লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-21 · ১৮ মিনিট
পরিবারের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন বা রক্তের সম্পর্কের মধ্যে জমিজমা হস্তান্তরের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং সবচেয়ে কম খরচের আইনি মাধ্যম হলো 'হেবা দলিল' (Gift Deed)। কিন্তু সাধারণ হেবা এবং 'হেবা-বিল-এওয়াজ' (Hiba-bil-Iwaz)-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী, কোনটিতে রেজিস্ট্রেশন খরচ নামমাত্র ১০০ টাকা আর কোনটিতে সাফ-কবলা দলিলের মতো কর দিতে হয়—তা অনেকেরই অজানা। এছাড়া হেবা করার পর কি তা বাতিল করা যায়? এসব গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নের ব্যাখ্যা ও সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold;text-decoration:underline;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর বিস্তারিত দিকনির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো। সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত আইনি পরামর্শে কল করুন: <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold;">০১৭১২-৬৫৫৫৪৬</a>।
মুসলিম আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায়, সুস্থ মস্তিষ্কে এবং কোনো আর্থিক প্রতিদান ব্যতিরেকে তার স্বনামে থাকা সম্পত্তি অন্য কাউকে নিঃশর্তভাবে দান করেন, তবে তাকে হেবা (Heba / Gift) বলা হয়।
হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য ৩টি শর্ত পূরণ হওয়া বাধ্যতামূলক:
২০০৪ সালের রেজিস্ট্রেশন আইন সংশোধনের মাধ্যমে হেবা দলিল রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়। তবে রক্তের ঘনিষ্ঠ ১৫টি সম্পর্কের মধ্যে হেবা করলে সরকার বিশেষ ফি ছাড় প্রদান করে। সম্পর্কগুলো হলো:
উক্ত ১৫টি সম্পর্কের বাইরে (যেমন চাচা-ভাতিজা, খালা-ভাগ্নে, দুলাভাই বা দূরবর্তী আত্মীয়) হেবা করলে তা সাধারণ দানপত্র (Gift Deed) হিসেবে গণ্য হবে এবং নিয়মিত সাফ-কবলা দলিলের মতো সম্পূর্ণ সরকারি ফি প্রযোজ্য হবে।
আরবি 'এওয়াজ' শব্দের অর্থ হলো প্রতিদান বা বিনিময়। সুতরাং হেবা-বিল-এওয়াজ মানে হলো প্রতিদানের বিনিময়ে দান।
প্রথাগত উদাহরণ: বাবা তার সন্তানকে অথবা মুরিদ তার পীর সাহেবকে একটি ধর্মীয় কিতাব, জায়নামাজ বা সোনার আংটি উপহার দিলেন এবং তার বিনিময়ে দাতা খুশি হয়ে তাকে একখণ্ড জমি হেবা করে দিলেন। মুসলিম আইনে এটিকে বিক্রয় বা আধা-বিক্রয় চুক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এতে দখল হস্তান্তর না হলেও দলিল রেজিস্ট্রেশনের সাথে সাথেই স্বত্ব হস্তান্তরিত হয়।
| বৈশিষ্ট্য | সাধারণ হেবা | হেবা-বিল-এওয়াজ |
|---|---|---|
| ১. প্রতিদান | সম্পূর্ণ প্রতিদানহীন নিঃশর্ত দান। | যেকোনো মূল্যের প্রতিদানের বিনিময়ে দান। |
| ২. দখল হস্তান্তর | দখল হস্তান্তর বাধ্যতামূলক। | রেজিস্ট্রেশনই স্বত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ। |
| ৩. বাতিল করার সুযোগ | শর্তসাপেক্ষে বিশেষ ক্ষেত্রে বাতিলযোগ্য। | কোনো অবস্থাতেই দাতা কর্তৃক বাতিল করা যায় না। |
