দ্বিতীয় বিয়ের পর মায়ের কাছে কি সন্তান থাকবে? কাস্টডি নিয়ে আদালতের যুগান্তকারী রায় ও বাস্তব সমাধান

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-13

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বিবাহবিচ্ছেদের পর মা যদি পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে বাবা অনেক সময়ই দাবি করেন যে মায়ের আর সন্তানের ওপর কোনো অধিকার নেই। সাধারণ সমাজে এমন প্রচলিত ধারণা থাকলেও সুপ্রিম কোর্ট ও পারিবারিক আদালতের বাস্তব আইন অত্যন্ত আধুনিক ও মানবিক। এ বিষয়ে সম্পূর্ণ আইনি নজির বিশ্লেষণ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।

ঐতিহ্যগত মুসলিম আইন বনাম আধুনিক বিচারিক নীতি

ঐতিহ্যগত হানাফি ফিকহ অনুযায়ী সাধারণত বলা হয়ে থাকে যে মা যদি কোনো অনাত্মীয় (গায়রে মাহরাম) ব্যক্তিকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তবে তিনি সন্তানের লালন-পালনের অগ্রাধিকার (হিযানত) হারাতে পারেন। কিন্তু ১৮৯০ সালের অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন (Guardianship and Wards Act, 1890) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অসংখ্য ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে—ফিকহের এই নিয়ম কোনো চরম বা অনমনীয় নীতি নয়।

আদালতের সর্বোচ্চ প্রাধান্য: ‘ওয়েলফেয়ার অব দ্য চাইল্ড’ (Welfare of the Child)

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ (যেমন: আবু বকর সিদ্দিকী বনাম এস এম এ বকর এবং পরবর্তীতে অসংখ্য নজিরে) দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে—সন্তানের হেফাজতের প্রশ্নে পিতামাতার ব্যক্তিগত অধিকারের চেয়ে ‘সন্তানের সার্বিক কল্যাণ ও মঙ্গল’ (Welfare and Best Interest of the Minor)-ই হলো আদালতের একমাত্র প্রধান বিবেচনা। মা যদি দ্বিতীয় বিয়েও করেন কিন্তু তিনিই যদি সন্তানের শারীরিক, মানসিক ও পড়াশোনার সর্বোত্তম পরিবেশ দিতে সক্ষম হন, তবে আদালত কখনোই মায়ের কোল থেকে সন্তানকে বিচ্ছিন্ন করবেন না।

দ্বিতীয় স্বামীর পরিবারে সন্তান নিরাপদ কি না তা যাচাইয়ের মাপকাঠি

পারিবারিক আদালত সাধারণত কয়েকটি বিষয় কঠোরভাবে তদন্ত করেন:

  • মায়ের দ্বিতীয় স্বামী সন্তানকে স্নেহ ও যত্নের সাথে গ্রহণ করেছেন কি না।
  • সন্তানের বর্তমান স্কুল, চিকিৎসা ও মানসিক বিকাশ দ্বিতীয় সংসারে স্বাভাবিক রয়েছে কি না।
  • বাবার সংসারে সন্তান গেলে সৎ মায়ের কাছে বা কাজের লোকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে কি না।

বাবার আর্থিক সচ্ছলতা কি সন্তান কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট?

অনেক বাবা মনে করেন তিনি আর্থিকভাবে কোটিপতি আর মা সামান্য আয়ের চাকরিজীবী বা গৃহিণী, তাই আদালত বাবাকেই সন্তান দিয়ে দেবেন। এটি একটি বিশাল ভুল ধারণা। আদালত স্পষ্টভাবে জানেন যে টাকার চেয়ে মায়ের মাতৃস্নেহ ও ব্যক্তিগত যত্ন শিশুর প্রাথমিক বয়সে হাজার গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাবা ধনী হলেও তার দায়িত্ব হলো আদালতে সন্তানের সকল ভরণপোষণ ও শিক্ষার ব্যয় বহন করা, সন্তান কেড়ে নেওয়া নয়।

পারিবারিক আদালতে হেফাজত (Hizanat) ধরে রাখার আইনি প্রস্তুতি

যদি বাবা পারিবারিক আদালতে সন্তানের হেফাজত চেয়ে মামলা করেন (Guardianship Suit), তবে মায়ের উচিত অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে সন্তানের স্কুলের ফলাফল, চিকিৎসকের রিপোর্ট এবং দ্বিতীয় স্বামীর সম্মতির হলফনামা পেশ করে প্রমাণ করা যে সন্তান মায়ের কাছেই সর্বোচ্চ সুখে রয়েছে।

পিতা হিসেবে সাক্ষাৎ ও খরচের দায়ভারের নিয়ম

সন্তান মায়ের কাছে থাকলেও পিতা তার প্রাকৃতিক অভিভাবক (Natural Guardian)। তাই পিতা সপ্তাহে বা মাসে নির্দিষ্ট দিনে আদালতে বা পার্ক/চেম্বারে সন্তানের সাথে দেখা করার (Visitation Rights) অধিকার পাবেন এবং প্রতি মাসের নিয়মিত খরপোশ দিতে আইনত বাধ্য থাকবেন।