মায়ের সম্পত্তি ভাগের নিয়ম – সন্তান ও স্বামীর আইনি অংশ ও অধিকার

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-07-22

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে যত আলোচনা হয়, মায়ের সম্পত্তির বণ্টন নিয়ে সচেতনতা তার চেয়ে অনেক কম। অনেক পরিবারেই প্রশ্ন জাগে—মায়ের মৃত্যুর পর তার নিজের অর্জিত বা পৈতৃক সম্পত্তি কে কতটুকু পাবে? মায়ের জীবিত অবস্থায় কি সন্তানরা সম্পত্তির দাবি করতে পারে? স্বামী বা মেয়ের অংশ কত? ২০২৬ সালের হালনাগাদ মুসলিম ও প্রচলিত উত্তরাধিকার আইনের আলোকে মায়ের সম্পত্তি বণ্টনের প্রতিটি আইনি ধাপ ও সঠিক অনুপাত এই গাইডে আলোচনা করা হলো। যেকোনো জটিল আইনি সমস্যায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর আইনি পরামর্শ নিতে পারেন।

মায়ের সম্পত্তির আইনি ভিত্তি ও উৎস

বাংলাদেশে মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, নারীদের সম্পত্তির ওপর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন মালিকানা স্বীকৃত। মুসলিম পার্সোনাল ল (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট, ১৯৩৭ এবং মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুসারে একজন নারী তার মালিকানাধীন সম্পত্তির সম্পূর্ণ একক স্বত্বাধিকারী।

মায়ের সম্পত্তির উৎস মূলত ৩ ধরনের হতে পারে:

  • নিজের অর্জিত সম্পত্তি: চাকরি, ব্যবসা বা নিজস্ব আয়ে কেনা জমি, ফ্ল্যাট, স্বর্ণালংকার বা ব্যাংক আমানত।
  • পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি: নিজ পিতা বা মাতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি।
  • স্বামী বা অন্য কারও কাছ থেকে প্রাপ্ত হেবা/দান/দেনমোহর: স্বামী দেনমোহর বাবদ বা ভালোবাসার উপহার হিসেবে (Heba) যে সম্পত্তি স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছেন।

আইনগতভাবে এই তিন প্রকারের যেকোনো উৎস থেকেই সম্পত্তি আসুক না কেন, মায়ের মৃত্যুর পর তা ফারায়েজ (ইসলামিক উত্তরাধিকার বিধি) অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টিত হবে।

মা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তির ওপর সন্তানদের অধিকার

অনেক পরিবারে ভুল ধারণা রয়েছে যে মা জীবিত থাকা অবস্থাতেই সন্তানরা মায়ের জমির অংশ দাবি করতে পারে। আইনি সত্য হলো—মা জীবিত থাকা অবস্থায় কোনো সন্তান মায়ের সম্পত্তির ওপর কোনো আইনি অধিকার বা দাবি রাখতে পারে না।

মা জীবিত অবস্থায় তার সম্পত্তির ব্যাপারে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্ত নিতে সম্পূর্ণ স্বাধীন:

  • মা চাইলে তার সম্পূর্ণ সম্পত্তি বিক্রি, দান বা অন্য কাউকে হস্তান্তর করতে পারেন।
  • মা চাইলে জীবদ্দশায় যেকোনো সন্তানকে রেজিস্ট্রিকৃত হেবা (Heba) দলিলের মাধ্যমে জমি বা বাড়ি লিখে দিতে পারেন।
  • কোনো সন্তান মাকে জোরপূর্বক সম্পত্তি লিখে দিতে বাধ্য করতে পারবে না। মানসিকভাবে সুস্থ থাকা অবস্থায় মা যাকে ইচ্ছা সম্পত্তি দিতে পারেন।

তবে মা যদি মানসিক ভারসাম্যহীন হন অথবা জালিয়াতি বা ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে কোনো এক সন্তান সব সম্পত্তি আত্মসাৎ করতে চায়, তবে অন্য সন্তানরা দেওয়ানি আদালতে নিষেধাজ্ঞা (Injunction) মামলা দায়ের করতে পারেন।

মুসলিম আইন অনুসারে মায়ের মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের অনুপাত

