খতিয়ান চেক অনলাইন বাংলাদেশ – RS, CS, BS খতিয়ান অনুসন্ধানের সম্পূর্ণ গাইড

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-07

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

জমির খতিয়ান হলো মালিকানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দলিল। এখন আর সরকারি অফিসে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হবে না — ঘরে বসেই eporcha.gov.bd তে RS, CS, BS সহ সব ধরনের খতিয়ান অনলাইনে চেক করুন। এই বিস্তারিত গাইডে আমরা খতিয়ানের প্রকারভেদ, অনুসন্ধানের পদ্ধতি এবং সার্টিফাইড কপি পাওয়ার উপায় আলোচনা করব।

খতিয়ান কী এবং কেন দরকার

খতিয়ান (Khatian) হলো ভূমি জরিপের সময় সরকার কর্তৃক প্রস্তুত করা একটি সরকারি নথি যা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জমির বিবরণ ধারণ করে। প্রতিটি খতিয়ানে থাকে:

  • মালিকের নাম ও ঠিকানা
  • দাগ নম্বর: জমির নির্দিষ্ট পরিচিতি সংখ্যা
  • জমির পরিমাণ: শতাংশ বা একর হিসেবে
  • জমির শ্রেণি: আবাদি, অনাবাদি, বাস্তু ইত্যাদি
  • মৌজার নাম ও নম্বর

খতিয়ান কেন প্রয়োজন?

  • ✅ জমি কেনা-বেচার সময় মালিকানা যাচাই
  • ✅ ব্যাংক ঋণের জন্য জামানত হিসেবে
  • ✅ আদালতে মামলায় প্রমাণ হিসেবে
  • ✅ নামজারি আবেদনের ভিত্তি হিসেবে
  • ✅ জমির সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তিতে
  • ✅ উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি প্রমাণে

বাংলাদেশে খতিয়ান সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং জেলা রেকর্ড রুম। বর্তমানে eporcha.gov.bd পোর্টালের মাধ্যমে ডিজিটালভাবে খতিয়ান অনুসন্ধান করা যায়।

বাংলাদেশের খতিয়ানের প্রকারভেদ (CS, RS, BS, SA)

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত ভূমি জরিপের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের খতিয়ান রয়েছে। প্রতিটির বৈশিষ্ট্য জানুন:

খতিয়ানের ধরনপূর্ণ নামজরিপকালগুরুত্ব
CS খতিয়ানCadastral Survey১৮৮৮-১৯৪০সবচেয়ে পুরনো, মূল রেকর্ড
SA খতিয়ানState Acquisition১৯৫৬-১৯৬২জমিদারি প্রথা বাতিলের পর
RS খতিয়ানRevisional Survey১৯৬৫-১৯৯৭সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত
BS খতিয়ানBangladesh Survey১৯৯০-বর্তমানসাম্প্রতিক ও হালনাগাদ রেকর্ড
মহানগর খতিয়ানCity Khatianশহর এলাকায়ঢাকা, চট্টগ্রাম ইত্যাদি শহরে

কোন খতিয়ান কোন কাজে?

  • RS খতিয়ান: বেশিরভাগ জমি লেনদেনে RS খতিয়ান ব্যবহার হয়। দলিল লেখার সময় RS দাগ নম্বর উল্লেখ করতে হয়।
  • BS খতিয়ান: সর্বশেষ জরিপের ভিত্তিতে তৈরি, বর্তমানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।
  • CS খতিয়ান: ঐতিহাসিক মালিকানা প্রমাণে, বিশেষত পুরনো বিরোধের ক্ষেত্রে।

সতর্কতা: বিভিন্ন খতিয়ানে দাগ নম্বর আলাদা হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট খতিয়ান নম্বর ও দাগ নম্বর সঠিকভাবে মিলিয়ে দেখুন।

eporcha.gov.bd তে খতিয়ান চেক করার পদ্ধতি

eporcha.gov.bd বাংলাদেশের সরকারি ভূমি রেকর্ড পোর্টাল যেখানে খতিয়ান অনুসন্ধান করা যায়।

সাধারণ পদ্ধতি (ধাপে ধাপে)

