জমি খারিজ ও ই-নামজারি করার সম্পূর্ণ আইনি গাইডলাইন ২০২৬: নিয়ম, ফি ও আপিল পদ্ধতি

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-31

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে বর্তমানে ডিজিটাল ই-নামজারি (E-Mutation) চালু করা হয়েছে। জমি ক্রয়, দান (হেবা), উত্তরাধিকার কিংবা বাটোয়ারা সূত্রে প্রাপ্ত জমির সরকারি রেকর্ডবুকে নতুন মালিকের নাম নথিভুক্ত না করা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি জমির পূর্ণাঙ্গ আইনি মালিকানা দাবি করতে পারেন না। হাল ই-নামজারি খতিয়ান ছাড়া জমি বিক্রি, হস্তান্তর বা খাজনা প্রদান করা আইনত অসম্ভব। এই নিবন্ধে কীভাবে ঘরে বসেই ই-নামজারি আবেদন করবেন, শুনানি ও কাগজপত্রের প্রস্তুতি নিবেন, সরকারি ফি কত এবং কোনো বিবাদের কারণে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নামজারি না-মঞ্জুর করলে কীভাবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বরাবরে আপিল বা মিস কেস করবেন—তার ২,৫০০+ শব্দের পূর্ণাঙ্গ আইনি সমাধান তুলে ধরা হলো। ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতায় সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত জমি বিশেষজ্ঞ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold;text-decoration:underline;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর সরাসরি সহায়তা পেতে ফোন করুন: <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold;">01712655546</a>।

কোনো স্থাবর সম্পত্তি বা জমি হস্তান্তর হওয়ার পর (যেমন: ক্রয়, দান, অসিয়ত বা উত্তরাধিকারসূত্রে) সরকারি রেকর্ডবুক বা খতিয়ানে পূর্বের মালিকের নাম কেটে নতুন সর্বস্বত্বাধিকারী মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং তার নামে নতুন পৃথক খতিয়ান খোলাকেই প্রচলিত বাংলায় জমি খারিজ, মিউটেশন বা ই-নামজারি (E-Mutation) বলা হয়।

পূর্বে জমি খারিজ করতে ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও এসি ল্যান্ড অফিসে বারবার দৌড়ঝাঁপ করতে হতো এবং মাস পেরিয়ে গেলেও খতিয়ান মিলত না। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থার ফলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি পোর্টালে অনলাইনেই আবেদন দাখিল করা যায়।

আইনি দৃষ্টিতে জমি খারিজের প্রধান ৪টি উদ্দেশ্য:

  1. মালিকানার সরকারি স্বীকৃতি: রেজিস্ট্রি দলিল আপনাকে স্বত্ব দেয়, কিন্তু নামজারি আপনাকে সরকারি রেকর্ডে রাজস্ব প্রদানকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
  2. ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) প্রদান: নতুন অনলাইন ভূমি রাজস্ব সিস্টেমে নিজস্ব নামজারি খতিয়ান না থাকলে হাল খাজনা পরিশোধ করা যায় না।
  3. ভবিষ্যৎ জমি বিক্রয় ও রূপান্তর: নিজ নামে নামজারি না থাকলে সাব-রেজিস্ট্রার পরবর্তীতে সেই জমির কোনো বিক্রয়, বন্ধক বা হেবা দলিল রেজিস্ট্রি করেন না।
  4. ব্যাংক ঋণ ও ইমারত নির্মাণ অনুমোদন: ব্যাংকে জমি বন্ধক রেখে লোন নিতে কিংবা রাজউক/পৌরসভা থেকে ভবনের প্ল্যান পাস করাতে হাল নামজারি খতিয়ান আবশ্যক।

আপনার জমি নামজারি সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতায় আমাদের জমি ও ভূমি আইন বিশেষজ্ঞ টিম-এর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।

২০২৩ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া "ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩" এর ধারা অনুযায়ী জমিতে প্রকৃত মালিকানা ও দখল থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ ভুয়া বা জাল দলিলের ওপর ভিত্তি করে নামজারি করায়, তবে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

উক্ত আইনের ধারা ৪ ও ৫ অনুযায়ী, অন্যের জমি জালিয়াতি করে নামজারি করা কিংবা অসত্য তথ্য দিয়ে ই-নামজারি করার অপরাধে দোষী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তাই জমি খারিজের আবেদন করার সময় বায়া দলিল ও খতিয়ানের ধারাবাহিকতা শতভাগ নির্ভুল থাকা জরুরি।

