লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-07
বাংলাদেশে জমি কেনার সময় শুধু জমির দামই নয়, নিবন্ধনের জন্য বেশ কিছু সরকারি ফি ও কর দিতে হয়। অনেকেই আগে থেকে এই খরচ হিসাব না করে পরে বিপাকে পড়েন। এই বিস্তারিত গাইডে আমরা ২০২৬ সালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী জমি নিবন্ধনের সকল খরচ বিস্তারিত আলোচনা করব।
জমি নিবন্ধন (Land Registration) হলো সরকারি রেকর্ডে জমির মালিকানা পরিবর্তনের আইনি স্বীকৃতি। এটি নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
জমি নিবন্ধন কেন অপরিহার্য:
বাংলাদেশে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে জমি নিবন্ধন করতে হয়। ২০২৬ সালে দেশজুড়ে ৪৮৫টির বেশি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে।
অনলাইনে নিবন্ধনের সুবিধা: এখন land.gov.bd পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে নিবন্ধনের আবেদন করা যায়, তবে চূড়ান্ত নিবন্ধন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সশরীরে করতে হয়।
জমি নিবন্ধনে মোট কয়েক ধরনের খরচ হয়। প্রতিটি আলাদা আলাদা সংস্থাকে দিতে হয়:
| খরচের ধরন | হার (আনুমানিক) | কাকে দিতে হয় |
|---|---|---|
| স্ট্যাম্প ডিউটি | দলিলের মূল্যের ১.৫% | সরকার (স্ট্যাম্প বিক্রেতার মাধ্যমে) |
| নিবন্ধন ফি | দলিলের মূল্যের ১% | সাব-রেজিস্ট্রার অফিস |
| স্থানীয় সরকার কর | দলিলের মূল্যের ৩% | সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা/ইউপি |
| উৎসে কর (AIT) | জমির মূল্যের ২% (গ্রাম) / ৩% (শহর) | জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) |
| মূল্য সংযোজন কর (VAT) | কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজ্য | NBR |
মোট সরকারি খরচ: সাধারণত দলিলের মূল্যের ৭-১০% সরকারি ফি ও কর বাবদ খরচ হয়।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: এই হারগুলো ২০২৬ সালের তথ্যের ভিত্তিতে প্রদত্ত। সরকার যেকোনো সময় এই হার পরিবর্তন করতে পারে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা land.gov.bd দেখুন।
স্ট্যাম্প ডিউটি (Stamp Duty) হলো জমির দলিলে আঁটা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মূল্য যা সরকারকে কর হিসেবে দেওয়া হয়। এটি স্ট্যাম্প আইন, ১৮৯৯ অনুযায়ী নির্ধারিত।
| দলিলের ধরন | স্ট্যাম্প ডিউটির হার |
|---|---|
| সাফ-কবলা দলিল (বিক্রয়) | দলিলের মূল্যের ১.৫% |
| হেবা দলিল (উপহার) | নির্দিষ্ট হার (কম) |
| বন্টন দলিল | নির্দিষ্ট হার |
| বন্ধকী দলিল | দলিলের মূল্যের উপর নির্ভরশীল |
স্ট্যাম্প ডিউটি হিসাব করতে দলিলের মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। দলিলের মূল্য হিসাব করতে সরকার নির্ধারিত 'মৌজা রেট' ব্যবহার করা হয়। বাজারমূল্য যদি মৌজা রেটের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে উচ্চতর মূল্যে স্ট্যাম্প ডিউটি দিতে হবে।
নিবন্ধন ফি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সরাসরি জমা দিতে হয়। এটি নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ এর ৭৮ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত।
| দলিলের মূল্য | নিবন্ধন ফি |
|---|---|
| ১ লক্ষ পর্যন্ত | দলিল মূল্যের ১% |
| ১ লক্ষের উপরে | দলিল মূল্যের ১% |
নিবন্ধন ফি সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নগদ বা অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। রসিদ অবশ্যই সংরক্ষণ করুন।
স্থানীয় সরকার কর (Local Government Tax) হলো জমি লেনদেনে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ) কর্তৃক আরোপিত কর।
| এলাকার ধরন | করের হার | কাকে দিতে হয় |
|---|---|---|
| সিটি কর্পোরেশন এলাকা | দলিল মূল্যের ৩% | সিটি কর্পোরেশন |
| পৌরসভা এলাকা | দলিল মূল্যের ৩% | পৌরসভা |
| ইউনিয়ন পরিষদ এলাকা | দলিল মূল্যের ৩% | ইউনিয়ন পরিষদ |
