লেখক: অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম · 2026-09-06 · ১৭ মিনিট
<p>জমিজমা বা স্থাবর সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধে দেওয়ানি আদালত যখন কোনো সম্পত্তিতে উভয় পক্ষকে স্থিতাবস্থা (Status Quo) বা কোনো পক্ষকে স্থাপনা নির্মাণ ও জমি হস্তান্তরে "অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা" (Temporary Injunction) প্রদান করেন, তখন অনেকে ভুলবশত মনে করেন এটি কেবল কাগজের হুকুম, পুলিশ না থাকলে কিছু হবে না। এই দুঃসাহসে ভর করে এলাকার অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিপক্ষ আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার আদেশ থাকা সত্ত্বেও রাতের আঁধারে জমিতে বাউন্ডারি ওয়াল তুলে ফেলে, গাছপালা কেটে ফেলে কিংবা জমি অন্য কারো কাছে গোপনে বিক্রি করে দেয়। কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশ অমান্য করা আইনের চোখে চরম ঔদ্ধত্য এবং আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল। দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর আদেশ ৩৯ নিয়ম ২(৩) [Order XXXIX Rule 2(3) CPC] এবং আদালত অবমাননা আইন অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গকারীকে বিজ্ঞ আদালত সরাসরি <strong>দেওয়ানি কারাগারে (Civil Jail) ৬ মাসের জন্য বন্দি রাখার নির্দেশ দিতে পারেন এবং তার সমস্ত সম্পত্তি ক্রোক ও নিলাম করার ক্ষমতা রাখেন।</strong> আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য হলে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ কীভাবে তাৎক্ষণিক বিচারকের কাছে প্রতিকার চাইবেন এবং দখলদারকে কীভাবে পুলিশ দিয়ে শায়েস্তা করবেন—তার বাস্তবসম্মত আইনি রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো। আইনি পরামর্শে: <a href="/advocate-md-shah-alam" style="color:var(--gold);font-weight:bold">অ্যাডভোকেট মোঃ শাহ আলম</a> — <a href="tel:01712655546" style="color:var(--gold);font-weight:bold">📞 01712655546</a></p>
| বিষয় / শর্ত | সরকারি নিয়ম, ফি ও আইন (২০২৬) |
|---|---|
| প্রযোজ্য আইন ও আদালত | বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (CrPC) ও সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ |
| আগাম ও নিয়মিত জামিন | হাইকোর্ট বিভাগে আগাম জামিন (ধারা ৪৯৮ CrPC) ও ম্যাজিস্ট্রেট/দায়রা আদালতে নিয়মিত জামিন |
| সরকারি পোর্টাল ও যাচাই | supremecourt.gov.bd, judiciary.gov.bd, pcc.police.gov.bd ও land.gov.bd |
| জরুরি আইনি পরামর্শ চেম্বার | অ্যাডভোকেট মো. শাহ আলম (বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট) — ০১৭১২-৬৫৫৫৪৬ |
দেওয়ানি মোকদ্দমা একটি দীর্ঘমেয়াদী বিচারিক প্রক্রিয়া। একটি স্বত্ব বা বাটোয়ারা মোকদ্দমা দায়ের করার পর তা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এই বিচার চলাকালীন বিবাদী যদি বিরোধীয় জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে ফেলে, পুকুর ভরাট করে ফেলে কিংবা জমিটি কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করে হস্তান্তর করে দেয়, তবে মামলার শেষে বাদী জয়ী হলেও সেই রায়ের কোনো কার্যকারিতা থাকে না।
মামলার বিষয়বস্তুর প্রকৃতি যেন কোনোভাবেই পরিবর্তিত না হয় এবং বাদী যেন অপূরণীয় ক্ষতির (Irreparable Loss) সম্মুখীন না হন, সে জন্য সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ৫৩ ধারা এবং দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর আদেশ ৩৯ নিয়ম ১ ও ২ অনুযায়ী আদালত "অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা" (Temporary Injunction) জারি করেন। এর মাধ্যমে মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্পত্তিতে কোনো প্রকার পরিবর্তন সাধন বা হস্তান্তর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।
সাধারণ মানুষ প্রায়ই নিষেধাজ্ঞা ও স্থিতাবস্থাকে গুলিয়ে ফেলেন:
দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর আদেশ ৩৯ নিয়ম ২(৩) [Order XXXIX Rule 2(3)] এ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের পরিণতির কথা বলা হয়েছে:
"নিষেধাজ্ঞা অমান্য বা শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে যে আদালত উক্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়াছিলেন, সেই আদালত আদেশ অমান্যকারী ব্যক্তির সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবেন এবং উক্ত ব্যক্তিকে অনধিক ৬ (ছয়) মাস মেয়াদের জন্য দেওয়ানি কারাগারে আটক রাখিবার আদেশ দিতে পারিবেন।"
এই বিধির অধীনে আদালত একই সাথে দুটি মারাত্মক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন:
প্রতিপক্ষ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কাজ শুরু করলে বাদী হিসেবে আপনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত সম্পূর্ণ আইনি ও কৌশলী:
পদক্ষেপ ১: অকাট্য প্রামাণ্য চিত্র সংগ্রহ: জমিতে নির্মাণ সামগ্রী (ইট, বালু, রড), শ্রমিকদের কাজ করার দৃশ্য এবং প্রতিপক্ষের উপস্থিতির স্পষ্ট তারিখ ও সময় সংবলিত ভিডিও ও রঙিন ফটোগ্রাফ তুলে রাখুন।
পদক্ষেপ ২: স্থানীয় থানায় অবহিতকরণ: আদালতের নিষেধাজ্ঞার সার্টিফাইড কপি সাথে নিয়ে স্থানীয় থানার ওসি (OC) বরাবরে দ্রুত একটি আবেদন বা জিডি (GD) করুন যাতে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে শান্তি বজায় রাখার জন্য কাজ বন্ধ করতে পারে।
পদক্ষেপ ৩: আইনজীবীর মাধ্যমে ভায়োলেশন পিটিশন: সময় নষ্ট না করে আদালতে দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৯ আদেশ ২(৩) নিয়ম মতে মিস মোকদ্দমা দায়ের করুন।
যে আদালত মূল নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছিলেন, ঠিক সেই আদালতেই বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে "বিবিধ মোকদ্দমা (ইনজাংশন ভায়োলেশন)" বা Misc Case দায়ের করতে হয়।
মামলা পরিচালনার ধাপসমূহ:
আদালত আদেশ ৩৯ নিয়ম ২(৪) অনুযায়ী অমান্যকারীর সম্পত্তি ক্রোক করার পর এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। এক বছর পরেও যদি বিবাদী তার অবৈধ স্থাপনা নিজ খরচে অপসারণ না করে, তবে আদালত উক্ত ক্রোককৃত সম্পত্তি সরাসরি নিলামে বিক্রি করেন এবং বিক্রির টাকা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বাদীকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করে অবশিষ্টাংশ মূল মালিককে ফেরত দেন।
আপনার জমি বিরোধ, বাটোয়ারা মামলা, জামিন, তালাক বা সাইবার জটিলতায় বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিতে সুপ্রিম কোর্ট বা উত্তরা চেম্বারে নথিপত্রসহ সরাসরি বসুন।
দেওয়ানি জেলে পাঠানো সাধারণ ফৌজদারি কয়েদির মতো নয়। এখানে আদালত অবমাননাকারীকে জেলহাজতে আটকে রাখার সমস্ত দৈনিক খাদ্য খরচ (Subsistence Allowance) প্রাথমিকভাবে বাদী আদালতে সরকারি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দেন, যা পরবর্তীতে বিবাদীর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ডিক্রি জারির মাধ্যমে আদায় করা হয়। জেলে থাকা অবস্থায় বিবাদী যদি ভুল স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং অবৈধ স্থাপনা ভেঙে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে রাজি হয়, তবে আদালত তাকে মুক্তি দিতে পারেন।
অনেক সময় ভায়োলেশন মামলার দীর্ঘ শুনানির অপেক্ষায় থাকলে জমিতে ভবন উঠে যাবে। তাই সবচেয়ে দ্রুততম ও কার্যকর হাতিয়ার হলো একই সাথে বিজ্ঞ দেওয়ানি আদালতে "পুলিশ সহায়তার দরখাস্ত" (Application for Police Help under Section 151 CPC) পেশ করা।
আদালত তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (OC) সরাসরি নির্দেশ দেন যাতে বিরোধীয় সম্পত্তিতে কোনো প্রকার নতুন নির্মাণকাজ বা পরিবর্তন হতে না দেওয়া হয় এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা শতভাগ বলবৎ রাখা হয়। পুলিশ এই নির্দেশ পাওয়ার সাথে সাথে জমিতে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয় এবং অমান্যকারীদের গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করে।
অনেকে মনে করেন যে কোনোভাবে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে একবার ভবন বা দেয়াল তুলে ফেলতে পারলে আদালত আর তা ভাঙবেন না—এটি সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা।
সুপ্রিম কোর্টের প্রতিষ্ঠিত নজির অনুযায়ী, আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যদি কোনো পক্ষ জমিতে কোনো প্রাচীর বা বহুতল ভবনও নির্মাণ করে ফেলে, তবে আদালত তাকে কোনো বৈধতার সুযোগ দেবেন না। আদালত দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫১ ধারায় "বাধ্যতামূলক আদেশ" (Mandatory Injunction) প্রদান করে সরকারি খরচে বা নাজিরের মাধ্যমে বুলডোজার দিয়ে সেই অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেবেন এবং সমস্ত ভাঙচুরের খরচ বিবাদীর কাছ থেকে আদায় করবেন।
নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের কয়েকটি যুগান্তকারী রায়:
১. মোঃ সামসুল আলম বনাম হাবিবুর রহমান (45 DLR): আদালত রায় দেন যে, আদালতের আদেশের কথা জেনেও যে ব্যক্তি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সম্পত্তিতে কোনো পরিবর্তন আনে, সে আইনের দৃষ্টিতে একজন চরম অবমাননাকারী এবং তাকে অবিলম্বে দেওয়ানি জেলে প্রেরণ করতে হবে।
২. জহিরুল ইসলাম বনাম বাংলাদেশ (49 DLR AD): মাননীয় আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নির্মিত যেকোনো স্থাপনা আদালত ভেঙে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সম্পূর্ণ ক্ষমতাবান; অবৈধ নির্মাণকারী কোনো ন্যায়বিচার বা ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে না।
আদালত থেকে ইনজাংশন পাওয়ার পর বাদীকে নিচের পদক্ষেপগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে:
আদালতের নিষেধাজ্ঞার আদেশ হলো রাষ্ট্রের আইনগত সার্বভৌমত্বের প্রতীক। কোনো ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, আদালতের আদেশ অমান্য করে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ আইনে নেই। প্রতিপক্ষ আদালতের আদেশ ভঙ্গ করলে ভয় পাবেন না বা মারামারিতে জড়াবেন না। সুশৃঙ্খলভাবে ভিডিও ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে আপনার বিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আদেশ ৩৯ নিয়ম ২(৩) এবং পুলিশ সহায়তার আবেদন পেশ করুন। আদালতের হাত অত্যন্ত শক্তিশালী; আইন অমান্যকারীকে কারাগারে যেতেই হবে এবং আপনার জমির পবিত্রতা শতভাগ সুরক্ষিত থাকবে।
দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৩৯ নিয়ম ২(৩) অনুযায়ী বিজ্ঞ আদালত নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ৬ (ছয়) মাস পর্যন্ত দেওয়ানি কারাগারে আটক রাখার নির্দেশ দিতে পারেন।
হ্যাঁ, আদালতের আদেশ অমান্য করে নির্মিত যেকোনো স্থাপনা আদালত পরবর্তীতে বাধ্যতামূলক আদেশের (Mandatory Injunction) মাধ্যমে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে পারেন।
সবচেয়ে দ্রুততম উপায় হলো দেওয়ানি আদালতে ধারা ১৫১ সিপিসি মতে জরুরি "পুলিশ সহায়তার দরখাস্ত" (Police Help) দাখিল করা, যাতে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ৫২ ধারা (Doctrine of Lis Pendens) অনুযায়ী বিচারাধীন মামলায় কৃত বিক্রয় বাতিল ও অকার্যকর হবে এবং ক্রেতা কোনো আইনি স্বত্ব পাবেন না।
অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা সাধারণত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকে। তবে নির্দিষ্ট সময়সীমার নিষেধাজ্ঞা থাকলে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা নবায়নের আবেদন করতে হয়।