  1. পোর্টালে প্রবেশ: ব্রাউজার খুলুন এবং eporcha.gov.bd লিখুন।
  2. খতিয়ান অনুসন্ধান নির্বাচন: হোম পেজে 'খতিয়ান অনুসন্ধান' বা 'Khatian Search' অপশনে ক্লিক করুন।
  3. জরিপের ধরন নির্বাচন: CS, SA, RS, BS বা নামজারি খতিয়ান নির্বাচন করুন।
  4. বিভাগ ও জেলা নির্বাচন করুন।
  5. উপজেলা ও মৌজা নির্বাচন করুন।
  6. অনুসন্ধান পদ্ধতি নির্বাচন করুন: খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর বা মালিকের নাম।
  7. ক্যাপচা পূরণ করুন এবং 'অনুসন্ধান' বাটনে ক্লিক করুন।
অনুসন্ধানের ধরনকী দিতে হবেকখন ব্যবহার করবেন
খতিয়ান নম্বর দিয়েসুনির্দিষ্ট খতিয়ান নম্বরনম্বর জানা থাকলে
দাগ নম্বর দিয়েমৌজার দাগ নম্বরদাগ নম্বর জানা থাকলে
মালিকের নাম দিয়েমালিকের পুরো নামঅন্য তথ্য না জানলে
পিতার নাম দিয়েপিতার নামসাধারণ নামে অনেক ফলাফল আসলে

নাম দিয়ে খতিয়ান অনুসন্ধান

মালিকের নাম দিয়ে খতিয়ান খোঁজার পদ্ধতি অনেকের জন্য সহজ, কারণ খতিয়ান নম্বর সবার মনে থাকে না।

নাম দিয়ে অনুসন্ধানের পদক্ষেপ

  • eporcha.gov.bd তে খতিয়ান অনুসন্ধানে যান
  • অনুসন্ধান পদ্ধতি হিসেবে 'মালিকের নাম' নির্বাচন করুন
  • মালিকের পুরো নাম বাংলায় লিখুন
  • পিতার নাম দিলে নির্ভুল ফলাফল পাবেন
  • জেলা, উপজেলা ও মৌজা সঠিকভাবে নির্বাচন করুন

নাম দিয়ে খোঁজার সমস্যা ও সমাধান

নাম বাংলায় লেখার ক্ষেত্রে বানানের পার্থক্যে ফলাফল না আসতে পারে। যেমন 'রহিম' ও 'রাহিম' দুটি আলাদা অনুসন্ধান ফলাফল দেবে।

  • বিভিন্ন বানানে চেষ্টা করুন
  • আংশিক নাম দিয়েও খোঁজ করুন
  • পিতার নাম বা দাদার নাম দিয়ে ক্রস-চেক করুন

মৌজা খোঁজার উপায়

মৌজার নাম না জানলে বা ভুলে গেলে:

  • পুরনো দলিলে মৌজার নাম থাকে
  • স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা ভূমি অফিসে জিজ্ঞেস করুন
  • dlrs.gov.bd পোর্টালে মৌজার তালিকা পাবেন

দাগ নম্বর দিয়ে খতিয়ান অনুসন্ধান

দাগ নম্বর হলো জমির নির্দিষ্ট পরিচিতি সংখ্যা। একই মৌজায় প্রতিটি প্লটের আলাদা দাগ নম্বর থাকে।

দাগ নম্বর কোথায় পাবেন?

  • জমির ক্রয় দলিলে দাগ নম্বর উল্লেখ থাকে
  • পুরনো খতিয়ানে দাগ নম্বর আছে
  • ভূমি অফিসে জিজ্ঞেস করলে জানাবে
  • মৌজা ম্যাপে দাগ নম্বর দেখা যায়

দাগ নম্বর দিয়ে অনুসন্ধান পদ্ধতি

  1. eporcha.gov.bd তে প্রবেশ করুন
  2. 'খতিয়ান অনুসন্ধান' নির্বাচন করুন
  3. জরিপের ধরন (RS/BS) নির্বাচন করুন
  4. বিভাগ → জেলা → উপজেলা → মৌজা নির্বাচন করুন
  5. 'দাগ নম্বর দিয়ে' অনুসন্ধান নির্বাচন করুন
  6. দাগ নম্বর লিখুন এবং সার্চ করুন

একই দাগে একাধিক খতিয়ান

একটি দাগ নম্বরে একাধিক মালিক থাকতে পারেন (যৌথ মালিকানায়)। এক্ষেত্রে প্রতিটি মালিকের জন্য আলাদা খতিয়ান থাকবে। দাগের মোট জমি এবং প্রতিটি খতিয়ানে দাগের কত অংশ আছে তা মিলিয়ে দেখুন।