| ৪. প্রি-অ্যাম্পশন (অগ্রক্রয়) | শরিকরা অগ্রক্রয়ের মামলা করতে পারে না। | অ-আত্মীয়ের ক্ষেত্রে অগ্রক্রয় প্রযোজ্য হতে পারে। |
| ৫. সরকারি খরচ | ১৫ সম্পর্কের মধ্যে মাত্র ১০০ টাকা রেজিস্ট্রেশন ফি। | বিনিময়ের প্রকৃতি অনুযায়ী নিয়মিত কর প্রযোজ্য। |
রক্তের সম্পর্কের ১৫ জন ব্যক্তির মধ্যে সাধারণ হেবা দলিল রেজিস্ট্রেশনের হালনাগাদ সরকারি খরচ:
অর্থাৎ মাত্র ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকার সরকারি চালানে কোটি টাকার জমিও রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বৈধভাবে হেবা রেজিস্ট্রি করা সম্ভব।
মুসলিম আইনের ১৬৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হেবা দলিলের দখল হস্তান্তরের পূর্বে দাতা যেকোনো সময় হেবা বাতিল করতে পারেন। কিন্তু একবার রেজিস্ট্রি হয়ে এবং দখল বুঝিয়ে দেওয়ার পর সাধারণ হেবা সহজে বাতিল করা যায় না। তবে নিচের ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে হেবা বাতিল হতে পারে:
তবে স্বামী-স্ত্রী অথবা রক্তের নিষিদ্ধ সম্পর্কের (Prohibited Degree) আত্মীয়দের মধ্যে হেবা হলে তা আদালত ব্যতিরেকে একতরফা বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের দেশে প্রায়শই বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের অজান্তে কোনো চালাক সন্তান সমস্ত জমি নিজের নামে হেবা দলিল করিয়ে নেয়। ভুক্তভোগী বাবা বা বঞ্চিত ভাই-বোনেরা দেওয়ানি আদালতে দলিল বাতিলের মামলা (Suit for Cancellation of Deed) দায়ের করতে পারেন। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী আদালত ভুয়া হেবা দলিল বাতিল ঘোষণা করতে পারেন।
হেবা দলিল ভবিষ্যতে অন্যান্য ওয়ারিশদের সাথে পারিবারিক বিরোধের বড় কারণ হতে পারে। তাই হেবা করার সময় স্পষ্ট শর্তাবলি, সঠিক চৌহদ্দি এবং প্রত্যক্ষ দখল নিশ্চিত করে অভিজ্ঞ আইনজীবীর তত্ত্বাবধানে দলিল রেজিস্ট্রি করা বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের চেম্বারে হেবা দলিল ড্রাফটিং ও লিগ্যাল সিকিউরিটি যাচাইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়।
না। চাচা-ভাতিজার সম্পর্ক নির্ধারিত ১৫টি রক্তের সম্পর্কের মধ্যে পড়ে না। ফলে চাচা ভাতিজাকে জমি দিতে চাইলে নিয়মিত দানপত্র দলিল করতে হবে এবং দলিলের মূল্যের ওপর পুরো সরকারি শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হবে।
হ্যাঁ, শতভাগ বাধ্যতামূলক। হেবা দলিল রেজিস্ট্রির পর অবিলম্বে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে ই-নামজারি আবেদন করে গ্রহীতার নামে নতুন খতিয়ান তৈরি করতে হবে, অন্যথায় দলিলে শতভাগ মালিকানা থাকা সত্ত্বেও বিক্রয় বা খাজনা দেওয়া যাবে না।
২০০৪ সালের ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশে মৌখিক হেবা আইনত অকার্যকর। এখন হেবা অবশ্যই লিখিত এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রি করা বাধ্যতামূলক।
না। হেবা-বিল-এওয়াজে যেহেতু প্রতিদান গ্রহণ করা হয়, তাই প্রতিদান গ্রহণের পর কোনো অবস্থাতেই দাতা একতরফাভাবে হেবা-বিল-এওয়াজ দলিল বাতিল করতে পারেন না।