হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিতে কত টাকা লাগে ও কী কী কাগজ লাগে? ধারা ৪৯৮ নিয়ম

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-22 · ১৬ মিনিট

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

<p>রাজনীতি, পারিবারিক শত্রুতা, জমিজমা কিংবা ব্যবসায়িক রেষারেষির কারণে যখন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় মিথ্যা বা ষড়যন্ত্রমূলক এফআইআর (FIR) বা আদালতে সিআর মামলা দায়ের হয়, তখন যেকোনো মুহূর্তে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার এক চরম বিভীষিকাময় আতঙ্ক তৈরি হয়। রাতে ঘরে ঘুমানো যায় না, ব্যবসা-চাকরি বন্ধ হয়ে যায় এবং সম্মানহানির ভয় তাড়া করে ফেরে। এই ধরনের অন্যায় গ্রেফতার ও হয়রানি থেকে কোনো নাগরিককে মুক্ত রাখার জন্য বাংলাদেশের সংবিধানে ও আইনে সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে <strong>"আগাম জামিন" (Anticipatory Bail)</strong> গ্রহণ করা। ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (CrPC)-এর ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই সশরীরে হাইকোর্টে হাজির হয়ে এই জামিন নিতে পারেন। তবে সাধারণ মানুষের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—<em>"হাইকোর্টে আগাম জামিন করতে মোট কত টাকা খরচ হয়? কী কী কাগজপত্র লাগে? এবং হাইকোর্টে কি নিজে যেতে হয়?"</em> আগাম জামিনের যাবতীয় খরচ, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস, জামিন পাওয়ার শর্তাবলী ও পরবর্তী ট্রায়াল কোর্টের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>

⚡ হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন — একনজরে মূল আইনি তথ্য
  • ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী গ্রেফতারের বাস্তব আশঙ্কা থাকলে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতারের আগেই হাইকোর্টে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আগাম জামিন নেওয়া যায়।
  • আগাম জামিনের ক্ষেত্রে আসামিকে অবশ্যই হাইকোর্ট এজলাসে বিজ্ঞ বিচারপতিদের সামনে সশরীরে উপস্থিত (Physical Appearance) থাকতে হয়; অনুপস্থিত থেকে কোনো আগাম জামিন পাওয়া যায় না।
  • হাইকোর্ট সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য (যেমন ৪ থেকে ৮ সপ্তাহ) অন্তর্বর্তীকালীন আগাম জামিন মঞ্জুর করেন এবং মেয়াদ শেষে সংশ্লিষ্ট দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।
  • সরকারি কোর্ট ফি, স্ট্যাম্প ও পেপারবুক বাবদ সরকারি খরচ প্রায় ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা; আর সুপ্রিম কোর্টের বিজ্ঞ অ্যাডভোকেটের পেশাগত ফিসহ সার্বিক খরচ সাধারণত ৫০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
  • হাইকোর্টের আগাম জামিনের সার্টিফাইড আদেশ সাথে রাখলে মেয়াদকালীন পুলিশ বা কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসামিকে গ্রেফতার বা হয়রানি করতে পারে না।
📋 সূচিপত্র
  1. ১. আগাম জামিন (Anticipatory Bail) কী এবং সাধারণ জামিনের সাথে পার্থক্য
  2. ২. ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৮: হাইকোর্টের অসীম অন্তর্নিহিত ক্ষমতা
  3. ৩. কোন কোন মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেওয়া যায়?
  4. ৪. হাইকোর্টে আগাম জামিন করতে মোট কত টাকা খরচ হয়? (বিস্তারিত খরচের হিসাব)
  5. ৫. আগাম জামিনের আবেদনের জন্য কী কী কাগজপত্র ও নথিপত্র লাগবে?
  6. ৬. হাইকোর্টে সশরীরে হাজিরা ও শুনানি প্রক্রিয়া (ধাপে ধাপে রূপরেখা)
  7. ৭. হাইকোর্ট সাধারণত কতদিনের জন্য আগাম জামিন মঞ্জুর করেন?
  8. ৮. আগাম জামিন পাওয়ার পর মেয়াদ শেষে দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণের নিয়ম
  9. ৯. পুলিশ কি আগাম জামিন থাকা অবস্থায় গ্রেফতার করতে পারে?
  10. ১০. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় ও জামিনের শর্তাবলী (DLR Reference)
  11. ১১. আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হলে তাৎক্ষণিক পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ
  12. ১২. সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র ফৌজদারি আইনজীবীর স্ট্র্যাটেজিক দিকনির্দেশনা

