লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>পিতার মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া জমিজমা, বাড়ি ও ব্যাংক একাউন্টের বণ্টন নিয়ে পরিবারে বিরোধ দেখা দেওয়া আমাদের সমাজের একটি অতি সাধারণ কিন্তু বেদনাদায়ক বাস্তবতা। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ ও কোরআনিক ফারায়েজ নীতি অনুযায়ী মৃত বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভাইয়েরা বোনদের বঞ্চিত করে বা পিতার জীবদ্দশায় মৃত ভাইয়ের সন্তানদের (নাতি-নাতনিদের) অংশ দিতে চায় না। বাবার সম্পত্তি বণ্টনের সঠিক আইন ও বণ্টননামা দলিলের ধাপগুলো বিস্তারিত তুলে ধরা হলো। আইনি পরামর্শে: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
ইসলামিক আইন ও বাংলাদেশের দেওয়ানি উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, পিতা মৃত্যুবরণ করলেই সঙ্গে সঙ্গে পুরো সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে ভাগ করা যায় না। ফারায়েজ বণ্টনের পূর্বে ৪টি কাজ ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করতে হয়:
উপরোক্ত ৪টি দায় মেটানোর পর যে নিট সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে, শুধুমাত্র সেটিই ফারায়েজ অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ হবে।
মৃত ব্যক্তির স্ত্রীর অংশ পবিত্র কোরআনে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত (জাবিল ফুরুজ বা নির্দিষ্ট অংশীদার):
স্ত্রীর এক-অষ্টমাংশ অংশ বাদ দেওয়ার পর বাকি সাত-অষ্টমাংশ (৭/৮ অংশ) সম্পত্তি আসাবা (অবশিষ্টভোগী) হিসেবে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বণ্টিত হয়। কোরআনের সূরা নিসার ১১ নম্বর আয়াত অনুযায়ী—১ জন ছেলে পাবে ২ জন মেয়ের সমান অংশ।
প্রাচীন ফিকহ শাস্ত্রে নিয়ম ছিল যে পিতা বেঁচে থাকতে কোনো সন্তান মারা গেলে সেই সন্তানের ছেলে-মেয়েরা তাদের দাদার সম্পত্তিতে কোনো অংশ পেত না, কারণ জীবিত চাচারা তাদের বঞ্চিত করত।
কিন্তু বাংলাদেশে এই অমানবিক প্রথা দূর করার জন্য মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ (Muslim Family Laws Ordinance, 1961)-এর ৪ ধারা সংযোজন করা হয়েছে। এই ধারা অনুযায়ী:
পিতার মৃত্যুর পূর্বে যদি তার কোনো ছেলে বা মেয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তবে উক্ত মৃত ছেলে বা মেয়ে বেঁচে থাকলে পিতার সম্পত্তিতে যে অংশ পেতেন, তাদের সন্তানরা (অর্থাৎ নাতি-নাতনিরা) হুবহু সেই সম্পূর্ণ অংশ সমহারে লাভ করবেন। চাচা বা ফুফুরা তাদের কোনোভাবেই বঞ্চিত করতে পারবেন না।
যদি কোনো ব্যক্তির কেবল কন্যাসন্তান থাকে (কোনো ছেলে সন্তান না থাকে), তবে ফারায়েজ হিসাব নিম্নরূপ হয়:
আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভাইয়েরা বাবার ভিটেমাটি বা মূল্যবান জমি এককভাবে দখল করে রাখে এবং বোনদের ফাঁকি দেওয়ার জন্য মিথ্যা মৌখিক হেবা বা ভুয়া দলিল প্রদর্শন করে।
আইন অনুযায়ী পৈত্রিক সম্পত্তিতে ভাই ও বোনের অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত। ভাইয়েরা জমি না দিলে বোনেরা সহকারী জজ আদালতে "বাটোয়ারা মোকদ্দমা" (Partition Suit) দায়ের করতে পারেন। আদালত অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগ করে ফিতা দিয়ে মেপে বোনের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে পৃথক সাহাম (লট) নির্ধারণ করে দেন।
ওয়ারিশরা যদি পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে জমি ভাগ করে নিতে চান, তবে মুখে মুখে ভাগ করা বা স্ট্যাম্পে আপসনামা লেখা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের বিধান মতে, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা থেকে ওয়ারিশন সনদ (Succession Certificate) গ্রহণ করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রি আপস বণ্টননামা দলিল (Partition Deed) সম্পাদন করতে হবে। এরপর সেই দলিলের ভিত্তিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে আবেদন করে প্রত্যেকের নামে পৃথক পৃথক ই-নামজারি খতিয়ান তৈরি করতে হবে।
