মিথ্যা যৌতুক মামলা (নারী ও শিশু ৩/৪ ধারা) থেকে বাঁচার উপায় ২০২৬ — জামিন, ডিসচার্জ ও বাদীর শাস্তি

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

<p>দাম্পত্য জীবনে সামান্য মনোমালিন্য, বনিবনা না হওয়া কিংবা বিবাহবিচ্ছেদের সময় অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় স্ত্রীর পরিবার অন্ধ আক্রোশের বশবর্তী হয়ে স্বামী এবং তার নিরপরাধ বৃদ্ধ পিতা-মাতা, ভাই-বোন এমনকি বিবাহিত ননদদের নাম জড়িয়ে থানায় বা বিজ্ঞ আদালতে একটি মারাত্মক মিথ্যা যৌতুকের মামলা দায়ের করে। অভিযোগ তোলা হয়—<em>"১০ লাখ টাকা যৌতুক না পেয়ে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে!"</em> যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮-এর ৩ ও ৪ ধারা অথবা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ১১(গ) ধারায় যখন বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনাল বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে সমন বা গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি হয়, তখন পুরো পরিবারটির সামাজিক মর্যাদা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। সরকারি বা বেসরকারি চাকরিজীবীদের চাকরি চলে যাওয়ার ভয় এবং নিরীহ বৃদ্ধ মা-বাবার জেল খাটার আতঙ্ক তৈরি হয়। কিন্তু হতাশ হবেন না; বাংলাদেশ আইন ও উচ্চ আদালত মিথ্যা যৌতুক মামলা কঠোর হস্তে দমন করার জন্য সুস্পষ্ট আইনি বিধান তৈরি করেছে। গ্রেফতার এড়িয়ে প্রথম দিনেই কীভাবে জামিন পাবেন, ট্রায়াল শুরু হওয়ার আগেই কীভাবে ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪১ক ধারায় মামলা থেকে অব্যাহতি (Discharge) পাবেন এবং মিথ্যা মামলা দায়েরের অপরাধে বাদীর ৫ বছরের জেল করাবেন—তার সম্পূর্ণ বাস্তবিক আইনি গাইডলাইন নিচে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>

যৌতুক আমাদের সমাজের একটি ঘৃণ্য সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধি দূর করার জন্য রাষ্ট্র অত্যন্ত কঠোর আইন প্রণয়ন করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে যৌতুক আইনের সিংহভাগ ব্যবহার হচ্ছে পারিবারিক ব্ল্যাকমেইলিং ও প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে। স্ত্রী যখন স্বামীর অনৈতিক কোনো দাবি না মেনে নিজে সংসার করতে চান না বা অন্য কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, তখন দেনমোহরের টাকা আদায় এবং স্বামীকে শায়েস্তা করার জন্য মিথ্যা যৌতুক মামলা দায়ের করা একটি নিয়মিত ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে।

মামলার এজাহারে প্রায়ই দেখা যায় অবাস্তব ও কল্পিত নাটক: যে শাশুড়ি বিছানা থেকে উঠতে পারেন না, তার বিরুদ্ধেও চুল ধরে মারার অভিযোগ আনা হয়; যে ননদ বহু দূরে শ্বশুরবাড়িতে থাকেন, তাকেও মারধরের প্রধান সহযোগী বানিয়ে আসামি করা হয়। এই ধরনের বানোয়াট মামলায় আতঙ্কিত হয়ে ভুল পদক্ষেপ নিলে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। সঠিক আইনি পথে লড়াই করলে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমেই এই মিথ্যা অভিযোগের মুখোশ উন্মোচন করা সম্ভব।

২০১৮ সালের নতুন যৌতুক নিরোধ আইনে যৌতুক দাবি করা এবং যৌতুক প্রদান করা উভয়কেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে:

  • ধারা ৩ (যৌতুক দাবি করার অপরাধ): প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিবাহ বহাল থাকাকালে কোনো পক্ষ যৌতুক দাবি করলে সে অনধিক ৫ বছর কিন্তু ন্যূনতম ১ বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
  • ধারা ৪ (যৌতুক গ্রহণ বা প্রদানের অপরাধ): বর বা কনে পক্ষের কেউ যৌতুক গ্রহণ বা প্রদান করলে সমপরিমাণ শাস্তির বিধান রয়েছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তির বিষয় হলো—যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮-এর অধীনে দায়েরকৃত মামলা ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় জামিনযোগ্য (Bailable) এবং আপসযোগ্য (Compoundable)। অর্থাৎ বিজ্ঞ আদালতে যথানিয়মে হাজির হলে আসামির তাৎক্ষণিক জামিন লাভ আইনত নিশ্চিত।

অনেক চতুর বাদী যৌতুক নিরোধ আইনে জামিন হয়ে যায় দেখে দ্রুত বিজ্ঞ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে গিয়ে ১১(গ) ধারায় (যৌতুকের জন্য সাধারণ জখম) পিটিশন দায়ের করেন।