১. আগাম জামিন (Anticipatory Bail) কী এবং সাধারণ জামিনের সাথে পার্থক্য

সাধারণ জামিন (Regular Bail) চাওয়া হয় যখন কোনো ব্যক্তি ইতিমধ্যে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে থানা হাজতে বা আদালতের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছেন। কিন্তু আগাম জামিন (Anticipatory Bail) হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আইনি প্রক্রিয়া। কোনো ব্যক্তি যখন জানতে পারেন যে তার বিরুদ্ধে কোনো থানায় একটি মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এজাহার (FIR) হয়েছে বা তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার করানোর চক্রান্ত চলছে, তখন তিনি গ্রেফতার হওয়ার আগেই বিজ্ঞ আদালতের শরণাপন্ন হন।

সহজ কথায়, গ্রেফতার হওয়ার আগেই সম্ভাব্য গ্রেফতারি পরোয়ানা বা হয়রানি ঠেকানোর জন্য আদালত থেকে যে জামিন বা আইনি সুরক্ষা লাভ করা হয়, তাকেই আগাম জামিন বলা হয়। এই জামিনের মূল উদ্দেশ্য হলো নিরীহ ও সম্মানিত নাগরিকদের মিথ্যা মামলায় বিনা বিচারে পুলিশের হাত থেকে সাময়িক নিরাপত্তা দেওয়া যাতে তারা ন্যায়বিচারের সুযোগ পান।

২. ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ধারা ৪৯৮: হাইকোর্টের অসীম অন্তর্নিহিত ক্ষমতা

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৪৯৮ ধারায় হাইকোর্ট বিভাগ এবং মহানগর দায়রা জজ আদালতকে যেকোনো মামলায় জামিন প্রদানের বিশেষ ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের প্রচলিত সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহ্য ও প্র্যাকটিস অনুযায়ী আগাম জামিনের আবেদন সাধারণত সরাসরি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগেই দায়ের করা হয়।

সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও চলাফেরার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো নিরপরাধ নাগরিক যেন মিথ্যা অভিযোগে অযথা পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের শিকার না হন, সে জন্যই মহামান্য হাইকোর্ট বেঞ্চ ধারা ৪৯৮-এর অধীনে নিজের বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে আসামিকে আগাম জামিন প্রদান করেন।

৩. কোন কোন মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেওয়া যায়?

যেকোনো আমলযোগ্য (Cognizable) এবং জামিন-অযোগ্য (Non-bailable) মামলায় যেখানে গ্রেফতারের সুনির্দিষ্ট ও বাস্তব আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে আগাম জামিনের আবেদন করা যায়। প্র্যাকটিসে সবচেয়ে বেশি যেসব ক্ষেত্রে আগাম জামিন হয়:

  • পারিবারিক ও যৌতুক মামলা: যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারার মিথ্যা মামলায় স্বামী ও তার পিতা-মাতার গ্রেফতার ঠেকাতে।
  • রাজনৈতিক ও নাশকতা মামলা: দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯ ও ৪৩৫ ধারায় দলবদ্ধ ভাঙচুর বা বিস্ফোরক আইনের হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলা।
  • জমিজমা ও মারামারির মামলা: জমি নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭ (হত্যার চেষ্টা) ধারায় দায়েরকৃত ক্রস কেস।
  • ব্যবসায়িক প্রতারণা: দণ্ডবিধির ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় প্রতারণা ও আত্মসাতের সিআর বা জিআর মোকদ্দমা।
  • ডিজিটাল ও সাইবার মামলা: সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট সংক্রান্ত অভিযোগে।

৪. হাইকোর্টে আগাম জামিন করতে মোট কত টাকা খরচ হয়? (বিস্তারিত খরচের হিসাব)

হাইকোর্টে আগাম জামিন সংক্রান্ত খরচের বিষয়টি সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই ভাবেন হাইকোর্টে জামিন করাতে আকাশচুম্বী খরচ হয়। প্রকৃতপক্ষে আদালতের সরকারি ফি খুবই সীমিত; খরচের সিংহভাগ নির্ধারিত হয় মামলার আসামি সংখ্যা, অভিযোগের গুরুত্ব এবং আইনজীবীর সিনিয়রিটির ওপর ভিত্তি করে।

খরচের খাত আনুমানিক ব্যয়সীমা বিবরণ
সরকারি কোর্ট ফি ও স্ট্যাম্প ৩,০০০ - ৫,০০০ টাকা ওকালতনামা, কোর্ট ফি এবং এফিডেভিট কমিশনারের নির্ধারিত সরকারি ফি
ড্রাফটিং ও পেপারবুক তৈরি ৫,০০০ - ৮,০০০ টাকা সবুজ লিগ্যাল পেপারে মামলা টাইপিং, সাইটেশন প্রিন্ট ও হাইকোর্টের সেকশনে ফাইল বাঁধাই
বিজ্ঞ আইনজীবীর পেশাগত ফি ৪০,০০০ - ১,০০,০০০+ টাকা সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড (AOR) ও শুনানিকারী বিজ্ঞ আইনজীবীর পারিশ্রমিক
সার্টিফাইড কপি ও অর্ডার শিট ২,০০০ - ৪,০০০ টাকা হাইকোর্টের জামিন আদেশের সিলমোহরযুক্ত মূল সার্টিফাইড কপি উত্তোলন খরচ

সাধারণ মানের একটি ফৌজদারি মামলায় ১ থেকে ৩ জন আসামির জন্য হাইকোর্টে আগাম জামিনের সামগ্রিক স্ট্যান্ডার্ড খরচ সাধারণত ৫০,০০০ থেকে ১,৫০,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। অতি গুরুতর মামলায় সিনিয়র আইনজীবী বা ব্যারিস্টার শুনানি করলে ফি বৃদ্ধি পেতে পারে।

৫. আগাম জামিনের আবেদনের জন্য কী কী কাগজপত্র ও নথিপত্র লাগবে?

হাইকোর্টে আগাম জামিন পেতে হলে বিজ্ঞ আইনজীবীকে নিচের নথিপত্রগুলো সরবরাহ করতে হবে:

  • ১. মূল এফআইআর (FIR) বা এজাহারের কপি: সংশ্লিষ্ট থানার মামলার এজাহারের স্পষ্ট সার্টিফাইড কপি বা ফটোকপি। সিআর মামলা হলে নালিশি দরখাস্ত ও সমন/ওয়ারেন্টের কপি।
  • ২. ফরওয়ার্ড রিপোর্ট বা সিজারলিস্ট (যদি থাকে): পুলিশের কোনো জব্দতালিকা থাকলে তার অনুলিপি।
  • ৩. আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও ছবি: আবেদনকারী প্রতিটি আসামির এনআইডি কপি ও পাসপোর্ট সাইজ ২ কপি ছবি।
  • ৪. নির্দোষ প্রমাণের প্রমাণাদি: ঘটনার দিন আসামি অন্য কোথাও ছিলেন (Alibi), বা চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, বা অফিসে ছিলেন তার অকাট্য টিকিট, সিসিটিভি ফুটেজ বা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন।
  • ৫. ওকালতনামায় স্বাক্ষর: সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারিত ওকালতনামায় আসামির নিজ স্বাক্ষর বা টিপসহি।

৬. হাইকোর্টে সশরীরে হাজিরা ও শুনানি প্রক্রিয়া (ধাপে ধাপে রূপরেখা)

আগাম জামিনের সবচেয়ে কঠোর শর্ত হলো—আসামিকে সশরীরে হাইকোর্ট বিভাগের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের এজলাসে উপস্থিত থাকতে হবে। কোনো অসুস্থ ব্যক্তি ছাড়া প্রক্সি দিয়ে আগাম জামিন সম্ভব নয়।

আদালতের কার্যক্রমের ধাপসমূহ:

