লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06
<p>পরিবারে পিতার অকালমৃত্যুর পর রেখে যাওয়া নাবালক বা এতিম সন্তানদের জমিজমা নিয়ে আমাদের সমাজে হরহামেশাই নির্মম শোষণ ঘটে থাকে। দেখা যায় নাবালক সন্তানের মা বা চতুর চাচা-জেঠারা নিজেদের খরচের অজুহাতে বিজ্ঞ আদালতের কোনো প্রকার পূর্বানুমতি ছাড়াই নাবালকের সম্পত্তি কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে গোপনে বিক্রি (Kabala) করে দেন। পরবর্তীতে সন্তানরা যখন ১৮ বছর পূর্ণ করে সাবালক হয়, তখন তারা এসে দেখে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি অন্যের দখলে চলে গেছে। অসহায় তরুণরা তখন প্রশ্ন তোলেন—<em>"আমি যখন নাবালক ছিলাম, তখন আমার মা বা চাচা যে জমি বিক্রি করেছিলেন, তা কি আইনত বৈধ? আমি কি সেই জমি এখন ফেরত পেতে পারি? এবং নাবালকের জমি বিক্রি করার আসলে সঠিক আইনি নিয়ম কী?"</em> দ্য গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট ১৮৯০ (The Guardians and Wards Act, 1890) এবং মুসলিম আইন নাবালকদের সম্পত্তি রক্ষায় পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোরতম বর্ম নির্মাণ করেছে। বিজ্ঞ জেলা জজ আদালতের পূর্বানুমতি ছাড়া বিক্রিত সমস্ত দলিল আইনের চোখে সম্পূর্ণ শূন্য ও অবৈধ (Void ab initio)। কীভাবে সাবালক হওয়ার পর সেই জমি পুনরুদ্ধার করবেন এবং আইনসঙ্গতভাবে বিক্রি করার সঠিক প্রক্রিয়া কী—তার বিস্তারিত রোডম্যাপ নিচে উপস্থাপন করা হলো। বিশেষ আইনি সহযোগিতায়: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
সাবালকত্ব আইন ১৮৭৫ (The Majority Act, 1875) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির বয়স ১৮ (আঠারো) বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে আইনের চোখে নাবালক (Minor) হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে কোনো নাবালকের ব্যক্তি ও সম্পত্তির জন্য যদি আদালত কর্তৃক অভিভাবক নিযুক্ত করা হয়, তবে তার ক্ষেত্রে সাবালকত্বের বয়স হবে ২১ (একুশ) বছর।
আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—নাবালক নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে অক্ষম। তাই রাষ্ট্র এবং আদালত নাবালকের অভিভাবক (Parens Patriae) হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যেন অসদুপায়ে বা মিথ্যা অজুহাতে নাবালকের ভবিষ্যৎ সম্পত্তি আত্মসাৎ করতে না পারে, সে জন্যই আইনে প্রতিটি পদক্ষেপে আদালতের কঠোর অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মুসলিম আইন অনুযায়ী নাবালকের সম্পত্তির আইনগত অভিভাবকত্বের একটি সুনির্দিষ্ট ক্রম রয়েছে:
উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি—এমনকি মা, আপন ভাই বা চাচাও—মুসলিম আইনে নাবালকের সম্পত্তির আইনগত অভিভাবক নন।
আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি জমি বিক্রি হয় মায়ের স্বাক্ষরে। বাবা মারা যাওয়ার পর মা নাবালক সন্তানদের সাথে নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে সাফ-কবলা দলিলে সই করে জমি বিক্রি করে দেন। ক্রেতারাও ভাবেন "মায়ের চেয়ে আপন তো আর কেউ নেই, মা যখন সই করেছে তখন দলিল পাকা!"
