নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টন ও উত্তরাধিকার আইন ২০২৬: সাক্ষ্য আইনের ১০৮ ধারা — ৭ বছর নিখোঁজ বিধান

লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-11 · 12 min read

⚠️ দাবিত্যাগ: এই নিবন্ধটি শুধুমাত্র সাধারণ আইনি তথ্যের জন্য। এটি আইনি পরামর্শ নয়। সরাসরি পরামর্শের জন্য +880 1712-655546-এ যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশে বিভিন্ন কারণে মানুষ নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশ হতে পারেন—নৌ বা সড়ক দুর্ঘটনা, প্রবাসে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নিরুদ্দেশ হওয়া কিংবা দুর্ভাগ্যজনকভাবে গুম বা অপহরণের শিকার হওয়া। কোনো পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, পিতা বা স্বামী যদি বছরের পর বছর নিখোঁজ থাকেন, তবে তার রেখে যাওয়া অসহায় পরিবার এক ভয়াবহ আইনি সংকটের মুখোমুখি হয়। স্ত্রী ও সন্তানরা পিতা বা স্বামীর রেখে যাওয়া জমিজমা বিক্রি করতে পারেন না, ব্যাংকে জমানো কোটি টাকা তুলতে পারেন না, এমনকি ওয়ারিশ সনদ বা নামজারিও করতে পারেন না; কারণ সরকারি অফিস ও সাব-রেজিস্ট্রার স্পষ্ট জানিয়ে দেন—'যেহেতু মৃত্যুর কোনো ডেথ সার্টিফিকেট নেই, তাই এই ব্যক্তিকে জীবিত ধরে সম্পত্তি হস্তান্তর করা সম্ভব নয়'। কিন্তু কোনো মানুষ কি অনন্তকাল নিখোঁজ থাকতে পারে? আইন কি পরিবারকে চিরকাল এই অসহায়ত্বের মধ্যে ফেলে রাখবে? কখনোই নয়। বাংলাদেশ সাক্ষ্য আইন ১৮৭২ (Evidence Act, 1872)-এর ১০৮ ধারায় নিখোঁজ ব্যক্তির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত যৌক্তিক 'আইনি মৃত্যুর অনুমান' (Presumption of Death)-এর বিধান রয়েছে। ২০২৬ সালের আধুনিক আইনি প্রক্রিয়ায় নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টন, আদালতের ডিক্রি ও ওয়ারিশদের স্বত্ব প্রতিষ্ঠার সম্পূর্ণ গাইড নিচে তুলে ধরা হলো।

: · ভূমি ও উত্তরাধিকার আইনজীবী ঢাকা

এক নজরে মূল তথ্য (Quick Answer Table)

বিষয় / শর্তসরকারি নিয়ম, ফি ও আইন (২০২৬)
প্রযোজ্য আইনমুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ ও ফারায়েজ আইন (হানাফি ফিকহ)
ছেলে ও মেয়ের অনুপাত২ : ১ (প্রত্যেক পুত্র ১ কন্যার দ্বিগুণ অংশ পাবে — সূরা নিসা ৪:১১)
স্ত্রীর ও স্বামীর অংশসন্তান থাকলে স্ত্রী ১/৮ অংশ (১২.৫%), স্বামী ১/৪ অংশ (২৫%)
মায়ের ও বাবার অংশসন্তান থাকলে মা ১/৬ অংশ (১৬.৬৭%) এবং বাবা ১/৬ অংশ
সরকারি খতিয়ান ও নামজারি পোর্টালland.gov.bd, eporcha.gov.bd ও dlrms.land.gov.bd
⚡ এক নজরে
📋 সূচিপত্র
  1. ১. নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশ ব্যক্তি (Mafqud) সংক্রান্ত আইনি সমস্যা ও বাস্তব জটিলতা
  2. ২. সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এর ধারা ১০৭ বনাম ধারা ১০৮: বেঁচে থাকার অনুমান বনাম মৃত্যুর অনুমান
  3. ৩. টানা ৭ বছর নিখোঁজ থাকার আইনি শর্ত ও প্রমাণের উপাদানসমূহ
  4. ৪. থানায় জিডি (General Diary) ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আবশ্যকতা
  5. ৫. দেওয়ানি আদালতে 'দেওয়ানি মৃত্যুর ঘোষণা' (Declaration of Civil Death) মোকদ্দমা
  6. ৬. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা ও দেওয়ানি ডিক্রি লাভের প্রক্রিয়া ২০২৬
  7. ৭. নিখোঁজ ব্যক্তির পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ দাবি করার নিয়ম
  8. ৭. আদালত কর্তৃক ডিক্রি পাওয়ার পর ওয়ারিশান সনদ ও উত্তরাধিকার নামজারি
  9. ১০. নিখোঁজ ব্যক্তির স্ত্রীর পুনর্বিবাহের আইনি নিয়ম: মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯
  10. ৮. ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ ও সঞ্চয়পত্র উত্তোলনে সাকসেশন সার্টিফিকেট (Succession Certificate)
  11. ৯. ইসলামী শরীয়াহ ও মুসলিম ফারায়েজ আইনে 'মাফকুদ' (নিখোঁজ ব্যক্তি)-এর সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম
  12. ১০. ডিক্রি লাভের পর নিখোঁজ ব্যক্তি হঠাৎ জীবিত ফিরে এলে সম্পত্তির কী হবে?
  13. ১১. সিনিয়র সিভিল ও পারিবারিক আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম ডি শাহ আলমের চেম্বারের আইনি গাইডলাইন

১. নিখোঁজ বা নিরুদ্দেশ ব্যক্তি (Mafqud) সংক্রান্ত আইনি সমস্যা ও বাস্তব জটিলতা

একটি পরিবারের পিতা বা স্বামী যখন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান, তখন প্রাথমিকভাবে পরিবার তার ফিরে আসার আশায় দিন গোনে। কিন্তু বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও যখন তার কোনো খোঁজ মেলে না, তখন সংসারের খরচ, সন্তানদের লেখাপড়া ও চিকিৎসা চালাতে গিয়ে তার রেখে যাওয়া স্থাবর সম্পত্তি বা ব্যাংক ব্যালেন্স ব্যবহারের অপরিহার্য প্রয়োজন দেখা দেয়। প্রশাসনিক ও আইনি বাধা: ১. সাব-রেজিস্ট্রার অফিস: নিখোঁজ ব্যক্তির জমি বিক্রি করতে গেলে সাব-রেজিস্ট্রার দলিলের অনুমতি দেন না, কারণ জীবিত ব্যক্তির জমি তার স্বাক্ষর ছাড়া ওয়ারিশরা বিক্রি করতে পারেন না। ২. ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে নমিনি বা ওয়ারিশরা টাকা তুলতে পারেন না কারণ সিটি কর্পোরেশনের ডেথ সার্টিফিকেট ছাড়া ব্যাংক টাকা রিলিজ করে না। ৩. এসি ল্যান্ড অফিস: ওয়ারিশদের নামে নামজারি বা জমাভাগ করতে অস্বীকার করে। এই সকল জটিলতা থেকে পরিবারকে মুক্ত করার একমাত্র আইনি চাবিকাঠি হলো উপযুক্ত আদালতের বিচারিক ঘোষণা।

২. সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এর ধারা ১০৭ বনাম ধারা ১০৮: বেঁচে থাকার অনুমান বনাম মৃত্যুর অনুমান

সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এ মানুষের জীবন ও মৃত্যুর অনুমান নিয়ে দুটি অত্যন্ত সুন্দর বিপরীতমুখী ধারা রয়েছে: - ধারা ১০৭ (Presumption of Life): যদি প্রমাণিত হয় যে কোনো ব্যক্তি বিগত ৩০ বছরের মধ্যে জীবিত ছিলেন, তবে আদালত ধরে নেবেন যে তিনি এখনও জীবিত আছেন; এবং যিনি দাবি করবেন যে তিনি মারা গেছেন, প্রমাণের ভার (Burden of Proof) তার ওপরই বর্তাবে। - ধারা ১০৮ (Presumption of Death - ১০৭ ধারার ব্যতিক্রম): কিন্তু ধারা ১০৮-এ বলা হয়েছে—যদি প্রমাণিত হয় যে উক্ত ব্যক্তি সম্পর্কে বিগত ৭ (সাত) বছর যাবৎ এমন কোনো ব্যক্তি কিছুই শোনেননি যারা স্বাভাবিকভাবেই তার সংবাদ পেতেন (যেমন তার স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, ভাই-বোন), তবে প্রমাণের ভার স্থানান্তরিত হয় এবং আদালত আইনত অনুমান করে নেন যে উক্ত ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন।

৩. টানা ৭ বছর নিখোঁজ থাকার আইনি শর্ত ও প্রমাণের উপাদানসমূহ

আদালতে ৭ বছর নিখোঁজ প্রমাণের জন্য নিম্নোক্ত শর্তগুলো শতভাগ পূরণ হতে হয়: ১. নিরবচ্ছিন্ন ৭ বছরের অনুপস্থিতি: ব্যক্তিটি যে তারিখে নিখোঁজ হয়েছিলেন, সেই দিন থেকে আদালতে মামলা দায়েরের তারিখ পর্যন্ত পূর্ণ ৭ বছর (৮৪ মাস) নিরবচ্ছিন্নভাবে পার হতে হবে। ২. সম্ভাব্য সংবাদদাতাদের অজ্ঞতা: নিখোঁজ ব্যক্তির সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব বা সহকর্মীদের কেউই তার কোনো জীবিত থাকার প্রমাণ, ফোন কল, চিঠি বা মেসেজ পাননি। ৩. স্বাভাবিক অনুসন্ধান পরিচালনা: পরিবার বসে থাকেনি, বরং আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, সম্ভাব্য সকল স্থান, হাসপাতাল ও কারাগারে খোঁজ নিয়েও তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।

৪. থানায় জিডি (General Diary) ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আবশ্যকতা

নিখোঁজ হওয়ার পরপরই এবং পরবর্তী আইনি লড়াইয়ের জন্য দুটি প্রাথমিক নথি আদালতের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে: ১. থানায় তাৎক্ষণিক সাধারণ ডায়েরি (GD): ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার দিন বা কয়েক দিনের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট থানায় একটি নিখোঁজ জিডি করতে হবে এবং জিডির সিলমোহরযুক্ত মূল কপি আজীবন ফাইলে সংরক্ষণ করতে হবে। জিডিতে ব্যক্তির ছবি, শারীরিক বর্ণনা ও শেষ দেখার স্থান সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। ২. জাতীয় পত্রিকায় নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি: কমপক্ষে একটি বহুল প্রচারিত বাংলা এবং একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে ছবিসহ 'নিখোঁজ সংবাদ' বা সন্ধানের বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতে হবে এবং পত্রিকার মূল কপি কেটে ফাইলে রাখতে হবে।

৫. দেওয়ানি আদালতে 'দেওয়ানি মৃত্যুর ঘোষণা' (Declaration of Civil Death) মোকদ্দমা

৭ বছর পূর্ণ হওয়ার পর পরিবারের ওয়ারিশগণ সরাসরি বিজ্ঞ দেওয়ানি আদালতে একটি মূল স্বত্ব মোকদ্দমা দায়ের করবেন। মোকদ্দমার শিরোনাম: 'দেওয়ানি মৃত্যুর ঘোষণামূলক মোকদ্দমা' (Suit for Declaration of Civil Death)। মামলায় বাদী হবেন নিখোঁজ ব্যক্তির বৈধ ওয়ারিশগণ (যেমন স্ত্রী ও সন্তানরা)। আর বিবাদী করা হবে সরকারকে (জেলা প্রশাসক - DC) অথবা কোনো দূরবর্তী আত্মীয়কে যারা পরবর্তীতে সম্পত্তিতে আপত্তি তুলতে পারে। একই সাথে নিখোঁজ ব্যক্তির নামেও সমন জারি করা হয়।

৬. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা ও দেওয়ানি ডিক্রি লাভের প্রক্রিয়া ২০২৬

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ (Specific Relief Act, 1877)-এর ধারা ৪২ হলো ঘোষণামূলক মোকদ্দমার ভিত্তি। আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া: ১. আরজি দাখিল: অভিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে সাক্ষ্য আইনের ১০৮ ধারা ও সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা উল্লেখ করে আরজি দাখিল। ২. পত্রিকায় সমন জারি: আদালত নিখোঁজ ব্যক্তির উদ্দেশ্যে জাতীয় পত্রিকায় ৩০ দিনের সময় দিয়ে বিশেষ সমন জারি করেন। ৩. সাক্ষ্যগ্রহণ (Evidence): শুনানির দিন বাদী (স্ত্রী বা সন্তান) এবং ২ জন স্থানীয় নিরপেক্ষ প্রতিবেশী কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জবানবন্দি দেবেন যে বিগত ৭ বছরে নিখোঁজ ব্যক্তির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ৪. চূড়ান্ত ডিক্রি: আদালত সন্তুষ্ট হলে রায় ও ডিক্রি প্রদান করবেন যে—'অমুক ব্যক্তি অমুক তারিখ থেকে নিখোঁজ থাকায় আইনের চোখে তিনি মৃত হিসেবে ঘোষিত হইলেন'।

৭. নিখোঁজ ব্যক্তির পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ দাবি করার নিয়ম

যদি নিখোঁজ ব্যক্তি কোনো সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী বা কর্মকর্তা হয়ে থাকেন, তবে তার চাকরিজনিত পাওনা যেমন পেনশন, গ্র্যাচুইটি, গ্রুপ বীমা এবং কল্যাণ তহবিলের অর্থ অবমুক্ত করার ক্ষেত্রেও এক বিশাল সমস্যা তৈরি হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের প্রচলিত পেনশন বিধিমালা অনুযায়ী কোনো কর্মচারী নিরুদ্দেশ হলে তার স্ত্রী বা বৈধ মনোনীত ওয়ারিশদের অনুকূলে পারিবারিক পেনশন চালু করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হয়। তবে চূড়ান্ত গ্র্যাচুইটি ও ভবিষ্য তহবিলের মোট অর্থ এককালীন তোলার জন্য সরকারি হিসাব রক্ষণ অফিস (AG Office) দেওয়ানি আদালতের সাক্ষ্য আইনের ১০৮ ধারা অনুযায়ী প্রদত্ত মৃত্যুর ডিক্রি ও সাকসেশন সার্টিফিকেট দাখিল করার শর্তারোপ করে। তাই আদালতের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এক্ষেত্রে পরিবারের সরকারি পাওনা আদায়ে অপরিহার্য চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে।
⚖️ আইনি কেস মূল্যায়ন ও চেম্বার অ্যাপয়েন্টমেন্ট

আপনার জমি বিরোধ, বাটোয়ারা মামলা, জামিন, তালাক বা সাইবার জটিলতায় বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে সুপ্রিম কোর্ট বা উত্তরা চেম্বারে নথিপত্রসহ সরাসরি বসুন।

জরুরি হোয়াটসঅ্যাপ সরাসরি কল: ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬

৭. আদালত কর্তৃক ডিক্রি পাওয়ার পর ওয়ারিশান সনদ ও উত্তরাধিকার নামজারি

দেওয়ানি আদালতের ডিক্রির সার্টিফায়েড কপি হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী প্রশাসনিক দরজাগুলো একে একে খুলে যায়: ধাপসমূহ: ১. স্থানীয় পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদে আদালতের ডিক্রি জমা দিয়ে আনুষ্ঠানিক 'ওয়ারিশান সনদ' (Succession Certificate) গ্রহণ করা। ২. স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে আবেদন করে নিখোঁজ ব্যক্তির জমি ওয়ারিশদের নামে 'ই-নামজারি' (e-Mutation) সম্পাদন। ৩. ওয়ারিশরা এখন নিজ নামে নতুন খতিয়ান পাবেন এবং চাইলে সেই জমি নিজেদের মধ্যে বণ্টন বা তৃতীয় পক্ষের কাছে নির্দ্বিধায় সাব-কবলা রেজিস্ট্রি করে বিক্রি করতে পারবেন।

১০. নিখোঁজ ব্যক্তির স্ত্রীর পুনর্বিবাহের আইনি নিয়ম: মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯

পিতা বা স্বামীর সম্পত্তির বাইরেও পরিবারের সবচেয়ে মানবিক সংকট তৈরি হয় নিখোঁজ ব্যক্তির বিবাহিতা স্ত্রীর জীবন নিয়ে। স্বামী নিরুদ্দেশ থাকলে স্ত্রী কি দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবেন? মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন ১৯৩৯ (Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939)-এর ধারা ২(১) অনুযায়ী যদি কোনো স্বামীর বিগত ৪ (চার) বছর যাবত কোনো সন্ধান বা অবস্থান জানা না যায়, তবে স্ত্রী সরাসরি উপযুক্ত পারিবারিক আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের (Dissolution of Marriage) মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন। আদালত তদন্ত ও শুনানির পর বিচ্ছেদের ডিক্রি দিলে স্ত্রী ইদ্দতকাল পালন শেষে নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন। পরবর্তীতে স্বামী ফিরে এলেও স্ত্রীর সেই দ্বিতীয় বিবাহ আইনসম্মত ও সম্পূর্ণ বৈধ থাকবে।

৮. ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ ও সঞ্চয়পত্র উত্তোলনে সাকসেশন সার্টিফিকেট (Succession Certificate)

নিখোঁজ ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যদি নগদ টাকা, ফিক্সড ডিপোজিট (FDR), ডিপিএস বা জাতীয় সঞ্চয়পত্র থাকে: সাকসেশন আইন ১৯২৫ (Succession Act, 1925): আদালতের মৃত্যুর ডিক্রি সহ বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ আদালতে 'উত্তরাধিকার সনদ' বা সাকসেশন কেস ফাইল করতে হবে। আদালত উত্তরাধিকারীদের হিস্যা অনুযায়ী টাকার অনুপাত নির্ধারণ করে সার্টিফিকেট প্রদান করবেন। উক্ত সার্টিফিকেট ব্যাংকে জমা দিলে ব্যাংক ম্যানেজার কোনো প্রকার আপত্তি ছাড়াই ওয়ারিশদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সম্পূর্ণ অর্থ পে-অর্ডারের মাধ্যমে স্থানান্তর করে দেবেন।

৯. ইসলামী শরীয়াহ ও মুসলিম ফারায়েজ আইনে 'মাফকুদ' (নিখোঁজ ব্যক্তি)-এর সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম

ইসলামিক আইনশাস্ত্রে নিখোঁজ ব্যক্তিকে বলা হয় 'মাফকুদ আল-খবর' (Mafqud-ul-Khabar)। শরীয়াহ ও আধুনিক আইনের সমন্বয়: - প্রাচীন ইমামদের মতে নিখোঁজ ব্যক্তির সমবয়সী ব্যক্তিরা মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করার মত থাকলেও আধুনিক হানাফি ও মালেকি ফিকহ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট সময় পর আদালতের ডিক্রির মাধ্যমে তার সম্পত্তি বণ্টন সম্পূর্ণ বৈধ। - বাংলাদেশ আইন অনুযায়ী সাক্ষ্য আইনের ১০৮ ধারার ৭ বছর মেয়াদই বিচার বিভাগীয়ভাবে চূড়ান্ত মানদণ্ড। - আদালত যখন মৃত্যুর ঘোষণা দেন, তখন থেকেই তার ফারায়েজ কার্যকর হয় এবং ইসলামিক ফারায়েজ অনুযায়ী স্ত্রী ১/৮ অংশ (সন্তান থাকলে) বা ১/৪ অংশ পাবেন এবং পুত্র ও কন্যারা ২:১ অনুপাতে বাকি সমুদয় সম্পত্তি লাভ করবেন।

১০. ডিক্রি লাভের পর নিখোঁজ ব্যক্তি হঠাৎ জীবিত ফিরে এলে সম্পত্তির কী হবে?

এটি একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ আইনি পরিস্থিতি—আদালতের ডিক্রি হয়ে সম্পত্তি ভাগ হয়ে যাওয়ার পর যদি নিখোঁজ ব্যক্তি ১০ বা ১৫ বছর পর অলৌকিকভাবে জীবিত ফিরে আসেন, তবে আইনের কী ব্যবস্থা? আইনগত পরিণতি: সাক্ষ্য আইনের ১০৮ ধারা মূলত একটি 'আইনি অনুমান' (Rebuttable Presumption)। ব্যক্তিটি জীবিত ফিরে আসায় সেই অনুমান মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ১. সম্পত্তি যদি ওয়ারিশদের হাতেই অবিভক্ত থাকে, তবে মূল ব্যক্তি তার সম্পত্তির পুনর্বহাল চাইতে পারেন। ২. কিন্তু ওয়ারিশরা যদি ইতিমধ্যে সরল বিশ্বাসে মূল্যের বিনিময়ে কোনো তৃতীয় পক্ষের নিকট জমিটি বিক্রি করে দেন (Bona-fide Purchaser), তবে ক্রেতার স্বত্ব বাতিল হবে না; ব্যক্তি তার ওয়ারিশদের কাছ থেকে বিক্রিত অর্থের ন্যায্য হিস্যা দাবি করতে পারবেন।

১১. সিনিয়র সিভিল ও পারিবারিক আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম ডি শাহ আলমের চেম্বারের আইনি গাইডলাইন

নিখোঁজ ব্যক্তির সম্পত্তি উদ্ধার একটি গভীর আইনি কৌশল ও আদালতের ডিক্রি অর্জনের ওপর নির্ভরশীল। সঠিক পন্থায় দেওয়ানি মামলা না চালালে পরিবার আজীবন উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। অ্যাডভোকেট এম ডি শাহ আলম সাহেবের চেম্বারের বিশেষায়িত সেবা: - নিখোঁজ ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় জিডি ও পত্রিকায় আইনি বিজ্ঞপ্তি ব্যবস্থাপনা। - সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা ও সাক্ষ্য আইনের ১০৮ ধারায় নিখোঁজ ব্যক্তির দেওয়ানি মৃত্যুর ডিক্রি লাভ। - ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রের অর্থ রিলিজের জন্য যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দ্রুত সাকসেশন সার্টিফিকেট অর্জন। - ওয়ারিশদের নামে জমি ই-নামজারি ও আপস বণ্টনের পূর্ণাঙ্গ আইনি সমাধান। - চেম্বার যোগাযোগের ঠিকানা: রুম নং ২০৮ ও ২১৪, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবন, পুরাতন কোর্ট চত্বর, ঢাকা। ফোন: ০১৭১১-৯৪৬১৯৮ / ০১৭৩১৮৪১৯১৯।

সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

কত বছর নিখোঁজ থাকলে আদালত মৃত ঘোষণা করতে পারেন?

সাক্ষ্য আইন ১৮৭২-এর ১০৮ ধারা অনুযায়ী টানা ৭ (সাত) বছর ধরে কোনো ব্যক্তির সংবাদ পাওয়া না গেলে আদালত তাকে মৃত হিসেবে ঘোষণা করতে পারেন।

নিখোঁজ স্বামীর সম্পত্তি কি স্ত্রী সরাসরি বিক্রি করতে পারে?

না। দেওয়ানি আদালত থেকে সাক্ষ্য আইনের ১০৮ ধারায় মৃত্যুর ডিক্রি এবং ওয়ারিশান সনদ গ্রহণ ব্যতীত স্ত্রী বা সন্তানরা সরাসরি জমি বিক্রি করতে পারেন না।

নিখোঁজ ব্যক্তির ব্যাংক একাউন্টের টাকা কীভাবে তোলা যায়?

আদালত থেকে মৃত্যুর ঘোষণার ডিক্রি পাওয়ার পর বিজ্ঞ আদালতে সাকসেশন কেস করে সাকসেশন সার্টিফিকেট নিয়ে ব্যাংকে জমা দিলে ব্যাংক টাকা পরিশোধ করে।

নিখোঁজ ব্যক্তির মামলায় প্রধান প্রমাণ কী?

থানার নিখোঁজ জিডি, পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি এবং নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের শপথযুক্ত সাক্ষ্য আদালতে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।

আদালত থেকে মৃত্যুর ডিক্রি পেতে কতদিন সময় লাগে?

কাগজপত্র ও সাক্ষী প্রস্তুত থাকলে দেওয়ানি আদালতে সমন জারি ও শুনানির মাধ্যমে সাধারণত ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে ডিক্রি লাভ করা সম্ভব।

দায়বর্জন (Disclaimer): এই আর্টিকেলে পরিবেশিত তথ্যসমূহ কেবল আইনি সচেতনতা ও সাধারণ শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। এটি কোনো প্রত্যক্ষ আইনি পরামর্শ (Legal Advice) নয় এবং এর মাধ্যমে কোনো আইনজীবী-মক্কেল সম্পর্ক (Attorney-Client Relationship) তৈরি হয় না। আপনার সুনির্দিষ্ট মামলার আইনি প্রতিকারের জন্য সরাসরি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বা জজ কোর্টের তালিকাভুক্ত বিজ্ঞ আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন।
আইনি সহায়তা বা জরুরি পরামর্শের প্রয়োজন?
যোগাযোগ করুন এডভোকেট মোঃ শাহ আলম: +880 1712-655546  |  WhatsApp
উত্তরা চেম্বার: বাড়ি ৪৬, রোড ৬/বি, সেক্টর ১২, উত্তরা, ঢাকা-১২৩০
কোর্ট চেম্বার: আইনজীবী সমিতি ভবন, ৪র্থ তলা, ৬/৭ কোর্ট হাউস স্ট্রিট, কোতোয়ালি, ঢাকা-১১০০