  1. ফাইলিং ও কজলিস্ট: সমস্ত কাগজপত্র প্রস্তুত করে হাইকোর্টের ফাইলিং সেকশনে জমা দেওয়া হয়। ফাইল নম্বর আসার পর তা নির্দিষ্ট ফৌজদারি বেঞ্চের দৈনিক কার্যতালিকা বা ডেইলি কজলিস্টে (Daily Cause List) অন্তর্ভুক্ত হয়।
  2. এজলাসে অবস্থান: শুনানির দিন সকালে আসামি তার আইনজীবী সহ সংশ্লিষ্ট বিচারপতিদের এজলাসে আসন গ্রহণ করেন।
  3. নাম ডাকা ও শুনানি: কজলিস্টের সিরিয়াল অনুযায়ী বেঞ্চ অফিসার মামলাটি ডাকলে আসামি এজলাসের সামনে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞ বিচারপতিদের সামনে চেহারা প্রদর্শন করেন।
  4. বিজ্ঞ আইনজীবীর যুক্তি উপস্থাপন: আসামির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী দাঁড়িয়ে মামলার অসত্যতা, আসামির সামাজিক মর্যাদা, এজাহারে কোনো সুনির্দিষ্ট ভূমিকা না থাকা এবং গ্রেফতার হলে অপূরণীয় ক্ষতির দিকটি মাননীয় আদালতের সামনে জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন।
  5. রাষ্ট্রপক্ষের বিরোধিতা ও আদেশ: ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (DAG) বা সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (AAG) রাষ্ট্রপক্ষে বক্তব্য দেন। আদালত সন্তুষ্ট হলে সাথে সাথেই অন্তর্বর্তীকালীন আগাম জামিনের মৌখিক আদেশ ঘোষণা করেন।

৭. হাইকোর্ট সাধারণত কতদিনের জন্য আগাম জামিন মঞ্জুর করেন?

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা অনুযায়ী হাইকোর্ট সাধারণত কাউকে মামলার শেষ পর্যন্ত স্থায়ী আগাম জামিন দেন না। হাইকোর্ট সাধারণত ৪ (চার) সপ্তাহ থেকে ৮ (আট) সপ্তাহের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন আগাম জামিন মঞ্জুর করেন।

আদেশে আদালত স্পষ্টভাবে লিখে দেন যে, এই নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে আসামিকে স্থানীয় সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ সিনিয়র স্পেশাল জজ বা মহানগর দায়রা জজ আদালতে সশরীরে আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং নিয়মিত জামিনের প্রার্থনা করতে হবে।

৮. আগাম জামিন পাওয়ার পর মেয়াদ শেষে দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণের নিয়ম

হাইকোর্টের দেওয়া মেয়াদ (যেমন ৬ সপ্তাহ) শেষ হওয়ার অন্তত ৩ থেকে ৪ দিন পূর্বে আসামিকে হাইকোর্টের আদেশের সার্টিফাইড কপি সহ স্থানীয় জজ কোর্টে আত্মসমর্পণ (Surrender) করতে হয়। স্থানীয় জজ কোর্টের বিজ্ঞ আইনজীবী হাইকোর্টের আদেশ দাখিল করে নিয়মিত জামিনের দরখাস্ত পেশ করবেন। যেহেতু হাইকোর্ট ইতিমধ্যে আসামিকে জামিনযোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন, তাই স্থানীয় জজ আদালত সাধারণত সেই মেধার ভিত্তিতে আসামির জামিন বহাল রাখেন এবং ট্রায়াল পর্যন্ত নিয়মিত জামিন মঞ্জুর করেন।

৯. পুলিশ কি আগাম জামিন থাকা অবস্থায় গ্রেফতার করতে পারে?

কোনো অবস্থাতেই না। মহামান্য হাইকোর্টের আগাম জামিনের আদেশ কোনো সাধারণ কাগজের চিঠি নয়; এটি একটি সুপ্রিম জুডিশিয়াল অর্ডার। আগাম জামিনের আদেশ জারির পর আসামিকে কোনো পুলিশ অফিসার বা কোনো গোয়েন্দা সংস্থা উক্ত মামলায় গ্রেফতার করতে পারবে না। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি আদেশের কথা জেনেও গ্রেফতার করে, তবে তা সরাসরি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আদালত অবমাননা (Contempt of Court) হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারের চাকরি চলে যাওয়া সহ জেল হতে পারে।

১০. সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায় ও জামিনের শর্তাবলী (DLR Reference)