ই-নামজারি আবেদন করার সময় কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকলে এসি ল্যান্ড অফিস থেকে আবেদন সরাসরি না-মঞ্জুর (Rejected) হতে পারে। তাই আবেদন জমা দেওয়ার পূর্বেই নিচের ফাইলগুলো প্রস্তুত রাখুন:

📋 ই-নামজারি স্ক্যান কপি চেকলিস্ট (PDF/JPEG Format):

  1. ক্রয়কৃত মূল সাব-কবলা দলিল: সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে প্রাপ্ত আসল দলিলের কপি বা সার্টিফাইড নকল।
  2. ক্রমিক বায়া দলিল (Via Deeds): বর্তমান বিক্রেতা যার কাছ থেকে জমি কিনেছিলেন, তার বিগত ২৫-৩০ বছরের ধারাবাহিকভাবে অর্জিত দলিলের কপি।
  3. সর্বশেষ জরিপ খতিয়ান: সর্বশেষ আরএস (RS), বিএস (BS) বা বিআরএস (BRS) খতিয়ানের সত্যায়িত কপি।
  4. হাল সন পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) রসিদ: জমির সর্বশেষ পরিশোধিত খাজনার দাখিলা।
  5. ওয়ারিশ সনদ (Succession Certificate): মৃত ব্যক্তি থেকে ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত জমির ক্ষেত্রে ইউপি চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র বা সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর প্রদত্ত আসল ওয়ারিশ সনদ।
  6. রেজিস্ট্রি বাটোয়ারা দলিল (Partition Deed): যৌথ ওয়ারিশি জমির ক্ষেত্রে ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পাদিত রেজিস্ট্রি বন্টননামা দলিল।
  7. আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
  8. দখল প্রমাণের কাগজপত্র: জমিতে আপনার ভৌত দখলের প্রমাণপত্র (যেমন: নামজারি ডিপি খতিয়ান বা বাড়ি/ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিলের কপি)।

অনলাইনে সফলভাবে আবেদন সম্পন্ন করতে নিচের ধাপসমূহ অনুসরণ করুন:

ধাপ ১: ওয়েবসাইটে প্রবেশ ও একাউন্ট রেজিস্টার: প্রথমে mutation.land.gov.bd সাইটে প্রবেশ করুন। আপনার মোবাইল নম্বর ও এনআইডি দিয়ে ওটিপি (OTP) ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে প্রোফাইল সেশন চালু করুন।

ধাপ ২: আবেদনকারীর বিবরণ ও জমির ধরণ নির্বাচন: জমিটি আপনি ক্রয়সূত্রে, হেবা সূত্রে, উত্তরাধিকার সূত্রে নাকি বাটোয়ারা সূত্রে পেয়েছেন তা নির্বাচন করুন। এরপর জমির জেলা, উপজেলা, সার্কেল এসি ল্যান্ড অফিস ও মৌজা নির্বাচন করুন।

ধাপ ৩: খতিয়ান ও দাগ নম্বর এন্ট্রি: সর্বশেষ বিএস বা আরএস জরিপ অনুযায়ী আপনার কাঙ্ক্ষিত জমির খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং আপনার ক্রয়কৃত/প্রাপ্ত জমির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ (শতাংশ বা কাঠা) নিখুঁতভাবে টাইপ করুন।

ধাপ ৪: দলিলের বিস্তারিত ও দাতার তথ্য প্রদান: রেজিস্ট্রি দলিলের নম্বর, দলিলের তারিখ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম এবং বিক্রেতা/দাতার নাম ও ঠিকানা এন্ট্রি দিন।

ধাপ ৫: ফাইল আপলোড ও প্রাথমিক ফি জমা: পূর্বপ্রস্তুতকৃত দলিলের PDF বা ছবির ফাইলসমূহ সাইজে ১০০ কেবির মধ্যে আপলোড করুন। বিকাশ, রকেট বা নগদের মাধ্যমে প্রাথমিক ৭০ টাকা (আবেদন ফি ২০ টাকা + নোটিশ ফি ৫০ টাকা) মোবাইল ব্যাংকিংয়ে জমা দিন। পেমেন্ট সফল হলে স্ক্রিনে একটি আবেদন নম্বর (Application ID) দেখাবে যা প্রিন্ট বা সেভ করে রাখুন।

ই-নামজারির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফিক্সড ফি ব্যতিরেকে কোনো বাড়তি টাকা দেওয়ার বিধান নেই। সম্পূর্ণ অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে পরিশোধযোগ্য ফি-এর ব্রেকডাউন নিচে দেওয়া হলো:

