এনজিও ও সমবায় সমিতির অতিরিক্ত সুদের চাপ ও ব্ল্যাঙ্ক চেক মামলা থেকে সুরক্ষা ২০২৬

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-10

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশের প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত মানুষের অন্যতম বড় দুর্ভোগের নাম এনজিও (NGO), মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ ও দাদন ব্যবসায়ীদের অস্বাভাবিক চক্রবৃদ্ধি সুদের জাল। ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার সময় ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে স্বাক্ষরযুক্ত ফাঁকা চেক (Blank Cheque) এবং ফাঁকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক দস্তখত করিয়ে রাখা হয়। পরবর্তীতে কিস্তির মূল টাকা ও আসল সুদ পরিশোধ করে দেওয়ার পরও অতিরিক্ত চক্রবৃদ্ধি সুদ চাপিয়ে সেই ব্ল্যাঙ্ক চেকে ৫ লাখ বা ১০ লাখ টাকার অকাল্পনিক অঙ্ক বসিয়ে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট (NI Act)-এর ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনার মামলা দিয়ে গ্রাহককে জেলে পাঠানোর ভয় দেখানো হয়। অনেকেই জানেন না যে, ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (MRA) এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়ে ব্ল্যাঙ্ক চেকের অপব্যবহার সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। জানুন এই সুদের ফাঁদ ও মিথ্যা চেক মামলা থেকে আত্মরক্ষার পূর্ণাঙ্গ আইনি প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশে পরিচালিত সকল ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি অ্যাক্ট, ২০০৬ (MRA Act)-এর অধীন নিবন্ধিত ও নিয়ন্ত্রিত হতে বাধ্য। এমআরএ-এর সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ক্ষুদ্রঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার বাৎসরিক ২৪% (ডিক্লাইনিং মেথডে) নির্ধারিত।

⚠️ এনজিও ও সমবায় সমিতির সুদের সীমা লঙ্ঘন

কোনো এনজিও বা সমবায় সমিতি চক্রবৃদ্ধি হারে মাসিক ৫% বা ১০% হারে সুদ দাবি করলে তা সরাসরি অবৈধ। সমবায় অধিদপ্তর বা এমআরএ কোনো সমিতিকে সাধারণ জনগণের কাছে ব্যাংকিং করার বা চড়া সুদে ঋণের ব্যবসা করার অনুমতি দেয় না। এমন অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল এবং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারে।

ঋণ বিতরণের সময় কোনো গ্রাহকের কাছ থেকে ফাঁকা চেক নেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী নিষিদ্ধ। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এবং হাইকোর্ট বিভাগের একাধিক নজিরে (যেমন: আব্দুল কাদের চৌধুরী বনাম রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট রায়) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:

"A blank cheque obtained as security cannot be converted into a negotiable instrument for a magnified amount." অর্থাৎ জামানত হিসেবে রাখা চেকের কোনো আইনি কার্যকারিতা এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার ক্ষেত্রে নেই, যদি না ঋণগ্রহীতার সাথে সুনির্দিষ্ট অডিটকৃত দেনা-পাওনার হিসাব প্রমাণিত হয়।

তফসিলি ব্যাংকের অর্থ ঋণ মামলা এবং অননুমোদিত সমিতি বা ব্যক্তির চেকের মামলার আইনি পার্থক্য নিচে তুলে ধরা হলো:

বিবেচ্য বিষয়বৈধ তফসিলি ব্যাংক ঋণঅবৈধ সুদের কারবারি / এনজিও ব্ল্যাঙ্ক চেক
ঋণের কাগজপত্রস্যাংকশন লেটার, সিআইবি সম্মতি ও বন্ধকী দলিলমৌখিক ঋণ অথবা খালি স্ট্যাম্প ও ব্ল্যাঙ্ক চেক রাখা
সুদের বৈধতাবাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত সুদ হারের মধ্যে সীমাবদ্ধচক্রবৃদ্ধি হারে আকাশচুম্বী অনৈতিক সুদ দাবি
আদালতে মোকদ্দমাঅর্থ ঋণ আদালত আইন ২০০৩ অনুযায়ী পরিচালিতএনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারার অপব্যবহার (যা আদালতে খারিজযোগ্য)

যদি আপনার বিরুদ্ধে কোনো এনজিও বা সুদের দালাল মিথ্যা চেক মামলা ঠুকে দেয়, তবে ভয় না পেয়ে বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে এই ৪টি ধাপ অনুসরণ করুন:

  1. ১. সমন বা ওয়ারেন্টের পর দ্রুত জামিন গ্রহণ: দায়রা আদালতে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করুন। ১৩৮ ধারার মামলায় জামিন পাওয়া আসামির আইনগত অধিকার।
  2. ২. ৩৪৩ ধারায় আসামির পরীক্ষা ও ঋণ পাশবই দাখিল: এনজিওর দেওয়া কিস্তির পাশবই বা ব্যাংক স্লিপ দাখিল করে প্রমাণ করুন আপনি মূল টাকা পরিশোধ করে দিয়েছেন।
  3. ৩. হাতের লেখা ও কালির ফরেনসিক পরীক্ষা: চেকে আপনার শুধু স্বাক্ষর আছে কিন্তু অঙ্ক ও তারিখ অন্য কারও হাতে লেখা—এই মর্মে সিআইডির হস্তলিপি বিশারদ (Handwriting Expert) দিয়ে পরীক্ষার আবেদন করুন।
  4. ৪. কন্সিডারেশন (Consideration) অস্বীকার: এনআই অ্যাক্টের ১১৮ ধারা অনুযায়ী চেক ইস্যুর বিপরীতে যে বৈধ প্রতিদান (টাকা পাওয়ার কারণ) ছিল না, তা জেরা ও প্রমাণের মাধ্যমে আদালতকে দেখান।

ব্ল্যাঙ্ক চেক ফেরত না দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করলে গ্রাহকও চুপ করে বসে থাকবেন না। দণ্ডবিধির ৪০৬ (অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ), ৪২০ (প্রতারণা) এবং ৩৮৫/৫০৬ ধারায় (ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি) সংশ্লিষ্ট এনজিও কর্মকর্তা বা সুদের ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাল্টা ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যায়।

তাছাড়া মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) এর নির্বাহী ভাইস-চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ পাঠালে এনজিওর বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয় এবং অনেক সময় মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়।

বাংলাদেশে তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অর্থ ঋণ আদালত আইন ২০০৩ একটি বিশেষ আইন। কিন্তু সাধারণ এনজিও বা মাল্টিপারপাস সমিতিগুলো অর্থ ঋণ আদালতের অন্তর্ভুক্ত নয়; তারা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির অনুমোদিত শর্তে ঋণ বিতরণ করে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ আদায়ের জন্য কোনো এনজিও ফৌজদারি আদালতের এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ ধারায় চেক ডিজঅনারের মামলা দিয়ে সাধারণ মানুষকে কারাগারে পাঠাতে পারে না। যদি কোনো দেনা বকেয়া থাকে, তবে তা দেওয়ানি আদালতে 'মানি স্যুট' (Money Suit) দায়েরের মাধ্যমে মূল টাকা ও বৈধ সুদ হিসাব করে নিষ্পত্তি করতে হবে। চেককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অপচেষ্টা আদালত কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করছেন।

ঋণের সময় এনজিও বা দাদন ব্যবসায়ীরা প্রায়ই খালি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে আঙুলের ছাপ বা স্বাক্ষর নিয়ে রাখে। পরবর্তীতে সেখানে নিজেদের ইচ্ছেমতো বাড়ি বা জমি বিক্রির বায়নানামা বা কোটি টাকার ধারের শর্ত লিখে জাল দলিল তৈরি করে। দণ্ডবিধির ৪৬৭ (মূল্যবান জামানত জালিয়াতি) এবং ৪৬৮ ধারায় প্রতারণামূলক জালিয়াতির শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। যদি কেউ এমন স্ট্যাম্পের অপব্যবহার করে মামলা করে, তবে আদালতে উক্ত স্ট্যাম্পটির ভেন্ডার নম্বর, ক্রয় তারিখ এবং ব্যবহৃত কালির কেমিক্যাল টেস্টের জন্য আবেদন করতে হয়। স্ট্যাম্প জালিয়াতি প্রমাণিত হলে বাদী নিজেই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশে সুদের জুলুম থেকে দরিদ্র ও ঋণগ্রস্ত মানুষদের রক্ষা করতে একটি ঐতিহাসিক আইন বলবৎ রয়েছে, যা হলো দ্য ইউজুরিয়াস লোনস অ্যাক্ট, ১৯১৮ (Usurious Loans Act, 1918)। এই আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী আদালত যদি দেখতে পান যে ঋণের সুদের হার অস্বাভাবিক, নিপীড়নমূলক এবং অসম ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে জোরপূর্বক চুক্তি করা হয়েছে, তবে আদালত উক্ত সুদের হিসাব পুনরায় খুলে (Re-open the transaction) দিতে পারেন।

আদালত অতিরিক্ত সুদের সমুদয় দাবি বাতিল করে কেবল মূল ঋণের টাকা সরকার নির্ধারিত সুদে পরিশোধের কিস্তি বেঁধে দেওয়ার সর্বময় ক্ষমতা রাখেন। সুপ্রিম কোর্টের বহু রায়ে বলা হয়েছে, ব্যাংক হোক বা এনজিও, কোনো প্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে দাদন বা চক্রবৃদ্ধি সুদের শোষণ চালাতে পারে না। ঋণগ্রহীতা যদি সময়মতো এই আইনের সুবিধা গ্রহণ করেন, তবে এনজিওর কোটি টাকার মিথ্যা দাবি আদালত এক আদেশে নামিয়ে আনতে পারেন।

যদি কোনো এনজিও বা সমবায় সমিতি এমআরএ বিধিমালা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে গ্রাহকের দেওয়া জামানতের ফাঁকা চেক দিয়ে একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে চরম হয়রানি করে, তবে ভুক্তভোগী নাগরিক সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন (Writ Petition) দায়ের করতে পারেন।

উচ্চ আদালত প্রাথমিক শুনানিতে সুদের হিসাব ও লাইসেন্সের অসঙ্গতি দেখতে পেলে সংশ্লিষ্ট চেক মামলার বিচারিক কার্যক্রমের ওপর ৬ মাস বা ১ বছরের স্থগিতাদেশ (Stay Order) জারি করেন এবং এনজিওর কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে সরকারের সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে 'কারণ দর্শানোর রুল' (Rule Nisi) প্রদান করেন। এর ফলে ঋণগ্রহীতা তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারের ভয় বা জেল খাটার ঝুঁকি থেকে পূর্ণ সাংবিধানিক সুরক্ষা লাভ করেন।

⚖️ চেক ডিজঅনার ও সুদের মামলায় নির্ভরযোগ্য আইনি সুরক্ষা

চেকের মিথ্যা মামলায় অনেকেই না বুঝে জেল খাটেন বা ভয় পেয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দেন। অথচ সঠিক আইনগত আত্মরক্ষা নিলে এ ধরনের ব্ল্যাঙ্ক চেকের মামলা থেকে বেকসুর খালাস পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম এনআই অ্যাক্ট ও ব্যাংক ঋণ মামলায় বিশ্বস্ততার সাথে সুরক্ষা প্রদান করে আসছেন।

সরাসরি চেম্বার পরামর্শ বা মামলা মোকদ্দমার জন্য যোগাযোগ করুন:
📞 ফোন / হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৭১২৬৫৫৫৪৬ (01712655546)
📍 চেম্বার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন ভবন, ঢাকা।