লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-13
ব্যবসায়িক শত্রুতা, জমিজমার বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরে অনেক সময় নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মাদকের চালান (ইয়াবা, ফেন্সিডিল ইত্যাদি) দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অত্যন্ত কঠোর ও জামিন-অযোগ্য হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা চরম আতঙ্কে পড়েন। কীভাবে জব্দতালিকা (Seizure List) চ্যালেঞ্জ করে নির্দোষ প্রমাণ করবেন এবং দ্রুত জামিন পাবেন, তা নিয়ে আদালতের বাস্তব দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রবীণ ফৌজদারি আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর ৩৬(১) সারণি অনুযায়ী মাদকের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে শাস্তি নির্ধারিত হয়। অল্প পরিমাণ (যেমন: ১০০ পিসের নিচে ইয়াবা) হলে সর্বনিম্ন ১ বছর থেকে ৫ বছর, আর ২০০ পিসের ওপরে গেলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম শাস্তির বিধান রয়েছে। এই আইনের ৩১ ধারা অনুযায়ী অনেক মামলাই সরাসরি জামিন-অযোগ্য এবং ট্রায়াল ছাড়া জামিন প্রদান নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আদালতের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, শত্রু পক্ষ স্থানীয় পুলিশ সোর্সের সাথে যোগসাজশ করে নিরীহ ব্যক্তির গাড়ি, দোকান বা পকেটে গোপনে মাদক রেখে দেয় এবং অভিযানের নাটক সাজায়। গ্রেফতারের পর দ্রুত এজাহার দায়ের করে বিজ্ঞ আদালতে চালান দেওয়া হয়।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা এবং মাদক আইনের বিধান অনুসারে—মাদক উদ্ধারের সময় স্থানীয় দুজন নিরপেক্ষ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখে তাদের উপস্থিতিতে মাদক জব্দ ও তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। কিন্তু বেশিরভাগ মিথ্যা মামলায় দেখা যায়—সাক্ষী হিসেবে রাখা হয়েছে পুলিশের গাড়ির ড্রাইভার কিংবা চিহ্নিত কোনো সোর্সকে। আইনজীবীর মূল কাজ হলো এই জব্দতালিকার ত্রুটি আদালতে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করা।
ঘটনাস্থলে কোনো দোকানদার, পথচারী বা নিরপেক্ষ সাক্ষী না থাকা এবং জব্দতালিকায় থাকা তথাকথিত সাক্ষীরা যদি জবানবন্দিতে বলে যে তারা ঘটনাস্থলে কিছু উদ্ধার হতে দেখেনি বরং ফাঁকা কাগজে স্বাক্ষর করেছে—তাহলে পুরো মামলার ভিত্তি ভেঙে পড়ে এবং বিজ্ঞ আদালত আসামিকে বেকসুর খালাস দিতে বাধ্য হন।
আসামিকে যেখান থেকে আটক করা হয়েছে এবং যে স্থান থেকে মাদক উদ্ধারের নাটক সাজানো হয়েছে, তার আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ আদালতের আদেশে বাজেয়াপ্ত করার জন্য প্রথম দিনেই ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৪ ধারায় আবেদন করতে হবে। সিসিটিভি ফুটেজে আটকের আসল সময় ও স্থান প্রকাশিত হলে পুলিশের মিথ্যা এজাহার তাৎক্ষণিক ফাঁস হয়ে যায়।
ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জামিন নামঞ্জুর হলে দ্রুত দায়রা জজ আদালতে মিস কেস (Crl. Misc.) করতে হয়। সেখানেও জামিন না পেলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় জামিনের পিটিশন দাখিল করতে হবে। হাইকোর্ট বিভাগ জব্দতালিকার অসঙ্গতি, আসামির পূর্বের ক্লিন রেকর্ড এবং দীর্ঘ কারাবাস বিবেচনা করে জামিন মঞ্জুর করেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৪২ ধারা অনুযায়ী—কোনো ব্যক্তি বা কর্মকর্তা যদি কোনো ব্যক্তিকে ক্ষতি করার অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যা মাদক মামলা দায়ের করেন, তবে বাদী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজেরই সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের কঠোর বিধান রয়েছে।