মৃত বাবার সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক নিয়ম ২০২৬ — ফারায়েজ হিসাব, নাতি-নাতনির অধিকার ও ওয়ারিশ বণ্টন

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

<p>পিতার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া জমিজমা, বাড়ি ও ব্যাংক একাউন্টের বণ্টন নিয়ে পরিবারে বিরোধ দেখা দেওয়া আমাদের সমাজের একটি অতি সাধারণ কিন্তু বেদনাদায়ক বাস্তবতা। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ ও কোরআনিক ফারায়েজ নীতি অনুযায়ী মৃত বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভাইয়েরা বোনদের বঞ্চিত করে বা পিতার জীবদ্দশায় মৃত ভাইয়ের সন্তানদের (নাতি-নাতনিদের) অংশ দিতে চায় না। বাবার সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক আইন ও বণ্টননামা দলিলের ধাপগুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। আইনি পরামর্শে: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>

ইসলামিক আইন ও বাংলাদেশের দেওয়ানি উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, পিতা মৃত্যুবরণ করলেই সঙ্গে সঙ্গে পুরো সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে ভাগ করা যায় না। ফারায়েজ বণ্টনের পূর্বে ৪টি কাজ ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হয়:

  1. কাফন ও দাফনের খরচ: মৃত ব্যক্তির নিজস্ব সম্পদ থেকে স্বাভাবিক কাফন-দাফনের খরচ নির্বাহ করা।
  2. ঋণ বা দেনা পরিশোধ: পিতা কোনো ব্যাংক লোন বা ব্যক্তিগত ঋণ রেখে গেলে তা আগে পরিশোধ করতে হবে।
  3. স্ত্রীর বকেয়া দেনমোহর: মৃত ব্যক্তির স্ত্রীর দেনমোহর যদি জীবদ্দশায় পরিশোধ না করা হয়ে থাকে, তবে তা অগ্রাধিকারযোগ্য ঋণ হিসেবে সম্পত্তির মূল অংশ থেকে পরিশোধ করতে হবে।
  4. বৈধ উইল বা অসিয়ত কার্যকর: মৃত ব্যক্তি যদি কোনো অ-ওয়ারিশের অনুকূলে কোনো অসিয়ত করে যান, তবে ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) পর্যন্ত সেই অসিয়ত পূরণ করতে হবে।

উপরোক্ত ৪টি দায় মেটানোর পর যে নিট সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে, শুধুমাত্র সেটিই ফারায়েজ অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে।

মৃত ব্যক্তির স্ত্রীর অংশ পবিত্র কোরআনে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত (জাবিল ফুরুজ বা নির্দিষ্ট অংশীদার):

📌 স্ত্রীর অংশ নির্ধারণের মূল নিয়ম

  • সন্তান থাকলে: যদি মৃত স্বামীর কোনো সন্তান (ছেলে বা মেয়ে বা তাদের বংশধর) থাকে, তবে স্ত্রী পাবেন মোট সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ বা আট ভাগের এক ভাগ (১/৮ অংশ)। একাধিক স্ত্রী থাকলে তারা সকলে মিলে এই এক-অষ্টমাংশ সমানভাবে ভাগ করে নেবেন।
  • সন্তান না থাকলে: যদি মৃত স্বামীর কোনো সন্তানাদি না থাকে, তবে স্ত্রী পাবেন মোট সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ বা চার ভাগের এক ভাগ (১/৪ অংশ)।

স্ত্রীর এক-অষ্টমাংশ অংশ বাদ দেওয়ার পর বাকি সাত-অষ্টমাংশ (৭/৮ অংশ) সম্পত্তি আসাবা (অবশিষ্টভোগী) হিসেবে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বণ্টিত হয়। কোরআনের সূরা নিসার ১১ নম্বর আয়াত অনুযায়ী—১ জন ছেলে পাবে ২ জন মেয়ের সমান অংশ।

💡 বাস্তব উদাহরণ: মা, ২ ছেলে ও ১ মেয়ে ওয়ারিশ থাকলে

  • মা পাবেন = ১/৮ অংশ (বা ৫/৪০ অংশ)।
  • অবশিষ্ট থাকে = ৭/৮ অংশ (বা ৩৫/৪০ অংশ)।
  • যেহেতু ২ ছেলে ও ১ মেয়ে, তাই মোট শেয়ার সংখ্যা = (২ × ২) + ১ = ৫টি শেয়ার।
  • প্রতিটি মেয়ের শেয়ার = ৩৫ ÷ ৫ = ৭/৪০ অংশ।
  • প্রতিটি ছেলের শেয়ার = ৭ × ২ = ১৪/৪০ অংশ।
  • যাচাই: মা ৫/৪০ + ছেলে-১ ১৪/৪০ + ছেলে-২ ১৪/৪০ + মেয়ে ৭/৪০ = ৪০/৪০ = ১০০%!