মায়ের মৃত্যুর পর প্রথমে মায়ের কোনো ঋণ বা বকেয়া দেনমোহর (যদি থাকে) তা পরিশোধ করতে হবে এবং তার যদি কোনো বৈধ ওসিয়ত (সর্বোচ্চ ১/৩ অংশ) থাকে তা পূরণ করার পর অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

মায়ের প্রধান ওয়ারিশরা হলেন: স্বামী (পিতা), সন্তান (ছেলে ও মেয়ে), এবং মায়ের নিজ পিতা-মাতা (যদি তারা জীবিত থাকেন)।

ওয়ারিশ (উত্তরাধিকারী)শর্ত/পরিস্থিতিআইনি অংশ (Share)
স্বামী (মৃতার স্বামী)সন্তান বা নাতি-নাতনি থাকলে১/৪ অংশ (২৫%)
স্বামী (মৃতার স্বামী)কোনো সন্তান না থাকলে১/২ অংশ (৫০%)
মাতা (মৃতার নিজ মা)সন্তান বা একাধিক ভাইবোন থাকলে১/৬ অংশ
পিতা (মৃতার নিজ বাবা)সন্তান থাকলে১/৬ অংশ
ছেলে ও মেয়েস্বামী ও পিতামাতার অংশ দেওয়ার পর বাকি অংশেছেলে পাবে মেয়ের দ্বিগুণ (২:১ অনুপাত)

মায়ের সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের অংশের হিসাব (২:১ নিয়ম)

পিতার সম্পত্তির মতো মায়ের সম্পত্তির ক্ষেত্রেও মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে 'ছেলে পাবে মেয়ের দ্বিগুণ' নীতি প্রযোজ্য।

ব্যবহারিক উদাহরণ:

ধরা যাক, মায়ের মোট সম্পত্তি ১২ শতক জমি। মায়ের মৃত্যুর সময় তার স্বামী (পিতা), ২ জন ছেলে এবং ১ জন মেয়ে জীবিত আছেন। (মায়ের পিতামাতা পূর্বে মারা গেছেন ধরে নিয়ে):

  1. প্রথম ধাপ (স্বামীর অংশ): সন্তান থাকায় স্বামী পাবেন মোট সম্পত্তির ১/৪ অংশ = ১২ শতকের ১/৪ = ৩ শতক।
  2. দ্বিতীয় ধাপ (অবশিষ্ট অংশ): অবশিষ্ট জমি থাকে = (১২ - ৩) = ৯ শতক।
  3. তৃতীয় ধাপ (ছেলে ও মেয়ের বণ্টন): ২ ছেলে + ১ মেয়ে = মোট ভাগ হবে (২+২+১) = ৫ ভাগ।
  4. প্রতি এক ভাগ = ৯ ÷ ৫ = ১.৮ শতক।
  5. ১ জন মেয়ে পাবেন: ১ ভাগ = ১.৮ শতক।
  6. প্রতিটি ছেলে পাবেন: ২ ভাগ = ৩.৬ শতক (২ জন ছেলে মিলে ৭.২ শতক)।

এই হিসাব অনুযায়ী ৩ শতক স্বামী + ৭.২ শতক ২ ছেলে + ১.৮ শতক ১ মেয়ে = মোট ১২ শতক জমি নির্ভুলভাবে বণ্টিত হলো।

মায়ের সম্পত্তিতে স্বামীর (পিতার) আইনি অংশ

অনেকে না জেনে মনে করেন মায়ের সম্পত্তি শুধুই সন্তানেরা পাবে, স্বামী কিছু পাবেন না। এটি একটি মস্ত বড় আইনি ভুল।

আইন অনুযায়ী স্ত্রী আগে মারা গেলে স্ত্রীর সম্পত্তিতে স্বামীর সুস্পষ্ট অধিকার রয়েছে:

  • মৃত স্ত্রীর সন্তান (বা পুত্রের সন্তান) থাকলে স্বামী স্ত্রীর মোট সম্পত্তির ১/৪ অংশ (চার ভাগের এক ভাগ) পাবেন।
  • মৃত স্ত্রীর কোনো সন্তান বা নাতি-নাতনি না থাকলে স্বামী মোট সম্পত্তির ১/২ অংশ (অর্ধেক) পাবেন।

স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তানদের সাথে সমানভাবে ওয়ারিশ হবেন এবং নামজারি খতিয়ানে তার নামও যুক্ত হবে।

শুধু মেয়ে বা একাধিক মেয়ে থাকলে সম্পত্তি বণ্টনের বিধান

যদি মায়ের কোনো ছেলে সন্তান না থাকে, শুধু মেয়ে থাকে, তবে সম্পত্তি বণ্টনে ফারায়েজের বিশেষ নিয়ম প্রয়োগ হয়:

  • শুধুমাত্র ১ জন মেয়ে থাকলে: সে মায়ের সম্পত্তির ঠিক ১/২ অংশ (অর্ধেক) পাবে।
  • ২ বা ততোধিক মেয়ে থাকলে: তারা সবাই মিলে একত্রে মোট সম্পত্তির ২/৩ অংশ (তিন ভাগের দুই ভাগ) সমানভাবে ভাগ করে নেবে।
  • বাকি অংশ স্বামী ও অন্যান্য আসাবা ওয়ারিশরা (যেমন মায়ের ভাই/ভাতিজা বা শ্বশুরবাড়ির আসাবা) পাবেন।

যদি মা জীবিত অবস্থায় চান যে তার মৃত্যুর পর তার কন্যাসন্তানরা যেন সম্পূর্ণ জমি পায় এবং দূর সম্পর্কের আত্মীয়রা অংশ না পায়, তবে মা জীবদ্দশাতেই রেজিস্ট্রিকৃত হেবা বিল এওয়াজ বা দান দলিলে মেয়েদের নামে জমি লিখে দিয়ে যেতে পারেন।

মায়ের অর্জিত সম্পত্তি বনাম পৈতৃক বা হেবা পাওয়া সম্পত্তি

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে মায়ের সম্পত্তি যেভাবেই অর্জিত হোক না কেন, বণ্টনের নিয়মে কোনো পার্থক্য নেই।

অনেকে মনে করেন মা যদি তার বাবার বাড়ি থেকে সম্পত্তি পান, তবে তা শুধু মেয়রাই পাবে বা শুধু ভাইয়েরা পাবে—এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কথা। পিতা থেকে পাওয়া জমি হোক কিংবা দেনমোহরে পাওয়া জমি হোক, মায়ের মৃত্যুর মুহূর্ত থেকে তা ফারায়াজের সাধারণ বণ্টন নীতি অনুযায়ী স্বামী, ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বন্টিত হবে।

মায়ের সম্পত্তি বণ্টনে সচরাচর ভুল ও আইনি জটিলতা

মায়ের সম্পত্তি বণ্টন ও নামজারির সময় পরিবারে কিছু মারাত্মক ভুল দেখা যায়:

  1. বোনদের বঞ্চনা করা: ভাইয়েরা জোর করে বোনদের না জানিয়ে মায়ের জমি নিজেদের নামে নামজারি করে নেওয়ার চেষ্টা করে। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি। বোনদের সম্মতি ও এনআইডি ছাড়া নামজারি করা হলে এসিল্যান্ড বা আদালতে নামজারি বাতিল (Namjari Cancellation) মামলা দায়ের করা যায়।
  2. ওয়ারিশান সনদে তথ্য গোপন করা: সিটি কর্পোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওয়ারিশ সনদ নেওয়ার সময় মায়ের কোনো মেয়ে বা মৃত সন্তানের ওয়ারিশদের নাম বাদ দিলে তা ফৌজদারি অপরাধ (প্রতারণা ও জালিয়াতি)।
  3. মায়ের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন নামজারি না করা: মায়ের মৃত্যুর পর দ্রুত ওয়ারিশান সনদ সংগ্রহ করে এসি ল্যান্ড (AC Land) অফিসে ওয়ারিশন সূত্রে ই-নামজারি (E-Namjari) করিয়ে ফেলা উচিত।

⚖️ বিশেষজ্ঞ আইনি পরামর্শের জন্য যোগাযোগ: আপনার আইনি বিষযটি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম-এর সাথে সরাসরি কথা বলুন বা আমাদের বিশেষজ্ঞ আইনি সেবা গ্রহণ করুন। যেকোনো প্রয়োজনে সরাসরি যোগাযোগ পেজে ক্লিক করুন।