আগাম জামিন সংক্রান্ত আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজিরসমূহ:

১. দুলাল মিয়া বনাম রাষ্ট্র (55 DLR AD): বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ অভিমত দেন যে, আগাম জামিন কোনো সাধারণ অধিকার নয়, এটি একটি ব্যতিক্রমী সুরক্ষা (Exceptional Remedy)। যেখানে মামলাটি রাজনৈতিক হয়রানি বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসামূলক প্রমাণিত হয়, সেখানে আদালত নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় আগাম জামিন প্রদান করবেন।

২. মোজাম্মেল হক বনাম রাষ্ট্র (49 DLR): আদালত নির্দেশ দেন যে, হত্যা বা মারাত্মক অস্ত্রধারীদের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আগাম জামিন বিবেচনায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

১১. আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হলে তাৎক্ষণিক পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ

যদি কোনো কারণে হাইকোর্টের কোনো নির্দিষ্ট বেঞ্চ আগাম জামিন নামঞ্জুর (Reject) করেন, তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। হাইকোর্ট যদি সরাসরি পুলিশে দেওয়ার নির্দেশ না দেন, তবে পিটিশনটি প্রত্যাহার (Not Pressed) করিয়ে অন্য কোনো সম-এখতিয়ারসম্পন্ন বেঞ্চে নতুন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা যায়। অথবা সরাসরি স্থানীয় দায়রা জজ আদালতে গিয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন শুনানির পদক্ষেপ নেওয়া যায়।

১২. সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র ফৌজদারি আইনজীবীর স্ট্র্যাটেজিক দিকনির্দেশনা

মিথ্যা মামলা হলে পুলিশি গ্রেফতারের ভয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আত্মগোপন করে থাকা কোনো সমাধান নয়। পুলিশ একবার গ্রেফতার করে আদালতে চালান দিলে জজ কোর্টে বা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে জামিন পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে এবং জেল খাটতে হতে পারে। তাই খবর পাওয়ার প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মামলার এজাহারের কপি সংগ্রহ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করুন। হাইকোর্ট থেকে নেওয়া একটি সময়োচিত আগাম জামিনের আদেশ আপনাকে কারাবাসের অবমাননা থেকে রক্ষা করবে এবং আপনার মৌলিক ব্যক্তিস্বাধীনতাকে শতভাগ অক্ষুণ্ণ রাখবে।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

হাইকোর্টে আগাম জামিনের শুনানির সময় কি আসামিকে উপস্থিত থাকতে হয়?

হ্যাঁ, এটি শতভাগ বাধ্যতামূলক। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারার অধীনে আগাম জামিন পেতে হলে আসামিকে অবশ্যই সশরীরে হাইকোর্ট বেঞ্চের কাঠগড়ার সামনে উপস্থিত থাকতে হবে।

আগাম জামিন সাধারণত কতদিনের জন্য দেওয়া হয়?

হাইকোর্ট সাধারণত ৪ সপ্তাহ থেকে ৮ সপ্তাহের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন আগাম জামিন প্রদান করেন এবং এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন।

হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন পেতে কতদিন সময় লাগে?

কাগজপত্র প্রস্তুত থাকলে সাধারণত ২ থেকে ৪ কার্যদিবসের মধ্যে পেপারবুক তৈরি, ফাইলিং এবং কজলিস্টে ওঠার পর শুনানি সম্পন্ন করে জামিনের আদেশ পাওয়া যায়।

মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) থাকলে কি আগাম জামিন পাওয়া যায়?

হ্যাঁ, ওয়ারেন্ট জারি হলেও আসামি যদি পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হওয়ার আগেই নিজে স্বেচ্ছায় হাইকোর্টে এসে আত্মসমর্পণ করেন, তবে আদালত আগাম জামিন বিবেচনা করতে পারেন।

আগাম জামিন পেলে কি পুলিশ আমাকে আর কখনোই গ্রেফতার করতে পারবে না?

হাইকোর্টের আদেশে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে পুলিশ উক্ত মামলায় গ্রেফতার করতে পারবে না। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই দায়রা আদালতে আত্মসমর্পণ করে নিয়মিত জামিন নিতে হবে।

আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546  |  WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০