জমির নামজারি বা খারিজ বাতিল হলে মিস কেস ও এডিসি রেভিনিউ আদালতে আপিল করার নিয়ম ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-11-02 · ১৩ মিনিট পড়ার সময়

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে জমি বা ফ্ল্যাট কেনার পর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রি হলেও মূল মালিকানা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ হয় না, যতক্ষণ না সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিস থেকে **নামজারি (Mutation/খারিজ)** সম্পন্ন করে নতুন খতিয়ান তৈরি করা হয়। কিন্তু বর্তমানে অনলাইন ই-নামজারি (e-Namjari) সিস্টেমে আবেদন করার পর হাজার হাজার সাধারণ নাগরিক ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা একটি চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন: এসি ল্যান্ড অফিস কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই কিংবা দূরবর্তী স্বার্থান্বেষী মহলের ভুয়া আপত্তির ওপর ভিত্তি করে আবেদনটি 'বাতিল' বা 'খারিজ' করে দেয়। অনেক সময় লেখা থাকে 'মালিকানা নিয়ে বিরোধ আছে, দেওয়ানি আদালতে যান' অথবা 'বায়া দলিলের ধারাবাহিকতা নেই'। তবে জেনে রাখা ভালো—এসি ল্যান্ড নামজারি বাতিল করলেই সব শেষ হয়ে যায় না। **স্টেট একুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট ১৯৫০ (SAT Act)** এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়েল অনুযায়ী এসি ল্যান্ডের কাছে **রিভিউ মিস কেস (Review Miss Case)** দায়ের এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে **এডিসি রেভিনিউ (ADC Revenue)** আদালতে আপিল করার সুস্পষ্ট আইনি প্রতিকার রয়েছে। এই গাইডে নামজারি বাতিলের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে আপিল, তামাদি মেয়াদ ও প্রতিকার বিশদভাবে তুলে ধরা হলো।

: · ভূমি ও নামজারি আইনজীবী উত্তরা ঢাকা

এক নজরে মূল তথ্য (Quick Answer Table)

বিষয় / শর্তসরকারি নিয়ম, ফি ও আইন (২০২৬)
অফিসিয়াল অনলাইন পোর্টালmutation.land.gov.bd, land.gov.bd, dlrms.land.gov.bd ও eporcha.gov.bd
মোট সরকারি নামজারি ফি১,১৭০ টাকা (কোর্ট ফি ২০ + নোটিশ ৫০ + রেকর্ড সংশোধন ১,০০০ + খতিয়ান ১০০ টাকা)
নিষ্পত্তির নির্ধারিত সময়সাধারণত ২৮ কার্যদিবস (প্রবাসীদের জন্য দ্রুত নিষ্পত্তির বিশেষ ব্যবস্থা)
ভূমি সেবা হটলাইন১৬১২২ (কল সেন্টার) — ২৪ ঘণ্টা সরকারি ভূমি তথ্য ও অভিযোগ
অনলাইন খতিয়ান ও ডিসিআরঅনলাইন পেমেন্টের পর কিউআর কোডযুক্ত ই-খতিয়ান ও DCR ডাউনলোড
⚡ এক নজরে
📋 সূচিপত্র
  1. ১. এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারি আবেদন বাতিলের মূল কারণসমূহ
  2. ২. রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০: ধারা ১৪৭ থেকে ১৫০
  3. ৩. সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কাছে রিভিউ মিস কেস করার নিয়ম
  4. ৪. অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতে আপিল করার ধাপে ধাপে নিয়ম
  5. ৫. বিভাগীয় কমিশনার ও ভূমি আপিল বোর্ডে রিভিশন আবেদন
  6. ৬. রাজস্ব আদালতসমূহের তুলনামূলক তালিকা: সময়সীমা ও ক্ষমতা
  7. ৭. হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট অব ম্যান্ডামাস: ভূমি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিকার
  8. ৮. বায়া দলিলের ধারাবাহিকতা ও খতিয়ানের ভুল সংশোধনের উপায়
  9. ৯. প্রবাসীদের জন্য দেশে না এসে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে আপিল
  10. ১০. বাস্তব আদালতের কেস স্টাডি: সাভারে প্রবাসীর বাতিল নামজারি উদ্ধার
  11. ১১. সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQs)

১. এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারি আবেদন বাতিলের মূল কারণসমূহ

অনলাইন ভূমি পোর্টালে (mutation.land.gov.bd) আবেদন জমা দেওয়ার পর সাধারণত নিচের কারণগুলোতে এসি ল্যান্ড আবেদন নামঞ্জুর করেন:

  • বায়া দলিলের ধারাবাহিকতার অভাব: সিএস বা এসএ খতিয়ানের মূল রেকর্ডীয় মালিক থেকে বর্তমান বিক্রেতা পর্যন্ত ২৫ বছরের দলিলের চেইন বা খতিয়ান আপলোড না করা।
  • স্বার্থান্বেষী মহলের ভুয়া আপত্তি: স্থানীয় দালাল বা শরিকদাররা কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই একটি সাদা কাগজে 'আপত্তি দরখাস্ত' দিলে তহশিলদার ও এসি ল্যান্ড জটিলতা এড়াতে সরাসরি নামজারি বাতিল করে দেন।
  • জমির পরিমাপে গরমিল: মাঠের দখল অথবা দলিলে উল্লেখিত জমি আরএস বা বিএস রেকর্ডের অংশের সাথে হুবহু না মেলা।
  • অর্পিত বা খাস সম্পত্তির ভুয়া তকমা: ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) যাচাই না করেই ভুলবশত জমিটিকে খাস বা অর্পিত সম্পত্তি বলে মনগড়া তদন্ত রিপোর্ট প্রদান করলে।

২. রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০: ধারা ১৪৭ থেকে ১৫০

ভূমি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আদেশের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে State Acquisition and Tenancy Act 1950 (SAT Act)-এর বিধানগুলো জানা অপরিহার্য:

  • ১৪৭ ধারা (আপিল): রাজস্ব কর্মকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো মূল আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আপিল দায়ের করার সংবিধিবদ্ধ অধিকার পান।
  • ১৪৮ ধারা (আপিলের তামাদি মেয়াদ): কালেক্টর বা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর কাছে আপিল দায়েরের নির্ধারিত মেয়াদ হলো আদেশের তারিখ থেকে ৩০ (ত্রিশ) দিন।
  • ১৪৯ ধারা (রিভিশন): এডিসি রেভিনিউয়ের আদেশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কমিশনার এবং পরবর্তীতে ভূমি আপিল বোর্ডে রিভিশন করার এখতিয়ার প্রদান করে।
  • ১৫০ ধারা (রিভিউ): এসি ল্যান্ডের সামনে কোনো নতুন তথ্য বা দলিল উপস্থাপিত হলে তিনি স্বীয় আদেশ পুনর্বিবেচনা (Review) করতে পারেন।

৩. সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কাছে রিভিউ মিস কেস করার নিয়ম

যদি কোনো পদ্ধতিগত কারণে আবেদন বাতিল হয়ে থাকে—যেমন সার্ভার সমস্যার কারণে নির্দিষ্ট তারিখে শুনানিতে হাজির হতে না পারা, বা কোনো একটি দাখিলা কপি দিতে না পারা—তবে সরাসরি এসি ল্যান্ডের কাছে রিভিউ মিস কেস করাই সবচেয়ে দ্রুত সমাধান:

  • স্টেট একুইজিশন অ্যাক্টের ১৫০ ধারা অনুযায়ী আদেশ প্রদানের ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করতে হবে।
  • মিস কেস দায়ের হলে এসি ল্যান্ড নতুন কেস নম্বর দেন এবং ইউনিয়ন তহশিলদারকে সরেজমিনে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন।
  • উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে শুনানির পর এসি ল্যান্ড পূর্বের বাতিলের আদেশ প্রত্যাহার করে নামজারির খতিয়ান জারির আদেশ প্রদান করতে পারেন।

৪. অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আদালতে আপিল করার ধাপে ধাপে নিয়ম

এসি ল্যান্ড যদি বেআইনিভাবে বা অসৎ উদ্দেশ্যে নামজারি আবেদন বাতিল করেন, তবে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত এডিসি (রাজস্ব) আদালতে আপিল করতে হবে:

  1. সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ: এসি ল্যান্ডের বাতিলের আদেশ এবং তহশিলদারের তদন্ত রিপোর্টের সার্টিফায়েড কপি জেলা রেকর্ড রুম বা এসি ল্যান্ড অফিস থেকে সংগ্রহ করুন।
  2. আপিল মেমোরেন্ডাম তৈরি: একজন দক্ষ সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের আইনজীবীর মাধ্যমে আইনের সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট তুলে ধরে আপিলের আর্জি ড্রাফট করুন।
  3. কোর্ট ফি স্ট্যাম্প যুক্তকরণ: কোর্ট ফিস আইন অনুযায়ী নির্ধারিত নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প সংযুক্ত করুন।
  4. শুনানি ও এলসিআর তলব: এডিসি (রাজস্ব) আপিলটি গ্রহণ করে নিম্ন আদালতের রেকর্ড (Lower Court Records - LCR) তলব করবেন এবং নালিশি জমিতে অন্য কারও নামজারি করার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করবেন।
  5. চূড়ান্ত রায়: শুনানিতে দলিলের বৈধতা প্রমাণিত হলে এডিসি রেভিনিউ এসি ল্যান্ডের বাতিলের আদেশ বাতিল ঘোষণা করে আবেদনকারীর নামে নামজারি মঞ্জুরের নির্দেশ দেন।

৫. বিভাগীয় কমিশনার ও ভূমি আপিল বোর্ডে রিভিশন আবেদন

যদি কোনো কারণে এডিসি (রাজস্ব) আদালত থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার না মেলে, তবে পরবর্তী ধাপগুলো হলো:

  • বিভাগীয় কমিশনারের কাছে রিভিশন: ১৪৯ ধারা অনুযায়ী আদেশের ৬০ (ষাট) দিনের মধ্যে বিভাগীয় কমিশনার (যেমন ঢাকা সেগুনবাগিচাস্থ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়) বরাবর রিভিশন পিটিশন দাখিল করতে হবে।
  • ভূমি আপিল বোর্ড (Bhumi Appeal Board), ঢাকা: ভূমি আপিল বোর্ড আইন ১৯৮৯ অনুযায়ী গঠিত এই বোর্ড ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত। বিভাগীয় কমিশনারের আদেশের বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে ভূমি আপিল বোর্ডে চূড়ান্ত রিভিশন করা যায়, যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।
⚖️ আইনি কেস মূল্যায়ন ও চেম্বার অ্যাপয়েন্টমেন্ট

আপনার জমি বিরোধ, বাটোয়ারা মামলা, জামিন, তালাক বা সাইবার জটিলতায় বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে সুপ্রিম কোর্ট বা উত্তরা চেম্বারে নথিপত্রসহ সরাসরি বসুন।

জরুরি হোয়াটসঅ্যাপ সরাসরি কল: ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬

৬. রাজস্ব আদালতসমূহের তুলনামূলক তালিকা: সময়সীমা ও ক্ষমতা

কোন আদালতে কখন এবং কীভাবে আবেদন করতে হবে তার তুলনামূলক মেট্রিক্স নিচে তুলে ধরা হলো:

আদালতের স্তরআইনি বিধানআবেদনের তামাদি মেয়াদমূল ক্ষমতাপরবর্তী ধাপ
এসি ল্যান্ড (রিভিউ মিস কেস)SAT Act, ধারা ১৫০আদেশের ৩০ দিনের মধ্যেনিজস্ব বাতিল আদেশ পুনর্বিবেচনা ও মঞ্জুরএডিসি রাজস্ব আপিল
এডিসি রাজস্ব (নামজারি আপিল)SAT Act, ধারা ১৪৭-১৪৮আদেশের ৩০ দিনের মধ্যেএসি ল্যান্ডের আদেশ বাতিল ও সরাসরি নামজারির নির্দেশবিভাগীয় কমিশনার রিভিশন
বিভাগীয় কমিশনার (রিভিশন)SAT Act, ধারা ১৪৯আদেশের ৬০ দিনের মধ্যেআইনগত ও এখতিয়ারগত ভুল সংশোধনভূমি আপিল বোর্ড, ঢাকা
ভূমি আপিল বোর্ড (চূড়ান্ত রিভিশন)ভূমি আপিল বোর্ড আইন ১৯৮৯আদেশের ৯০ দিনের মধ্যেরাজস্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত রায়হাইকোর্ট রিট পিটিশন

৭. হাইকোর্ট ডিভিশনে রিট অব ম্যান্ডামাস: ভূমি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিকার

যদি আপনার কাছে রেজিস্ট্রিকৃত বৈধ দলিল, পূর্ববর্তী রেকর্ড ও দেওয়ানি আদালতের চূড়ান্ত রায় থাকে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা ঘুষ বা হয়রানির উদ্দেশ্যে বছরের পর বছর নামজারি ঝুলিয়ে রাখে বা বাতিল করে, তবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ of Mandamus) করা যায়।

হাইকোর্ট বিভাগ শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট এসি ল্যান্ড ও এডিসি রেভিনিউকে ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নামজারি খতিয়ান সম্পন্ন করার সরাসরি নির্দেশ দেন। আদালতের এই নির্দেশ অমান্য করলে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার (Contempt of Court) ফৌজদারি শাস্তি হতে পারে।

৮. বায়া দলিলের ধারাবাহিকতা ও খতিয়ানের ভুল সংশোধনের উপায়

আপিল মামলায় জয়লাভ করতে হলে নথিপত্রের ত্রুটিগুলো সমাধান করতে হবে:

  • হারিয়ে যাওয়া বায়া দলিলের সার্টিফায়েড কপি: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ভলিউম বা রেকর্ড বুক থেকে তল্লাশি দিয়ে পুরোনো দলিলের নকল তুলুন।
  • রেকর্ড রুম থেকে খতিয়ান তোলা: জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ড রুম থেকে সিএস, এসএ, আরএস ও সিটি জরিপের জলছাপযুক্ত সার্টিফায়েড পর্চা সংগ্রহ করুন।
  • ওয়ারিশান সনদ ও এফিডেভিট: পৈতৃক সম্পত্তির ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর বা ইউপি চেয়ারম্যানের দেওয়া ওয়ারিশান সনদের সাথে নোটারি করা পারিবারিক বংশবৃত্তান্ত হলফনামা যুক্ত করুন।

৯. প্রবাসীদের জন্য দেশে না এসে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে আপিল

প্রবাসী বাংলাদেশিরা দূরে থাকার কারণে অসাধু ব্যক্তিরা সুযোগ নিয়ে তাদের পৈতৃক বা কেনা জমির নামজারি বাতিল করিয়ে নেয়। প্রবাসীদের দেশে আসার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২ অনুযায়ী বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়িত করে দেশে পাঠালে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ডিসি অফিস থেকে ভেরিফিকেশনের পর আইনজীবীর মাধ্যমে সহজেই পরিচালনা করা যায়। আইনজীবী আপনার পক্ষে এসি ল্যান্ড ও এডিসি আদালতে উপস্থিত হয়ে নামজারি পুনরুদ্ধার করবেন।

১০. বাস্তব আদালতের কেস স্টাডি: সাভারে প্রবাসীর বাতিল নামজারি উদ্ধার

সিডনি প্রবাসী এক বাংলাদেশি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ঢাকার সাভারে ১০ শতাংশের একটি আবাসিক প্লট ক্রয় করেন। ২০২৩ সালে তার অনলাইন ই-নামজারি আবেদনটি সাভার এসি ল্যান্ড অফিস থেকে হঠাৎ বাতিল করা হয় এবং কারণ দেখানো হয় 'এসএ রেকর্ডের অমিল নিয়ে স্থানীয় আপত্তি'। তদন্তে দেখা যায় স্থানীয় এক দালাল মোটা অংকের টাকা দাবি করে না পেয়ে ১৯৭৪ সালের একটি ভুয়া দলিলের ফটোকপি দিয়ে এই আপত্তি দিয়েছিল।

প্রবাসী ভদ্রলোক সিডনি থেকে আমাদের চেম্বারে যোগাযোগ করলে আমরা নিচের পদক্ষেপ নিই:

  1. সিডনিস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে স্পেশাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করিয়ে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়ন সম্পন্ন করা হয়।
  2. সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মূল ভলিউম বই পরীক্ষা করে প্রমাণ করা হয় যে দালালের দেখানো ১৯৭৪ সালের দলিলটি সম্পূর্ণ জাল এবং ওই নম্বরের দলিলটি অন্য একটি মৌজার।
  3. স্টেট একুইজিশন অ্যাক্টের ১৪৮ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকার এডিসি (রাজস্ব) আদালতে নামজারি আপিল দায়ের করা হয়।
  4. এডিসি রেভিনিউ আদালত নিম্ন আদালতের নথি তলব করেন এবং নালিশি জমিতে অন্য কারও নামজারি করার ওপর তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
  5. চূড়ান্ত শুনানিতে এডিসি রেভিনিউ এসি ল্যান্ডের বাতিলের আদেশ বাতিল ঘোষণা করেন এবং অবিলম্বে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ক্লায়েন্টের নামে নামজারি খতিয়ান ও দাখিলা ইস্যুর চূড়ান্ত আদেশ দেন।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

ই-নামজারি বাতিল হলে কত দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়?

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর ১৪৮ ধারা অনুযায়ী এসি ল্যান্ডের বাতিলের আদেশের তারিখ থেকে ঠিক ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে এডিসি রেভিনিউ আদালতে আপিল করতে হবে।

একই এসি ল্যান্ডের কাছে কি রিভিউ মিস কেস করা যায়?

হ্যাঁ। আইনের ১৫০ ধারা অনুযায়ী আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে এসি ল্যান্ডের কাছে রিভিউ মিস কেস করা যায়, যদি কোনো নতুন প্রমাণ বা করণিক ভুলের কারণে পূর্বে নামজারি বাতিল হয়ে থাকে।

এডিসি রেভিনিউ আদালতও যদি আপিল খারিজ করে দেয় তবে কী করণীয়?

এডিসি রাজস্ব আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে ৬০ দিনের মধ্যে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রিভিশন দায়ের করা যায় এবং এরপর ঢাকার ভূমি আপিল বোর্ডে চূড়ান্ত রিভিশন করা যায়।

দলিল থাকার পরও ভূমি কর্মকর্তা নামজারি না দিলে কি হাইকোর্টে রিট করা যায়?

হ্যাঁ। সকল কাগজপত্র সঠিক থাকা সত্ত্বেও ভূমি কর্মকর্তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নামজারি আটকে রাখলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে সরাসরি হাইকোর্টে রিট অব ম্যান্ডামাস দায়ের করা যায়।

বায়া দলিলের ঘাটতি থাকলে কীভাবে সমাধান করতে হয়?

সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ভলিউম বা বালাম বই থেকে তল্লাশি দিয়ে বিগত ২৫ বছরের ধারাবাহিক বায়া দলিলের সার্টিফায়েড কপি তুলে আপিল নথির সাথে দাখিল করতে হয়।

প্রবাসী ব্যক্তি কি দেশে না এসে নামজারি আপিল চালাতে পারেন?

হ্যাঁ। বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে স্পেশাল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সত্যায়ন করে দেশে পাঠালে আইনজীবীর মাধ্যমে এডিসি ও এসি ল্যান্ড আদালতে সম্পূর্ণ মামলা পরিচালনা করা সম্ভব।

নামজারি খতিয়ান ছাড়া কি জমি বিক্রি বা ব্যাংকে বন্ধক রাখা যায়?

না। বর্তমানে রেজিস্ট্রেশন আইন এবং ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী নিজের নামের নামজারি খতিয়ান ও হাল সনের খাজনা দাখিলা ছাড়া জমি হস্তান্তর, বিক্রি বা ব্যাংক ঋণ গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

ভূমি আপিল বোর্ডের সিদ্ধান্ত কি চূড়ান্ত?

প্রশাসনিক রাজস্ব কাঠামোর মধ্যে ভূমি আপিল বোর্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এর বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হলে একমাত্র প্রতিকার হলো সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করা।

দায়বর্জন (Disclaimer): এই আর্টিকেলে পরিবেশিত তথ্যসমূহ কেবল আইনি সচেতনতা ও সাধারণ শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো প্রত্যক্ষ আইনি পরামর্শ (Legal Advice) নয় এবং এর মাধ্যমে কোনো আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক (Attorney-Client Relationship) তৈরি হয় না। আপনার সুনির্দিষ্ট মামলার আইনি প্রতিকারের জন্য সরাসরি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের তালিকাভুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।
আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546  |  WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০