⚖️ ধারা ১১(গ) মামলার আইনি বাস্তবতা ও জামিন নীতি

নারী ও শিশু আইনের ১১(গ) ধারা সাধারণত জামিন-অযোগ্য হিসেবে গণ্য হলেও সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নীতিমালার আলোকে এটি একটি লঘুতর অপরাধ। এই ধারায় কোনো মারাত্মক অঙ্গহানি বা রক্তপাতের বিষয় থাকে না। বাদী যদি কোনো রেজিস্টার্ড সরকারি হাসপাতালের খাঁটি ইনজুরি সার্টিফিকেট (Injury Certificate) দাখিল করতে ব্যর্থ হন এবং কেবল প্রাথমিক প্রেসক্রিপশন দিয়ে মামলা করেন, তবে বিজ্ঞ ট্রাইব্যুনাল আসামিপক্ষের যুক্তিসঙ্গত বক্তব্য ও ওকালতনামা দেখে প্রথম বা দ্বিতীয় শুনানিতেই আসামির নিয়মিত জামিন মঞ্জুর করে থাকেন।

মামলার নোটিশ বা ওয়ারেন্টের খবর পাওয়া মাত্রই পরিবারের করণীয়:

  1. আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও বাকবিতণ্ডা বর্জন: শ্বশুরবাড়ি গিয়ে গালিগালাজ বা হুমকি দিতে যাবেন না; এতে তারা সেই কথোপকথন রেকর্ড করে অতিরিক্ত ফৌজদারি মামলা ঠুকে দিতে পারে।
  2. মামলার মূল আরজি ও এফআইআর সংগ্রহ: জজ কোর্টের অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীর মাধ্যমে মামলার সিআর বা জিআর নম্বর ও অভিযোগের অবিকল নকল তুলুন।
  3. আসামিদের তালিকা পরীক্ষা: মামলায় বৃদ্ধ মা-বাবা, গর্ভবতী বোন বা প্রবাসে থাকা ভাইদের নাম আছে কিনা তা চিহ্নিত করুন।
  4. আদালতে তাৎক্ষণিক উপস্থিতির প্রস্তুতি: পুলিশি গ্রেফতার এড়াতে বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে সমন্বয় করে জামিনের আবেদন ফাইল করুন।

যদি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে থানায় সরাসরি এফআইআর হয় এবং পুলিশ বাড়িতে এসে গ্রেফতারের হুমকি দেয়, তবে সময়ক্ষেপণ না করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে উপস্থিত হয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় "আগাম জামিন" (Anticipatory Bail) গ্রহণ করুন।

হাইকোর্ট সাধারণত পরিবারের বৃদ্ধ পিতা-মাতা ও নারীদের কোনো শর্ত ছাড়াই তাৎক্ষণিক ৪ থেকে ৮ সপ্তাহের আগাম জামিন মঞ্জুর করেন এবং স্বামীকে সুরক্ষার আদেশ দেন। হাইকোর্টের আদেশ হাতে থাকলে স্থানীয় পুলিশ কাউকে আর গ্রেফতার করতে পারে না।

আদালতের সমন পেলে নির্দিষ্ট তারিখে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হয়। জামিনের শুনানির সময় আইনজীবী তুলে ধরবেন যে: আসামি সম্মানিত নাগরিক, ঘটনার দিনে যৌতুকের কোনো দাবি ছিল না, এটি নিছক পারিবারিক বিরোধ এবং পারিবারিক আদালতে দেনমোহরের মামলা করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও হয়রানির উদ্দেশ্যে এই ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। আদালত স্থানীয় উপযুক্ত জামিনদারের মুচলেকায় আসামিদের জামিন মঞ্জুর করবেন।

মিথ্যা মামলাকে গোড়াতেই ধ্বংস করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো দালিলিক প্রমাণ (Alibi Evidence):

  • উপস্থিত না থাকার প্রমাণ: এজাহারে যে তারিখ ও সময়ে যৌতুকের দাবিতে মারধরের কথা বলা হয়েছে, সেই সময় স্বামী বা তার আত্মীয়রা যদি অফিসে, হাসপাতালে বা ভিন্ন শহরে থাকেন, তবে তার বায়োমেট্রিক অ্যাটেনডেন্স, ট্রেনের টিকিট বা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করুন।
  • ব্যাংকিং ও আর্থিক সচ্ছলতার রেকর্ড: স্বামীর নিজস্ব ভালো আয় বা সম্পত্তি রয়েছে যা প্রমাণ করে যে তিনি কোনো যৌতুকের ওপর নির্ভরশীল নন।
  • স্ত্রীর সাথে কথোপকথন: চ্যাট হিস্ট্রি বা অডিও রেকর্ডে যদি দেখা যায় বিবাদের কারণ যৌতুক নয় বরং অন্য কোনো ব্যক্তিগত বিষয়, তবে তা আদালতের সামনে উপস্থাপন করুন।

