লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-15
বাংলাদেশে একটি বহুল প্রচলিত কুসংস্কার ও সামাজিক অন্যায় হলো—বোনের বিয়ের পর কিংবা মৃত্যুর পর মামারা ভাগ্নে-ভাগ্নীদের বলেন, ‘তোমাদের নানার বাড়িতে কোনো হক নেই, যা ছিল সবই ছেলেদের’। অথচ মুসলিম উত্তরাধিকার আইন ও বাংলাদেশের পারিবারিক আইনে মৃত মায়ের প্রাপ্য হিস্যা তার মৃত্যুর পর সরাসরি সন্তানদের ওপর বর্তায়। এ বিষয়ে স্পষ্ট আইনি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্র্যাকটিসিং আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>।
পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার বিধান এবং মুসলিম ফারায়েজ আইন অনুযায়ী পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে ভাইয়ের পাশাপাশি বোনের নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে। একজন কন্যা একা থাকলে মোট সম্পত্তির অর্ধেক (১/২), একাধিক কন্যা থাকলে দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সমানভাবে ভাগ করে নেন। আর ভাই-বোন একসাথে থাকলে ভাই বোনের দ্বিগুণ হারে (২:১ অনুপাতে) অংশীদার হন। কোনো অবস্থাতেই ভাইরা বোনকে বঞ্চিত করতে পারেন না।
যদি নানা বা নানির জীবদ্দশাতেই মা মৃত্যুবরণ না করেন (অর্থাৎ নানা মারা যাওয়ার পর মা মারা যান), তবে মা জীবদ্দশায় যে হিস্যা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন, তার মৃত্যুর সাথে সাথে সেই পুরো অংশ মা’র ওয়ারিশান সনদ অনুযায়ী তার ছেলে-মেয়ে এবং স্বামী লাভ করবেন। মামারা কোনো অবস্থাতেই ভাগ্নে-ভাগ্নীদের অংশ নিজেরা গ্রাস করতে পারেন না।
পূর্বে পিতামহের জীবদ্দশায় সন্তান মারা গেলে তার এতিম সন্তানরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতো। কিন্তু ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা (Section 4, MFLO 1961) অনুযায়ী—পিতার পূর্বে যদি কোনো পুত্র বা কন্যা মারাও যান, তবুও জীবিত থাকলে তিনি যে পরিমাণ সম্পত্তি পেতেন, তার সন্তানরা (নাতি-নাতনি/ভাগ্নে-ভাগ্নী) ঠিক সেই পরিমাণ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন। ফলে মায়ের অকাল মৃত্যু হলেও নানার সম্পত্তিতে সন্তানদের অধিকার সম্পূর্ণ অটুট থাকে।
মামারা যদি পৈতৃক ভিটায় বা জমিতে অংশীদার বোন/ভাগ্নেদের না জানিয়ে একতরফা জমি বিক্রি করার চেষ্টা করেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সহকারী জজ আদালতে বাটোয়ারা মামলা দায়ের করে দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১ ও ২ নিয়ম অনুযায়ী অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Ad-interim Injunction) আনতে হবে। নিষেধাজ্ঞা জারি হলে জমি বিক্রয় বা অবকাঠামো নির্মাণ সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষিত হবে।
আপসের অপেক্ষা না করে নানার মূল খতিয়ান, নানার মৃত্যু সনদ, নানার ওয়ারিশান সনদ এবং মায়ের ওয়ারিশান সনদ সংগ্রহ করে অনলাইনে ই-নামজারির (Mutation) আবেদন করতে হবে। এসি ল্যান্ড শুনানিতে উভয় পক্ষকে নোটিশ করবেন এবং ফারায়েজ হিসাব অনুযায়ী ভাগ্নে-ভাগ্নীদের নামে আলাদা হোল্ডিং ও জমা-খারিজ খতিয়ান খুলে দিতে বাধ্য।
বাটোয়ারা মামলায় দুটি ধাপ রয়েছে: প্রথম ধাপে আদালত মালিকানা অংশ নির্ধারণ করে প্রাথমিক ডিক্রি (Preliminary Decree) দেন। এরপর সরকারি অ্যাডভোকেট কমিশনারের মাধ্যমে জমি পরিমাপ করে সহ-শরিকদের সীমানা চিহ্নিত করে চূড়ান্ত ডিক্রি (Final Decree) কার্যকর করা হয়। মামাদের কোনো দখল বা দাপট আদালতের ডিক্রির সামনে টেকে না।