প্রাচীন ফিকহ শাস্ত্রে নিয়ম ছিল যে পিতা বেঁচে থাকতে কোনো সন্তান মারা গেলে সেই সন্তানের ছেলে-মেয়েরা তাদের দাদার সম্পত্তিতে কোনো অংশ পেত না, কারণ জীবিত চাচারা তাদের বঞ্চিত করত।

কিন্তু বাংলাদেশে এই অমানবিক প্রথা দূর করার জন্য মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961)-এর ৪ ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী:

📜 ৪ ধারার ঐতিহাসিক বিধান

পিতার মৃত্যুর পূর্বে যদি তার কোনো ছেলে বা মেয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তবে উক্ত মৃত ছেলে বা মেয়ে বেঁচে থাকলে পিতার সম্পত্তিতে যে অংশ পেতেন, তাদের সন্তানরা (অর্থাৎ নাতি-নাতনিরা) হুবহু সেই সম্পূর্ণ অংশ সমহারে লাভ করবেন। চাচা বা ফুফুরা তাদের কোনোভাবেই বঞ্চিত করতে পারবেন না।

যদি কোনো ব্যক্তির কেবল কন্যাসন্তান থাকে (কোনো ছেলে সন্তান না থাকে), তবে ফারায়েজ হিসাব নিম্নরূপ হয়:

  • একক কন্যাসন্তান: যদি কেবল ১ জন মেয়ে থাকে, তবে সে পাবে মোট সম্পত্তির অর্ধেক (১/২ অংশ)।
  • একাধিক কন্যাসন্তান: যদি ২ বা ততোধিক মেয়ে থাকে, তবে তারা সকলে মিলে মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩ অংশ) সমানভাবে ভাগ করে নেবে।
  • অবশিষ্ট অংশ: স্ত্রীর অংশ এবং মেয়েদের অংশ দেওয়ার পর যে অবশিষ্ট সম্পত্তি থাকবে, তা আসাবা হিসেবে মৃত ব্যক্তির পিতা, চাচা বা ভাইদের মধ্যে যাবে (রদ্দ বা আউলের হিসাব সাপেক্ষে)।

আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভাইয়েরা বাবার ভিটেমাটি বা মূল্যবান জমি এককভাবে দখল করে রাখে এবং বোনদের ফাঁকি দেওয়ার জন্য মিথ্যা মৌখিক হেবা বা ভুয়া দলিল প্রদর্শন করে।

আইন অনুযায়ী পৈত্রিক সম্পত্তিতে ভাই ও বোনের অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত। ভাইয়েরা জমি না দিলে বোনেরা সহকারী জজ আদালতে "বাটোয়ারা মোকদ্দমা" (Partition Suit) দায়ের করতে পারেন। আদালত অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করে ফিতা দিয়ে মেপে বোনের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে পৃথক সাহাম (লট) নির্ধারণ করে দেন।

ওয়ারিশরা যদি পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে জমি ভাগ করে নিতে চান, তবে মুখে মুখে ভাগ করা বা স্ট্যাম্পে আপসনামা লেখা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের বিধান মতে, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে ওয়ারিশন সনদ (Succession Certificate) গ্রহণ করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রি আপস বণ্টননামা দলিল (Partition Deed) সম্পাদন করতে হবে। এরপর সেই দলিলের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে আবেদন করে প্রত্যেকের নামে পৃথক পৃথক ই-নামজারি খতিয়ান তৈরি করতে হবে।

⚖️ পৈত্রিক সম্পত্তি বিরোধ নিষ্পত্তিতে সরাসরি পরামর্শ নিন

ফারায়েজ হিসাবের নিখুঁত ক্যালকুলেশন, আপস বণ্টননামা দলিল প্রস্তুত কিংবা আদালতে বাটোয়ারা মামলা সফলভাবে পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলমের সরাসরি দিকনির্দেশনা গ্রহণ করুন।

📞 সরাসরি কল: 01712655546 💬 WhatsApp পরামর্শ 📍 চেম্বার ঠিকানা

আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, পিতা বার্ধক্যে উপনীত হলে কোনো এক চতুর সন্তান অন্য ভাই-বোনদের অগোচরে ভুল বুঝিয়ে বা চাপের মুখে পুরো সম্পত্তি নিজের নামে হেবা বা রেজিস্ট্রি করিয়ে নেন।