এই কর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধনের আগেই পরিশোধ করতে হয় এবং রসিদ জমা দিতে হয়।
ঢাকা শহরের কিছু এলাকায় অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হতে পারে। নির্দিষ্ট এলাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি কর্পোরেশন বা ভূমি অফিসে জানুন।
উৎসে কর (Advance Income Tax / AIT) হলো জমি বিক্রির সময় আয়কর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আরোপিত কর যা দলিল নিবন্ধনের আগেই পরিশোধ করতে হয়।
| এলাকা | করের হার | বিক্রেতার TIN থাকলে |
|---|---|---|
| গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী সিটি, ঢাকা বিভাগ | ৪% | ৪% |
| অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন এলাকা | ৩% | ৩% |
| জেলা সদর পৌরসভা | ২% | ২% |
| অন্যান্য পৌরসভা ও গ্রাম এলাকা | ১% | ১% |
উৎসে কর কে দেয়? সাধারণত ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী কেউ একজন বা উভয়েই দিতে পারেন। তবে আইনত এটি বিক্রেতার কর।
সংশ্লিষ্ট আয়কর সার্কেলে বা ব্যাংকে চালানের মাধ্যমে উৎসে কর পরিশোধ করুন। কর পরিশোধের চালানের কপি দলিল নিবন্ধনের সময় জমা দিতে হবে।
বাস্তব উদাহরণ দিয়ে জমি নিবন্ধনের মোট খরচ বোঝা সহজ হবে:
| খরচের ধরন | হার | পরিমাণ |
|---|---|---|
| স্ট্যাম্প ডিউটি | ১.৫% | ৭৫,০০০ টাকা |
| নিবন্ধন ফি | ১% | ৫০,০০০ টাকা |
| স্থানীয় সরকার কর | ৩% | ১,৫০,০০০ টাকা |
| উৎসে কর (AIT) | ৪% | ২,০০,০০০ টাকা |
| মোট সরকারি খরচ | ৯.৫% | ৪,৭৫,০০০ টাকা |
| খরচের ধরন | হার | পরিমাণ |
|---|---|---|
| স্ট্যাম্প ডিউটি | ১.৫% | ১৫,০০০ টাকা |
| নিবন্ধন ফি | ১% | ১০,০০০ টাকা |
| স্থানীয় সরকার কর | ৩% | ৩০,০০০ টাকা |
| উৎসে কর (AIT) | ১% | ১০,০০০ টাকা |
| মোট সরকারি খরচ | ৬.৫% | ৬৫,০০০ টাকা |
অতিরিক্ত খরচ: এর বাইরে উকিলের ফি, দলিল লেখক (deed writer) এর ফি এবং অন্যান্য খরচ যোগ হবে।
সরকারি ফি ছাড়াও জমি নিবন্ধনে আরও কিছু খরচ হতে পারে:
| খরচের ধরন | আনুমানিক পরিমাণ | বিবরণ |
|---|---|---|
| দলিল লেখক ফি | ৫০০ - ৫,০০০ টাকা | দলিল টাইপ/লেখার জন্য |
| উকিলের ফি | ৫,০০০ - ৫০,০০০ টাকা | জটিলতা অনুযায়ী |
| জমি পরিমাপ/সার্ভে | ৩,০০০ - ১৫,০০০ টাকা | নিজস্ব সার্ভেয়ার দিয়ে |
| যাতায়াত ও অন্যান্য | ১,০০০ - ৫,০০০ টাকা | বিভিন্ন অফিসে যাওয়া আসা |
| নামজারি আবেদন ফি | ১,০০০ - ৩,০০০ টাকা | নিবন্ধনের পর নামজারি |
জমির খতিয়ান ও দলিল যাচাই করার পদ্ধতি জানতে এখানে ক্লিক করুন।
উত্তর: আইনত উৎসে কর বিক্রেতার দায়, কিন্তু বাস্তবে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী যেকেউ দিতে পারেন। সাধারণত বাংলাদেশে ক্রেতাই বেশিরভাগ খরচ বহন করেন।
উত্তর: কম মূল্য দেখানো অবৈধ। ধরা পড়লে জরিমানা এবং মামলার মুখোমুখি হতে পারেন। এছাড়া ভবিষ্যতে জমি বিক্রির সময় ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স বাড়তে পারে।
উত্তর: আংশিকভাবে হ্যাঁ। কিছু কর অনলাইনে পরিশোধ করা যায়, তবে সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে সশরীরে যেতেই হয়।
উত্তর: সাধারণত না। তবে অতিরিক্ত পরিশোধ হলে সংশ্লিষ্ট অফিসে আবেদন করে ফেরত পাওয়া সম্ভব।
উত্তর: সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা জেলা রেজিস্ট্রার অফিস থেকে মৌজা রেটের তালিকা পাওয়া যায়।
জমি নিবন্ধন একটি জটিল প্রক্রিয়া যেখানে সামান্য ভুলে বড় আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। আমাদের অভিজ্ঞ ভূমি আইন বিশেষজ্ঞরা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় আপনাকে গাইড করবেন।
আমাদের চেম্বার উত্তরা, ঢাকাতে অবস্থিত। প্রথম পরামর্শ বিনামূল্যে।
বিনামূল্যে পরামর্শের জন্য এখনই যোগাযোগ করুন →
📍 ঠিকানা: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম, উত্তরা, ঢাকা, বাংলাদেশ
🌐 ওয়েবসাইট: advmdshahalam.me
🕐 অফিস সময়: শনি-বৃহস্পতিবার, সকাল ১০টা - বিকাল ৫টা