লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-08-04
<p>বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন হলেও, অনেক ক্ষেত্রে এর অপব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। পারিবারিক কলহ, ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা অন্য কোনো কারণে নিরীহ মানুষকে মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসানোর ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। মিথ্যা যৌতুক মামলা বা নির্যাতনের অভিযোগে জীবন ও সম্মান বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে সঠিক আইনি পদক্ষেপ নিলে এই ধরনের মিথ্যা মামলা থেকে সহজেই আত্মরক্ষা করা সম্ভব। এই আর্টিকেলে আমরা মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলা থেকে বাঁচার উপায়, হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নেওয়ার নিয়ম, এবং মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে ১৭ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।</p>
আমাদের সমাজে নারী নির্যাতন বা যৌতুক দাবির অভিযোগে দায়ের করা মামলার একটি বড় অংশই অনেক সময় মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণিত হয়। সাধারণত পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব বা তালাক সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অপব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে ১১(গ) ধারায় যৌতুকের জন্য মারধর বা যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়েরের প্রবণতা বেশি। এ ধরনের মামলাগুলোতে শুধু স্বামী নয়, বরং তার বৃদ্ধ পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনকেও আসামি করা হয়, যা আইনের চরম অপব্যবহার। মিথ্যা মামলার কারণে একজন নিরপরাধ ব্যক্তির চাকরি, সম্মান ও ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে পারে। তাই মামলা দায়ের হওয়ার সাথে সাথেই আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আপনার বিরুদ্ধে থানায় বা ট্রাইবুনালে মিথ্যা মামলা হলে সর্বপ্রথম কাজ হলো গ্রেফতার এড়ানোর জন্য জামিনের ব্যবস্থা করা। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অপরাধগুলো সাধারণত আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য। এক্ষেত্রে গ্রেফতার এড়াতে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আগাম জামিন (Anticipatory Bail) নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ। আগাম জামিন পেতে হলে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে মামলাটি সম্পূর্ণ হয়রানিমূলক এবং আপনাকে অহেতুক গ্রেফতারের আশঙ্কা রয়েছে। হাইকোর্টে আবেদন করার জন্য মামলার এজাহার বা পিটিশনের সার্টিফাইড কপি বা ফটোকপি, আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র এবং প্রাসঙ্গিক প্রমাণাদি প্রয়োজন হবে। মহামান্য হাইকোর্ট সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য (যেমন ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ) আগাম জামিন মঞ্জুর করেন এবং এই সময়ের মধ্যে নিম্ন আদালত বা ট্রাইবুনালে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন। সঠিক নিয়মে আগাম জামিন নিলে পুলিশের হয়রানি থেকে সম্পূর্ণ রক্ষা পাওয়া যায়।
মিথ্যা মামলা প্রমাণের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হলো 'অ্যালিবাই' বা ঘটনাস্থলে অনুপস্থিতির প্রমাণ। বাদী যদি দাবি করে যে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়ে আপনি তাকে নির্যাতন করেছেন, তবে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে ওই সময়ে আপনি অন্য কোথাও ছিলেন। এর জন্য অফিসের হাজিরা খাতা, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল লোকেশন বা কল রেকর্ড, হোটেলের বিল বা হাসপাতালের রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে আদালতে দাখিল করতে পারেন। এছাড়া, যদি আপনাদের মধ্যে আগে থেকেই কোনো বিরোধ বা মামলা থেকে থাকে (যেমন: আপনি আগে তালাকের নোটিশ দিয়েছেন বা পারিবারিক আদালতে অন্য মামলা চলমান), তবে তার নথিপত্রও সংগ্রহ করুন। এই প্রমাণগুলো মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (IO) বা আদালতে দাখিল করলে মামলাটি মিথ্যা বলে সহজেই প্রমাণিত হতে পারে।
থানা বা তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে, তবে মামলাটি বিচারের জন্য ট্রাইবুনালে বদলি হয়। চার্জ গঠনের (Charge Framing) শুনানির সময় আপনার আইনজীবী ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৫(সি) ধারা বা প্রাসঙ্গিক আইন অনুযায়ী অব্যাহতির আবেদন (Discharge Petition) করতে পারেন। এই আবেদনে তুলে ধরতে হবে যে মামলার এজাহার, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং পুলিশ রিপোর্টে আপনার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রাথমিক প্রমাণ (Prima Facie) নেই। বিচারক যদি দেখেন যে অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং মামলা চালানোর মতো কোনো উপাদান নেই, তবে তিনি চার্জ গঠনের আগেই আপনাকে অব্যাহতি দিতে পারেন। এটি মিথ্যা মামলা থেকে দ্রুত নিষ্কৃতি পাওয়ার একটি কার্যকর আইনি প্রক্রিয়া।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত)-এর ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। যদি কোনো ব্যক্তি কারও ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের অধীনে মিথ্যা মামলা দায়ের করে এবং তদন্তে বা বিচারে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে ওই মিথ্যা মামলা দায়েরকারীর সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হতে পারে। আপনার বিরুদ্ধে করা মামলাটি যদি ট্রাইবুনালে মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে আপনি খালাস পান, তবে আপনি ওই একই ট্রাইবুনালে বাদীর বিরুদ্ধে ১৭ ধারায় পাল্টা পিটিশন মামলা দায়ের করতে পারবেন। আইনের এই বিধানটি মিথ্যা মামলার প্রবণতা কমাতে এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পারিবারিক বিরোধ থেকে সৃষ্ট মামলাগুলো দীর্ঘমেয়াদে উভয়ের জন্যই মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিকর। অনেক ক্ষেত্রে মিথ্যা মামলা দায়ের হওয়ার পরও উভয় পক্ষের আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি বা আইনজীবীদের মধ্যস্থতায় বিষয়টি আদালতের বাইরে মীমাংসা করা সম্ভব। বর্তমানে আদালতও পারিবারিক মামলাগুলোতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) বা আপোষ-মীমাংসাকে উৎসাহিত করে। স্বামী-স্ত্রী যদি পুনরায় সংসার করতে চান অথবা সম্মতির ভিত্তিতে বিবাহবিচ্ছেদ (খুলা তালাক) করতে চান, তবে একটি লিখিত চুক্তির (Terms of Settlement) মাধ্যমে ট্রাইবুনালে আপোষনামা দাখিল করে মামলাটি নিষ্পত্তি করা যায়। এতে দীর্ঘ আইনি লড়াই ও হয়রানি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
নারী নির্যাতন মামলা অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় শুরু থেকেই একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। আগাম জামিন থেকে শুরু করে চার্জ গঠন, জেরা (Cross-examination) এবং চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপন—প্রতিটি ধাপে আইনজীবীর আইনি দক্ষতা আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। মিথ্যা মামলা থেকে বাঁচতে সঠিক সময়ে সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়াই একমাত্র পথ।
আপনার আইনি সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম সর্বদা প্রস্তুত। সঠিক আইনি পরামর্শ পেতে আজই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।