⚖️ অবৈধ দলিল বাতিলের দেওয়ানি মোকদ্দমা

পিতার মৃত্যুর পর বঞ্চিত অন্যান্য ওয়ারিশরা দেওয়ানি যুগ্ম জেলা জজ আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী উক্ত হেবা বা বিক্রয় দলিল বাতিলের মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন। যদি প্রমাণ করা যায় যে পিতা মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম ছিলেন (Undue Influence) বা দখলের হস্তান্তর ঘটেনি, তবে আদালত জালিয়াতিপূর্ণ দলিল সরাসরি বাতিল ঘোষণা করেন এবং ফারায়েজ অনুযায়ী সকল সন্তানের হিস্যা পুনর্বহাল করেন।

পিতার রেখে যাওয়া জমি কোনো ভাই বা বোন যদি অন্য ভাইদের না জানিয়ে বাইরের কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করে দেয়, তবে অন্যান্য সহ-শরিকরা রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা অনুযায়ী সহকারী জজ আদালতে অগ্রক্রয়াধিকার বা প্রি-ইম্পশন মোকদ্দমা করতে পারেন। আইনের বিধান অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে বাইরের ক্রেতার টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে উক্ত জমি নিজেদের অধিকারে ফিরিয়ে আনা যায়।

অনেকেই মনে করেন, পিতা রেগে গিয়ে কোনো সন্তানকে "ত্যাজ্য পুত্র" বা "ত্যাজ্য কন্যা" ঘোষণা করে সম্পত্তি থেকে চিরতরে বেদখল করতে পারেন। এটি আইনত সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ধারণা।

📜 ত্যাজ্য করার কোনো আইনি বৈধতা নেই

বাংলাদেশে কোনো নোটারি এফিডেভিট বা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কোনো সন্তানকে ত্যাজ্য করা যায় না; পিতার মৃত্যুর পর আইনত সকল সন্তানই ফারায়েজ অনুযায়ী ওয়ারিশ হবেন। তবে পিতা যদি জীবদ্দশায় সুস্থ মস্তিষ্কে কাউকে রেজিস্ট্রি দানপত্র বা হেবা করে দখল বুঝিয়ে দেন, কেবল তখনই সেই হস্তান্তরিত অংশ মূল ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে বাদ যাবে। মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার জন্য কোনো অসিয়ত করলে তা ওয়ারিশদের সম্মতি ব্যতিরেকে মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি বৈধ হয় না।

পিতা মারা যাওয়ার পর শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বিঘ্নে সম্পত্তি হস্তান্তরে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা উচিত:

  1. ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশন কাউন্সিলর অফিস থেকে মূল ওয়ারিশন সনদ (Succession Certificate) সংগ্রহ।
  2. পিতার নামে থাকা সকল খতিয়ান, পর্চা, ডিসিআর ও খাজনার দাখিলা একত্রিত করে ভূমি অফিসে মূল মালিকানা তল্লাশ।
  3. পারিবারিক বৈঠকে বিজ্ঞ আইনজীবীর উপস্থিতিতে সরকারি সার্ভেয়ার দিয়ে জমি পরিমাপ করে সীমানা নির্ধারণ।
  4. সকল ভাই-বোন ও মায়ের সশরীরে উপস্থিতিতে রেজিস্ট্রি আপস বণ্টননামা দলিল সম্পাদন।
  5. প্রত্যেকের নামে পৃথক খারিজ বা ই-নামজারি খতিয়ান তৈরি করে সরকারের হালনাগাদ খাজনা পরিশোধ করা।

অনেক পরিবারে মৃত পিতার এক বা একাধিক সন্তান বিদেশে কর্মরত থাকেন। প্রবাসে অবস্থানকালে দেশে বাবার জমিজমা বণ্টন বা বিক্রি করতে হলে দ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২-এর বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের কনস্যুলার কর্মকর্তার সামনে উপস্থিত হয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে হয়। এরপর উক্ত দলিলটি বাংলাদেশে এনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের (DC) কার্যালয় থেকে স্ট্যাম্প শুল্ক যুক্ত করে রেজিস্ট্রিভুক্ত করাতে হয়। উপযুক্ত পাওয়ার ছাড়া প্রবাসে থাকা ভাই বা বোনের পক্ষে দেশে থাকা অন্য ভাইয়েরা কোনো সম্পত্তি বিক্রি বা নামজারি করতে পারেন না; করলে তা দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৭ ধারায় জালিয়াতি ও বাতিলযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে।