মায়ের সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক আইনি নিয়ম ২০২৬: ফারায়িজ অনুযায়ী ছেলে, মেয়ে ও স্বামীর সুনির্দিষ্ট অংশ

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-21 · ১৯ মিনিট

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

পিতার সম্পত্তির তুলনায় মায়ের সম্পত্তির বণ্টন নিয়ে সমাজে আরও বেশি বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন মায়ের সোনাদানা কেবল মেয়েরা পাবে এবং জমিজমা কেবল ছেলেরা পাবে—যা ইসলামী ফারায়িজ ও বাংলাদেশের আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আবার মা মারা গেলে জীবিত স্বামী (বাবা) কতটুকু অংশ পাবেন এবং মায়ের কোনো ভাই-বোন (মামা-খালা) অংশ পাবেন কিনা, তা নিয়েও তীব্র পারিবারিক বিবাদ সৃষ্টি হয়। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী মায়ের ত্যাজ্য সম্পত্তি বণ্টনের নিখুঁত গাণিতিক ফর্মুলা ও সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold;text-decoration:underline;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর বিস্তারিত দিকনির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো। উত্তরাধিকার সম্পত্তি সংক্রান্ত পরামর্শে সরাসরি কল করুন: <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold;">০১৭১২-৬৫৫৫৪৬</a>।

⚡ এক নজরে: মায়ের সম্পত্তি ফারায়িজ নীতিমালা
  • মায়ের সম্পত্তিতে (জমি ও সোনা) ছেলে ও মেয়ের অধিকার ২:১ অনুপাতে নির্ধারিত; মায়ের সোনা শুধু মেয়েদের নয়।
  • মৃত মায়ের সন্তান (ছেলে বা মেয়ে) থাকলে স্বামী (বাবা) পাবেন মোট সম্পত্তির ঠিক ১/৪ (চারভাগের একভাগ) অংশ।
  • যদি মৃত মায়ের কোনো সন্তান বা নাতি-নাতনি না থাকে, তবে স্বামী পাবেন মোট সম্পত্তির ১/২ (অর্ধেক) অংশ।
  • মৃত মায়ের জীবিত পিতা ও মাতা থাকলে প্রত্যেকে পাবেন ১/৬ (ছয়ভাগের একভাগ) অংশ করে।
  • মৃত মায়ের সন্তান বা পিতা বেঁচে থাকলে মায়ের ভাই-বোন (মামা-খালা) কোনো অংশ পাবেন না (তারা বঞ্চিত বা মাহজুব হবেন)।
📋 সূচিপত্র
  1. ১. মায়ের সম্পত্তি বণ্টনের ৩টি মৌলিক আইনি মূলনীতি
  2. ২. মৃত স্ত্রীর সম্পত্তিতে স্বামীর (পিতা) প্রাপ্ত অংশ
  3. ৩. ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ২:১ অনুপাতে বণ্টনের গাণিতিক উদাহরণ
  4. ৪. মায়ের সোনাগয়না ও ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পদ বণ্টনের সঠিক বিধান
  5. ৫. মামা ও খালারা কি ভাগ্নির/বোনের সম্পত্তিতে অংশ পাবেন?
  6. ৬. কেবল ১ জন বা একাধিক কন্যা সন্তান থাকলে বণ্টনের নিয়ম (রদ নীতি)
  7. ৭. মায়ের সম্পত্তি জোরপূর্বক ভোগদখল ঠেকাতে বাটোয়ারা মামলা
  8. ৮. উত্তরাধিকার সম্পত্তি বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ

১. মায়ের সম্পত্তি বণ্টনের ৩টি মৌলিক আইনি মূলনীতি

মা জীবিত থাকা অবস্থায় তার নিজের কেনা, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বা দেনমোহর বাবদ পাওয়া যেকোনো সম্পত্তির তিনি একক এবং নিরঙ্কুশ মালিক। মায়ের মৃত্যুর পর তার সম্পদ বণ্টনে ৩টি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হয়:

  • মায়ের ঋণ ও অসিয়ত নিষ্পত্তি: মা যদি কারও কাছে ঋণগ্রস্ত থাকেন, তবে তার সম্পত্তি থেকে আগে ঋণ শোধ করতে হবে। মায়ের কোনো বৈধ অসিয়ত থাকলে তা অনাত্মীয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১/৩ অংশ পর্যন্ত কার্যকর হবে।
  • স্থাবর ও অস্থাবর সব সম্পদে একই নিয়ম: জমি, বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স কিংবা স্বর্ণালংকার—সবকিছুই একই উত্তরাধিকার অনুপাতে ভাগ হবে।
  • মৌখিক বণ্টন আইনত অকার্যকর: রেজিস্ট্রি আপোস বণ্টননামা বা দেওয়ানি আদালতের বাটোয়ারা ডিক্রি ছাড়া পৃথক খতিয়ান বা নামজারি করা যায় না।

২. মৃত স্ত্রীর সম্পত্তিতে স্বামীর (পিতা) প্রাপ্ত অংশ

স্ত্রী মারা গেলে স্বামীর অংশ পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ১২ নম্বর আয়াতের বিধান অনুযায়ী সরাসরি নির্ধারিত:

  • সন্তান থাকলে (ছেলে, মেয়ে, পুত্রের সন্তান): স্বামী স্ত্রীর মোট রেখে যাওয়া সম্পত্তির ১/৪ (চারভাগের একভাগ বা ২৫%) অংশের মালিক হবেন।
  • সন্তান না থাকলে: স্বামী পাবেন স্ত্রীর রেখে যাওয়া মোট সম্পত্তির ১/২ (অর্ধেক বা ৫০%) অংশ।

স্বামী জীবিত থাকা সত্ত্বেও সন্তানরা যদি বাবাকে বাদ দিয়ে এককভাবে মায়ের সম্পত্তি নিজেদের নামে নামজারি করার চেষ্টা করে, তবে বাবা এসিল্যান্ড অফিসে আপত্তি এবং আদালতে বণ্টনের মামলা করতে পারেন।

৩. ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ২:১ অনুপাতে বণ্টনের গাণিতিক উদাহরণ

পিতার সম্পত্তির মতোই মায়ের সম্পত্তিতেও ছেলে ও মেয়ের প্রাপ্ত অংশের অনুপাত ২:১। অর্থাৎ এক ভাই দুই বোনের সমান পাবে।

📊 বাস্তব উদাহরণ (স্বামী, ১ ছেলে ও ২ মেয়ে রেখে মা মারা গেলে):

মোট জমি: ১২ বিঘা।
১. স্বামী পাবেন ১/৪ অংশ = ১২ বিঘার ১/৪ = ৩ বিঘা।
২. অবশিষ্ট জমি = ১২ - ৩ = ৯ বিঘা (যা সন্তানদের মধ্যে ২:১ অনুপাতে বণ্টন হবে)।
ছেলে পাবে ২ পয়েন্ট, প্রতি মেয়ে ১ পয়েন্ট = ২ + ১ + ১ = মোট ৪ শেয়ার।
• ছেলে পাবে: ৯ বিঘার ২/৪ অংশ = ৪.৫ বিঘা।
• ১ম মেয়ে পাবে: ৯ বিঘার ১/৪ অংশ = ২.২৫ বিঘা।
• ২য় মেয়ে পাবে: ৯ বিঘার ১/৪ অংশ = ২.২৫ বিঘা।
যোগফল: ৩ + ৪.৫ + ২.২৫ + ২.২৫ = ঠিক ১২ বিঘা।

৪. মায়ের সোনাগয়না ও ব্যক্তিগত অস্থাবর সম্পদ বণ্টনের সঠিক বিধান

আমাদের দেশে প্রচলিত একটি মারাত্মক কুসংস্কার হলো—'মায়ের সোনা কেবল মেয়েরা বা পুত্রবধূরা পাবে, ছেলেরা এতে কোনো অংশ পাবে না'। আইন ও শরীয়ত মতে এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।

মায়ের ব্যবহৃত সমস্ত স্বর্ণালংকার, রূপা, নগদ টাকা, প্রাইজবন্ড বা আসবাবপত্র সবই মায়ের ত্যাজ্য সম্পত্তি। এই সমুদয় সম্পদ স্বর্ণকারের মাধ্যমে বর্তমান বাজারমূল্যে মূল্যায়ন করিয়ে মোট টাকায় রূপান্তর করতে হবে এবং জমি বণ্টনের মতো স্বামী, ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে নির্ধারিত অনুপাতে ভাগ করতে হবে। যদি মেয়েরা সোনা রাখতে চায়, তবে ছেলেদের তাদের প্রাপ্ত অংশের সমমূল্যের অর্থ বা অতিরিক্ত জমি ছেড়ে দিতে হবে।

৫. মামা ও খালারা কি ভাগ্নির/বোনের সম্পত্তিতে অংশ পাবেন?

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, মৃত মায়ের যদি কোনো পুত্র সন্তান (ছেলে) বেঁচে থাকে, তবে মায়ের কোনো ভাই বা বোন (মামা-খালা) এক ছটাক জমিও পাবেন না। পুত্র সন্তান থাকার কারণে তারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত (হজব) হবেন।

তবে যদি মৃত মায়ের কোনো সন্তান না থাকে এবং পিতা বা দাদা জীবিত না থাকেন, কেবল তখনই মামা ও খালারা আসাবা হিসেবে অবশিষ্ট সম্পত্তির অংশ পেতে পারেন।

৬. কেবল ১ জন বা একাধিক কন্যা সন্তান থাকলে বণ্টনের নিয়ম (রদ নীতি)

যদি মৃত মায়ের কোনো ছেলে না থাকে, কেবল মেয়ে থাকে:

  • শুধুমাত্র ১ জন মেয়ে থাকলে: মেয়ে পাবেন মোট সম্পত্তির ১/২ (অর্ধেক) অংশ।
  • ২ বা ততোধিক মেয়ে থাকলে: সব মেয়েরা মিলে যৌথভাবে পাবেন মোট সম্পত্তির ২/৩ (দুই-তৃতীয়াংশ) অংশ।
  • অবশিষ্ট সম্পত্তি (Doctrine of Return / Radd): যদি স্বামী বাদে অন্য কোনো রক্তের আত্মীয় না থাকে, তবে হানাফী আইন এবং বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী অবশিষ্ট সম্পত্তিও মেয়েদের মধ্যেই আনুপাতিক হারে ফেরত (Return/Radd) আসবে।

৭. মায়ের সম্পত্তি জোরপূর্বক ভোগদখল ঠেকাতে বাটোয়ারা মামলা

অনেক পরিবারে ভাইয়েরা মায়ের মৃত্যুর পর বোনদের বা দ্বিতীয় পক্ষের সন্তানদের অংশ দিতে চায় না। এই অবস্থায় দেওয়ানি সহকারী জজ আদালতে বাটোয়ারা মামলা (Partition Suit) দায়ের করতে হয়। মামলা চলাকালে জমিতে দখল বদল বা বিক্রি ঠেকাতে আদালত থেকে দ্রুততম সময়ে নিষেধাজ্ঞা (Injunction) পাওয়া যায়।

৮. উত্তরাধিকার সম্পত্তি বিশেষজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ

মায়ের সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে পারিবারিক তিক্ততা তৈরি না করে ফারায়িজ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সঠিক হিসেব বের করে আপোস বণ্টননামা দলিল রেজিস্ট্রি করে নেওয়াই সর্বোত্তম পন্থা। আমাদের চেম্বারে উত্তরাধিকার হিসেব নির্ধারণ এবং দেওয়ানি বাটোয়ারা মামলা পরিচালনায় দীর্ঘ ২০+ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। যেকোনো আইনি জটিলতায় যোগাযোগ করুন।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

মায়ের জীবদ্দশায় কি সন্তানরা মায়ের সম্পত্তি দাবি করতে পারে?

না। মা যতদিন জীবিত আছেন, তিনি তার সম্পত্তির একমাত্র মালিক। তিনি যাকে ইচ্ছা দান (হেবা) করতে পারেন বা বিক্রি করতে পারেন। তার জীবদ্দশায় কোনো সন্তান উত্তরাধিকার দাবি করতে পারে না।

মায়ের দেনমোহরের টাকা পরিশোধ না করে বাবা মারা গেলে কী হবে?

মায়ের দেনমোহর বাবার ওপর একটি ঋণ (Debt)। বাবার মৃত্যুর পর বাবার রেখে যাওয়া মূল সম্পত্তি থেকে আগে মায়ের দেনমোহরের বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে হবে, তারপর বাবার অবশিষ্ট সম্পত্তি সব ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে।

মা যদি তার সম্পত্তি শুধুমাত্র এক সন্তানকে লিখে দেন, তা কি বৈধ?

মা জীবিত অবস্থায় সুস্থ মস্তিষ্কে কাউকে রেজিস্ট্রি হেবা বা দানপত্র দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি দিয়ে দখল বুঝিয়ে দিলে তা আইনত বৈধ। তবে মৃত্যুর পর মৌখিক কোনো নির্দেশ দিয়ে অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করা যায় না।

মায়ের নামে থাকা জমি কীভাবে নিজের নামে নামজারি করব?

মায়ের মৃত্যুর পর সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছ থেকে 'ওয়ারিশান সনদ' সংগ্রহ করতে হবে। এরপর সকল ওয়ারিশদের মধ্যে রেজিস্ট্রি বাটোয়ারা দলিল করে অনলাইনে mutation.land.gov.bd পোর্টালে ই-নামজারির আবেদন করতে হবে।

আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546  |  WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০