লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-22 · ১৯ মিনিট
বাংলাদেশে পিতা মারা যাওয়ার পর অনেক পরিবারেই নাবালক সন্তানের সম্পত্তি নিয়ে ঘোরতর অন্যায় ও আইনবহির্ভূত হস্তান্তর ঘটে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মা, চাচা, মামা কিংবা সৎভাইরা নিজেদের 'স্বাভাবিক অভিভাবক' দাবি করে জেলা জজ আদালতের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকেই নাবালকের অংশ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গোপনে সাফ-কবলা দলিলে বিক্রি করে দেন। অথচ অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০ (Guardians and Wards Act, 1890)-এর সুস্পষ্ট বিধান হলো—আদালতের সুনির্দিষ্ট অনুমতি ছাড়া নাবালকের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয় বা বন্ধক দেওয়া আইনত বাতিলযোগ্য (Voidable)। কিন্তু সেই নাবালক যখন বড় হয়ে সাবালকত্ব অর্জন করে, তখন কীভাবে সেই বেদখল জমি উদ্ধার করবেন? কতদিনের মধ্যে আদালতে মামলা করতে হবে? সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold;text-decoration:underline;">অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম</a>-এর আদালতের বাস্তব দিকনির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো। চেম্বার পরামর্শে সরাসরি কল করুন: <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold;">01712655546</a>।
সাবালকত্ব আইন ১৮৭৫ (Majority Act, 1875) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সে নাবালক। তবে আদালত যদি কোনো নাবালকের জন্য অভিভাবক নিয়োগ করে, তবে তার ক্ষেত্রে সাবালকত্ব অর্জনের বয়স হয় ২১ বছর।
অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০-এর Section 29 অনুযায়ী, কোনো নিযুক্ত অভিভাবক আদালতের সুস্পষ্ট অনুমতি ছাড়া নাবালকের স্থাবর সম্পত্তি বিক্রয়, দান, বন্ধক কিংবা ৫ বছরের অধিক মেয়াদে লিজ দিতে পারেন না। জেলা জজ আদালত কেবল তখনই বিক্রির অনুমতি দেন যখন নাবালকের জীবনধারণ বা শিক্ষার একান্ত জরুরি প্রয়োজন (Legal Necessity) প্রমাণিত হয়।
বাস্তব জীবনে সবচেয়ে বড় ভুলটি ঘটে এখানেই। মুসলিম আইনে পিতার মৃত্যুর পর মা কিন্তু সম্পত্তির স্বত্বাধিকারী অভিভাবক (Legal Guardian) নন; মা হলেন কেবল নাবালকের শারীরিক প্রতিপালক (Custody বা হিজানতদার)। চাচা বা মামা হলেন অ-অভিভাবক (De facto Guardian)।
প্রিভি কাউন্সিলের ঐতিহাসিক মামলা Imambandi v. Mutsaddi এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অসংখ্য নজিরে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—মা বা চাচার নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি করার কোনো আইনগত ক্ষমতা নেই। তারা যদি নাবালকের অভিভাবক হিসেবে পরিচয় দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি বিক্রি করে দেন, তবে সেই দলিল আইনের চোখে এক পয়সারও কার্যকর স্বত্ব হস্তান্তর করে না।
অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন ১৮৯০-এর Section 30 অনুযায়ী, আদালতের অনুমতি ছাড়া নাবালকের সম্পত্তি হস্তান্তর আইনত Voidable at the instance of the minor — অর্থাৎ নাবালকের পক্ষে এই দলিলটি সম্পূর্ণ বাতিলযোগ্য।
নাবালক যখন শিশু থাকে, তখন সে তো আদালতে যেতে পারে না। তাই আইন তাকে সুরক্ষা দিয়েছে যে, সে যখন সাবালকত্ব অর্জন করবে এবং বুঝতে শিখবে যে তার শৈশবে তার জমি অন্যায়ভাবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল, তখন সে নিজেই আদালতে গিয়ে উক্ত দলিল বাতিল ঘোষণা করাতে পারবে।
এই মামলার সবচেয়ে মারাত্মক ও জীবনঘাতী টেকনিক্যাল বিষয় হলো তামাদির সময়সীমা (Limitation Period)। বহু মানুষ সঠিক সময়ে মামলা না করে আজীবনের জন্য পৈতৃক জমি হারান।
তামাদি আইন ১৯০৮-এর শিডিউল-১ এর Article 44 অনুযায়ী: নাবালক যে তারিখে ১৮ বছর বয়সে পদার্পণ করে সাবালক হবে, সেই তারিখ থেকে ঠিক ৩ (তিন) বছরের মধ্যে আদালতে বিক্রয় দলিল বাতিলের মামলা দায়ের করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ: কোনো ব্যক্তি যদি ১ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে ১৮ বছর পূর্ণ করে, তবে তাকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখের মধ্যেই আদালতে মোকদ্দমা রুজু করতে হবে। ২১ বছর পার হয়ে গেলে আদালত তামাদি আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী মামলাটি খারিজ করে দিতে বাধ্য।
সাবালক হওয়ার পর জমি পুনরুদ্ধারের জন্য সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে দেওয়ানি মোকদ্দমা দায়ের করার আইনি ধাপসমূহ:
জমির ক্রেতা যদি দাবি করে যে, সে না জেনে সম্পূর্ণ বাজারমূল্য দিয়ে কিনেছে (Bona fide purchaser for value without notice), তাহলেও আদালত নাবালকের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেবে। কারণ আইনের সাধারণ নীতি হলো: Nemo dat quod non habet (কারও যে স্বত্ব নেই, সে তা অন্যকে দিতে পারে না)। অভিভাবকের বিক্রি করার ক্ষমতাই যেখানে ছিল না, সেখানে ক্রেতা কোনো স্বত্ব দাবি করতে পারে না। তবে আদালত কিছু বিরল ক্ষেত্রে ইকুইটির খাতিরে ক্রেতাকে বিক্রেতার (অভিভাবকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে) ক্ষতিপূরণ আদায়ের অধিকার দিতে পারেন, কিন্তু নাবালকের জমি ফিরিয়ে দিতেই হবে।
নাবালকের জমি হস্তান্তরের মামলা দেওয়ানি আদালতের অত্যন্ত সূক্ষ্ম আইনগত দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। তামাদি গণনায় একদিনের ভুল কিংবা আরজিতে প্রতিকার প্রার্থনায় ত্রুটি থাকলে আদালত থেকে ডিক্রি পাওয়া সম্ভব নয়। আপনার শৈশবে যদি কোনো অভিভাবক অনুমতি ছাড়া পৈতৃক জমি বিক্রি করে থাকে এবং আপনি জমি ফেরত চান, তবে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলমের চেম্বারে সরাসরি পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন: 01712655546।