মুসলিম আইনে মা হলেন কেবল নাবালকের শরীরের জিম্মাদার (Custody or Hizanat)। মা কখনোই নাবালকের সম্পত্তির আইনগত অভিভাবক (Legal Guardian of Property) নন। মা যদি বিজ্ঞ জেলা জজ আদালতের আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া নাবালকের অংশের জমি বিক্রি করেন, তবে সেই দলিল আইনের চোখে সম্পূর্ণ মূল্যহীন, অবৈধ ও বাতিল (Void ab initio)। সন্তানরা সাবালক হয়ে আদালতে দাঁড়ালে ক্রেতার সেই দলিল এক ফুঁতে উড়ে যাবে।
নাবালকের জমি আইনসঙ্গতভাবে বিক্রি বা পরিচালনা করতে হলে প্রথমে যা করতে হবে তা হলো—১৮৯০ সালের অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন (The Guardians and Wards Act, 1890)-এর ১০ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলার বিজ্ঞ জেলা জজ আদালতে (District Judge Court) অভিভাবক নিয়োগের মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে।
আদালত আবেদনকারীর সততা, নাবালকের সাথে রক্তের সম্পর্ক এবং নাবালকের কল্যাণ বিবেচনা করে তদন্ত শেষে মা বা অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকে নাবালকের সম্পত্তির "আইনগত অভিভাবক" (Court Guardian) হিসেবে ঘোষণা করে সার্টিফিকেট প্রদান করবেন।
অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ পেলেও অভিভাবক নিজের ইচ্ছামতো জমি বিক্রি করতে পারেন না। ১৮৯০ সালের আইনের ২৯ ধারা অনুযায়ী অভিভাবককে জমি বিক্রির জন্য আদালতে পৃথকভাবে "বিক্রয়ের পূর্বানুমতির দরখাস্ত" (Permission to Sell Minor's Property) পেশ করতে হয়।
বিজ্ঞ জেলা জজ আদালত নাজির বা সহকারী জজকে দিয়ে তদন্ত করান এবং সন্তুষ্ট হলে সুনির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে জমি বিক্রির অনুমতি প্রদান করেন। রায়ে বলা হয় কোন দাগের কতটুকু জমি কত টাকার কম দামে বিক্রি করা যাবে না এবং বিক্রির সমস্ত টাকা নাবালকের নামে সরকারি ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট (FDR) হিসেবে জমা রাখতে হবে।
বিজ্ঞ আদালত অত্যন্ত রক্ষণশীল। কেবল নিচের ৩টি চরম মানবিক ও অপরিহার্য কারণ প্রমাণিত হলেই জমি বিক্রির আদেশ দেওয়া হয়:
আদালতের অনুমতি ছাড়া মা, চাচা বা কোনো ব্যক্তি কর্তৃক নাবালকের জমি হস্তান্তরের আইনি স্থিতি:
| বিক্রেতার পরিচয় | বিক্রয় দলিলের ধরন | আদালতে আইনি ফলাফল |
|---|---|---|
| মা, ভাই বা চাচা (ডি ফ্যাক্টো অভিভাবক) | সম্পূর্ণ বাতিল দলিল (Void Deed) | আইনের চোখে শুরু থেকেই অস্তিত্বহীন; ক্রেতা কোনো মালিকানা পান না |
| আদালত নিযুক্ত অভিভাবক (অনুমতি ব্যতিরেকে) | বাতিলযোগ্য দলিল (Voidable Deed) | নাবালক সাবালক হয়ে মামলা করলে বিজ্ঞ আদালত তা বাতিল করে দেন |
| জেলা জজ আদালতের বৈধ অনুমতি সহকারে | শতভাগ বৈধ ও সুরক্ষিত দলিল | সাবালক হয়ে সন্তান এই দলিল চ্যালেঞ্জ করতে পারে না |
যদি আপনার নাবালক অবস্থায় আপনার মা বা চাচা অবৈধভাবে জমি বিক্রি করে থাকেন, তবে সাবালক হওয়ার সাথে সাথেই আপনাকে আদালতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
তামাদি আইন ১৯০৮ (The Limitation Act, 1908)-এর ৬ ও ৮ ধারা এবং প্রথম তফসিলের ৪৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী:
"নাবালক ব্যক্তি ১৮ বছর বয়স পূর্ণ (সাবালক) হওয়ার তারিখ হইতে ঠিক ৩ (তিন) বৎসরের মধ্যে দেওয়ানি আদালতে জমি উদ্ধারের মামলা দায়ের করিতে হইবে।"
