লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-22 · ১৬ মিনিট
বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক ও সম্পত্তি হস্তান্তরে 'হেবা' (Hiba) এবং 'হেবা বিল এওয়াজ' (Hiba-bil-Ewaz) বহুল ব্যবহৃত দুটি দলিল। তবে সাধারণ মানুষ এমনকি অনেক দলিল গ্রহীতাও এই দুইয়ের মধ্যকার সূক্ষ্ম কিন্তু মারাত্মক আইনি পার্থক্য বুঝতে পারেন না। সাধারণ হেবা যেখানে নিছক স্নেহ-ভালোবাসার কারণে কোনো বিনিময় ছাড়াই দেওয়া হয়, হেবা বিল এওয়াজে সেখানে একটি 'এওয়াজ' বা প্রতিদান থাকা আবশ্যক—যেমন একখণ্ড জায়নামাজ, পবিত্র কোরআন শরীফ বা কিছু অর্থ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাধারণ হেবা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রত্যাহার বা বাতিল করা সম্ভব হলেও, হেবা বিল এওয়াজ বিক্রয় দলিলের মতো কাজ করে এবং তা একতরফাভাবে বাতিল করা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে অসৎ ওয়ারিশরা হেবা বিল এওয়াজ জালিয়াতি করে মেয়ে বা বোনদের বঞ্চিত করার চেষ্টা করে। এই জটিল আইনি বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold;text-decoration:underline;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর আদালতের বাস্তব বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো। চেম্বার পরামর্শের জন্য কল করুন: <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold;">01712655546</a>।
মুসলিম আইনে হেবা বিল এওয়াজ (Hiba-bil-Ewaz) হলো এমন একটি দানপত্র, যা কোনো কিছুর বিনিময়ে সম্পাদিত হয়। অর্থাৎ দাতা কোনো সম্পত্তি দান করছেন এবং গ্রহীতা তার বিনিময়ে দাতাকে কোনো প্রতিদান (Ewaz) প্রদান করছেন।
বাস্তব আদালতে এওয়াজ হিসেবে সাধারণত একটি স্বর্ণের আংটি, জায়নামাজ, তসবিহ, কোরআন শরীফ বা নগদ ১০০ থেকে ১০০০ টাকা উল্লেখ করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রিভি কাউন্সিল ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বহু রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে—হেবা বিল এওয়াজ আদতে একটি বিক্রয় চুক্তি (Contract of Sale)-এর সমতুল্য। এখানে বিনিময় বা প্রতিদান প্রদান প্রমাণিত হলে হস্তান্তরিত সম্পত্তিতে গ্রহীতার মালিকানা চিরস্থায়ী হয়ে যায়।
| তুলনার বিষয় | সাধারণ হেবা (Simple Gift) | হেবা বিল এওয়াজ (Hiba-bil-Ewaz) |
|---|---|---|
| ১. প্রতিদান বা বিনিময় | কোনো প্রতিদান বা বিনিময় থাকে না, নিছক স্নেহবশত দান। | বাস্তব প্রতিদান বা এওয়াজ (Ewaz) প্রদান বাধ্যতামূলক। |
| ২. আইনি চরিত্র | বিশুদ্ধ দানপত্র (Pure Gift)। | বিক্রয় চুক্তির (Sale) অনুরূপ ফলাফল দেয়। |
| ৩. দখল হস্তান্তর | দখল হস্তান্তর (Delivery of possession) ব্যতিরেকে হেবা অসম্পূর্ণ। | এওয়াজ প্রদান ও গ্রহণে স্বত্ব বর্তায়, তাৎক্ষণিক দখল না পেলেও চুক্তি কার্যকর থাকে। |
| ৪. বাতিলের সুযোগ | নির্দিষ্ট আইনি কারণ ছাড়া বাতিল অসম্ভব হলেও রক্তের বাইরে কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাহারের সুযোগ থাকে। | সম্পন্ন হওয়ার পর কোনো অবস্থাতেই একতরফা প্রত্যাহারযোগ্য নয়। |
রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর Section 78B অনুযায়ী মুসলিম আইনে রক্তের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যে হেবা দলিল রেজিস্ট্রির জন্য সরকার বিশেষ আর্থিক ছাড় দিয়েছে:
অনেকে মনে করেন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দাতা চাইলে নিজেই 'বাতিল দলিল' (Deed of Revocation / Cancellation) রেজিস্ট্রি করে হেবা বা হেবা বিল এওয়াজ বাতিল করে দিতে পারেন। এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত হলো—একবার একটি হেবা বা হেবা বিল এওয়াজ দলিল সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে সম্পাদিত ও রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে, দাতা একতরফাভাবে বাতিল দলিল করে তা অকার্যকর করতে পারেন না। কারণ রেজিস্ট্রির সাথে সাথেই গ্রহীতার অনুকূলে সংবিধিবদ্ধ মালিকানা স্বত্ব স্থানান্তরিত হয়ে গেছে। এটি বাতিল করতে হলে উপযুক্ত দেওয়ানি আদালতের ডিক্রি ছাড়া কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা সাব-রেজিস্ট্রারের কোনো এখতিয়ার নেই।
পৈতৃক সম্পত্তিতে প্রায়ই দেখা যায়—পিতা মারা যাওয়ার পর বা জীবিত থাকাকালে কোনো চালাক ভাই দাবি করে বসেন, ‘পিতা আমাকে সমস্ত জমি হেবা বিল এওয়াজ করে দিয়েছেন’। এ জাতীয় ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বোন বা ওয়ারিশদের দ্রুত ৩টি পদক্ষেপ নিতে হবে:
জাল বা প্রতারণামূলক হেবা বিল এওয়াজ দলিল নিষ্পত্তির একমাত্র আইনি ফোরাম হলো সহকারী জজ আদালত। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী দলিল বাতিলের মোকদ্দমা (Suit for Cancellation of Document) দায়ের করতে হবে।
তামাদি সীমা: তামাদি আইন ১৯০৮-এর আর্টিকেল ৯১ অনুযায়ী, জাল দলিলের খবর বা অস্তিত্ব জানার ৩ (তিন) বছরের মধ্যে আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে। ৩ বছর পার হয়ে গেলে মামলা তামাদি দোষে বারিত (Barred by Limitation) হতে পারে। একই সাথে দেওয়ানি কার্যবিধির Order 39 Rule 1 & 2 ধারায় বিরোধীয় জমিতে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ নিতে হবে যাতে অপরপক্ষ জমি বিক্রি বা হস্তান্তর করতে না পারে।
হেবা বা হেবা বিল এওয়াজ সম্পাদন কিংবা এর বিরুদ্ধে আইনি লড়াই—উভয় ক্ষেত্রেই সামান্য ভুলে কোটি টাকার সম্পত্তি হাতছাড়া হতে পারে। আপনার পরিবারের স্বত্ব রক্ষা এবং সঠিক দেওয়ানি ড্রাফটিংয়ের জন্য সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলমের চেম্বারে সরাসরি সাক্ষাতের জন্য কল করুন: 01712655546।