জমি নিবন্ধন ফি বাংলাদেশ – স্ট্যাম্প ডিউটি ও সম্পূর্ণ খরচের হিসাব

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-07

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে জমি কেনার সময় শুধু জমির দামই নয়, নিবন্ধনের জন্য বেশ কিছু সরকারি ফি ও কর দিতে হয়। অনেকেই আগে থেকে এই খরচ হিসাব না করে পরে বিপাকে পড়েন। এই বিস্তারিত গাইডে আমরা ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জমি নিবন্ধনের সকল খরচ বিস্তারিত আলোচনা করব।

জমি নিবন্ধন কী এবং কেন জরুরি

জমি নিবন্ধন (Land Registration) হলো সরকারি রেকর্ডে জমির মালিকানা পরিবর্তনের আইনি স্বীকৃতি। এটি নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

জমি নিবন্ধন কেন অপরিহার্য:

  • ✅ আইনি মালিকানা: রেজিস্ট্রি না হলে আইনত মালিকানা দুর্বল।
  • ✅ তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে সুরক্ষা: রেজিস্ট্রি দলিল থাকলে প্রতারকের বিরুদ্ধে আইনগত সুরক্ষা পাওয়া যায়।
  • ✅ ব্যাংক ঋণ: রেজিস্ট্রি দলিল ছাড়া জমি বন্ধক রেখে ঋণ পাওয়া কঠিন।
  • ✅ নামজারি: নিবন্ধনের পরেই নামজারি আবেদন করা যায়।

বাংলাদেশে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে জমি নিবন্ধন করতে হয়। ২০২৬ সালে দেশজুড়ে ৪৮৫টির বেশি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে।

অনলাইনে নিবন্ধনের সুবিধা: এখন land.gov.bd পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে নিবন্ধনের আবেদন করা যায়, তবে চূড়ান্ত নিবন্ধন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সশরীরে করতে হয়।

জমি নিবন্ধনের প্রধান খরচগুলো

জমি নিবন্ধনে মোট কয়েক ধরনের খরচ হয়। প্রতিটি আলাদা আলাদা সংস্থাকে দিতে হয়:

খরচের ধরনহার (আনুমানিক)কাকে দিতে হয়
স্ট্যাম্প ডিউটিদলিলের মূল্যের ১.৫%সরকার (স্ট্যাম্প বিক্রেতার মাধ্যমে)
নিবন্ধন ফিদলিলের মূল্যের ১%সাব-রেজিস্ট্রার অফিস
স্থানীয় সরকার করদলিলের মূল্যের ৩%সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা/ইউপি
উৎসে কর (AIT)জমির মূল্যের ২% (গ্রাম) / ৩% (শহর)জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)
মূল্য সংযোজন কর (VAT)কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজ্যNBR

মোট সরকারি খরচ: সাধারণত দলিলের মূল্যের ৭-১০% সরকারি ফি ও কর বাবদ খরচ হয়।

গুরুত্বপূর্ণ নোট: এই হারগুলো ২০২৬ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রদত্ত। সরকার যেকোনো সময় এই হার পরিবর্তন করতে পারে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা land.gov.bd দেখুন।

স্ট্যাম্প ডিউটি: হার ও হিসাব

স্ট্যাম্প ডিউটি (Stamp Duty) হলো জমির দলিলে আঁটা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মূল্য যা সরকারকে কর হিসেবে দেওয়া হয়। এটি স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯ অনুযায়ী নির্ধারিত।

স্ট্যাম্প ডিউটির হার (২০২৬)

দলিলের ধরনস্ট্যাম্প ডিউটির হার
সাফ-কবলা দলিল (বিক্রয়)দলিলের মূল্যের ১.৫%
হেবা দলিল (উপহার)নির্দিষ্ট হার (কম)
বন্টন দলিলনির্দিষ্ট হার
বন্ধকী দলিলদলিলের মূল্যের উপর নির্ভরশীল

স্ট্যাম্প ডিউটি কীভাবে পরিশোধ করবেন?