পর্চা ও খতিয়ানের পার্থক্য

বিষয়খতিয়ানপর্চা
সংজ্ঞামালিকানার রেকর্ড বুকখতিয়ানের অনুলিপি/কপি
ব্যবহারমূল রেকর্ড সংরক্ষণব্যক্তিগত ব্যবহার, দলিল
সার্টিফাইড কপিপ্রযোজ্য নয়সার্টিফাইড পর্চা পাওয়া যায়

অনলাইনে সার্টিফাইড খতিয়ান কপি ডাউনলোড

eporcha.gov.bd পোর্টালে এখন অনলাইনে সার্টিফাইড খতিয়ান কপি বা পর্চা ডাউনলোড করার সুবিধা আছে।

সার্টিফাইড পর্চার জন্য আবেদন পদ্ধতি

  1. eporcha.gov.bd তে রেজিস্ট্রেশন বা লগইন করুন
  2. 'পর্চা আবেদন' বা 'Apply for Porcha' অপশনে যান
  3. সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের তথ্য দিন
  4. ফি পরিশোধ করুন (অনলাইন পেমেন্ট)
  5. আবেদন জমা দিন এবং আবেদন নম্বর সংগ্রহ করুন
  6. নির্ধারিত সময়ে (সাধারণত ৩-৭ দিন) পর্চা ডাউনলোড করুন

পর্চার ফি তালিকা (২০২৬)

সেবাফি
অনলাইন পর্চা (অসার্টিফাইড ভিউ)বিনামূল্যে
সার্টিফাইড পর্চা (RS/BS)১০০-২০০ টাকা
CS পর্চা১০০-৩০০ টাকা
জরুরি পর্চা সেবাঅতিরিক্ত ফি প্রযোজ্য

অফিস থেকে পর্চা নেওয়ার পদ্ধতি

অনলাইনে সমস্যা হলে সরাসরি জেলা রেকর্ড রুম বা উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে আবেদন ফর্ম পূরণ করে পর্চা নিতে পারেন।

খতিয়ান যাচাই করবেন যেভাবে

জমি কেনার আগে খতিয়ান যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। নকল বা ভুল খতিয়ান দেখিয়ে প্রতারণার ঘটনা প্রায়ই ঘটে।

খতিয়ান যাচাইয়ের চেকলিস্ট

  • ✅ মালিকের নাম মিলিয়ে দেখুন: খতিয়ানে নাম ও বিক্রেতার নাম একই কিনা।
  • ✅ দাগ নম্বর মিলিয়ে দেখুন: দলিলের দাগ নম্বর ও খতিয়ানের দাগ নম্বর একই হওয়া চাই।
  • ✅ জমির পরিমাণ মিলিয়ে দেখুন: খতিয়ানে উল্লেখিত পরিমাণ ও বিক্রিত পরিমাণ সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা।
  • ✅ মৌজার নাম ও নম্বর মিলিয়ে দেখুন।
  • ✅ নামজারি খতিয়ান চেক করুন: সর্বশেষ নামজারি কখন হয়েছে তা দেখুন।
  • ✅ দায়মুক্তি সনদ (Encumbrance Certificate) নিন: জমিতে কোনো ব্যাংক ঋণ বা দায় আছে কিনা তা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জানুন।

লাল নিশান (Red Flags) সতর্কতা

নিচের বিষয়গুলো দেখলে সতর্ক হন:

  • ❌ খতিয়ানে মৃত ব্যক্তির নাম এবং উত্তরাধিকারসূত্রে নামজারি হয়নি
  • ❌ একই দাগে একাধিক ব্যক্তি মালিক দাবি করছেন
  • ❌ খতিয়ানে জমির পরিমাণ দলিলের চেয়ে কম
  • ❌ সরকারি/অধিগ্রহণ করা জমি বলে চিহ্নিত
  • ❌ ব্যাংকে বন্ধকী জমি

খতিয়ানে ভুল থাকলে কী করবেন

খতিয়ানে নাম বানান ভুল, পরিমাণ কম, বা অন্য কোনো ত্রুটি থাকলে সংশোধনের আবেদন করতে হবে।

