খতিয়ানে নাম বা দাগ নম্বর ভুল? এসি ল্যান্ডে মিস কেস বনাম দেওয়ানী আদালতে স্বত্ব ঘোষণার মামলা

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-15

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

জমি নিজের দখলে আছে, রেজিস্ট্রি দলিলও শতভাগ নিখুঁত, কিন্তু জরিপের সময় মাঠপর্যায়ের ভুলের কারণে বিএস বা আরএস খতিয়ানে নিজের নামের বদলে প্রতিবেশীর নাম উঠে গেছে—এমন সমস্যায় প্রতিনিয়ত হাজারো মানুষ বিপাকে পড়েন। অনেকেই জানেন না এই ভুল কি সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঠিক করতে পারেন, নাকি দেওয়ানী আদালতে মামলা করতে হয়। বাস্তব আইনি জটিলতার সমাধান তুলে ধরেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্র্যাকটিসিং আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।

খতিয়ানে ভুল কীভাবে হয়: লিপিকর প্রমাদ বনাম স্বত্ব সংক্রান্ত বিরোধ

জরিপ চলাকালীন ভূমি রেকর্ডে দুই ধরনের ভুল সংঘটিত হয়: এক. কেরানি বা মুদ্রণজনিত ভুল (Clerical/Typographical Error), যেমন পিতার নামে একটি বর্ণ ভুল হওয়া বা জমার অংক উল্টাপাল্টা হওয়া। দুই. মৌলিক স্বত্ব বা মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ (Title Dispute), যেখানে প্রকৃত মালিকের বদলে প্রতারণামূলকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ব্যক্তির নামে খতিয়ান প্রস্তুত হয়ে গেছে।

সহকারী কমিশনার (ভূমি)-র এখতিয়ার: ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের ১৪৩ ধারা

১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন (State Acquisition and Tenancy Act)-এর ১৪৩ ও ১৪৪ ধারা অনুযায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড রেকর্ড অব রাইটস (Record of Rights/ROR) রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশোধনের সীমিত প্রশাসনিক ক্ষমতা ভোগ করেন। তবে তিনি আদালতের মতো বিতর্কিত মালিকানা বিচার করার এখতিয়ার রাখেন না।

এসি ল্যান্ড কোন কোন ভুল মিস কেসের মাধ্যমে সংশোধন করতে পারেন?

নিম্নলিখিত ক্ষেত্রগুলোতে এসি ল্যান্ড বরাবর মিস কেস (Miscellaneous Case) করে সহজ সমাধান পাওয়া যায়:

  • নামের বানান বা পিতার নামে সামান্য কেরানিমূল ভুল থাকলে।
  • দলিল ও পূর্ববর্তী খতিয়ানের সাথে দাগ নম্বরের লেখার ভুল স্পষ্ট থাকলে।
  • অংশ বণ্টনের অঙ্কে (যোগ-বিয়োগে) সাধারণ হিসাবের গড়মিল হলে।
  • আপসকেন্দ্রিক সহ-শরিকদের মধ্যে লিখিত সম্মতি থাকলে।

যখন এসি ল্যান্ডের হাত বাঁধা: স্বত্ব সংক্রান্ত বিরোধ ও দেওয়ানী আদালতের একচ্ছত্র ক্ষমতা

যদি ভুল খতিয়ানের ওপর ভিত্তি করে অপর পক্ষ নিজেকে বৈধ মালিক দাবি করে খাজনা দাখিলা দিয়ে থাকে এবং আপস করতে অস্বীকার করে, তবে এসি ল্যান্ড মিস কেস খারিজ করে দিতে বাধ্য। কারণ প্রশাসনিক কোনো কর্মকর্তা মালিকানা বা টাইটেল নিষ্পত্তি করতে পারেন না; এজন্য দেওয়ানী আদালতই একমাত্র উপযুক্ত ফোরাম।

ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল (LST) ও ২০২৩ সালের সাম্প্রতিক সংশোধনী

চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত বিএস বা সিটি জরিপের খতিয়ান চ্যালেঞ্জের জন্য সরকার ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল ও আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। ২০২৩ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধনী অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম জেলা জজ ও সহকারী জজ আদালতের সমমর্যাদায় পরিচালিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সাধারণ দেওয়ানী মামলার মতোই কার্যকারিতা বহন করে।

দেওয়ানী আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারায় স্বত্ব ঘোষণার মোকাদ্দমা

ভুল খতিয়ান বাতিল ও নিজের বৈধ মালিকানা সাব্যস্ত করতে ১৮৭৭ সালের সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা (Section 42, Specific Relief Act) অনুযায়ী সহকারী জজ বা যুগ্ম জেলা জজ আদালতে 'স্বত্ব ঘোষণা ও ভুল খতিয়ান বাতিল'-এর মামলা দায়ের করতে হয়। আদালত সিএস, এসএ, আরএস খতিয়ানের ধারাবাহিকতা ও দলিলের সত্যতা বিচার করে আপনার পক্ষে চূড়ান্ত রায় ও ডিক্রি প্রদান করবেন।

খতিয়ান সংশোধনের সঠিক আইনি পদক্ষেপের চেকলিস্ট

  1. সিএস থেকে সর্বশেষ জরিপ পর্যন্ত সকল খতিয়ানের সার্টিফায়েড নকল ও পিঠ দলিল সংগ্রহ করুন।
  2. ভুলটি কেরানিমূল নাকি মালিকানা সংক্রান্ত—তা অভিজ্ঞ দেওয়ানী আইনজীবীকে দিয়ে যাচাই করান।
  3. কেরানিমূল হলে প্রয়োজনীয় কোর্ট ফি দিয়ে এসি ল্যান্ড অফিসে মিস কেসের আবেদন জমা দিন।
  4. মালিকানা বিরোধ থাকলে সময় নষ্ট না করে উপযুক্ত দেওয়ানী আদালতে টাইটেল স্যুট দায়ের করুন।