  • নিবন্ধিত স্ট্যাম্প বিক্রেতার কাছ থেকে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প কিনুন
  • অথবা অনলাইনে e-stamp সিস্টেমের মাধ্যমে পরিশোধ করুন (যেখানে উপলব্ধ)
  • ব্যাংকের মাধ্যমে ট্রেজারি চালানে পরিশোধ করা যায়

দলিলের মূল্য নির্ধারণ

স্ট্যাম্প ডিউটি হিসাব করতে দলিলের মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। দলিলের মূল্য হিসাব করতে সরকার নির্ধারিত 'মৌজা রেট' ব্যবহার করা হয়। বাজারমূল্য যদি মৌজা রেটের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে উচ্চতর মূল্যে স্ট্যাম্প ডিউটি দিতে হবে।

নিবন্ধন ফি (Registration Fee)

নিবন্ধন ফি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সরাসরি জমা দিতে হয়। এটি নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ এর ৭৮ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত।

নিবন্ধন ফির হার (২০২৬)

দলিলের মূল্যনিবন্ধন ফি
১ লক্ষ পর্যন্তদলিল মূল্যের ১%
১ লক্ষের উপরেদলিল মূল্যের ১%

নিবন্ধন ফি ছাড়াও দিতে হয়

  • সার্টিফাইড কপি ফি: দলিলের সার্টিফাইড কপির জন্য আলাদা ফি
  • নকল ফি: দলিল নকলের জন্য প্রতি পাতা নির্দিষ্ট ফি
  • E-fee: কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সরকারি ফি

কীভাবে জমা দেবেন

নিবন্ধন ফি সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নগদ বা অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। রসিদ অবশ্যই সংরক্ষণ করুন।

স্থানীয় সরকার কর (Local Government Tax)

স্থানীয় সরকার কর (Local Government Tax) হলো জমি লেনদেনে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ) কর্তৃক আরোপিত কর।

স্থানীয় সরকার করের হার

এলাকার ধরনকরের হারকাকে দিতে হয়
সিটি কর্পোরেশন এলাকাদলিল মূল্যের ৩%সিটি কর্পোরেশন
পৌরসভা এলাকাদলিল মূল্যের ৩%পৌরসভা
ইউনিয়ন পরিষদ এলাকাদলিল মূল্যের ৩%ইউনিয়ন পরিষদ

এই কর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনের আগেই পরিশোধ করতে হয় এবং রসিদ জমা দিতে হয়।

ঢাকা শহরে অতিরিক্ত কর

ঢাকা শহরের কিছু এলাকায় অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হতে পারে। নির্দিষ্ট এলাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন বা ভূমি অফিসে জানুন।

উৎসে কর (Tax at Source/AIT)

উৎসে কর (Advance Income Tax / AIT) হলো জমি বিক্রির সময় আয়কর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আরোপিত কর যা দলিল নিবন্ধনের আগেই পরিশোধ করতে হয়।

উৎসে করের হার (২০২৬)

এলাকাকরের হারবিক্রেতার TIN থাকলে
গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী সিটি, ঢাকা বিভাগ৪%৪%
অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকা৩%৩%
জেলা সদর পৌরসভা২%২%
অন্যান্য পৌরসভা ও গ্রাম এলাকা১%১%

উৎসে কর কে দেয়? সাধারণত ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী কেউ একজন বা উভয়েই দিতে পারেন। তবে আইনত এটি বিক্রেতার কর।

উৎসে কর কোথায় দিতে হয়?

সংশ্লিষ্ট আয়কর সার্কেলে বা ব্যাংকে চালানের মাধ্যমে উৎসে কর পরিশোধ করুন। কর পরিশোধের চালানের কপি দলিল নিবন্ধনের সময় জমা দিতে হবে।

মোট খরচের উদাহরণসহ হিসাব

বাস্তব উদাহরণ দিয়ে জমি নিবন্ধনের মোট খরচ বোঝা সহজ হবে:

উদাহরণ ১: ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৫০ লক্ষ টাকার জমি

খরচের ধরনহারপরিমাণ
স্ট্যাম্প ডিউটি১.৫%৭৫,০০০ টাকা
নিবন্ধন ফি১%৫০,০০০ টাকা
স্থানীয় সরকার কর৩%১,৫০,০০০ টাকা
উৎসে কর (AIT)৪%২,০০,০০০ টাকা
মোট সরকারি খরচ৯.৫%৪,৭৫,০০০ টাকা

উদাহরণ ২: গ্রামীণ এলাকায় ১০ লক্ষ টাকার জমি

খরচের ধরনহারপরিমাণ
স্ট্যাম্প ডিউটি১.৫%১৫,০০০ টাকা
নিবন্ধন ফি১%১০,০০০ টাকা
স্থানীয় সরকার কর৩%৩০,০০০ টাকা
উৎসে কর (AIT)১%১০,০০০ টাকা
মোট সরকারি খরচ৬.৫%৬৫,০০০ টাকা

অতিরিক্ত খরচ: এর বাইরে উকিলের ফি, দলিল লেখক (deed writer) এর ফি এবং অন্যান্য খরচ যোগ হবে।

