লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-10
চিকিৎসা সেবায় মানুষের জীবন ও মৃত্যু নির্ভর করে নির্ভুল রোগ নির্ণয় ও দক্ষ চিকিৎসকের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজিক্যাল ল্যাব এবং ভুয়া ডিগ্রিধারী হাতুড়ে চিকিৎসকদের কারণে অসংখ্য নিরীহ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। ভুল রক্ত পরীক্ষা, ভুল ক্যান্সার বায়োপসি রিপোর্ট কিংবা অপ্রয়োজনীয় অপারেশনের কারণে সুস্থ মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করছেন, এমনকি প্রাণ হারাচ্ছেন। অনেকে ক্ষোভে ফেটে পড়লেও বুঝতে পারেন না যে কোন আইনে, কীভাবে এই অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার কীভাবে কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। 'বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) আইন ২০১০', ভোক্তা অধিকার আইন এবং দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলার পূর্ণাঙ্গ আইনি প্রক্রিয়া জানুন এই গাইডে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০-এর ২৮ ও ২৯ ধারা অনুযায়ী বৈধ এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রি এবং বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন ব্যতীত কোনো ব্যক্তি নামের আগে 'ডাক্তার' পদবি ব্যবহার করতে পারবেন না।
আইন অমান্য করে চিকিৎসা প্রদানকারী ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে। একইভাবে কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টার যদি কোনো প্যাথলজিস্ট চিকিৎসকের স্বাক্ষর জাল করে বা ভুল রিপোর্ট দিয়ে রোগীর জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে, তবে ল্যাবের লাইসেন্স বাতিলসহ মালিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু হয়।
রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিটি অধিকার সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের আওতায় একটি মৌলিক মানবাধিকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রতিটি অনুমোদিত ক্লিনিকের সামনে সরকার নির্ধারিত ফি চার্ট ও চিকিৎসকদের বৈধ বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন নম্বর দৃশ্যমান স্থানে ঝুলিয়ে রাখার স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কোনো ল্যাব বা হাসপাতাল যদি এই শর্ত লঙ্ঘন করে অথবা অনভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান দিয়ে পরীক্ষা চালায়, তবে আদালত কঠোর শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার আইনি এখতিয়ার রাখেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ে আপসহীন লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন।
আদালতে বা প্রশাসনিক ফোরামে প্রমাণ করতে হলে রোগীর স্বজনদের নিচের প্রমাণগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ করতে হবে:
প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতার জন্য আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন (ISO 15189) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বার্ষিক নবায়নকৃত লাইসেন্স থাকা অপরিহার্য। কোনো ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিকভাবে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ক্লিনিকের যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্টের ল্যাব টেস্ট সম্পন্ন করা উচিত। আইনের কঠোর প্রয়োগই সাধারণ রোগীর জীবন রক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির একমাত্র সুনিশ্চিত নিশ্চয়তা প্রদান করে।
ভুক্তভোগীর সুবিধার জন্য তিনটি আইনি ফোরামের তুলনামূলক রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:
| আইনি ফোরাম | মূল উদ্দেশ্য ও ফলাফল | ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির সুযোগ |
|---|---|---|
| ১. বিএমডিসি (BMDC) | ডাক্তারের রেজিস্ট্রেশন বা লাইসেন্স স্থায়ী বাতিল ও সতর্কতা | সরাসরি আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয় না, তবে দালিলিক প্রমাণ নিশ্চিত করে |
| ২. ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর | হাসপাতাল বা ল্যাবকে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও সিলগালা | আদায়কৃত সরকারি জরিমানার ২৫% তাৎক্ষণিক ভুক্তভোগী পান |
| ৩. দেওয়ানি জজ আদালত (Civil Court) | টর্ট আইনে অবহেলার দায়ে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ডিক্রি | রোগীর সম্পূর্ণ ক্ষতি, ভবিষ্যৎ আয়হানি মিলিয়ে কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ |
ভুল চিকিৎসা বা অপচিকিৎসায় রোগীর অপূরণীয় ক্ষতি হলে দেওয়ানি আদালতে 'টর্ট' (Law of Torts) ও চুক্তির বরখেলাপজনিত ক্ষতিপূরণ মোকদ্দমা দায়ের করা যায়। মামলায় রোগীর চিকিৎসার সমুদয় ব্যয়, কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য আয় এবং পরিবারের মানসিক যন্ত্রণার অর্থমূল্য হিসাব করে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হয়।
তাছাড়া সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ (জীবনের নিরাপত্তা ও আইনের আশ্রয় লাভ) এবং অনুচ্ছেদ ৩২ (জীবন রক্ষার মৌলিক অধিকার) লঙ্ঘিত হওয়ায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়েরের মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অন্তর্বর্তীকালীন কয়েক লাখ বা কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেওয়ার একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে।
যদি কোনো ভুয়া ডাক্তার রোগীর অঙ্গহানি ঘটায় বা মৃত্যুর কারণ হয়, তবে দণ্ডবিধির ৩০৪ক (অবহেলাজনিত মৃত্যু), ৩৩৮ (মারাত্মক আঘাত) এবং ৪১৯/৪২০ (ভুয়া পরিচয় ও প্রতারণা) ধারায় চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সিআর মামলা দায়ের করা যায়।
মামলায় আদালত সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের দ্বারা একটি মেডিকেল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেন। বোর্ড যদি ল্যাবের ভুল রিপোর্ট বা ডাক্তারের স্পষ্ট অপচিকিৎসার প্রমাণ পায়, তবে আসামিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ওয়ারেন্ট জারি হয় এবং জামিন নামঞ্জুর করে জেলে প্রেরণের আদেশ হয়।
ভুল চিকিৎসা বা ভুয়া ডাক্তারের কারণে পরিবারের প্রিয়জনকে হারানো অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল এই অন্যায়ের বিচার ও ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব। সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা জজ আদালতের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম অত্যন্ত দক্ষতার সাথে মেডিকেল নেগলিজেন্স রিট ও ক্ষতিপূরণ মোকদ্দমা পরিচালনা করে থাকেন।
সরাসরি চেম্বার পরামর্শ বা জরুরি আইনি সহায়তার জন্য যোগাযোগ করুন:
📞 ফোন / হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৭১২৬৫৫৫৪৬ (01712655546)
📍 চেম্বার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন, ঢাকা।
টর্ট আইন (Law of Torts) অনুযায়ী কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিয়োগকৃত ডাক্তার, প্যাথলজিস্ট বা নার্স যদি দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা প্রদর্শন করেন, তবে শুধুমাত্র ওই ডাক্তারই নন, বরং পুরো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ 'প্রতিনিধিত্বমূলক দায়' বা ভাইকারিয়াস লায়াবিলিটিতে দায়ী থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের যুগান্তকারী রায়গুলোতে বেসরকারি ক্লিনিকগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত রোগীর পরিবারকে কোটি কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে রোগীকে ভর্তি করার সময় যে চুক্তি ও সেবামূলক অঙ্গীকার তৈরি হয়, অবহেলার কারণে তা লঙ্ঘিত হলে ভুক্তভোগী সাধারণ ক্ষতি (General Damages), বিশেষ ক্ষতি (Special Damages) এবং শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ (Exemplary Damages) পাওয়ার সম্পূর্ণ আইনি অধিকার রাখেন।
অনেক ক্ষেত্রে রোগী মারা গেলে বা অঙ্গহানি হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মূল কেস ফাইল, ওটি নোট (Operation Theater Note), এনেস্থেশিয়া রেকর্ড এবং ওষুধের চার্ট গোপন বা পরিবর্তন করে ফেলে। এমন ঝুঁকি এড়াতে ঘটনার পরপরই ৩টি কৌশল অবলম্বন করা উচিত: (১) বিল পরিশোধের পূর্বে পুরো বেড-হেড টিকিটের (BHT) প্রতিটি পাতার স্পষ্ট ছবি ও ফটোকপি সংগ্রহ করা, (২) চিকিৎসকের মৃত্যুর কারণ সার্টিফিকেট (Death Certificate) কোনো অস্পষ্টতা ছাড়া গ্রহণ করা, এবং (৩) ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাৎক্ষণিক দরখাস্ত দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে সমস্ত মেডিকেল রেকর্ড বাজেয়াপ্ত (Seize) করে নিরাপদ জিম্মায় নেওয়ার আদেশ জারি করা।
চিকিৎসা সেবা গ্রহণকারী প্রতিটি নাগরিক আইন অনুযায়ী একজন 'ভোক্তা' হিসেবে স্বীকৃত। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪৫ ও ৫৩ ধারা অনুযায়ী অর্থ প্রদানের বিনিময়ে প্রতিশ্রুত সেবা যথাযথভাবে না দেওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ রি-এজেন্ট দিয়ে রক্ত পরীক্ষা করা কিংবা ভুল রিপোর্টের মাধ্যমে ভোক্তার জীবন বিপন্ন করা মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ।
ভুক্তভোগী বা তার পরিবার ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করতে পারেন। অধিদপ্তর উভয় পক্ষকে তলব করে শুনানিতে অসঙ্গতি পেলে অভিযুক্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে তাৎক্ষণিক লাখ টাকা জরিমানা ও ল্যাব সিলগালা করে দেয়। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সরকারি জরিমানার ২৫% অর্থ ভুক্তভোগী পরিবারকে সরাসরি প্রদান করা হয়, যা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি বয়ে আনে।
চিকিৎসা অবহেলা যখন শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং কোনো নামিদামি হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাঠামোগত দুর্নীতি ও অননুমোদিত ল্যাবের মাধ্যমে গণমানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, তখন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে মামলা (Public Interest Litigation - PIL) দায়ের করা হয়।
উচ্চ আদালত এ ধরনের মামলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিএমডিসি এবং ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন। আদালতের কড়া নির্দেশে ভুয়া ল্যাব সিলগালা করা, প্যাথলজিস্টদের লাইসেন্স অডিট এবং ক্ষতিগ্রস্ত রোগীদের কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠনের নির্দেশ জারি করা হয়। আইনের শাসনের এই বলিষ্ঠ প্রয়োগই চিকিৎসা খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।