভ করে।

১০. ডিএনএ টেস্টে খরচ ও সরকারি পরীক্ষা পদ্ধতির সময়সীমা ২০২৬

সরকারি ও বিচারিক চ্যানেলে ডিএনএ টেস্ট পরিচালনার বাস্তব তথ্য: - আদালতের মাধ্যমে প্রেরিত ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে সরকার নিজস্ব বাজেটে ডিএনএ পরীক্ষার খরচ বহন করে থাকে। - পারিবারিক আদালতের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালত সাধারণত আবেদনকারী অথবা উভয় পক্ষকে সরকারি নির্ধারিত ল্যাব ফি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। - নমুনা সংগ্রহের পর রিপোর্ট প্রস্তুত হয়ে সিলগালা খামে আদালতে পৌঁছাতে সাধারণত ৩ থেকে ৬ সপ্তাহ সময় লাগে।

১১. পারিবারিক ও মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম ডি শাহ আলমের চেম্বারের আইনি সহায়তা

সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে বিবাদ একটি পরিবার ও শিশুর জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সংকট। সামান্য ভুলের কারণে একটি নির্দোষ শিশুর ভবিষ্যৎ আজীবনের জন্য কলঙ্কিত হতে পারে। অ্যাডভোকেট এম ডি শাহ আলম সাহেবের চেম্বারের আইনি সেবা: - পারিবারিক আদালতে সন্তানের বৈধতা ঘোষণা ও খোরপোশ আদায়ের জোরালো মোকদ্দমা পরিচালনা। - উপযুক্ত গ্রাউন্ডে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে সরকারি ল্যাবে ডিএনএ টেস্টের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ আদায়। - মিথ্যা অপবাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা ও ডিএনএ রিপোর্টের বৈজ্ঞানিক জেরা (Cross-Examination) সম্পাদন। - চেম্বার যোগাযোগের ঠিকানা: রুম নং ২০৮ ও ২১৪, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবন, পুরাতন কোর্ট চত্বর, ঢাকা। ফোন: ০১৭১১-৯৪৬১৯৮ / ০১৭৩১৮৪১৯১৯।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

আদালত কি যেকোনো মামলায় ডিএনএ টেস্টের নির্দেশ দেন?

না। স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গমের সুযোগহীনতা বা সন্তানের বৈধতা নিয়ে অকাট্য সন্দেহ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আদালত ঢালাওভাবে ডিএনএ পরীক্ষার আদেশ দেন না।

স্বামীর অমতে কি গোপনে ডিএনএ টেস্ট করিয়ে আদালতে প্রমাণ দেওয়া যায়?

না। ২০১৪ সালের ডিএনএ আইন অনুযায়ী আদালতের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ল্যাবের কোনো অপ্রমাণিত রিপোর্ট আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না।

স্বামী ডিএনএ টেস্ট দিতে অস্বীকার করলে কী হয়?

আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও স্বামী রক্ত দিতে অস্বীকার করলে আদালত সাক্ষ্য আইনের ১১৪(g) ধারা অনুযায়ী স্বামীর বিরুদ্ধে প্রতিকূল রায় দিয়ে পিতৃত্বের ডিক্রি দেন।

ডিএনএ টেস্টে পিতৃত্ব প্রমাণ হলে কি সন্তান বাবার সম্পত্তির অংশ পাবে?

হ্যাঁ। সন্তান পিতার আইনগত বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং ইসলামিক ফারায়েজ অনুযায়ী সম্পত্তির পূর্ণ অংশীদার হয়।

ডিএনএ রিপোর্ট আসতে কতদিন সময় লাগে?

ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষার পর সাধারণত ৩ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে সিলগালা রিপোর্ট সরাসরি আদালতে পৌঁছায়।

দায়বর্জন (Disclaimer): এই আর্টিকেলে পরিবেশিত তথ্যসমূহ কেবল আইনি সচেতনতা ও সাধারণ শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো প্রত্যক্ষ আইনি পরামর্শ (Legal Advice) নয় এবং এর মাধ্যমে কোনো আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক (Attorney-Client Relationship) তৈরি হয় না। আপনার সুনির্দিষ্ট মামলার আইনি প্রতিকারের জন্য সরাসরি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের তালিকাভুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।
আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546  |  WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০