অনেকেই ভাবেন মামলা হলেই বুঝি বছরের পর বছর সাক্ষ্য ও বিচার চলবে। বাস্তবতা হলো—চার্জ গঠনের দিনেই মামলা শেষ করে দেওয়া যায়।

ফৌজদারি কার্যবিধির ২৪১ক ধারা (ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে) অথবা ২৬৫সি ধারা (দায়রা আদালতে) অনুযায়ী চার্জ গঠনের তারিখে আসামির আইনজীবী একটি শক্তিশালী "অব্যাহতির দরখাস্ত" (Discharge Application) দাখিল করবেন। বিজ্ঞ আদালত আরজি ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে যদি দেখেন যে যৌতুকের দাবির পক্ষে কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই এবং অভিযোগটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও হয়রানিমূলক, তবে আদালত কোনো সাক্ষ্যগ্রহণ ছাড়াই আসামিকে মামলা থেকে সম্পূর্ণ খালাস বা অব্যাহতি (Discharge) প্রদান করে মামলাটি চিরতরে সমাপ্ত করে দেন।

যদি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত স্পষ্ট মিথ্যা মামলা সত্ত্বেও ডিসচার্জ না দিয়ে চার্জ গঠন করে ফেলেন, তবে আসামিপক্ষ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১ক ধারা (Section 561A CrPC) মতে "কোয়াশমেন্ট পিটিশন" (Quashment Petition) দায়ের করতে পারেন। হাইকোর্ট বেঞ্চ নথিপত্র পর্যালোচনা করে বিচারিক আদালতের কার্যক্রমের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ (Stay Order) দেন এবং পরবর্তীতে মামলাটিকে আইনের অপব্যবহার (Abuse of Court Process) ঘোষণা করে সম্পূর্ণ বাতিল করে দেন।

মিথ্যা মামলা থেকে খালাস পাওয়ার পর চুপ করে বসে থাকবেন না। আইন আপনাকে মিথ্যা মামলাকারীর বিরুদ্ধে চরম শাস্তির হাতিয়ার দিয়েছে।

⚖️ ধারা ৬: মিথ্যা অভিযোগকারীর ৫ বছর কারাদণ্ড

যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮-এর ৬ ধারায় বলা হয়েছে: "যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্যে এই আইনের অধীন কোনো মামলা করিবার কোনো আইনানুগ ভিত্তি নাই জানিয়াও কোনো মিথ্যা অভিযোগ বা মামলা দায়ের করেন, তবে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।" অব্যাহতি পাওয়ার পর বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই ধারায় মামলা দায়ের করে মিথ্যা বাদীকে সরাসরি জেলে পাঠানো যায় এবং দণ্ডবিধির ২১১ ধারা ও দেওয়ানি আদালতে মানহানির কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করা যায়।

মিথ্যা যৌতুক মামলা দমন সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের পথপ্রদর্শক রায়সমূহ:

১. মোঃ মিজানুর রহমান বনাম রাষ্ট্র (52 DLR): সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, নিছক পারিবারিক বিরোধ বা দেনমোহরের দেনাপাওনাকে যৌতুকের মোড়কে ফেলে ফৌজদারি আদালতে টানাহেঁচড়া করা আদালতের প্রক্রিয়ার চরম অপব্যবহার; এমন মামলা হাইকোর্ট তাৎক্ষণিক বাতিল করবেন।

২. শামসুল আলম বনাম রাষ্ট্র (48 DLR AD): আপিল বিভাগ পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, যৌতুকের অভিযোগে পরিবারের দূরবর্তী আত্মীয়দের উদ্দেশ্যমূলকভাবে জড়ানো হলে আদালত তাদের প্রথম শুনানিতেই ডিসচার্জ প্রদান করবেন।

মিথ্যা মামলাকে ভয় পেয়ে কোনো অন্যায় আপস বা অর্থ দাবির কাছে মাথা নত করবেন না। আপনি যখন আপস করতে যাবেন, প্রতিপক্ষ ভাববে আপনি অপরাধী। মাথা উঁচু রেখে আইনের পথে লড়াই করুন। অভিজ্ঞ ফৌজদারি আইনজীবীর মাধ্যমে উপযুক্ত সময়ে আগাম জামিন গ্রহণ করুন, নির্দোষ প্রমাণের নথি উপস্থাপন করে ধারা ২৪১ক মতে ডিসচার্জের শুনানি করান এবং খালাস পাওয়ার পর ধারা ৬ অনুযায়ী মিথ্যা বাদীর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দায়ের করুন। আইনের কঠোর পথই আপনার পারিবারিক সম্মান শতভাগ পুনর্বহাল করবে।