অতিরিক্ত ও বিবিধ খরচ

সরকারি ফি ছাড়াও জমি নিবন্ধনে আরও কিছু খরচ হতে পারে:

খরচের ধরনআনুমানিক পরিমাণবিবরণ
দলিল লেখক ফি৫০০ - ৫,০০০ টাকাদলিল টাইপ/লেখার জন্য
উকিলের ফি৫,০০০ - ৫০,০০০ টাকাজটিলতা অনুযায়ী
জমি পরিমাপ/সার্ভে৩,০০০ - ১৫,০০০ টাকানিজস্ব সার্ভেয়ার দিয়ে
যাতায়াত ও অন্যান্য১,০০০ - ৫,০০০ টাকাবিভিন্ন অফিসে যাওয়া আসা
নামজারি আবেদন ফি১,০০০ - ৩,০০০ টাকানিবন্ধনের পর নামজারি

খরচ কমানোর উপায়

  • সঠিক মূল্য দেখান: কম মূল্যে দলিল করলে ভবিষ্যতে আইনি ঝুঁকি থাকে, তবে বাজারমূল্যে করলে কর বেশি।
  • মৌজা রেট জেনে নিন: সরকার নির্ধারিত মৌজা রেট জানলে সঠিক ফি হিসাব করতে পারবেন।
  • হেবা দলিলে কম ফি: উপহার হিসেবে হস্তান্তরে স্ট্যাম্প ডিউটি কম হতে পারে।
  • আইনজীবীর পরামর্শ: একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী সঠিক খরচ হিসাব করে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ব্যয় এড়াতে সাহায্য করতে পারেন।

জমির খতিয়ান ও দলিল যাচাই করার পদ্ধতি জানতে এখানে ক্লিক করুন।

প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: জমি নিবন্ধনের খরচ কি ক্রেতা না বিক্রেতা দেবে?

উত্তর: আইনত উৎসে কর বিক্রেতার দায়, কিন্তু বাস্তবে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী যেকেউ দিতে পারেন। সাধারণত বাংলাদেশে ক্রেতাই বেশিরভাগ খরচ বহন করেন।

প্রশ্ন ২: কম মূল্য দেখিয়ে দলিল করলে কী হবে?

উত্তর: কম মূল্য দেখানো অবৈধ। ধরা পড়লে জরিমানা এবং মামলার মুখোমুখি হতে পারেন। এছাড়া ভবিষ্যতে জমি বিক্রির সময় ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স বাড়তে পারে।

প্রশ্ন ৩: অনলাইনে কি সব ফি দেওয়া যায়?

উত্তর: আংশিকভাবে হ্যাঁ। কিছু কর অনলাইনে পরিশোধ করা যায়, তবে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সশরীরে যেতেই হয়।

প্রশ্ন ৪: নিবন্ধন ফি কি রিফান্ড হয়?

উত্তর: সাধারণত না। তবে অতিরিক্ত পরিশোধ হলে সংশ্লিষ্ট অফিসে আবেদন করে ফেরত পাওয়া সম্ভব।

প্রশ্ন ৫: মৌজা রেট কোথায় পাবো?

উত্তর: সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা জেলা রেজিস্ট্রার অফিস থেকে মৌজা রেটের তালিকা পাওয়া যায়।

কীভাবে আমরা সাহায্য করতে পারি

জমি নিবন্ধন একটি জটিল প্রক্রিয়া যেখানে সামান্য ভুলে বড় আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। আমাদের অভিজ্ঞ ভূমি আইন বিশেষজ্ঞরা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় আপনাকে গাইড করবেন।

আমাদের জমি নিবন্ধন সেবা

  • ✅ দলিল তৈরি ও নিবন্ধনে আইনি সহায়তা
  • ✅ সঠিক ফি ও কর হিসাব করে দেওয়া
  • ✅ জমির মালিকানা যাচাই (Due Diligence)
  • ✅ সব সরকারি অফিসে যোগাযোগ ও ফলো-আপ
  • ✅ নিবন্ধন পরবর্তী নামজারি প্রক্রিয়া
  • ✅ প্রতারণামূলক দলিল থেকে সুরক্ষা

আমাদের চেম্বার উত্তরা, ঢাকাতে অবস্থিত। প্রথম পরামর্শ বিনামূল্যে।

বিনামূল্যে পরামর্শের জন্য এখনই যোগাযোগ করুন →

📍 ঠিকানা: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম, উত্তরা, ঢাকা, বাংলাদেশ
🌐 ওয়েবসাইট: advmdshahalam.me
🕐 অফিস সময়: শনি-বৃহস্পতিবার, সকাল ১০টা - বিকাল ৫টা