খতিয়ান সংশোধনের পদ্ধতি

  • তহসিলদার/AC Land এ আবেদন: সাধারণ ভুলের জন্য সংশ্লিষ্ট তহসিলদার বা AC Land অফিসে আবেদন করুন।
  • রেকর্ড সংশোধন মামলা: বড় ত্রুটির জন্য ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনাল বা দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হতে পারে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

  • মূল ক্রয় দলিল
  • পুরনো খতিয়ান
  • সঠিক তথ্যের প্রমাণ (যদি থাকে)
  • আবেদন ফর্ম (নির্ধারিত)
  • আবেদনকারীর NID

ডিজিটাল খতিয়ানে সংশোধন

eporcha পোর্টালে তথ্য ভুল থাকলে পোর্টালের হেল্পডেস্কে বা সরাসরি ভূমি অফিসে অভিযোগ করুন। ডিজিটাল তথ্য হালনাগাদ করতে সংশ্লিষ্ট জেলা রেকর্ড রুমে যোগাযোগ করুন।

DLRMS ও ভূমি রেকর্ড সিস্টেম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: অনলাইনে খতিয়ান দেখতে কোনো ফি লাগে?

উত্তর: শুধু দেখার জন্য (ভিউ করা) বিনামূল্যে। সার্টিফাইড পর্চা ডাউনলোড করতে নির্ধারিত ফি দিতে হবে।

প্রশ্ন ২: RS ও BS খতিয়ানে পার্থক্য কী?

উত্তর: RS হলো রিভিশনাল সার্ভে (১৯৬৫-১৯৯৭) এবং BS হলো বাংলাদেশ সার্ভে (১৯৯০-বর্তমান)। BS সর্বশেষ ও আরও হালনাগাদ রেকর্ড। তবে সব এলাকায় এখনও BS জরিপ সম্পন্ন হয়নি।

প্রশ্ন ৩: খতিয়ান না থাকলে কি জমির মালিকানা প্রমাণ করা যাবে?

উত্তর: খতিয়ান না থাকলেও ক্রয় দলিল, হেবা দলিল বা উত্তরাধিকার সনদ দিয়ে মালিকানা প্রমাণ করা যায়। তবে খতিয়ান থাকলে তা অনেক শক্তিশালী প্রমাণ।

প্রশ্ন ৪: মৌজার নাম জানি না — কীভাবে খোঁজব?

উত্তর: পুরনো দলিলে মৌজার নাম থাকে। না থাকলে স্থানীয় ভূমি অফিস বা ইউনিয়ন পরিষদে জিজ্ঞেস করুন।

প্রশ্ন ৫: খতিয়ান কি জমির মালিকানার একমাত্র প্রমাণ?

উত্তর: না। খতিয়ান রেকর্ড প্রমাণ, কিন্তু একমাত্র নয়। রেজিস্ট্রি দলিল, দখল ও সুদীর্ঘ ভোগদখলও মালিকানা প্রমাণে ভূমিকা রাখে।

কীভাবে আমরা সাহায্য করতে পারি

খতিয়ান সংক্রান্ত জটিলতা — চাই তা ভুল রেকর্ড হোক, প্রতারণামূলক জমি বিক্রির চেষ্টা হোক বা সীমানা বিরোধ হোক — আমাদের বিশেষজ্ঞ আইনজীবী টিম সব ধরনের সমস্যায় আপনার পাশে থাকবে।

আমাদের ভূমি আইন সেবা

  • ✅ খতিয়ান অনুসন্ধান ও যাচাইকরণ
  • ✅ জমি কেনার আগে Due Diligence
  • ✅ খতিয়ান সংশোধন আবেদন
  • ✅ ভূমি রেকর্ড সংক্রান্ত মামলা পরিচালনা
  • ✅ সার্টিফাইড পর্চা সংগ্রহে সহায়তা
  • ✅ নামজারি ও দলিল রেজিস্ট্রেশন

আমাদের চেম্বার উত্তরা, ঢাকাতে অবস্থিত। প্রথম পরামর্শ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।

এখনই বিনামূল্যে পরামর্শ নিন →

📍 ঠিকানা: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম, উত্তরা, ঢাকা, বাংলাদেশ
🌐 ওয়েবসাইট: advmdshahalam.me
🕐 অফিস সময়: শনি-বৃহস্পতিবার, সকাল ১০টা - বিকাল ৫টা