অর্থাৎ ২১ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই মামলা করতে হবে। ২১ বছর পার হয়ে গেলে মামলা তামাদি দোষে বারিত হয়ে যেতে পারে (যদিও ডি ফ্যাক্টো অভিভাবকের ভয়েড দলিলের ক্ষেত্রে ১২ বছরের সময় পাওয়া যায়, তবুও ৩ বছরের মধ্যে মামলা করা সবচেয়ে নিরাপদ)।
ক্ষতিগ্রস্ত সাবালক ব্যক্তি সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দুটি প্রার্থনায় যৌথ মামলা দায়ের করবেন:
ক্রেতা যদি দাবি করেন—"আমি তো লাখ লাখ টাকা দিয়ে জমি কিনেছি, আমার কী হবে?" আইন অত্যন্ত কঠোর: ক্রেতাকে জমি ছেড়ে দিয়ে দখল ত্যাগ করতে হবে। ক্রেতা নাবালকের বিরুদ্ধে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারেন না। ক্রেতা কেবল যে মা বা চাচা টাকা নিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করে টাকা ফেরত চাইতে পারেন।
নাবালকের সম্পত্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের নজিরসমূহ:
১. ইমাদুদ্দিন বনাম আহমদ হোসেন (40 DLR): সুপ্রিম কোর্ট দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, মুসলিম আইনে মা কখনোই নাবালকের সম্পত্তির অভিভাবক নন; জেলা জজের পূর্বানুমতি ছাড়া মায়ের সম্পাদিত দলিল আইনত সম্পূর্ণ বাতিল (Void) এবং ক্রেতা কোনো স্বত্ব পায় না।
২. জাহানারা বেগম বনাম রাষ্ট্র (47 DLR AD): আপিল বিভাগ পরিষ্কার রায় দেন যে, নাবালক সাবালক হওয়ার পর নিজের পৈতৃক সম্পদ উদ্ধার করতে আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত কোনো আর্থিক বিবেচনায় দখলদারকে সুরক্ষা দেবেন না।
জমি কেনার সময় যদি দেখেন দাতার মধ্যে কোনো নাবালক সন্তান রয়েছে বা নাবালকের পক্ষে মা/চাচা সই করছেন, তবে সাবধান! বিজ্ঞ জেলা জজ আদালতের অনুমতির মূল সার্টিফাইড আদেশ ছাড়া ভুলেও এক পয়সা লেনদেন করবেন না। আর যদি আপনি এমন এক ভুক্তভোগী হন যার নাবালকত্বের সুযোগ নিয়ে অতীতে সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, তবে সময় নষ্ট না করে ২১ বছর বয়সের আগেই একজন দক্ষ দেওয়ানি আইনজীবীর মাধ্যমে দলিল বাতিলের মোকদ্দমা দায়ের করুন। আইন আপনার পৈতৃক হক ফিরিয়ে দিতে শতভাগ আপনার পক্ষে দাঁড়াবে।
দেওয়ানি আদালতে দলিল বাতিলের মামলার পাশাপাশি নাবালকের জমি প্রতারণামূলকভাবে বিক্রি করার দায়ে প্রতারক পক্ষ ও অসৎ ক্রেতার বিরুদ্ধে সরাসরি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায়। দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪২০ (প্রতারণা), ৪৬৫ ও ৪৬৮ (জালিয়াতি) এবং ৪০৬ (বিশ্বাসভঙ্গ) ধারায় মামলা করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করানো সম্ভব। যদি কোনো অসাধু ব্যক্তি নিজেকে নাবালকের বৈধ অভিভাবক সাজিয়ে ভুয়া কোর্ট অর্ডার দেখিয়ে জমি বিক্রি করে থাকে, তবে তা দণ্ডবিধির ৪৬৭ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ। নতুন ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৩ অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির জমি অন্যায়ভাবে দখল বা হস্তান্তর করা একটি জামিন-অযোগ্য অপরাধ। দেওয়ানি মোকদ্দমার সাথে সাথে ফৌজদারি নালিশ চালালে দখলদার আপস করে স্বেচ্ছায় জমি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।