নারী নির্যাতন ও যৌতুকের মিথ্যা মামলা: এজলাসে নির্দোষ প্রমাণ ও চার্জশিট বাতিলের বাস্তব কেস স্টাডি

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-13

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

পারিবারিক মনোমালিন্য থেকে হঠাৎ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) বা যৌতুক নিরোধ আইনে মিথ্যা মামলা হওয়া এখন এজলাসের নিয়মিত চিত্র। ভুয়া মামলায় ফেঁসে গেলে ঘাবড়ে না গিয়ে কীভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করবেন এবং সুপ্রিম কোর্ট থেকে মামলা বাতিল (Quashment) করবেন, তা নিয়ে বিস্তারিত গাইড। আইনি সহায়তায় <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--accent);font-weight:600;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর শরণাপন্ন হন।

বাস্তব পরিস্থিতি: যেভাবে তুচ্ছ বিরোধ রূপ নেয় যৌতুকের মামলায়

আদালতের প্র্যাকটিসে এমন বহু ঘটনার সাক্ষী হয়েছি, যেখানে স্বামী-স্ত্রীর সাধারণ দাম্পত্য কলহ কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সাথে সামান্য মতবিরোধের জেরে সোজা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১০ লাখ বা ২০ লাখ টাকা যৌতুকের মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে। মামলায় শুধু স্বামী নন, বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি এমনকি প্রবাসে থাকা দেবর-ননদকেও আসামি করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে পুরো পরিবার চরম মানসিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

সাধারণ মানুষ যেখানে মারাত্মক ভুল করে ফেলে

এমন মামলা হওয়ার পর বেশিরভাগ পরিবার ভয় পেয়ে যায় এবং প্রথম যে ভুলটি করে তা হলো—দালালদের খপ্পরে পড়ে লাখ লাখ টাকা নষ্ট করা কিংবা আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যাওয়া। অনেকে মনে করেন আপস করলেই মুক্তি মিলবে, ফলে বাধ্য হয়ে অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত করেন। মনে রাখবেন, যৌতুক ও নারী নির্যাতনের মামলা জামিন-অযোগ্য হলেও সঠিক আইনি ধারায় আগালে প্রথম দিন থেকেই আদালতের পূর্ণ সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।

তদন্ত চলাকালীন সময়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের ৩টি অব্যর্থ পদক্ষেপ

মামলা যখন তদন্তাধীন থাকে, তখন বসে না থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তার (IO) নিকট লিখিতভাবে নিজের নির্দোষিতার প্রমাণ পেশ করতে হবে:

  • অ্যালিবাই বা অনুপস্থিতির প্রমাণ (Plea of Alibi): এজাহারে যে তারিখ ও সময়ে মারধর বা যৌতুক দাবির কথা বলা হয়েছে, সেই সময় আপনি বা অন্য আসামিরা কর্মস্থলে, সিসিটিভি ফুটেজে বা অন্য কোথাও ছিলেন কি না তার দালিলিক প্রমাণ জমা দিন।
  • ডিজিটাল সাক্ষ্য সংরক্ষণ: হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, কল রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথোপকথন যাতে প্রমাণ করে যে কোনো যৌতুকের দাবি ছিল না বরং বিরোধের কারণ ভিন্ন।
  • ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড: স্ত্রীর নিয়মিত ভরণপোষণ এবং পরিবারের খরচ পাঠানোর প্রমাণ ব্যাংকিং স্টেটমেন্টের মাধ্যমে তুলে ধরুন।

চার্জশিট হয়ে গেলে ট্রাইব্যুনালে ডিসচার্জ (Discharge) আবেদনের নিয়ম

যদি পুলিশ পক্ষপাতমূলকভাবে চার্জশিট দাখিল করে ফেলে, তবুও ঘাবড়ানোর কারণ নেই। ট্রাইব্যুনালে যখন অভিযোগ গঠন (Charge Framing) শুনানি হয়, তখন ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪১(ক) বা ২৬৫(গ) ধারায় অব্যাহতি (Discharge)-র আবেদন করতে হয়। আইনজীবী যদি নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করতে পারেন যে এজাহারের অভিযোগ বানোয়াট এবং কোনো সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য নেই, তবে বিজ্ঞ আদালত বিচার শুরুর আগেই আসামিকে বেকসুর খালাস দিতে পারেন।

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ৫৬১(এ) ধারায় মামলা বাতিল (Quashment)

যদি দেখা যায় মামলাটি স্পষ্টতই হয়রানিমূলক এবং কোনো প্রাথমিক উপাদান ছাড়াই ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে দায়ের করা হয়েছে, তবে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১(এ) ধারায় কোয়াশমেন্ট (Quashment) পিটিশন ফাইল করা যায়। হাইকোর্ট বিভাগ মামলার সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত (Stay) করে দিতে পারেন এবং শুনানি শেষে সম্পূর্ণ মামলাটি বাতিল ঘোষণা করার ক্ষমতা রাখেন।

মিথ্যা মামলা প্রমাণিত হলে বাদীর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা ও ক্ষতিপূরণ

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ১৭ ধারায় এবং যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮-এর ৫ ধারায় স্পষ্ট বলা আছে—কোনো ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা দায়ের করলে বাদীর নিজেরই সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হবে। এছাড়া পেনাল কোডের ২১১ ধারায় মিথ্যা অভিযোগ দায়েরের জন্য পাল্টা মামলা ও ক্ষতিপূরণ দাবি করা যায়।

প্রয়োজনীয় আইনি ডকুমেন্টস চেকলিস্ট

মামলা লড়তে সাথে যা যা গুছিয়ে রাখবেন:

  1. মামলার সার্টিফায়েড এজাহার ও জব্দতালিকা কপি।
  2. নিকাহনামা ও কাবিননামার মূল ও সত্যায়িত কপি।
  3. অভিযুক্ত ব্যক্তিদের নিজ নিজ পেশাগত উপস্থিতি বা বিদেশ থাকার পাসপোর্ট সিল কপি।
  4. স্ত্রীকে পাঠানো ভরণপোষণের মানি রিসিট বা ব্যাংকিং ট্রানজেকশন হিস্ট্রি।