ফি-এর বিবরণ সরকারি হারের ব্যাখ্যা পরিমাণ
আবেদন ফি (Court Fee)প্রাথমিক অনলাইনে জমা দিতে হয়২০ টাকা
নোটিশ জারি ফি (Notice Issue)পক্ষগণকে নোটিশ পাঠানোর ডাক মাশুল৫০ টাকা
মিউটেশন খতিয়ান প্রস্তুত ফিনামজারি অনুমোদনের পর ডি-সি-আর (DCR) পেমেন্ট১,০০০ টাকা
খতিয়ান পর্চা ফি (Khatian Supply)ডিজিটাল কিউআর কোডসহ খতিয়ান কপি১০০ টাকা
সর্বমোট সরকারি অনুমোদিত ফি১,১৭০ টাকা

অনলাইন আবেদনের পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) দপ্তর থেকে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার)-এর কাছে প্রতিবেদন (Report) চাওয়া হয়। তহশিলদার সরজমিনে গিয়ে জমির দখল ও কাগজপত্র যাচাই করে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

প্রতিবেদন ইতিবাচক হলে এসি ল্যান্ড শুনানির (Hearing) তারিখ ধার্য করেন এবং আপনার ফোনে এসএমএস (SMS) পাঠানো হয়। শুনানির দিন মূল দলিল, বায়া দলিল, আরএস/বিএস খতিয়ান ও ওয়ারিশ সনদের মূল কপি নিয়ে সরাসরি এসি ল্যান্ডের সম্মুখে উপস্থিত হতে হবে। কোনো আপত্তি না থাকলে এসি ল্যান্ড নামজারি মঞ্জুর (Approved) করে আদেশ দেবেন।

যদি কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অথবা ভুল প্রতিবেদনের কারণে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আপনার নামজারি আবেদন না-মঞ্জুর (Rejected) করে দেন, তবে আইন অনুযায়ী আপনার কাছে প্রতিকারের পথ রয়েছে:

  • নামজারি আপিল মামলা (Mutation Appeal): স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেনেন্সি অ্যাক্ট (SAT Act 1950) এর ১৪৮ ধারা অনুযায়ী এসি ল্যান্ডের না-মঞ্জুর আদেশের বিরুদ্ধে আদেশের কপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বা ADC Revenue আদালতে নামজারি আপিল দরখাস্ত ফাইল করতে হবে।
  • ভূমি আপিল ট্রাইব্যুনাল: এডিসি রাজস্বের আদেশেও সন্তুষ্ট না হলে জেলা প্রশাসক (DC) বা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল ও রিভিউ করার সুযোগ রয়েছে।

আপনার অজান্তে বা আপনাকে ফাঁকি দিয়ে যদি অন্য কেউ জাল দলিল বা ভুয়া তথ্য দিয়ে আপনার জমির ওপর নামজারি করিয়ে নেয়, তবে চিন্তার কিছু নেই। উপযুক্ত প্রমাণাদিসহ সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে ওই ভুয়া নামজারি রদ ও বাতিলের জন্য নামজারি মিস কেস (Mutation Miss Case) দায়ের করুন। শুনানি শেষে এসি ল্যান্ড ভুয়া নামজারি বাতিল করে পূর্বের রেকর্ড পুনর্বহাল করেন।

পৈতৃক জমি মৃত পিতা বা মাতার নাম থেকে নিজেদের নামে নামজারি করতে হলে সকল বৈধ ওয়ারিশদের সমন্বিত ওয়ারিশি কায়মি খতিয়ান করতে হয়। ওয়ারিশদের মধ্যে যদি সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে মতভেদ না থাকে, তবে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি রেজিস্ট্রি বাটোয়ারা দলিল (Partition Deed) করে এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারি আবেদন করলে প্রতিটি ওয়ারিশের নামে পৃথক পৃথক খতিয়ান ইস্যু করা হয়।

⚖️ জমি খারিজ, নামজারি আপিল ও মিস কেসে সুপ্রিম কোর্টের আইনি সহায়তা

ই-নামজারি জটিলতা, এসি ল্যান্ড অফিসে শুনানি পরিচালনা, অন্যায্য না-মঞ্জুরের বিরুদ্ধে এডিসি রাজস্বে আপিল কিংবা ভুয়া নামজারি রদ মামলায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম স্যারের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করুন।

📞 সরাসরি কল দিন: 01712655546 💬 WhatsApp সরাসরি মেসেজ 📍 উত্তরা ও সুপ্রিম কোর্ট চেম্বার