ফারায়েজ হিসাবের নিখুঁত ক্যালকুলেশন, আপস বণ্টননামা দলিল প্রস্তুত কিংবা আদালতে বাটোয়ারা মামলা সফলভাবে পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলমের সরাসরি দিকনির্দেশনা গ্রহণ করুন।
আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, পিতা বার্ধক্যে উপনীত হলে কোনো এক চতুর সন্তান অন্য ভাই-বোনদের অগোচরে ভুল বুঝিয়ে বা চাপের মুখে পুরো সম্পত্তি নিজের নামে হেবা বা রেজিস্ট্রি করিয়ে নেন।
পিতার মৃত্যুর পর বঞ্চিত অন্যান্য ওয়ারিশরা দেওয়ানি যুগ্ম জেলা জজ আদালতে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী উক্ত হেবা বা বিক্রয় দলিল বাতিলের মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন। যদি প্রমাণ করা যায় যে পিতা মানসিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম ছিলেন (Undue Influence) বা দখলের হস্তান্তর ঘটেনি, তবে আদালত জালিয়াতিপূর্ণ দলিল সরাসরি বাতিল ঘোষণা করেন এবং ফারায়েজ অনুযায়ী সকল সন্তানের হিস্যা পুনর্বহাল করেন।
পিতার রেখে যাওয়া জমি কোনো ভাই বা বোন যদি অন্য ভাইদের না জানিয়ে বাইরের কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করে দেয়, তবে অন্যান্য সহ-শরিকরা রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ৯৬ ধারা অনুযায়ী সহকারী জজ আদালতে অগ্রক্রয়াধিকার বা প্রি-ইম্পশন মোকদ্দমা করতে পারেন। আইনের বিধান অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে বাইরের ক্রেতার টাকা ব্যাংকে জমা দিয়ে উক্ত জমি নিজেদের অধিকারে ফিরিয়ে আনা যায়।
অনেকেই মনে করেন, পিতা রেগে গিয়ে কোনো সন্তানকে "ত্যাজ্য পুত্র" বা "ত্যাজ্য কন্যা" ঘোষণা করে সম্পত্তি থেকে চিরতরে বেদখল করতে পারেন। এটি আইনত সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ধারণা।
বাংলাদেশে কোনো নোটারি এফিডেভিট বা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে কোনো সন্তানকে ত্যাজ্য করা যায় না; পিতার মৃত্যুর পর আইনত সকল সন্তানই ফারায়েজ অনুযায়ী ওয়ারিশ হবেন। তবে পিতা যদি জীবদ্দশায় সুস্থ মস্তিষ্কে কাউকে রেজিস্ট্রি দানপত্র বা হেবা করে দখল বুঝিয়ে দেন, কেবল তখনই সেই হস্তান্তরিত অংশ মূল ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে বাদ যাবে। মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার জন্য কোনো অসিয়ত করলে তা ওয়ারিশদের সম্মতি ব্যতিরেকে মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশের বেশি বৈধ হয় না।
পিতা মারা যাওয়ার পর শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বিঘ্নে সম্পত্তি হস্তান্তরে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা উচিত:
অনেক পরিবারে মৃত পিতার এক বা একাধিক সন্তান বিদেশে কর্মরত থাকেন। প্রবাসে অবস্থানকালে দেশে বাবার জমিজমা বণ্টন বা বিক্রি করতে হলে দ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন ২০১২-এর বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের কনস্যুলার কর্মকর্তার সামনে উপস্থিত হয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদন করতে হয়। এরপর উক্ত দলিলটি বাংলাদেশে এনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের (DC) কার্যালয় থেকে স্ট্যাম্প শুল্ক যুক্ত করে রেজিস্ট্রিভুক্ত করাতে হয়। উপযুক্ত পাওয়ার ছাড়া প্রবাসে থাকা ভাই বা বোনের পক্ষে দেশে থাকা অন্য ভাইয়েরা কোনো সম্পত্তি বিক্রি বা নামজারি করতে পারেন না; করলে তা দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৭ ধারায় জালিয়াতি ও বাতিলযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে।